সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘২৩ নম্বর তৈলচিত্র’

  আলাউদ্দিন আল আজাদের   ‘ ২৩ নম্বর তৈলচিত্র ’   ( ১৯৬০) বাংলা সাহিত্যের একটি মনস্তাত্ত্বিক ও শিল্পতাত্ত্বিক মাইলফলক। এটি কেবল একজন চিত্রশিল্পীর জীবনসংগ্রামের আখ্যান নয় , বরং মানুষের অবদমিত কামনা , শিল্পসত্তা এবং সামাজিক সংস্কারের এক জটিল রসায়ন। উপন্যাসটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শিল্পী জাহেদ। তার কাছে চিত্রকর্ম কেবল রেখা বা রঙের বিন্যাস নয় , বরং জীবনের গূঢ় সত্য উন্মোচনের মাধ্যম। উপন্যাসের নাম ‘ ২৩ নম্বর তৈলচিত্র ’ প্রতীকীভাবে সেই বিশেষ শিল্পকর্মটিকে নির্দেশ করে , যা জাহেদের জীবনের চরম সত্যকে ধারণ ক ’ রে আছে। জাহেদ এমন এক শিল্পী যিনি ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তার ক্যানভাসে ফু ’ টে ওঠে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং অবচেতনের অন্ধকার অলিগলি। আলাউদ্দিন আল আজাদ এই উপন্যাসে মানুষের অবচেতন মনের এক নিপুণ ময়নাতদন্ত করেছেন। জাহেদ তার ভাই ও ভ্রাতৃবধূর সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে নিজের শিল্পীসত্তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা ক ’ রে। জাহেদের বড় ভাই শরিফ এবং তার স্ত্রী সুরাইয়ার দাম্পত্য জীবনের ফাঁকফোকর দিয়ে জাহেদের মনে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় , তা-ই এই উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি। সু...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও ‘১৯৭১’ উপন্যাস

  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রাম যখন তুঙ্গে , তখন সীমান্তের ওপারে বসে সেই আগ্নেয় উপাখ্যানকে লেখনীতে রূপ দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১) । তাঁর ১৯৭১ উপন্যাসটি কেবল একটি যুদ্ধের দলিল নয় , বরং এটি এক বিপন্ন মানবতার ঘুরে দাঁড়ানোর আর্তনাদ ও আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক সংকলন। তারাশঙ্করের লেখনীতে সবসময়ই প্রান্তিক মানুষ ও মৃত্তিকা-সংলগ্ন জীবন জয়গান গেয়েছে , আর এই উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি জাতি তার অস্তিত্বের সংকটে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে বিস্ফোরিত হয়। উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের অবরুদ্ধ জনপদ , পাক হানাদার বাহিনীর নির্মমতা এবং তার বিপরীতে বাংলার দামাল ছেলেদের মরণপণ লড়াই। লেখক এখানে কেবল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করেননি , বরং মানুষের মনের গহীনে থাকা দেশপ্রেম ও ত্যাগের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। উপন্যাসের চরিত্রগুলো যেন এক-একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হ ’ য়ে ওঠে , যারা শান্তির নীড় হারিয়ে যুদ্ধের দাবদাহে পুড়ে খাঁটি সোনায়...

সামাজিক বাস্তবতা

শহরের বু ’ কে দাঁড়িয়ে দেখি এক তরুণী রাস্তার পাশে দাড়িয়ে আছে , হাতে একটি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে , কিন্তু চোখে রয়েছে আশার আলোর বদলে এক ক্লান্তি , আমি ভাবি , কী বদলেছে আমরা ভাবিনি , কিন্তু সময় বদলেছে নিচে থেকে উপড়ে নগরীর রঙিন বিলবোর্ড , তাতে আমাদের নাম লেখা নেই , শুধু একটি বিজ্ঞাপনের হাসি যা জানে না এই মাটির ঘ্রাণ তুমি কি দেখেছো সেই শিশুটিকে , যে স্কুল যাবে বলে একটা স্বপ্ন বানিয়েছে , কিন্তু পথে একটি ব্যাগ-ছাড়া হাঁটছে ? আমি বলি আমরা জানি না বা জানার চেষ্টা করি না এদের নাম , এদের অভিপ্রায় তবু গভীরে অনুভব করি স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝখানে একটি প্রসার হয়তো আমরা সকলে একসাথে নয় , কিন্তু প্রত্যেকটি হৃদয়ে রয়েছে বিঁধা একটি প্রশ্ন এই পরিবর্তন কি শুধু কথায় থাকবে ? আমি আশাবাদী হয়ে বলি হ্যাঁ , কোনোদিন এটা আগুন হয়ে উঠবে , নগরীর দেয়ালে লেখা শব্দ হয়ে নয় , তবু মানুষের মুখে , মানুষের শব্দে সত্যি বলবে , আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়েছি।  

তোমার অপেক্ষা

  তোমার শরীরের কাছে এলেই এই শহরটা হঠাৎ কুয়াশা হয়ে যায় , বিলীন হয় ট্রাফিক সিগন্যাল , ধোঁয়াটে রেস্তোরাঁ আর নাগরিক কোলাহল আমি দেখি , তোমার ওই গ্রীবা আসলে কোনো হাড়-মাংসের গঠন নয় ওটা এক তপ্ত শ্বেতপাথরের পাহাড় , যার ঢালে হাত রাখলে আমার আঙুলগুলো একেকটা তৃষ্ণার্ত যাযাবর হয়ে পথ হারায় তোমার ত্বকের অমসৃণতায় আমি খুঁজি এক প্রাচীন গুহাচিত্র , যেখানে আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রথম আগুনের জন্ম দিয়েছিল তোমার নিশ্বাস যখন আমার কন্ঠনালীতে আছড়ে পড়ে , মনে হয় ওটা কোনো বাতাস নয় , ওটা এক কালবৈশাখীর ভ্রূকুটি ; যা আমার পাঁজরের হাড়গুলোকে মড়মড় শব্দে ভাঙতে চায় তোমার নাভিমূলের ওই নিভৃত হ্রদে যখন আমার ছায়া পড়ে , আমি দেখি সেখানে হাজার বছরের জমাট বাঁধা এক অন্ধকার যা কোনো সূর্য চেনে না , চেনে কেবল রক্তের নিগূঢ় টান ওটা তো শরীর নয় , ওটা মহাকালের এক একাকী ধাবমান ধূমকেতু , যার লেজের ঝাপটায় আমার তিল তিল করে গড়া সভ্যতা চূর্ণ হয় তোমার আঙুলের ডগায় যখন আমার নাম লেখা হয় অলক্ষ্যে , আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসে এক নিষিদ্ধ জলপ্রপাত সেখানে জল নেই , আছে গলিত লাভার মতো তীব্র এক দহন ; তোমার নখের আঁচড়ে যখন পিঠের চামড়া আলগা হয়ে আসে...

ভালোবাসার উপাখ্যান

তোমার শরীরের মানচিত্রে আমি যখন নিবিষ্ট হচ্ছি , মনে হয় ওটা কোনো নারীদেহ নয় , এক আদিম অরণ্যের গোপন শিস ; যেখানে লতাগুল্মের আড়ালে ওত পেতে আছে এক তৃষ্ণার্ত চিতা তোমার উন্নত গ্রীবা যেন এক শ্বেতপাথরের পাহাড় , যার ঢাল বেয়ে নেমে আসে আমার আঙুলের অবাধ্য ঝরনাধারা সেখানে জল নয় , ঝরে পড়ে কয়েক ফোঁটা গাঢ় তপ্ত অন্ধকার তোমার নিঃশ্বাসে যখন বুনো কামিনীর ঘ্রাণ লেগে থাকে , আমার চারপাশের এই ধোঁয়াটে শহরটা মুহূর্তেই বিলীন হয় ; আমি দেখি , আমার হৃদপিণ্ড এখন এক অশান্ত বঙ্গোপসাগর তার লবণাক্ত ঢেউ আছড়ে পড়ছে তোমার নাভিমূলের সৈকতে , সেখানে জন্ম নিচ্ছে শ্যাওলা মাখা এক অদ্ভুত প্রবাল দ্বীপ যেখানে কোনো মানচিত্র নেই , আছে কেবল আদিম এক দহন তুমি যখন তোমার মেঘের মতো ঘন চুলগুলো আলগা করো , আমার জানলার ওপাশে আকাশটা হঠাৎই ছিঁড়ে পড়ে মাটির বুকে ওটা তো চুল নয় , ওটা এক কালবৈশাখীর ঘনঘটা যা আমার পাজরের হাড়গুলোকে মড়মড় শব্দে ভাঙতে চায় তোমার প্রতিটি লোমকূপ যেন একেকটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি , সেখান থেকে নির্গত হচ্ছে উত্তপ্ত লাভার মতো এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ; যা আমার সভ্যতার আবরণ পুড়িয়ে ছাই করে দেয় নিমিষেই মাঝে মাঝে তোমার ওই রক্তিম ও...

রক্তিম দহনের পাণ্ডুলিপি

তুমি আসলে কোনো মানবী নও , আমার এই দগ্ধ নগরে তুমি এক নীল আগুনের শিখা , যা ছুঁলে পুড়ে যায় না , বরং জমে যায় বরফ তোমার ওই চোখের অতল গহ্বরে যখন আমি তাকাই , দেখি সেখানে কয়েকশ বছরের পুরনো এক তুষারপাত যেখানে আমার সব যুক্তি , সব সতর্কতা মরে পড়ে আছে একান্ত একাকী ,   কোনো এক নিষিদ্ধ অরণ্যের হরিণের মতো শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গল যখন আমার টুঁটি চেপে ধরে , আমি তোমার গ্রীবার ভাঁজে খুঁজি এক চিলতে প্রাচীন নক্ষত্রলোক তোমার আঙুলের স্পর্শে আমার বুকের পাজরগুলো একেকটা সেতারের তার হয়ে বেজে ওঠে তীব্র হাহাকারে সে সুর কোনো বসন্তের নয় , ওটা এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস ; যা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয় আমার জমানো সব নাগরিক ভদ্রতা , আর আমি নগ্ন হয়ে দাঁড়াই তোমার ওই নির্মম সৌন্দর্যের সামনে মাঝে মাঝে মনে হয় , আমাদের এই প্রেম এক নিষিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ব আমরা খুঁড়ছি একে অপরের হৃদপিণ্ড সেখানে কোনো সোনা নেই , আছে কেবল প্রাচীন কোনো যুদ্ধের ক্ষত আর ভাঙা তলোয়ার তুমি যখন হাসো , আমার মনে হয় মাঝরাতের কারফিউ ভেঙে একদল বিদ্রোহী স্লোগান দিচ্ছে আমার শূন্য ধমনিতে তোমার ঠোঁটের ওই অবাধ্য তিলটা আসলে এক ব্ল্যাকহোল , যেখানে নিক্ষিপ্ত হচ্...

শহুরে একাকীত্বের ছায়া

এই যে ল্যাম্পপোস্টটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে গলির মোড়ে , ওটা আসলে কোনো লোহার থাম নয় , ওটা এক তস্কর ঋষি ; রাতের নির্জনতায় সে অন্ধকারকে ছেঁকে বের করে আনে হলদে বিষ তার ওই ঘোলাটে আলোর বৃত্তের ভেতর কত শত ছায়া খেলে যায় কতগুলো চোর , কতগুলো প্রেমিক , আর একরাশ মধ্যবিত্ত হাহাকার সবাই সেখানে এসে থামে , অথচ কেউ কাউকে ভালভাবে চেনে না ; যেন এক অদ্ভুত জাদুকরী রেখা টেনে রেখেছে এই নগরীর বুক ল্যাম্পপোস্টটার মাথায় যখন কাকেরা ঘুমিয়ে পড়ে ডানা গুটিয়ে , আমি দেখি , ওটা আসলে একটা নিঃসঙ্গ আলোকবর্তিকা নয় , বরং এই শহরের এক পরিত্যক্ত কঙ্কাল , যার কোনো মাংস নেই তার ভেতরে বয়ে চলে হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস , মাঝে মাঝে শর্ট সার্কিটে যখন স্ফুলিঙ্গ ঝরে পড়ে পিচঢালা পথে , মনে হয় ওটা তো বিদ্যুৎ নয় , ওটা শহরের কোনো চাপা কান্না যা কংক্রিটের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে হারিয়ে যায় ড্রেনের নরকে আমি যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই নিস্তব্ধতার ব্যবচ্ছেদ করি , দেখি জানলার গ্রিলগুলো একেকটা জেলের শিকের মতো বিঁধে আছে ; আর ওপাশে আমাদের যাপিত জীবন এক একটা শীতঘুমে মগ্ন ঘর শহরটা এখন আর ইঁট-পাথরের নেই , ওটা একটা প্রাচীন অজগর , যে গিলে ফেল...