শহরটা ছিল আকাশের দিকে ওঠা অসংখ্য কাচের শিরার মতো। যেন আলো ভেদ করে সব আলো তার গহ্বরে প্রবেশ করবে। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছে একদল স্বচ্ছ বৃক্ষ, যাদের পাতার বদলে আলো, শাখার বদলে স্যাটেলাইট-সংযোগ, আর শিকড়ের বদলে ভূগর্ভস্থ জেনারেটরের গম্ভীর স্পন্দন। শহরটির নাম ছিল নির্মলপুর। নামটি শুনলে শান্তি মনে হয়, কিন্তু নির্মলপুর শান্ত ছিল না; বরং সেখানে নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ।কারণ নির্মলপুরের মানুষ কথা বলত না। না, তারা বোবা ছিল না। তারা হাসত, কান্না করত, তর্ক করত, এমনকি প্রেমও করত, কিন্তু সবই তারা করত সংকেতভাষায়। শহরটির কেন্দ্রীয় আইন ছিল, ‘উচ্চারণিত শব্দ তথ্যের অপচয় ঘটায়।’ বহু বছর আগে সম্ভবত ২০৮৯ সালে, একটি বৈজ্ঞানিক দুর্ঘটনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তখন থেকে মানুষের মুখের ভাষা নিষিদ্ধ হয়। কণ্ঠস্বর কেবল গণবিজ্ঞপ্তি, জরুরি সংকেত, বা অনুমোদিত কৃত্রিম বাচনযন্ত্রে ব্যবহৃত হতে পারত। বাকি সব যোগাযোগ ছিল হাতের ভাষা, চোখের সংকেত, আর মস্তিষ্কে বসানো লিংক-চিপ-এর মাধ্যমে প্রেরিত নীরব তথ্যপ্রবাহ। যা চোখে-চোখে প্রেরিত হতে থাকে। কিন্তু এই শহরের নীচে, মাটির বহু গভ...
রাতুল আর অর্কের গ্রামে এমন একটা জায়গা ছিল, যেখানে রাস্তা হঠাৎ নরম হয়ে যায়, বাতাসও একটু থেমে যায়, আর লোকজনের গলা অজান্তেই নিচু হয়ে আসে। গ্রামটার নাম সোনামুখী চর, কিন্তু সবাই তাকে চেনে নদীর ভাঙনের ভয়ে আর নতুন মাটির গন্ধে। গ্রামের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে কাঁচা রাস্তা শেষ হয়ে কাঁদামাটির সরু পথ নদীর ধারের দিকে ঢুকে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক পুরনো বাড়ি, দরজা সাদা রঙের, জানালার কাঠ একটু নড়বড়ে, বারান্দার এক কোণে শ্যাওলা, আর চৌকাঠের গায়ে বৃষ্টির দাগ শুকিয়ে শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। লোকজন তাকে বলত দক্ষিণের শেষ বাড়ি। কিন্তু এই নামটা শুধু জায়গার নয়, অনেকদিন ধরে একধরনের নীরবতারও নাম ছিল। রাতুল আর অর্ক ছোটবেলা থেকেই জানত, যেসব জায়গা নিয়ে লোকজন কম কথা বলে, সেসব জায়গার দিকে তাদের চোখ বেশি যায়। স্কুলের পরে তারা নদীর পাড়ে, পুকুরঘাটে, ধানক্ষেতে, এমনকি মাঝেমধ্যে স্কুলের পেছনের পরিত্যক্ত আমবাগানেও ঘুরত, কিন্তু দক্ষিণের শেষ বাড়ির সামনে গিয়ে একধরনের অদ্ভুত থমকে যাওয়া তাদের গ্রাস করত। কেউ বলত বাড়িটা একসময় সরকারি কর্মচারীর ছিল, কেউ বলত কোনো এক নারীর, যিনি নিজের সব সন্তানকে হারিয়ে একা থেকে গেছেন, আব...