বছরের শেষ বিকেলগুলো অদ্ভুত হয়। সূর্য তখন যেন পৃথিবীর কাছাকাছি নেমে আসে , আলো হ ’ য়ে ওঠে কোমল , আর মানুষের মন অকারণে পুরোনো দিনের দিকে হাঁটতে শুরু ক ’ রে। এমনই এক বিকেলে বৃদ্ধ আবদুল কাদের নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর বয়স পঞ্চাশ কাছাকাছি। চুলের সাদা রং দেখে মনে হয় শীত যেন অনেক আগেই এসে তাঁর মাথায় স্থায়ী বাসা বেঁধেছে। শরীর এখনও শক্ত , কিন্তু চোখে একটি দীর্ঘ ক্লান্তি। যে ক্লান্তি পথ চলার নয় , অপেক্ষার। নদী র নাম মধুমতী। একসময় এই নদীর বুক চিরে নৌকা চলত , মাঝিদের ভাটিয়ালি গান ভেসে আসত দূর গ্রাম থেকে। এখন নদী অনেক শান্ত। আগের মতো ঢেউ নেই , কোলাহল নেই। শুধু জল আছে , আর আছে সময়ের মতো ধীরে ধীরে ব ’ য়ে চলা স্রোত। কাদের সাহেব প্রতিদিন বিকেলে এখানে আসেন। গ্রামের মানুষ বিষয়টি জানে। কেউ কেউ বলে , তিনি নদী দেখতে আসেন। কেউ বলে , তিনি মৃত স্ত্রীর স্মৃতি খুঁজতে আসেন। আবার অনেকে বিশ্বাস করে , তিনি এমন একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা করেন , যে আর কখনো ফিরবে না। সত্যিটা কেউ জানত না। ঘাটের পাশে একটি পুরোনো বটগাছ। তার ছায়ায় বসে কাদের সাহেব একটি টিনের বাক্স খুললেন। বাক্সটি ছোট , কিন্...
শহরের শেষ ট্রেনটা রাত সাড়ে ন ’ টায় ছাড়ে। তখন প্ল্যাটফর্মে মানুষ কমে আসে , শব্দ কমে আসে , এমনকি লোহার ওপর লোহার ঘষার যে দীর্ঘশ্বাস , সেটাও যেন ধীরে ধীরে নিভে যায়। রেলস্টেশনের বুকের ভিতর জমে থাকা আলো তখন হলুদ , ক্লান্ত , আর সামান্য দুঃখী। ঠিক সেই সময়ে এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ান প্ল্যাটফর্মের এক কোণে। তার হাতে একটা বাদামি খাম , আর চোখে এমন এক দৃষ্টি , যেন তিনি কাউকে খুঁজছেনও না , আবার হারিয়েও যেতে চান না। বৃদ্ধটির নাম নুরুল হক। শহরের মানুষ তাকে চিনত না। কিন্তু শহরের পুরোনো গাছগুলো , ভেজা ইটের দেয়ালগুলো , আর স্টেশনের বিক্রেতারা তাকে অনেকদিন ধরে দেখে আসছিল। কেউ জানত , তিনি প্রতিদিন একবার করে আসেন। কেউ জানত , তিনি কারও জন্য অপেক্ষা করেন। আর কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে বলত , ‘ এ লোকটা মনে হয় নিজের অতীতের সঙ্গে দেখা করতে আসে। ’ সেদিন ট্রেন আসতে দেরি করছিল। দূরে কালো আকাশের ভর করে একটি সাদা আলো এগিয়ে আসছিল। নুরুল হক প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে খামটা খুললেন। ভিতরে ছিল দুটি জিনিস , একটি পুরোনো চিঠি , আর একটি ছোট্ট শুষ্ক ফুল , একদিন লাল ছিল , এখন ধূসর হ ’ য়ে গেছে। চিঠিটা পড়তে পড়তে তার ঠোঁট...