গ্রামের নাম ছিল নৈরাশপুর। নামের মতোই জায়গাটা যেন আশা-হীন, নিঃশব্দ, আর ধূসর। বর্ষার শেষে সেখানে কুয়াশা নামে হঠাৎ, মাটির গন্ধ ওঠে, আর রাত নামলে মনে হয় অন্ধকারটা শুধু আকাশ থেকে নয়, গাছের ফাঁকফোকর, কাঁচা রাস্তা, এমনকি মানুষের বুকের ভেতর থেকেও বেরিয়ে আসে। অনেকটা সুনসান নিরাবতা। নৈরাশপুরের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। সবাই তাকে বলত ছায়া-ঘর। আসল নাম কেউ আর মনে রাখেনি। অনেক বছর আগে এক জমিদার এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন। পরে তার ছেলে, বউ, চাকর, খাজাঞ্চি, এক এক করে সবাই মারা যায়। তারপর বাড়িটা খালি পড়ে থাকে। কেউ বলত, রাতে সেখানে বাতি জ্বলে। কেউ বলত, সিঁড়িতে এক অচেনা মেয়ের পা-র শব্দ শোনা যায়। কেউ আবার বলত, বাড়ির পেছনের কুয়োর কাছে দাঁড়ালে নিজের নামটা নিজের গলায় শোনা যায়। অনেক কালো ছায়া চারিদিকে ঘুরাঘুরি করে। এই সব কথা শহর থেকে আসা লোকেরা হাসাহাসি ক’রে উড়িয়ে দিত। কিন্তু গ্রামের মানুষ হাসত না। তারা পথ বদলাত, সন্ধ্যার পর ছায়া-ঘরের দিক তাকাত না, আর বাচ্চাদের শাসন করত, ‘ওদিক যাস না। শহরের ছেলে রবীন এসব বিশ্বাস করত না। তার নিজের উপর খুব দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। রবীন ছিল ফটোগ্রাফার। পুরোনো বাড়ি, প...
শহরটা ছিল আকাশের দিকে ওঠা অসংখ্য কাচের শিরার মতো। যেন আলো ভেদ করে সব আলো তার গহ্বরে প্রবেশ করবে। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছে একদল স্বচ্ছ বৃক্ষ, যাদের পাতার বদলে আলো, শাখার বদলে স্যাটেলাইট-সংযোগ, আর শিকড়ের বদলে ভূগর্ভস্থ জেনারেটরের গম্ভীর স্পন্দন। শহরটির নাম ছিল নির্মলপুর। নামটি শুনলে শান্তি মনে হয়, কিন্তু নির্মলপুর শান্ত ছিল না; বরং সেখানে নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ।কারণ নির্মলপুরের মানুষ কথা বলত না। না, তারা বোবা ছিল না। তারা হাসত, কান্না করত, তর্ক করত, এমনকি প্রেমও করত, কিন্তু সবই তারা করত সংকেতভাষায়। শহরটির কেন্দ্রীয় আইন ছিল, ‘উচ্চারণিত শব্দ তথ্যের অপচয় ঘটায়।’ বহু বছর আগে সম্ভবত ২০৮৯ সালে, একটি বৈজ্ঞানিক দুর্ঘটনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তখন থেকে মানুষের মুখের ভাষা নিষিদ্ধ হয়। কণ্ঠস্বর কেবল গণবিজ্ঞপ্তি, জরুরি সংকেত, বা অনুমোদিত কৃত্রিম বাচনযন্ত্রে ব্যবহৃত হতে পারত। বাকি সব যোগাযোগ ছিল হাতের ভাষা, চোখের সংকেত, আর মস্তিষ্কে বসানো লিংক-চিপ-এর মাধ্যমে প্রেরিত নীরব তথ্যপ্রবাহ। যা চোখে-চোখে প্রেরিত হতে থাকে। কিন্তু এই শহরের নীচে, মাটির বহু গভ...