সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

পাকিস্তানবাদী বাংলা সাহিত্য

  পাকিস্তানবাদী বাংলা সাহিত্য বলতে সাধারণভাবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) যে সাহিত্যধারা গ’ড়ে উঠেছিল এবং যেখানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শ, দ্বিজাতি তত্ত্ব, ইসলামী জাতীয়তাবাদ, এবং একটি একক ‘পাকিস্তানি পরিচয়’ নির্মাণের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে তাকে বোঝানো হয়। এই সাহিত্যধারাকে বোঝার জন্য কেবল সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং তৎকালীন ইতিহাস, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বকে একসাথে বিবেচনা করা জরুরি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ভারত বিভক্ত হ’য়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়, কিন্তু ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুই অংশ পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান-নিয়ে গঠিত এই রাষ্ট্র শুরু থেকেই অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক সংকটে জর্জরিত ছিল। ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, আর পূর্ব পাকিস্তান ছিল জনসংখ্যায় বেশি হলেও রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমত...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

বাংলাদেশে খুন ও ধর্ষণ: এক নির্মম ঘটনা

  বাংলাদেশের সমাজ আজ এক অদ্ভুত দ্বৈরথের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে; একদিকে মানুষের স্বপ্ন, উন্নয়ন, অগ্রগতির গল্প, অন্যদিকে প্রতিদিনের সংবাদপত্রের ভাঁজে ভাঁজে রক্তের দাগ, নারীর আর্তনাদ, নিভে যাওয়া জীবনের শোক, আর বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া। খুন ও ধর্ষণ এমন দুটি অপরাধ, যা কেবল আইনভঙ্গ নয়, বরং মানবতার ওপর সরাসরি আঘাত। এ-দুটি ঘটনা ঘটলে শুধু একজন মানুষের জীবনই ধ্বংস হয় না, একটি পরিবার ভেঙে পড়ে, একটি সমাজের বিবেক কেঁপে উঠে, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে খুন ও ধর্ষণের ঘটনা তাই নিছক অপরাধতত্ত্বের বিষয় নয়; এটি সমাজবিজ্ঞান, নৈতিকতা, রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, মনস্তত্ত্ব এবং সাহিত্যেরও গভীর আলোচ্য। কারণ সাহিত্য মানুষের ভিতরের অন্ধকারকে যেমন ধারণ ক’রে, তেমনি সমাজের অসুখকেও আয়নার মতো প্রতিফলিত ক’রে। এই দেশ, যার ইতিহাস রক্ত, ত্যাগ, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ এবং আত্মমর্যাদার ইতিহাস। সেই দেশের বুকে আজও কেন মানুষ মানুষকে হত্যা করে, কেন নারীর শরীরকে ক্ষমতার ক্ষেত্র বানানো হয়, কেন ভয়ের সংস্কৃতি ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক হ’য়ে উঠছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল অপরাধীদের দিকে তাকালেই চলবে না; ত...

নতুন বইয়ের ঘ্রান

  নতুন বইয়ের ঘ্রান, এই একটিমাত্র ঘ্রানেই যেন সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব ক’রে তোলার গোপন ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে। পুরোনো দিনের ধুলো, ঘুমন্ত দুপুর, জানালার বাইরে থেমে-থেমে নামা রোদ, স্কুলব্যাগের কোণে সেঁটে থাকা শৈশবের নিরীহ ভয়, আর একরাশ অজানা সম্ভাবনা, সব মিলিয়ে বইয়ের সেই প্রথম গন্ধটি এমন এক অনুভব, যা শুধু নাকে আসে না, মনকেও স্পর্শ করে; মনে হয়, কেউ যেন দূর থেকে কোনো অদৃশ্য দরজা খুলে দিল, আর সেই দরজা পেরিয়ে হঠাৎ এক নতুন আলোর ঘরে প্রবেশ করলাম। নতুন বই হাতে নিলে প্রথম যে অনুভূতিটি জেগে ওঠে, তা হলো আকাঙ্ক্ষা; পাতা উল্টানোর আগে থেকেই মনে হয়, কোথাও হয়তো আমারই মতো এক নিঃসঙ্গ চিন্তা দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও হয়তো কোনো অপরিচিত লেখক শব্দের জালে লুকিয়ে রেখেছেন আমার না-বলা কথাগুলো, কোথাও হয়তো এমন এক পংক্তি অপেক্ষা করছে, যেটি আমাকে অচেনা ভোরের দিকে নিয়ে যাবে। বই কেবল কাগজের বাঁধাই নয়, কেবল ছাপার কালি নয়, কেবল মলাটের রং নয়; বই এক ধরনের নীরব যাত্রা, এক ধরনের ধীর অথচ গভীর উচ্চারণ, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরেই বারবার ফিরে আসে এবং নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার ক’রে। আর সেই যাত্রার দরজায় যে গন্ধটি প্রথম পাহারাদার হয়ে দাঁড়ায়, স...

বাঙলা কবিতা ও রাজনীতি

  বাঙলা কবিতা ও রাজনীতি, এই দুটি শব্দের সম্পর্ক কেবল বাহ্যিক নয়, গভীর, জটিল এবং বহুমাত্রিক। বাংলা ভাষার সাহিত্যপরিসরে কবিতা যেমন মানুষের অন্তর্লোক, প্রেম, বিরহ, সৌন্দর্য, নিঃসঙ্গতা, স্বপ্ন ও আত্মসংকটের ভাষা হ’য়ে উঠেছে, তেমনি রাজনীতি হ’য়ে উঠেছে তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। বাঙালি জীবনের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এত নিবিড়ভাবে যুক্ত যে বাংলা কবিতাকে কখনোই কেবল নান্দনিকতার খাঁচায় আবদ্ধ ক’রে দেখা যায় না। বাংলা কবিতা একই সঙ্গে ব্যক্তির অনুভব, সমষ্টির চেতনা এবং ইতিহাসের অভিঘাত বহন ক’রে। ফলে বাঙলা কবিতা যখন আত্মপ্রকাশ করেছে, তখন থেকেই কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্র, সমাজ, ক্ষমতা, শোষণ, বিদ্রোহ, স্বাধীনতা, জাতীয়তা, ভাষা, গণমানুষ, শ্রেণিসংগ্রাম এবং মানবমুক্তির প্রশ্ন তার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এই প্রবেশ কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকী, কখনো রূপক ও ইঙ্গিতের ভেতর দিয়ে, আবার কখনো ব্যক্তিগত আবেগের আড়ালে সামাজিক প্রতিবাদের ভাষা হ’য়ে। তাই বাংলা কবিতার ইতিহাস আসলে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক অন্তর্লীন পাঠ, যেখানে শব্দ, ছন্দ, চিত্রকল্প এবং কল্পনার আড়ালে লুকিয়ে থাকে সময়ের দাবি, যুগের সংকট ও মান...

সৈয়দ শামসুল হকের ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’

  সৈয়দ শামসুল হকের (১৯৩৫-২০১৬) ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক মনন ও শিল্পভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, কারণ এই উপন্যাসে কেবল একটি কাহিনি বলা হয়নি, বরং মানুষের অন্তর্লোক, সময়ের সংকট, সমাজের টানাপোড়েন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অস্তিত্বের জটিল প্রশ্নগুলো একসঙ্গে শিল্পরূপ পেয়েছে। উপন্যাসটির শিরোনামই আমাদের জানিয়ে দেয় যে, এটি শুধু বাহ্যিক ঘটনা-নির্ভর কোনো রচনা নয়, বরং প্রতীক, অনুভব, ইঙ্গিত এবং মানসিক অভিঘাতের একটি বিস্তৃত জগৎ, যেখানে বৃষ্টি প্রকৃতির সাধারণ উপাদান না হয়ে, হ’য়ে ওঠে এক গভীর প্রতীক, আর বিদ্রোহীগণ কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদী মানুষ না হ’য়ে দাঁড়ায় মানবচেতনার সেই অংশ, যা অন্যায়, অবদমন, ভয়, আত্মসমর্পণ এবং স্থবিরতার বিরুদ্ধে অবিরাম প্রশ্ন তোলে। এই উপন্যাসের মৌলিক আকর্ষণ এখানেই যে, লেখক সমাজবাস্তবতাকে সরাসরি বক্তৃতার ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেননি, বরং জীবনকে ভাঙা-গড়া, অনিশ্চিত, দ্বন্দ্বময় এবং বহুস্তরীয় এক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখিয়েছেন, ফলে উপন্যাস পাঠের সময় পাঠক শুধু ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করে না, বরং একটি চেতনার ভেতর দিয়ে হাঁটে, যেখানে বাস্তব আর প্রতীক, স্মৃতি আর বর্তমান,...

ইমদাদুল হক মিলনের 'নুরজাহান'

  ইমদাদুল হক মিলনের (১৯৫৫-) নুরজাহান উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যে এক গভীর মানবিক ও সামাজিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে , যেখানে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি আসলে একটি সামষ্টিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এই উপন্যাসকে কেবল একটি নারীর করুণ জীবনের বিবরণ হিসেবে পড়লে এর গভীরতা ধরা পড়ে না ; বরং এটি এক ধরনের নীরব সামাজিক নথি , যেখানে পিতৃতন্ত্র , ক্ষমতার কাঠামো , নৈতিক ভাঙন এবং ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি মিলিত হয়ে এক নির্মম বাস্তবতা নির্মাণ ক ’ রে। এখানে সাহিত্য কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয় , এটি একটি প্রতিবাদের ভাষা , একটি সাক্ষ্য। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নুরজাহানকে যদি আমরা কেবল ব্যক্তি হিসেবে দেখি , তাহলে তার জীবনের বেদনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ; কিন্তু লেখক তাকে এমনভাবে নির্মাণ ক ’ রেছেন যে সে হয়ে ওঠে একটি প্রতীকী সত্তা। সে যেন গ্রামীণ বাংলাদেশের হাজারো অবদমিত কণ্ঠের প্রতিনিধি , যাদের জীবনের ওপর সমাজের নিয়ম আর ক্ষমতার ভারী ছায়া পড়ে থাকে। তার জীবন শুরু হয় সম্ভাবনার আলো নিয়ে , কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আলো নিভে যেতে থাকে সামাজিক বাস্তবতার কঠোরতায়। এই নিভে যাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় ; বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়...

সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে সমাজ-বাস্তবতার উপস্থিতি

  সেলিনা হোসেন (১৯৪৭-) বাংলা কথাসাহিত্যের এমন এক প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক , যাঁর রচনাবলিতে সমাজ-বাস্তবতা কেবল একটি বিষয় নয় , বরং সাহিত্যসৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি। তাঁর উপন্যাসে ব্যক্তি ও সমাজ , ইতিহাস ও বর্তমান , শোষণ ও প্রতিরোধ , সবকিছু এমনভাবে মিশে থাকে যে তা পাঠককে এক গভীর অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে যায়। এই প্রবন্ধে তাঁর উপন্যাসে সমাজ-বাস্তবতার উপস্থিতি বিস্তৃতভাবে আলোচিত হবে , যেখানে আমরা তাঁর বিষয়বস্তু , চরিত্র নির্মাণ , ভাষাশৈলী , ইতিহাসচেতনা , নারীর অবস্থান , শ্রেণিসংগ্রাম এবং সামগ্রিক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করব। সেলিনা হোসেনের সাহিত্যজগৎ মূলত সমাজের ভেতরের বাস্তবতাকে কেন্দ্র ক ’ রে গ ’ ড়ে উঠেছে। তিনি কখনোই কল্পনার অতিরঞ্জিত জগতে আশ্রয় নেন না ; বরং বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন , মানুষের দুঃখ-দুর্দশা , আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সংগ্রামকে তাঁর লেখার উপজীব্য করেছেন। তাঁর উপন্যাস পড়লে মনে হয় , তিনি যেন সমাজের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী , যিনি মানুষের জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ক ’ রে তা শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। এই বাস্তবতার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা তাঁকে অন্য অনেক লেখকের থেকে আলাদা ক ’ রে তোলে। ...