বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, আন্দোলন, রাষ্ট্রগঠন আর
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস নয়; এটি বুদ্ধির, বিবেকের, ভাষার এবং আত্মমর্যাদারও
ইতিহাস। এই ইতিহাসে যে গোষ্ঠীটি সবচেয়ে গভীরভাবে উপস্থিত থেকেছে, সবচেয়ে বেশি আঘাত
পেয়েছে, আবার সবচেয়ে বেশি দায়িত্বও বহন করেছে, তারা হলো বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী। ‘বুদ্ধিজীবী’
শব্দটি এখানে কেবল পেশাগত শিক্ষিত মানুষদের নির্দেশ করে না; এটি এমন এক মানসিক ও
নৈতিক অবস্থান, যেখানে মানুষ সমাজকে দেখে, সমাজের পক্ষে কথা বলে, অন্যায়ের
বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সত্যকে রক্ষা ক’রে এবং নিজের বুদ্ধিকে কেবল জীবিকার অস্ত্র না
বানিয়ে বিবেকের আলোতে রূপান্তরিত ক’রে। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী তাই শুধু
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মী নন; তিনি
ইতিহাসের সাক্ষী, সমাজের অন্তর্জাগতিক অনুবাদক, জাতির চেতনার রক্ষক এবং সংকটের
মুহূর্তে নীরব বা উচ্চকিত এক নৈতিক কণ্ঠস্বর। এই দেশের বুদ্ধিজীবীকে বুঝতে হলে
আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, এই ভূখণ্ডে বুদ্ধিজীবী হওয়া কখনোই নিরাপদ ছিল না; এটি
ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, বিরোধপূর্ণ, প্রায়শই নিঃসঙ্গ এবং অনেক সময় প্রাণঘাতী এক অবস্থান।
উপনিবেশিক শাসন, ভাষা-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, রাজনৈতিক দমন, মতাদর্শিক
বিভাজন, দলীয় আনুগত্যের সংকট এবং বাজারমুখী সংস্কৃতির বিস্তার। এই সবকিছুর মধ্য
দিয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা বারবার পরীক্ষা দিয়েছেন; কেউ উত্তীর্ণ হয়েছেন, কেউ
ব্যর্থ হয়েছেন, কেউ আপস করেছেন, কেউ প্রতিবাদে উজ্জ্বল হয়েছেন, আবার কেউ নীরব থেকে
গেছেন। তবু মোটের উপর বলা যায়, বাংলাদেশের জাতিসত্তা গঠনে বুদ্ধিজীবীদের অবদান
অপরিসীম, এবং এই অবদানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের কোনো পূর্ণাঙ্গ পাঠ সম্ভব
নয়।
বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীর জন্ম মূলত ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর
দিয়ে। ব্রিটিশ শাসন নতুন শিক্ষাব্যবস্থা, ছাপাখানা, পত্রিকা, কলেজ-বিদ্যালয়,
প্রশাসনিক চাকরি এবং পাশ্চাত্য ভাবধারার মধ্য দিয়ে এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির
সৃষ্টি ক’রে, যারা একদিকে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, অন্যদিকে তার সমালোচক।
এই দ্বৈত অবস্থান থেকেই বাঙালি বুদ্ধিজীবীর উত্থান। কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি
নবজাগরণ মুসলিম সমাজে সমানভাবে বিকশিত না হলেও তার অভিঘাত এই ভূখণ্ডে এসে পৌঁছায়।
সাহিত্য, সাংবাদিকতা, আইন, শিক্ষকতা, চিকিৎসা, প্রশাসন, এসব পেশা হ’য়ে ওঠে বুদ্ধির
চর্চাক্ষেত্র। কিন্তু এ দেশের বুদ্ধিজীবীকে কখনোই কেবল বইপড়া মানুষ হিসেবে দেখা
যাবে না; কারণ বাংলার মুসলিম সমাজ, হিন্দু সমাজ, গ্রামীণ সমাজ এবং শহুরে সমাজ, সবখানেই
তিনি সামাজিক নেতৃত্ব, সংস্কারবাদ, শিক্ষা বিস্তার, ভাষা আন্দোলন এবং আত্মপরিচয়ের
প্রশ্নে ভূমিকা রেখেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল হুসেন, আবদুল হক, বুদ্ধদেব বসু,
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদ, আবুল মনসুর আহমদ, শামসুর রাহমান,
হুমায়ুন আজাদ, আল মাহমুদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, জহির রায়হান, হাসান হাফিজুর রহমান,
সিকান্দার আবু জাফর, আহমদ ছফা, এই নামগুলো কেবল সাহিত্যিকের নয়; এরা প্রত্যেকে
সমাজ-মনন, রাষ্ট্রচিন্তা এবং জাতীয় আত্মসচেতনতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের
বুদ্ধিজীবী ঐতিহাসিকভাবে সাহিত্যিক সংস্কৃতির সঙ্গে বাঁধা, কারণ বাংলায় সাহিত্যই
দীর্ঘকাল রাজনৈতিক ভাষ্য, সামাজিক প্রতিবাদ এবং জাতিগত আত্মপ্রকাশের প্রধান বাহন
ছিল। এ কারণে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীকে বুঝতে হলে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ,
সাংবাদিকতা, গান, নাটক, চলচ্চিত্র, সবকিছুর আন্তঃসম্পর্ক বুঝতে হয়।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ভাষা আন্দোলন।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল মাতৃভাষার দাবিতে তরুণদের আত্মদান ছিল না; এটি
ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্রোহ, আর এর পেছনে যে মননশীল
প্রস্তুতি ছিল, তার মূল চালিকা শক্তি ছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। মাতৃভাষার মর্যাদা,
শিক্ষার মাধ্যম, সাহিত্যচর্চার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক ভাষার প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক
অধিকার, এসব বিষয় শুধু রাজপথের স্লোগান দিয়ে সম্ভব হয়নি; এগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক
ভিত্তি তৈরি করেছিলেন শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। ভাষা আন্দোলনের
পর বাঙালি বুদ্ধিজীবী আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম
নয়, এটি ক্ষমতার, পরিচয়ের এবং প্রতিরোধেরও মাধ্যম। পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন উর্দুকে
একক রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তখন পূর্ববাংলার বুদ্ধিজীবীরা এর
বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গ’ড়ে তুলেছিলেন, তা কেবল সাংস্কৃতিক নয়, রাজনৈতিকও ছিল। এই
প্রতিরোধের ভিত থেকেই পরবর্তীতে ষাটের দশকের স্বায়ত্তশাসনের দাবি, গণতান্ত্রিক
আন্দোলন, ষড়যন্ত্রবিরোধী বয়ান এবং অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শক্তিশালী হয়। বলা
যায়, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের নৈতিক কর্তৃত্ব
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং জাতিকে শিখিয়েছিলেন যে বুদ্ধি যদি মেরুদণ্ড না হয়, তবে তা
কেবল চাকরি-নির্ভর নিস্তেজ তথ্যসম্ভার হ’য়ে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা ছিল আরও
জটিল, গভীর এবং বেদনাময়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত ছিল না; এটি ছিল একটি
জাতির অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা দুইভাবে অগ্রণী ছিলেন, এক,
সংগ্রামের পক্ষে মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি; দুই, যুদ্ধশেষে একটি নতুন
রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণের চিন্তা। মুক্তিযুদ্ধের সময়
সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, অনেকে সরাসরি সংগ্রামে যুক্ত
হন, অনেকে প্রবাসী সরকারকে সহায়তা করেন, অনেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেন,
আবার অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থী শিবিরে কাজ করেন। কিন্তু একই সঙ্গে পাকিস্তানি
বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী সবচেয়ে নির্মম আক্রমণটি
চালায় বুদ্ধিজীবীদের ওপর। ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের
ইতিহাসের এক গভীরতম ক্ষত। এই হত্যাকাণ্ড আকস্মিক ছিল না; এটি ছিল সুপরিকল্পিত।
কারণ দখলদার শক্তি জানত, যুদ্ধ জেতা বা হারা এক কথা, কিন্তু একটি জাতির
বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিলে তার ভবিষ্যৎকে দুর্বল করা যায়। তাই শিক্ষক,
লেখক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই
হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী একদিকে শহীদের মর্যাদায় উন্নীত হন,
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার চিরন্তন প্রশ্ন হ’য়ে ওঠেন। প্রশ্ন থেকে যায়: যে জাতি
তার বুদ্ধিজীবীদের যথাযথ নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে জাতি কি সত্যিই নিজের
ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে পারে? ১৯৭১-এর শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের কেবল অতীতের স্মৃতি
নন, তারা আমাদের বর্তমানের দায়। তারা শিখিয়ে গেছেন, বুদ্ধিজীবী হওয়া মানে সুবিধার
পাশে দাঁড়ানো নয়; বরং সংকটের মুহূর্তে সত্যের পক্ষে জীবন বাজি রাখা।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রারম্ভিক পর্যায়ে বুদ্ধিজীবীদের সামনে
নতুন এক জটিলতা দেখা দেয়। যুদ্ধজয়ের পর একটি রাষ্ট্র গঠন সহজ কাজ নয়; আরও কঠিন হয়
যখন সেই রাষ্ট্রের ভিতর ভাঙন, দুর্নীতি, ক্ষুধা, দলীয়করণ, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা,
আদর্শিক বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক হত্যা কাজ করতে থাকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের
বুদ্ধিজীবীরা একদিকে উন্নয়ন, সমাজগঠন, শিক্ষা সংস্কার, ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ,
গণতন্ত্রের সুরক্ষা এবং মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার পক্ষে কথা বলেন; অন্যদিকে তাঁরা
ক্ষমতার কেন্দ্রের সমালোচক হিসেবেও আবির্ভূত হন। এই সময়ে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা আরও
নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হ’য়ে ওঠে। কারণ স্বাধীনতার পর অবাধ প্রশংসার সুযোগ থাকে,
কিন্তু সত্য কথা বলার সাহসই তখন আসল পরীক্ষার জায়গা। অনেক বুদ্ধিজীবী রাষ্ট্রের
নীতিনির্ধারণে যুক্ত হন, কেউ পত্রিকায় কলাম লিখে জনমত গঠন করেন, কেউ
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করেন, কেউ নাটকে, উপন্যাসে, কবিতায়,
চলচ্চিত্রে সমাজের অসঙ্গতি উন্মোচন করেন। কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যায়, বুদ্ধিজীবীর
সংজ্ঞাও সংকুচিত হতে থাকে। ধীরে-ধীরে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি এমন এক শ্রেণির সঙ্গে
যুক্ত হয় যারা বড় বড় কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে জনগণের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে সংযোগ
হারিয়ে ফেলে; আবার অনেকে দলীয় আনুগত্যকে বুদ্ধিবৃত্তির বিকল্প বানিয়ে ফেলেন। এভাবে
বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ভেতর নৈতিক বিভাজন সৃষ্টি হয়। কেউ থাকেন জনগণের পক্ষে, কেউ
ক্ষমতার পাশে, কেউ বাজারের সঙ্গে, কেউ ব্যক্তিগত খ্যাতির সেবায়। ফলে বাংলাদেশের
বুদ্ধিজীবীর ইতিহাস কেবল গৌরবের নয়; এটি আত্মসমালোচনারও ইতিহাস।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীকে সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় তার সংকটে। কারণ
সুস্থ সমাজে বুদ্ধিজীবীর উপস্থিতি সবসময় ততটা দৃশ্যমান নয়, যতটা দৃশ্যমান হয়
সংকটকালে। সামরিক শাসন, জরুরি অবস্থা, গণতন্ত্রহীনতা, মতপ্রকাশের সংকোচন,
সাম্প্রদায়িক উগ্রতা, সাম্প্রতিক প্রযুক্তিনির্ভর অপতথ্য, এসবের মধ্য দিয়ে
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী বারবার পরীক্ষিত হয়েছেন। ১৯৭৫-এর পর রাজনৈতিক অস্থিরতা,
সামরিক শাসন ও মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতার যুগে বুদ্ধিজীবীরা কেউ প্রকাশ্যে, কেউ
গোপনে, কেউ সাহিত্যিক প্রতীকের ভেতর দিয়ে, কেউ বা পত্রিকার স্তম্ভে রাষ্ট্রক্ষমতার
সমালোচনা করেছেন। শামসুর রাহমানের কবিতা শহরের ভাঙন, অবরুদ্ধ চেতনা, স্বৈরশাসনের
ভয়, নাগরিক আশাভঙ্গ এবং আবারও স্বপ্ন দেখার শক্তিকে ধারণ ক’রে। আহমদ ছফার প্রবন্ধ
ও উপন্যাস বাঙালি মুসলমানের মানসিক সংকট, আত্মপরিচয়ের জটিলতা, মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি
এবং রাষ্ট্র-সমাজের দ্বিমুখী চরিত্রকে নির্মমভাবে উন্মোচন ক’রে। হাসান হাফিজুর
রহমান, নির্মলেন্দু গুণ, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ, আবুল হাসান, শামসুর রাহমান, সৈয়দ
শামসুল হক, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আজাদ, আনোয়ার পাশা, জাহানারা
ইমাম, প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের মনন-ইতিহাসে জায়গা ক’রে নিয়েছেন। কেউ
রাজপথের সঙ্গে, কেউ ভাষার সঙ্গে, কেউ নারীর সঙ্গে, কেউ শ্রেণি-সংগ্রামের সঙ্গে,
কেউ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, কেউ ব্যক্তি-স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ফলে
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী একরৈখিক নন; তিনি বহুস্বরিক, বহুমাত্রিক, কখনো
দ্বিধাগ্রস্ত, কখনো বেপরোয়া, কখনো সাহসী, কখনো আপসহীন, আবার কখনো পরাজিত। এই
বৈচিত্র্যই তাকে জীবন্ত রাখে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার
শহর-নির্ভরতা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা বা সিলেটকেন্দ্রিক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক পরিসর বুদ্ধিজীবী উৎপাদনের
প্রধান কেন্দ্র হ’য়ে উঠেছে। কিন্তু শহর-নির্ভর এই বুদ্ধিজীবীতা সবসময় গ্রামবাংলার
বাস্তবতার সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের সমাজের বিশাল অংশ কৃষক, শ্রমিক,
মৎস্যজীবী, হকার, রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক, অভিবাসী শ্রমিক, প্রান্তিক নারী
এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত; তাদের জীবন, ভাষা, যন্ত্রণা, অভিজ্ঞতা এবং আশা অনেক
সময় শহুরে বুদ্ধিজীবীর আলোচনায় প্রতীকী হ’য়ে থাকে, কিন্তু পূর্ণতা পায় না। এ-জায়গায়
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি যতটা ইংরেজি, তত্ত্ব,
ইউরোপীয় দর্শন ও নগরজীবনের সংকট নিয়ে আলোচনা করেন, ততটা গ্রামের ঋণ, ভূমি-বঞ্চনা,
নদীভাঙন, উপকূলীয় দুর্যোগ, শ্রমশোষণ, শিশুশ্রম, নারী নির্যাতন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং
শিক্ষাবৈষম্য নিয়ে সরাসরি সক্রিয় নন। অথচ বাংলাদেশের প্রকৃত বুদ্ধিজীবী হওয়ার অর্থ
কেবল বইয়ের ভাষায় সমাজ বিশ্লেষণ করা নয়; বরং সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তরের মানুষের
দুঃখকে নিজের চিন্তার কেন্দ্রে আনা। যে বুদ্ধিজীবী কৃষকের মাঠে দাঁড়াতে পারেন না,
শ্রমিকের ঘামে নিজেকে চিনতে পারেন না, নারীশ্রমের অদৃশ্য অবদানকে সম্মান করতে
পারেন না, তিনি হয়তো পণ্ডিত, কিন্তু তিনি পূর্ণ অর্থে জনগণের বুদ্ধিজীবী নন।
নারী বুদ্ধিজীবীদের কথা বললে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন একটি
মাত্রা খুলে যায়। দীর্ঘদিন ধরে বুদ্ধিজীবীর চিত্র পুরুষকেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু
বাংলাদেশের নারী লেখক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, গবেষক, শিল্পী ও সমাজকর্মীরা এই
ধারণাকে ক্রমশ ভেঙে দিয়েছেন। সুফিয়া কামাল, সেলিনা হোসেন, তাহমিনা আনাম, রোকেয়া
সুলতানা, নাসরীন জাহান, নাসরীন এ রহমান, বেলা রেজা, মেহের আফরোজ শাওন, শিরীন
আখতার, তারানা হালিম, রোকেয়া প্রাচী, জাহানারা ইমাম এবং আরও অনেকে নারী অভিজ্ঞতা,
শরীর, পরিবার, জাতিসত্তা, শিক্ষা, অধিকার এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নকে বুদ্ধিবৃত্তিক
আলোচনার কেন্দ্রে এনেছেন। বিশেষ ক’রে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এই অঞ্চলের নারীবাদী
বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের এক অনন্য অগ্রদূত। তিনি দেখিয়েছেন, নারীকে যদি কেবল
সামাজিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে জাতির অর্ধেক সম্ভাবনা নষ্ট হয়।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ইতিহাসে নারী বুদ্ধিজীবীরা শুধু নারী বিষয় নিয়ে লেখেননি;
তাঁরা রাষ্ট্র, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, আধুনিকতা এবং ন্যায়বিচার নিয়েও
কথা বলেছেন। এ-কারণে নারী বুদ্ধিজীবীদের অবদানকে আলাদা সংযোজন হিসেবে নয়, বরং
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নারী ছাড়া
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ইতিহাস অসম্পূর্ণ, কারণ নারীই সেই অর্ধাংশ, যার অভিজ্ঞতা
ছাড়া সমাজ-বাস্তবতা বোঝা অসম্ভব।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো
ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক। বাংলা ভাষা শুধু সাহিত্যচর্চার মাধ্যম নয়;
এটি বুদ্ধিজীবীর নৈতিক অবস্থানেরও চিহ্ন। এই দেশে অনেক বুদ্ধিজীবী ইংরেজিতে
লিখেছেন, বিদেশি তত্ত্বে চিন্তা করেছেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করেছেন; তবু
তাঁদের সার্থকতা নির্ভর করেছে বাংলার মাটি, নদী, স্মৃতি, জনজীবন, দুর্ভিক্ষ, শহর,
গ্রাম এবং সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। বাংলা ভাষা এত সমৃদ্ধ যে এটি কেবল আবেগ
প্রকাশের ভাষা নয়; এটি বিশ্লেষণ, প্রতিবাদ, রস, ইতিহাস, দর্শন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতারও
ভাষা। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী তাই ভাষার প্রতি সংবেদনশীল। তাঁর কাছে শব্দ শুধু
অলংকার নয়, শব্দ হলো দায়িত্ব। তিনি জানেন, একটি যথাযথ শব্দ একটি জনতার অভিমানকে
রূপ দিতে পারে। একটি সাহসী বাক্য স্বৈরশক্তির মুখোশ উন্মোচন করতে পারে, একটি
কবিতার পঙ্ক্তি বহু মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী অগ্নিসংযোগ ঘটাতে পারে। এই
ভাষা-চেতনার কারণেই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সাহিত্য ও রাজনীতির মধ্যে সেতুবন্ধন
রচনা করেছেন। একদিকে তিনি নন্দনতত্ত্বের প্রশ্ন তোলেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের
ন্যায়-অন্যায় বিচার করেন। এই দ্বৈত ভূমিকা তাঁকে অনন্য ক’রে তুলেছে।
তবে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর প্রতি সমালোচনাও জরুরি। কারণ শুধু
গৌরবগাথা বললে সত্যের একটি বড় অংশ আড়াল হ’য়ে যায়। বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী
দলনির্ভর হ’য়ে পড়েছেন, কেউ কেউ অনুদাননির্ভর, কেউ কেউ সংবাদমাধ্যমনির্ভর, কেউ আবার
একাডেমিক সাফল্যকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন। অনেকে বক্তৃতায় মুক্তচিন্তার কথা
বললেও বাস্তবে সংকীর্ণতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সত্যের
কণ্ঠ রুদ্ধ করেছেন, কেউ বিদেশি তত্ত্বের মোহে দেশীয় বাস্তবতাকে তুচ্ছ ভেবেছেন, কেউ
আবার জনমানুষের ভাষাকে অবজ্ঞা ক’রে কেবল আভিজাত্যমূলক বৌদ্ধিকতা প্রদর্শন করেছেন।
এইসব প্রবণতা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে দুর্বল করেছে। সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী
কখনো কেবল অভিজাত শ্রোতামণ্ডলীর সামনে নিজের পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করেন না। তিনি
সমাজকে শিক্ষা দেন, সমাজের কাছ থেকেও শেখেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর সামনে তাই আজ
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করা। দল, পেশা, অনুদান, সামাজিক
মর্যাদা, ব্যক্তিগত সুবিধা, সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে সত্যকে রক্ষা করা সহজ নয়, কিন্তু
এটাই বুদ্ধিজীবীর প্রধান দায়িত্ব। যে বুদ্ধিজীবী ক্ষমতার প্রশংসা করতে গিয়ে জনগণকে
ভুলে যান, তিনি ইতিহাসে থাকেন না; তিনি কেবল সাময়িক সুবিধাভোগী হিসেবে টিকে থাকেন।
কিন্তু যে বুদ্ধিজীবী অস্বস্তিকর সত্য বলেন, জনগণের পক্ষে থাকেন, এবং নিজের
অবস্থানকে প্রশ্ন করতে ভয় পান না, তিনিই দীর্ঘস্থায়ী প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান সময় বুদ্ধিজীবীর জন্য আরও নতুন চ্যালেঞ্জ
এনেছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিকতা, মতের দ্রুত
মেরুকরণ, ভুয়া তথ্য, হিংস্র মন্তব্য সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক অজ্ঞতা, পাঠের সংকট এবং
মনোযোগহীনতা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে জটিল ক’রে তুলেছে। এখন আর শুধু কলাম লিখে,
বক্তৃতা দিয়ে বা সেমিনারে অংশ নিয়ে বুদ্ধিজীবী হওয়া যায় না; এখন প্রয়োজন গভীর পাঠ,
ধৈর্য, তথ্যনিষ্ঠা, নৈতিক ভারসাম্য এবং জনমানুষের সঙ্গে সংলাপের সক্ষমতা। আজকের
বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীকে একই সঙ্গে শিক্ষক, গবেষক, যোগাযোগবিদ, সমাজ-পর্যবেক্ষক এবং
নৈতিক সাক্ষী হ’তে হয়। তাঁকে ধর্মীয় উগ্রতা, জাতিগত সংকীর্ণতা, লিঙ্গবৈষম্য,
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ভোক্তাবাদ, পরিবেশধ্বংস এবং শ্রমশোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান
নিতে হয়। তাঁকে কেবল অতীতের বীরত্ব স্মরণ করলেই চলবে না; বরং বর্তমানের জটিল
বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করতে হবে। দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বইপড়া, যুক্তি, সংলাপ,
সহনশীলতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরি করাও তাঁর কাজ। কারণ বুদ্ধিজীবীর আসল শক্তি
বক্তৃতার উচ্চতায় নয়, প্রজন্ম গঠনের ক্ষমতায়, নতুন দেশ গড়ার অঙ্গীকারে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীকে আবারও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।
তিনি এমন কেউ নন যিনি কেবল অভিজাত ক্যাফেতে বসে রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করেন; তিনি
এমন কেউ নন যিনি জনতার নাম ভাঙিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন; তিনি এমন কেউ নন যিনি
প্রতিটি শাসককে একই ভাষায় প্রশংসা করেন বা প্রতিটি বিরোধী কণ্ঠকে একইভাবে উচ্চকিত
করেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মূলত সেই মানুষ, যিনি ইতিহাসের সামনে দায়বদ্ধ, সত্যের
সামনে নত, এবং মানুষের সামনে জবাবদিহিমূলক। তাঁর চিন্তায় থাকতে হবে মাটি ও আকাশের
মিলন, সমাজ ও স্বপ্নের সংযোগ, ন্যায়ের প্রতি অনড়তা এবং জটিলতার প্রতি সহিষ্ণুতা।
তাঁকে বুঝতে হবে, বুদ্ধি যদি নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা শুষ্ক ক্ষমতা হয়ে
দাঁড়ায়; আর নৈতিকতা যদি বুদ্ধি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা অন্ধ আবেগে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীকে এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।
অতএব বলা যায়, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী কেবল একটি পেশাগত শ্রেণি
নয়; তিনি একটি ঐতিহাসিক দায়, একটি সাংস্কৃতিক শক্তি, একটি নৈতিক সম্ভাবনা এবং একই
সঙ্গে একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা থেকে
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সাহিত্য থেকে গণতন্ত্র, সব পর্বে তিনি উপস্থিত ছিলেন,
কখনো অগ্রভাগে, কখনো অন্তরালে, কখনো নীরবে, কখনো বজ্রকণ্ঠে। তাঁর গৌরব আছে, তাঁর
ব্যর্থতাও আছে; তাঁর ত্যাগ আছে, তাঁর আপসও আছে। কিন্তু সমগ্র ছবিটিকে দেখলে বোঝা
যায়, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী এই জাতির বিবেকের ধারক, ভাষার রক্ষক, ইতিহাসের সাক্ষী
এবং ভবিষ্যতের নির্মাতা। এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের সঙ্গে
থাকে, তবে বাংলাদেশ আরও মানবিক, আরও ন্যায়ভিত্তিক, আরও যুক্তিনিষ্ঠ এবং আরও
সৃজনশীল হ’য়ে উঠতে পারে। আর যদি সে কেবল সুবিধার বুদ্ধিজীবী হ’য়ে প’ড়ে, তবে সমাজের
মনন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর প্রতি প্রত্যাশা একটাই, তিনি
যেন ক্ষমতার দরজায় নয়, সত্যের পাড়ে দাঁড়ান; যেন জনগণের ভাষা বোঝেন; যেন অন্যায়ের
সঙ্গে আপস না করেন; যেন শিকড়কে ভুলে না যান; এবং যেন ইতিহাসের কঠিন মুহূর্তে
মানুষের পাশে থাকার নৈতিক সাহস হারিয়ে না ফেলেন। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে
বাঁচায় শুধু অর্থনীতি বা রাজনীতি নয়; বাঁচায় তার বুদ্ধির সততা, বিবেকের দৃঢ়তা এবং
স্বপ্নের অখণ্ডতা। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সেই অখণ্ডতারই নাম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন