সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব: নারীরা কতটুকু সার্থক

  নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব শুধু সাহিত্যের একটি আলাদা ব্যাখ্যা-পদ্ধতি নয়, এটি দীর্ঘদিনের নীরবতা, অবহেলা, প্রান্তিকতা ও অসমতার বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ। সাহিত্যকে যখন কেবল নন্দনভাবনা, কাহিনি বা ভাষার শিল্প হিসেবে দেখা হয়, তখন তার অন্তর্গত ক্ষমতার সম্পর্কগুলো অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব সেই অদৃশ্য কাঠামোকেই দৃশ্যমান করে। এটি প্রশ্ন তোলে, কে লিখছে, কার জন্য লিখছে, কাকে কেন্দ্র করে লিখছে, কার অভিজ্ঞতা সাহিত্যে স্থান পাচ্ছে, কার অভিজ্ঞতা ইতিহাসের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বের মৌলিক তাৎপর্য নিহিত। সাহিত্যে নারী শুধু একটি চরিত্র নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি অভিজ্ঞতা, একটি সংগ্রাম, একটি ভাষা এবং কখনও কখনও একটি নীরব বেদনার নাম। এই তত্ত্ব সেই নীরবতাকে ভাষা দেয়, সেই বেদনার শিকড় অনুসন্ধান করে এবং সাহিত্যের প্রচলিত পুরুষকেন্দ্রিক ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বের মূল কথা হলো, সাহিত্য কখনও নিরপেক্ষ নয়। যে সাহিত্যকে নিরপেক্ষ বলে মনে করা হয়, সেখানেও সমাজের ক্ষমতাবিন্যাস, লিঙ্গরাজনীতি, শ্রেণিসংঘাত, সাংস্কৃতিক পক...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

আমার হারানো শৈশব

  আমার হারানো শৈশব, এই শব্দের ভেতর যেন এক আশ্চর্য আলোর ঘর, যেখানে আজও আমি ফিরে যেতে চাই, যদিও জানি, ফিরে যাওয়া আর ফেরা নয়, তা কেবল মনের ভেতর নরম আলো জ্বালিয়ে এক অনন্ত খোঁজের নাম। ছেলেবেলা আমার কাছে কেবল বয়সের একটি অধ্যায় নয়; তা ছিল প্রথম ভাষা, প্রথম বিস্ময়, প্রথম অভিমান, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম হারানোর ক্ষীণ বেদনা, আর প্রথম উপলব্ধির উষ্ণতম সকাল। জীবনের পরে যতই দিন এসে জমা হয়েছে, ততই আমি বুঝেছি, মানুষের আসল সম্পদ তার হারানো স্মৃতি, গাড়ির জট নয়, পরিচয়ের ভার নয়; মানুষের সত্যিকার সম্পদ হচ্ছে সেইসব অদৃশ্য স্মৃতি, যেগুলো মুঠো খুললেই বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে, অথচ বুকের ভেতর থেকে যায় ফুলের গন্ধের মতো। আমার ছেলেবেলার দিনগুলোও তেমনই, ধরা যায় না, তবু ছাড়াও যায় না। আজ যখন স্মৃতির জানালায় তাকাই, দেখি কাদা-ধুলার মিশ্র এক দুপুর, এক টুকরো ভাঙা আকাশ, আর দূরে মায়ের গলার ডাক; দেখি কাঁচা রাস্তার ধারে নরম ঘাস, শাপলার ভেতর লুকোনো জোনাকি, পুকুরের জলে ভেসে থাকা সূর্যের কম্পিত মুখ, আর সন্ধ্যার আগে আগে পাড়ার মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের স্বর। আমার ছেলেবেলা ছিল এমনই এক জগত, যেখানে প্রতিটি জিনি...

বর্ষার শেষ বিকেল - ছোট গল্প

  শহরটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হতো , কেউ যেন অসাবধানে ধূসর রঙের উপর একটু নীল কালি ফেলে দিয়েছে। সবকিছুই এখানে অসম্পূর্ণ , অট্টালিকাগুলো অর্ধেক স্বপ্নের মতো দাঁড়িয়ে থাকে , রাস্তাগুলো কোথাও গিয়ে হঠাৎ থেমে যায় , আর মানুষগুলো প্রতিদিন নিজেদের ভিতর থেকে একটু একটু করে হারিয়ে যায়। তবু এই শহরেই কিছু মানুষ বেঁচে থাকে শুধুমাত্র একটি মুখের জন্য , একটি কণ্ঠের জন্য , কিংবা কোনো অসম্ভব স্পর্শের স্মৃতির জন্য। আবিরও তেমন একজন মানুষ ছিল। সে পেশায় চিত্রকর , কিন্তু তার ছবিগুলো কেউ বুঝত না। কারণ সে মানুষের মুখ আঁকত না , সে আঁকত মানুষের অনুপস্থিতি। তার ক্যানভাসে সবসময় একটি খালি চেয়ার থাকত , আধখোলা জানালা থাকত , কিংবা বৃষ্টির পরে ভেজা রাস্তা। যারা ছবি কিনতে আসত , তারা বলত , ‘ এখানে তো কিছুই নেই! ’ আবির মনে মনে বলত , ‘ সবচেয়ে বড় জিনিসগুলোই তো দেখা যায় না। ’ তার জীবন ছিল ধীর , নীরব , এবং অদ্ভুতভাবে একাকী। রাতের শেষে সে ছাদে উঠে দাঁড়াত , আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার মনে হতো , পৃথিবীতে নিশ্চয়ই এমন কিছু মানুষ আছে যারা ভুলবশত এখানে এসে পড়েছে , যাদের আসল ঠিকানা অন্য কোথাও। সেই সময়ই প...

নীল জ্যোৎস্নার জানালা- কিশোর গল্প

  রাতটা তখনও পুরোপুরি নামেনি , কিন্তু আকাশের গায়ে গায়ে এক ধরনের ধূসর নীল জড়ো হ ’ য়ে এসেছে। সন্ধ্যার শেষ আলো পাখিদের ডানায় লেগে ধীরে - ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের পেছনের মাঠটা , যেখানে দিনে ধানগাছের পাতায় রোদ ঝিলমিল করে , এখন সেখানে বাতাসের পাতলা সুর ছাড়া আর কিছু নেই। সেই মাঠের পাশের সরু কাঁচা পথ ধরে একা হাঁটছিল আরিফ। তার কাঁধে পুরোনো ব্যাগ , হাতে ভাঁজ করা একটা খাতার পাতা , আর চোখে এমন এক নীরবতা , যেন সে কিছু হারিয়ে ফেলেছে , অথচ কী হারিয়েছে তা নিজেও ঠিক জানে না। আরিফের বয়স পনেরো। এই বয়সে ছেলেদের চোখে সাধারণত দুনিয়া নিয়ে কৌতূহল থাকে , হাসির ঝাঁঝ থাকে , বন্ধুত্বের উচ্ছ্বাস থাকে। কিন্তু আরিফের ভেতরে ছিল অন্যরকম একটা চাপা শব্দ। তার বাবা গ্রামে অন্যর জমিতে কাজ করে। মা সংসারের জীর্ণতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আরিফ স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে ছোটদের পড়াত , কখনও বাজার থেকে চাল আনত , কখনও খালপাড়ের বাঁশঝাড় থেকে শুকনো বাঁশ কুড়োত। তবু তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল একা বসে পুরোনো বই পড়া। বইয়ের পাতার ভেতরে সে এমন সব জায়গা খুঁজে পেত , যেখানে দুঃখেরও একটা আলো থ...

লেখক ও প্রকাশক: কে কার উপর নির্ভর ?

  লেখক ও প্রকাশক , এই দুই সত্তা যেন একই নদীর দুই তীর , একে অন্যকে ঘিরেও আলাদা , একে অন্যকে ছুঁয়েও ভিন্ন। সাহিত্যজগতে তাদের সম্পর্ক কেবল ব্যবসা ও সৃষ্টির সম্পর্ক নয় , তা নির্ভরতা , সহযোগিতা , দ্বন্দ্ব , প্রত্যাশা , বিশ্বাস এবং কখনো কখনো অদৃশ্য এক চুক্তির সম্পর্ক ; যে চুক্তি কাগজে লেখা থাকে না , কিন্তু বইয়ের প্রতিটি পাতায় তার ছায়া পড়ে। প্রশ্নটি যখন ওঠে , লেখক ও প্রকাশক , কে কার উপর নির্ভর , তখন সহজ উত্তর দেওয়া কঠিন , কারণ সম্পর্কটি একমুখী নয়। লেখক ছাড়া প্রকাশক অর্থহীন , প্রকাশক ছাড়া লেখক অপূর্ণ । আবার পাঠক ছাড়া উভয়েই নিঃসঙ্গ। তবু যদি গভীরে যাই , দেখি এই নির্ভরতা সমান নয় , বরং সময় , সমাজ , অর্থনীতি , প্রযুক্তি , বাজার , খ্যাতি , সৃজনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার তারতম্যে বদলে যায়। একসময় লেখক প্রকাশকের মুখাপেক্ষী ছিলেন , আবার কখনো প্রকাশক লেখকের প্রতীক্ষায় থাকেন। কখনো লেখকের জন্য প্রকাশক দরজা , কখনো প্রকাশকের জন্য লেখক প্রাণ ; কখনো লেখক সৃষ্টি করেন , প্রকাশক তাকে আকার দেন , আর কখনো প্রকাশক কাঠামো তৈরি করেন , লেখক তার ভেতর আত্মা ঢেলে দেন। এই পারস্পরিক নির্ভরতার ইতিহাস সাহিত্যচর্চার ই...