বছরের শেষ বিকেলগুলো অদ্ভুত হয়।
সূর্য তখন যেন পৃথিবীর কাছাকাছি নেমে আসে, আলো হ’য়ে ওঠে কোমল, আর
মানুষের মন অকারণে পুরোনো দিনের দিকে হাঁটতে শুরু ক’রে।
এমনই এক বিকেলে বৃদ্ধ আবদুল কাদের নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর বয়স পঞ্চাশ কাছাকাছি। চুলের সাদা রং দেখে মনে হয় শীত যেন অনেক আগেই এসে তাঁর
মাথায় স্থায়ী বাসা বেঁধেছে। শরীর এখনও শক্ত, কিন্তু
চোখে একটি দীর্ঘ ক্লান্তি। যে ক্লান্তি পথ চলার নয়, অপেক্ষার।
নদীর নাম মধুমতী। একসময় এই নদীর বুক চিরে নৌকা চলত, মাঝিদের ভাটিয়ালি গান ভেসে আসত দূর গ্রাম
থেকে। এখন নদী অনেক শান্ত। আগের মতো ঢেউ নেই, কোলাহল নেই।
শুধু জল আছে, আর আছে সময়ের মতো ধীরে ধীরে ব’য়ে চলা স্রোত।
কাদের সাহেব প্রতিদিন বিকেলে এখানে
আসেন। গ্রামের মানুষ বিষয়টি জানে। কেউ কেউ বলে, তিনি নদী দেখতে আসেন। কেউ বলে, তিনি মৃত
স্ত্রীর স্মৃতি খুঁজতে আসেন। আবার অনেকে বিশ্বাস করে, তিনি
এমন একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা করেন, যে আর কখনো ফিরবে
না।
সত্যিটা কেউ জানত না।
ঘাটের পাশে একটি পুরোনো বটগাছ। তার
ছায়ায় বসে কাদের সাহেব একটি টিনের বাক্স খুললেন। বাক্সটি ছোট,
কিন্তু যত্নে রাখা। ভিতরে কয়েকটি হলদে হ’য়ে যাওয়া চিঠি, একটি সাদা-কালো ছবি, আর একটি শুকিয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার ফুল।
ছবিটিতে দুইজন মানুষ।
একজন তরুণ কাদের।
আরেকজন মেয়ে।
মেয়েটির নাম নীলা।
আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে, এই নদীর তীরেই তাদের প্রথম দেখা
হয়েছিল।
তখন কাদের কলেজে পড়েন। স্বপ্ন ছিল
অনেক বড়। শহরে যাবেন, বড় চাকরি করবেন,
পরিবারের অভাব দূর করবেন। আর নীলা? সে
ছিল গ্রামের স্কুলশিক্ষকের মেয়ে। বই পড়তে ভালোবাসত। রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ
বলতে পারত। সন্ধ্যায় নদীর ধারে বসে আকাশের রং বদলানো দেখত। চাঁপাফুলের
গন্ধে বুক ভরে নিতো।
তাদের প্রেম শুরু হয়েছিল কোনো
নাটকীয় ঘটনায় নয়।
একটি বই দিয়ে।
একদিন নীলার হাত থেকে একটি উপন্যাস
নদীতে পড়ে গিয়েছিল। কাদের ঝাঁপিয়ে পড়ে বইটি তুলে এনেছিলেন। বইটির অর্ধেক ভিজে
গিয়েছিল, কিন্তু সেই দিন থেকে দুজনের জীবনের গল্প
ভিজে গিয়েছিল একে অপরের অনুভূতিতে।
তারপর দীর্ঘ সময়।
চিঠি।
দেখা।
স্বপ্ন।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
নীলা বলত,
‘মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, স্মৃতি।’
কাদের হেসে বলতেন,
‘স্মৃতি দিয়ে তো সংসার চলে না।’
নীলা জবাব দিত,
‘সংসার টাকা দিয়ে চলে, জীবন চলে স্মৃতি
দিয়ে।’
তখন কাদের কথাটার গভীরতা বুঝতেন না।
যৌবন সাধারণত ভবিষ্যতের দিকে তাকায়।
অতীতের মূল্য বোঝে না।
কলেজ শেষ হওয়ার পর কাদের শহরে চলে যায়। চাকরি পেলেন। জীবন ব্যস্ত হ’য়ে উঠল।
প্রথমদিকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। তারপর মাসে একবার। তারপর দুই মাসে একবার। তারপর...
নীরবতা।
নীলা অপেক্ষা করত।
প্রথমে জানালার পাশে।
তারপর উঠোনে।
তারপর নদীর ঘাটে।
একসময় মানুষ অপেক্ষা করতে করতে নিজেই
অপেক্ষায় পরিণত হয়।
নীলাও হয়েছিল।
বছর কেটে গেল।
কাদের জীবনে দায়িত্ব বাড়ল। বাবা
অসুস্থ হলেন। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ। চাকরির চাপ। পদোন্নতির লড়াই।
এর মাঝে কোথাও নীলার জন্য লেখা শেষ
চিঠিটি পাঠানো হয়নি।
চিঠিটি আজও টিনের বাক্সে আছে।
হলুদ হ’য়ে যাওয়া সেই কাগজে লেখা,
‘নীলা,
আর একটু অপেক্ষা করো। সব গুছিয়ে তোমার কাছে ফিরব।’
কিন্তু তিনি ফেরেননি।
যখন ফিরলেন,
তখন অনেক দেরি হ’য়ে গেছে।
গ্রামে এসে শুনলেন,
নীলা আর নেই।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর সে মারা গেছে।
শেষ সময়েও নাকি সে নদীর দিকে তাকিয়ে
থাকত।
লোকজন বলত,
সে কারও জন্য অপেক্ষা করছে।
সেদিন প্রথমবার কাদের বুঝেছিলেন,
সময় শুধু মানুষকে বুড়ো করে না, কখনও
কখনও তাকে অপরাধীও ক’রে তোলে।
এরপর বহু বছর কেটে গেছে।
তিনি বিয়ে করেছিলেন।
সন্তান হয়েছে।
সংসার করেছেন।
দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিন্তু জীবনের গভীরে কোথাও একটি
অসমাপ্ত দরজা খোলা র’য়ে গেছে।
আজও।
প্রতিদিন।
সেই দরজার বাতাস তিনি অনুভব করেন।
বিকেলের আলো ক্রমে ফিকে হ’য়ে আসছিল।
নদীর ওপারে তখন সূর্যের শেষ রঙ
ছড়িয়ে পড়েছে।
ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন একটি ছোট
ছেলে ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছে।
বয়স দশ-এগারোর বেশি নয়।
ছেলেটি জলে পাথর ছুঁড়ছিল।
একটি।
দুটি।
তিনটি।
তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
‘দাদু, আপনি প্রতিদিন এখানে আসেন কেন?’
কাদের একটু চমকে গেলেন।
হেসে বললেন,
‘নদী দেখতে।’
ছেলেটি মাথা নাড়ল।
‘না। মানুষ শুধু নদী
দেখতে এতদিন আসে না।’
কাদের চুপ করে রইলেন।
ছেলেটি আবার বলল,
‘আপনি কি কাউকে মিস
করেন?’
বৃদ্ধের বুকের ভেতর হঠাৎ যেন পুরোনো
একটি ব্যথা নড়ে উঠল।
অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন,
‘হ্যাঁ।’
‘সে কি আর ফিরবে না?’
কাদের নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
‘না।’
ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ ক’রে থাকল।
তারপর খুব সহজভাবে বলল,
‘তাহলে আপনি কেন
অপেক্ষা করেন?’
প্রশ্নটি যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এলো।
সত্যিই তো।
কেন?
কাদের কখনও নিজেকে এই প্রশ্ন করেননি।
তিনি কি নীলার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?
না কি নিজের ক্ষমার জন্য?
মানুষ কখনও কখনও অন্য কাউকে নয়,
নিজের হারিয়ে যাওয়া অংশকে খুঁজতে থাকে।
হয়তো তিনি সেই মানুষটিকে খুঁজছিলেন,
যে একদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ফিরে
আসবে।
কিন্তু আসেনি।
সন্ধ্যা নেমে এলো।
আজানের ধ্বনি ভেসে এলো দূরের মসজিদ
থেকে।
নদীর ওপারে একটি ক’রে আলো জ্বলতে শুরু করল।
ঠিক তখন কাদেরের মনে হলো,
নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে কেউ যেন হাসছে।
সেই হাসি তিনি চেনেন।
বিশ বছর আগের।
নদীর বাতাসে ভেসে আসা।
অপেক্ষায় ভেজা।
নীলার হাসি।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
মনে হলো,
কেউ খুব ধীরে বলছে,
‘এতদিন পরও এলে?’
কাদেরের চোখ ভিজে উঠল।
জীবনে প্রথমবার তিনি উত্তর দিলেন,
‘হ্যাঁ। কিন্তু অনেক
দেরি করে।’
বাতাস বইল।
শিমুলের পাতা কাঁপল।
নদীর জল অন্ধকার হ’য়ে গেল।
আর সেই মুহূর্তে কাদের অনুভব করলেন,
ক্ষমা হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব ঘটনা।
কেউ শব্দ করে ক্ষমা করে না।
কেউ ঘোষণা দেয় না।
শুধু একসময় হৃদয়ের ভার একটু হালকা হ’য়ে যায়।
সেদিন তিনি টিনের বাক্স খুলে শেষ
চিঠিটি বের করলেন।
ধীরে ধীরে ছিঁড়ে ফেললেন।
তারপর টুকরোগুলো নদীর জলে ভাসিয়ে
দিলেন।
কাগজগুলো ভেসে যেতে লাগল।
দূরে।
আরও দূরে।
যেন অর্ধশতাব্দীর জমে থাকা অনুতাপ
স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাত নেমে এল সম্পূর্ণ।
আকাশে একে একে তারা ফুটল।
কাদের সাহেব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন।
আজ তাঁর পদক্ষেপ আগের চেয়ে হালকা।
পেছনে নদী র’য়ে গেল।
রয়ে গেল স্মৃতি।
রয়ে গেল ভালোবাসা।
কিন্তু অপেক্ষা রইল না।
কারণ তিনি অবশেষে বুঝেছেন,ভালোবাসার শেষ পরিণতি সবসময় মিলন নয়।
কখনও কখনও ভালোবাসার সবচেয়ে বড়
সৌন্দর্য হলো, তাকে মুক্তি দিতে
পারা।
আর নদীর ওপারে যে আলো এতদিন ধরে
জ্বলছিল, সেটি কোনো মানুষের নয়।
সেটি ছিল তাঁর নিজের হৃদয়ের আলো,
যেখানে নীলা এখনও বেঁচে আছে,
একটি বিকেলের রোদ হ’য়ে,
একটি অসমাপ্ত কবিতা হ’য়ে,
একটি দীর্ঘশ্বাস হ’য়ে,
আর এক জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুতাপ হ’য়ে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন