শহরের শেষ ট্রেনটা রাত সাড়ে ন’টায় ছাড়ে।
তখন প্ল্যাটফর্মে মানুষ কমে আসে, শব্দ
কমে আসে, এমনকি লোহার ওপর লোহার ঘষার যে দীর্ঘশ্বাস,
সেটাও যেন ধীরে ধীরে নিভে যায়। রেলস্টেশনের বুকের ভিতর জমে থাকা
আলো তখন হলুদ, ক্লান্ত, আর
সামান্য দুঃখী। ঠিক সেই সময়ে এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ান প্ল্যাটফর্মের এক কোণে। তার
হাতে একটা বাদামি খাম, আর চোখে এমন এক দৃষ্টি, যেন তিনি কাউকে খুঁজছেনও না, আবার হারিয়েও
যেতে চান না।
বৃদ্ধটির নাম নুরুল হক। শহরের মানুষ
তাকে চিনত না। কিন্তু শহরের পুরোনো গাছগুলো, ভেজা ইটের দেয়ালগুলো, আর স্টেশনের বিক্রেতারা
তাকে অনেকদিন ধরে দেখে আসছিল। কেউ জানত, তিনি প্রতিদিন
একবার করে আসেন। কেউ জানত, তিনি কারও জন্য অপেক্ষা করেন।
আর কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে বলত, ‘এ লোকটা মনে হয় নিজের
অতীতের সঙ্গে দেখা করতে আসে।’
সেদিন ট্রেন আসতে দেরি করছিল। দূরে
কালো আকাশের ভর করে একটি সাদা
আলো এগিয়ে আসছিল। নুরুল হক প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে খামটা খুললেন। ভিতরে ছিল
দুটি জিনিস, একটি পুরোনো চিঠি, আর
একটি ছোট্ট শুষ্ক ফুল, একদিন লাল ছিল, এখন ধূসর হ’য়ে গেছে।
চিঠিটা পড়তে পড়তে তার ঠোঁট কেঁপে
উঠল।
‘নুরুল,
তুমি যদি একদিন ফিরে আসো, আমাকে খুঁজে
পাবে না। আমি তবু অপেক্ষা করব, তোমার শেষ ট্রেনের শব্দে,
তোমার না বলা কথার ভেতরে, আর সেই
জানালায় যেখান দিয়ে তুমি একদিন তাকিয়ে ছিলে।
‘তোমার রওশন’
নুরুল হকের চোখে জল এলো,
কিন্তু তা পড়ল না। যেন অশ্রু তার ভেতরেই থেমে গেল, এক গভীর কূপের জলে। তিনি চিঠিটা ভাঁজ করে আবার খামে রাখলেন। ফুলটা হাতে
নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই ফুলটি তাঁকে একসময় রওশন দিয়েছিল। তখন তারা তরুণ।
নদীর ধারে, খোলা মাঠে, আর
শালিকের ডাকের ভেতর তাদের দিন কেটেছিল। নুরুল স্বপ্ন দেখতেন বড় শহরে যাবেন,
কাজ করবেন, টাকা পাঠাবেন, ফিরে এসে ঘর তুলবেন। রওশন বলেছিল, ‘টাকা পাঠিও,
কিন্তু নিজেকে পাঠাতে ভুলো না।’
তিনি ভোলেননি। শুধু ফিরতে দেরি
করেছিলেন। তারপর আর ফেরা হয়নি।
জীবন তাকে টেনে নিয়ে গেছে অন্যখানে,
কারখানার শব্দ, কাঁচা রোদ, অসুস্থ বাবা, ছেলের স্কুল ফি, ভাঙা ঘরের ছাদ, ঋণের দলিল। একটার পর একটা বছর
কেটে গেছে। মাঝের সময়ে রওশন কোথায় গেছে, কেমন আছে,
কার সঙ্গে আছে ,কিছুই তিনি ঠিক জানতেন
না। শুধু একদিন খবর পেয়েছিলেন, রওশন বেঁচে নেই। তারপর
থেকেই তিনি প্রতিদিন এই স্টেশনে আসেন। যেন শেষ ট্রেনের জানালা দিয়ে অন্তত একবার
তার মুখ দেখা যায়।
ট্রেন এসে থামল। হুইসেলের শব্দে রাত
কেঁপে উঠল। যাত্রী নেমে গেল, কেউ
উঠল। দরজার পাশে দাঁড়ানো কনডাক্টরের গলায় বিরক্তির ছাপ। নুরুল হক উঠে দাঁড়ালেন
না। তিনি শুধু জানালার দিকে তাকালেন। গাঢ় কাচের ভেতর নিজের অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব
দেখলেন, একজন ক্লান্ত মানুষ, যার
চুল সাদা, কাঁধ নত, আর পিঠে বহন
করা বয়সের ওজন যেন তাকে ভেঙে দিয়েছে।
ঠিক তখনই পাশের বেঞ্চে বসা এক ছোট
মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘দাদু, আপনি কাকে দেখছেন?’
নুরুল হক চমকে উঠলেন। মেয়েটির বয়স
খুব বেশি নয়, দশ কি এগারো হবে।
হাতে স্কুলের ব্যাগ, মুখে কৌতূহল। তার মায়ের হয়তো তখনও
টিকিট কাটা হয়নি, কিংবা অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নুরুল হক মৃদু হেসে বললেন,
‘একজন মানুষকে।’
‘এখনও কি দেখা যায়?’
‘সব মানুষ দেখা যায়
না। কিছু মানুষ থাকে ভেতরে।’
মেয়েটি এই উত্তর বুঝল কি না,
জানা গেল না। সে শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমার মা বলে, মানুষ না থাকলেও তার
অপেক্ষা থাকে।’
এই কথায় নুরুল হক স্থির হ’য়ে গেলেন। যেন অনেকদিন আগে হারিয়ে যাওয়া একটি সুর হঠাৎ কানের পাশে
ফিরে এলো। তিনি মেয়েটির দিকে তাকালেন। তার মুখে কোনো রহস্য ছিল না, ছিল কেবল শিশুর সরল সত্য। নুরুল হক ধীরে ধীরে বললেন,
‘তোমার মা খুব ঠিক কথা বলে।’
ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার সংকেত বাজল।
নুরুল হক তখনও বসে আছেন। ট্রেনের জানালাগুলো চোখের মতো এক এক করে চলতে লাগল। এক
জানালার ভিতর তিনি দেখলেন নিজেরই প্রতিবিম্বের পাশে রওশনকে,
না, ঠিক দেখা নয়; যেন স্মৃতির ধূসর কাঁচে তার মুখ ফু’টে উঠল।
রওশনের চুল গায়ে হাওয়ার মতো উড়ছে, গলায় সেই পুরোনো
লাল ওড়না, আর চোখে সেই অপরিমেয় অপেক্ষা, যা একদিন ছিল প্রেম, পরে ছিল অভিমান, তারপর নীরবতা।
ট্রেন একটু দূরে এগিয়ে গেল। আলো
ম্লান হতে লাগল। আর ঠিক তখনই নুরুল হকের হাত থেকে শুষ্ক ফুলটি মাটিতে পড়ে গেল।
তিনি নিচু হয়ে ফুলটি তুলতে গিয়ে
থেমে গেলেন। মাটির ওপর, স্টেশনের নোংরা ফাঁকে,
একটি নতুন কুঁড়ি দেখা গেল, অতি ছোট,
অতি সবুজ, যেন পরাজিত সময়ের বু’কের ভেতরও জীবন লুকিয়ে থাকে। তিনি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। কোনো
বৃষ্টি হয়নি, কোনো মালী আসেনি, তবু
সেই কুঁড়ি যেন রাতের মধ্যেও একটি অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি।
তখন নুরুল হক হঠাৎ বুঝলেন,
তিনি এতদিন কাকে খুঁজতে আসতেন?
রওশনকে?
নাকি সেই মানুষটিকে, যে একদিন ফিরে না
এসে নিজেকেই হারিয়েছিল?
তিনি খামটি পকেটে রেখে ধীরে ধীরে
প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। পেছনে স্টেশনের হলুদ আলো পড়ে তার
ছায়া দীর্ঘ হলো, তারপর ছোট। একদম
শেষ প্রান্তে পৌঁছে তিনি একবার থামলেন, আকাশের দিকে
তাকালেন, আর নিঃশব্দে বললেন,
‘এইবার আমি ফিরলাম।’
সেই রাতের পরে,
নুরুল হক আর প্রতিদিন স্টেশনে যাননি।
কিন্তু শহরের প্রান্তে, এক ছোট উঠোনে,
তিনি একটি শিউলি গাছ লাগিয়েছিলেন।
বর্ষা শেষে প্রথম যে ভোরে গাছটি ফুল দিল, পাড়ার লোকেরা দেখল,একজন বৃদ্ধ বেঞ্চে বসে
আছেন, হাতে বাদামি খাম নেই, কিন্তু
চোখে আছে এমন এক শান্তি, যেন বহু বছর পর কোনো দীর্ঘ
প্রতীক্ষা অবশেষে মানুষকে তার নিজের ঘরে ফিরিয়ে দিয়েছে।
আর দূর থেকে হঠাৎ মনে হলো,
শেষ ট্রেনের হুইসেল নয়, কেউ যেন অনেক
দূর থেকে খুব নরম করে ডাকছে:
‘নুরুল।’
তিনি ফিরে তাকালেন না।
কারণ কিছু ডাকের উত্তর দেওয়া হয় না।
কিছু ডাক মানুষকে শুধু আরও একবার বাঁচিয়ে তোলে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন