সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

দক্ষিণের শেষ বাড়ি -কিশোর গল্প

  রাতুল আর অর্কের গ্রামে এমন একটা জায়গা ছিল, যেখানে রাস্তা হঠাৎ নরম হয়ে যায়, বাতাসও একটু থেমে যায়, আর লোকজনের গলা অজান্তেই নিচু হয়ে আসে। গ্রামটার নাম সোনামুখী চর, কিন্তু সবাই তাকে চেনে নদীর ভাঙনের ভয়ে আর নতুন মাটির গন্ধে। গ্রামের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে কাঁচা রাস্তা শেষ হয়ে কাঁদামাটির সরু পথ নদীর ধারের দিকে ঢুকে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক পুরনো বাড়ি, দরজা সাদা রঙের, জানালার কাঠ একটু নড়বড়ে, বারান্দার এক কোণে শ্যাওলা, আর চৌকাঠের গায়ে বৃষ্টির দাগ শুকিয়ে শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। লোকজন তাকে বলত দক্ষিণের শেষ বাড়ি। কিন্তু এই নামটা শুধু জায়গার নয়, অনেকদিন ধরে একধরনের নীরবতারও নাম ছিল। রাতুল আর অর্ক ছোটবেলা থেকেই জানত, যেসব জায়গা নিয়ে লোকজন কম কথা বলে, সেসব জায়গার দিকে তাদের চোখ বেশি যায়। স্কুলের পরে তারা নদীর পাড়ে, পুকুরঘাটে, ধানক্ষেতে, এমনকি মাঝেমধ্যে স্কুলের পেছনের পরিত্যক্ত আমবাগানেও ঘুরত, কিন্তু দক্ষিণের শেষ বাড়ির সামনে গিয়ে একধরনের অদ্ভুত থমকে যাওয়া তাদের গ্রাস করত। কেউ বলত বাড়িটা একসময় সরকারি কর্মচারীর ছিল, কেউ বলত কোনো এক নারীর, যিনি নিজের সব সন্তানকে হারিয়ে একা থেকে গেছেন, আব...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

এসো আমার চোখের ভেতর -কিশোর গল্প

  বর্ষার শেষে যে-শহরটাকে দেখে মনে হয়, সে যেন নিজেরই ছায়া নিয়ে হাঁটছে, সেই শহরের এক কোণে ছিল একটি পুরোনো বটগাছ। গাছটা এত বড় যে তার নিচে দাঁড়ালে আকাশকে আর সম্পূর্ণ আকাশ মনে হতো না; পাতার ফাঁকে ফাঁকে টুকরো টুকরো নীল, আর সেই নীলের মধ্যে ধূসর মেঘের চলাফেরা। গাছটার গোড়ায় বসে প্রায়ই ছেলেরা খেলত, কেউ সাইকেলের চেন মেরামত করত, কেউ আবার অকারণেই আকাশের দিকে চেয়ে থাকত। তানিম প্রায় প্রতিদিনই ওই গাছের নিচ দিয়ে স্কুলে যেত। তার চোখে সবসময় একটা অদ্ভুত অস্থিরতা ছিল, যেন সে যা দেখছে, তার ভেতরেই আরও কিছু দেখার জন্য সে অপেক্ষা করছে। তানিমের বাবা ছিল রেলওয়ের মেকানিক, মা স্কুলে সেলাই শেখাতেন। সংসার বলতে এক ছোট্ট ঘর, লোহার খাট, এক কোণে পুরোনো আলমারি, আর দেয়ালে ঝোলানো এক অচেনা ভুবনের মানচিত্র। সেই মানচিত্রটা কে দিয়েছিল তানিম জানত না। তার জন্মেরও আগে নাকি সেটি ঘরে এসেছিল। মায়ের মতে, কোনো দূর দেশের রেলস্টেশনে কাজ করা এক আত্মীয় পাঠিয়েছিল। কিন্তু তানিমের ধারণা ছিল, মানচিত্রটা আসলে অন্য কোনো জীবনের দরজা। সে প্রায়ই আঙুল দিয়ে অজানা দেশগুলোর নাম ছুঁয়ে দেখত এবং মনে মনে ভাবত, এসব জায়গায় বাতাসের শব্দ কেমন হয়, রাত কে...

নীলখাতার শহর-কিশোর গল্প

  শরতের শেষের দিকের এক বিকেল। আকাশে তখন মেঘ ছিল না, কিন্তু বাতাসে ছিল মেঘের পূর্বাভাস, এক ধরনের হালকা, অনিশ্চিত গন্ধ, যেন দূরের নদী তার নিজের নাম ভুলে গিয়ে নতুন করে উচ্চারণ করতে চাইছে। কাশীপুর নামের সঙ্গে কাশফুলের কোনো মিল ছিল কি না, তা নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামাত না; তবু শরতের শেষে যখন ধুলোমাখা বাতাস স্কুলের মাঠ পেরিয়ে যেত, তখন কিছু একরকম সাদা সাদা আঁচল বাতাসের কাঁধে জড়িয়ে কাশীপুর একটু নরম, একটু মনখারাপি করে তুলত। এই শহরে চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে থাকত, নাম রাফি। সে খুব উচ্চস্বরে কথা বলত না, খুব দ্রুত হাঁটতও না, আবার খুব ধীরও না। তার অভ্যাস ছিল বইয়ের ভাঁজের মধ্যে ছোট ছোট কাগজ গুঁজে রাখা, যেসব কাগজে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা লেখা থাকত। যেমন, ‘একজন মানুষ নদীর মতো; তাকে দূর থেকে শান্ত মনে হয়, কিন্তু ভেতরে কত স্রোত, কে জানে?’ কিংবা ‘যে জিনিস ভাঙে, তা সবসময় কাঁচ নয়; কখনো আত্মবিশ্বাসও।’ রাফি এইসব কথা কোথায় পেত, সে নিজেও ঠিক বলতে পারত না। স্কুলের বাংলা বই, পুরোনো খবরের কাগজ, মামার বইয়ের তাক, আর নিজের মাথার ভেতরের অগোছালো চিন্তা, এই চারটে জায়গা থেকেই হয়তো। রাফির বাবা ছিলেন স্থানীয় পোস্ট অফিসের কর্মচারী। ম...

নিঃসঙ্গ মেঘ ও আমরা তিনজন -ছোট গল্প

  শহরটা দিনশেষে এমন এক রঙে ডুবে যেত , যেন কেউ আকাশের ওপর পুরোনো তামার পাত বসিয়ে দিয়েছে। জানালার কাচে শেষ বিকেলের আলো লেগে থাকত কিছুক্ষণ , তারপর ধীরে - ধীরে নেমে আসত ধোঁয়ার মতো নীল অন্ধকার। সেই শহরে , ঠিক এমন এক ঋতুর সন্ধ্যায় , অয়ন প্রথমবার বুঝেছিল , কিছু প্রেম মানুষকে সম্পূর্ণ ক ’ রে না , বরং ভেঙে ভেঙে নতুন ক ’ রে গ ’ ড়ে তোলে। অয়ন ছিল স্থির চোখের একজন মানুষ। সে কম কথার মানুষ।   ভাবনায় গভীর , চেতনায় আধুনিক , ভাবনায় অনেকটা অগ্রগামী । বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত ; স্লোগান বানাত , ব্র্যান্ডকে মানুষের স্বপ্নের মতো দেখাতে শিখত , অথচ নিজের জীবনের জন্য কোনো স্লোগান তার কাছে ছিল না। অফিসের কাচঘেরা তলাটিতে সবাই যখন ভেসে চলত দ্রুততা আর উচ্চাভিলাষের মধ্যে , তখন অয়ন চুপচাপ নোটবুকের পেছনের পাতায় লিখত , ‘ মানুষ যা চায় , তা সবসময় মানুষ যা প্রয়োজন , তা নয়। ’ এই একটি বাক্যই যেন তার ভিতরের বেঁচে থাকাকে ব্যাখ্যা করত।তার জীবনে প্রথম ঢুকেছিল মেঘলা। নামের মতোই সে ছিল অনিশ্চিত , ছায়াময় , অথচ আশ্চর্য উজ্জ্বল। মেঘলার হাসি ছিল এমন , যেন ব্যস্ত একটি গলি হঠাৎ একফোঁটা বৃষ্টিতে ধু ’ য়ে গেলে যে স্বস্তি ন...

অনুপস্থিতির নীল সৌন্দর্য

  তুমি চলে যাওয়ার পর , আমি আবিষ্কার করেছি মানুষের ভেতরেও একটি আবহাওয়া থাকে , সেখানে হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি নামে কোনো মেঘ ছাড়া সেখানে বজ্রপাত হয় কিন্তু আকাশে র কোনো শব্দ শোনা যায় না সেখানে শীত কাল নেমে নামে এমনভাবে , যেন একটি মৃত নক্ষত্র তার শেষ আলোটুকু ফিরিয়ে নিয়েছে তুমি চলে যাওয়ার পর , আমার ঘরের দেয়ালগুলো অদ্ভুত হ ’ য়ে উঠেছে রাতের বেলা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে , যেন তারা জেনে গেছে কতবার আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি তোমার নামের শব্দের চারপাশে ঘুরে বেড়াই এখন আর আমি তোমাকে ডাকি না , কারণ ডাকলে যদি ফিরে আসতে , তবে পৃথিবীর সমস্ত নদী শুধু উৎসের দিকে ই ব’য়ে যেত আমি শুধু তোমার অনুপস্থিতিকে ডাকি খুব নীরব আর শান্ত হ’য়ে আমি আজকাল মানুষের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে হারাই কারণ , তোমাকে হারানোর পরনিজেকে খুঁজে পাওয়ার আর কোনো প্রয়োজন বোধ করি না , কখনো কখনো গভীর রাতে আমি জানালার পাশে বসে থাকি। শহর তখন নিঃশব্দে গাঢ় ঘুমে মগ্ন রাস্তার বাতিগুলো জেগে থাকে একদল ব্যর্থ কবির মতো আর আমি ভাবি , তুমি কি কখনো হঠাৎ ঘুম ভেঙে আমার কথা মনে করো ? মনে পড়ে কি সেইসব দিন , যখন পৃথিবী আমাদের কাছে ...

ঘাস ফড়িঙের ছায়া-ছোট গল্প

  বর্ষার পরে অজস্র দিন কেটে গেলেও ওই সন্ধ্যেটির কথা আমার মনে এমনভাবে রয়ে গেছে , যেন বৃষ্টির জল শুকিয়ে গেলেও মাটির ভিতর থেকে একটুকরো সোঁদা গন্ধ উ ’ ঠে আসে। শহরের বাইরের পুরনো বাসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম দেখেছিলাম তাকে , একটি অল্পবয়সী মেয়ে , কাঁধে সাদা চাদর , হাতে কিছু বই , আর চোখে এমন এক অস্বচ্ছল উজ্জ্বলতা , যা মানুষের ভিতরের ক্লান্তিকে হঠাৎ অপমান ক ’ রে। তার নাম মীরা। নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল , এই নামের ভিতরে যেন এক ধরনের নরম কাচ আছে ; আলো পড়লে ঝিলমিল ক ’ রে , কিন্তু হাত দিলে আঙুল কাটে। আমার নিজের বয়স তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। বয়সের এই পর্যায়ে মানুষ হয় দৃঢ় হয়ে ওঠে , না হয় ভেতরে ভেতরে ভেঙে যেতে শুরু ক ’ রে। আমি দ্বিতীয় দলে ছিলাম। বাইরে থেকে আমাকে শান্ত , সুশৃঙ্খল , হয়তো কিছুটা নিরাসক্ত বলেই মনে হত। ভেতরে , সে সময় , এক পুরনো ক্ষত ক্রমাগত জেগে থাকত , সেই ক্ষতটি কোনো প্রেমের সম্পূর্ণ ভাঙন নয় , আবার কেবল বিচ্ছেদও নয় ; বরং এক এমন অসমাপ্ততার যন্ত্রণা , যেখানে হারানোর চেয়ে বেশি কষ্ট থাকে হারানোর আগের দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। এই অসমাপ্ততাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে , আবার ধীরে ...