বনমালীপুর নামটি প্রথম শুনি এক বর্ষার রাতে , যখন শহরের আকাশে বৃষ্টি নেমেছিল এমনভাবে , যেন কারও পুরনো কান্না গলিপথ বেয়ে নেমে আসছে। আমি তখন ঢাকায় থাকি ; কাগজের পাতায় শব্দ সাজাই , কাটা-ছেঁড়া বাক্যকে সমান করি , আর নিজের জীবনকে যতটা সম্ভব শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার ভান করি। কিন্তু মনের ভিতরে এমন কিছু জায়গা থাকে , যা কখনও শৃঙ্খলার অধীন হয় না। বনমালীপুর সেরকমই একটি নাম হ ’ য়ে উঠল , অজানা অথচ পরিচিত , দূরের অথচ অসম্ভব নিকটবর্তী। এই নামটি আমাকে দিলেন আমার মা। তিনি খুব কমই অতীতের কথা বলতেন। তাঁর মুখ ছিল এমনই শান্ত , যেন জীবনের বড় বড় ঢেউ বহু আগেই তাঁর ওপর আছড়ে পড়েছে , আর তার পর তিনি শুধু ভিজে কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় বসে আছেন। একদিন হঠাৎ তিনি বললেন , ‘ তোর নানার বাড়ি ছিল বনমালীপুরে। ’ এতটুকুই। আমি জিজ্ঞেস করলাম , ‘ কেমন গ্রাম ?’ মা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন , ‘ নদীর কাছাকাছি। কাঁঠালগাছ আর বকুলফুলের গন্ধ থাকত। আর ছিল এক মেয়ে , যে গান গাইত। ’ তারপর তিনি চুপ ক ’ রে গেলেন। সেই ‘ এক মেয়ে ’ শব্দটি আমার ভেতরে অনেকদিন ধ ’ রে বেঁচে রইল। কে সে ? কী তার নাম ? কেন মায়ের কণ্ঠে সেই স্মৃতি এত ধীরে...
রোদ ওঠার আগে চোখবন্দি ছিল ঘুমের ঢেউ , আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই নীরব স্রোতের কাছে , তুমি কি শুনেছো চুপচাপ হাওয়ার কথা , যাতে মিশেছে ভাঙা প্রত্যাশার স্পর্শ ? পাতার নিচে শিশির জমে , রেখে গেছে এক শত প্রশ্ন , কেন ফিরে আসেনি আলো ? বলছে গাছফুল , আমি বলি , হে আলো , একটু থেমে যাও , দেখতে চাই তোমার মুখ কী রুপে ম্লান হয়েছে। শহরের রোদের খোলস ভেঙেছে , সঠিক রেখা হারিয়েছে , আমি তবু আঁকছি তোমায় একটা বিস্তৃত বিছানায় , হাত নেই দেওয়া , শব্দ নেই বলার , শুধু এই নিঃশ্বাস যা তোমার জন্য গান গায়। তুমি যদি এসো , বলব , চলে আসো , এই নীরব রাস্তায় , যেখানে আলো ঘুমিয়ে পড়েছে , আমাদের মুখোমুখি হবে চুপচাপ আনন্দ , যেখানে ভালোবাসা হবে একটি শব্দের নিচে ক্লিষ্ট।