সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

ইলেকশন বনাম সিলেকশন: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

  ইলেকশন এবং সিলেকশন, এই শব্দ দু’টি কেবল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিন্ন রূপ নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবচেতনার গভীরতম দর্শনের সঙ্গে যুক্ত দু’টি বিপরীতধর্মী অথচ পরিপূরক ধারণা। ইলেকশন বা নির্বাচন বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে ভোটের মাধ্যমে বেছে নেয়। অন্যদিকে সিলেকশন বা নির্বাচনকৃত বাছাই হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ, দক্ষতা, যোগ্যতা বা প্রভাবের ভিত্তিতে কাউকে নির্বাচিত ক’রে। এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা কেবল রাজনৈতিক নয়; বরং তা নৈতিকতা, গণতন্ত্র, ক্ষমতা এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকেও গভীরভাবে স্পর্শ ক’রে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতার বণ্টন ও নেতৃত্ব নির্বাচন সর্বদাই একটি জটিল প্রক্রিয়া ছিল। প্রাচীন গ্রিক নগররাষ্ট্রে সীমিত পরিসরে ইলেকশনের ধারণা থাকলেও বাস্তবে সেখানে সিলেকশনের প্রভাব ছিল প্রবল। রাজতন্ত্রে সম্পূর্ণ সিলেকশন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, যেখানে জন্মই ছিল ক্ষমতার যোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড। আধুনিক গণতন্ত্র ইলেকশনকে কেন্দ্র ক’রে গ’ড়ে উঠলেও বাস্তব প্রেক্ষাপটে সিলেকশন এখনও অদৃশ্যভাবে সক্রিয়। ফলে ইলেকশন ও সিলেকশনের মধ্যে ...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

কবিতার প্রধান শত্রু

কবিতা মানুষের ভাষার সবচেয়ে সূক্ষ্ম , সবচেয়ে জটিল , সবচেয়ে অনির্বচনীয় শিল্প । সে যেমন হৃদয়ের গভীরতম সুরকে উচ্চারণ ক’রে , তেমনি ভাষার সীমাকে অতিক্রম ক’রে নীরবতার দিকে এগিয়ে যায় , আর এই কারণেই কবিতা লিখতে যেমন মন লাগে , তেমনি লাগে কঠোর আত্মশাসন , নিবিড় সংবেদন , গভীর পাঠ , নৈঃশব্দ্যের সাধনা এবং সত্যের প্রতি নির্মম আনুগত্য ; কিন্তু কবিতার এই সৌন্দর্য , এই অনির্বচনীয়তা , এই আত্মিক উচ্চতা যতই মহিমান্বিত হোক না কেন , তার পথ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে বহু শত্রু , যাদের কেউ বাইরের , কেউ ভেতরের , কেউ সামাজিক , কেউ নন্দনতাত্ত্বিক , কেউ মনস্তাত্ত্বিক , আর কেউ আবার সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে কবিতার দেহে ঢুকে পড়া ক্ষয়রোগের মতো ; এই শত্রুদের মধ্যে প্রধান শত্রু একটিই , কবিতার ভেতরের জীবন্ত সত্যকে নষ্ট ক’রে ফেলে যে কৃত্রিমতা , যে বাহুল্য , যে প্রস্তুত বাক্য , যে স্বাভাবিক অনুভবকে পরিত্যাগ ক’রে সাজানো ভাষার বিন্যাস সেটিই কবিতার প্রধান শত্রু । কারণ কবিতা প্রথমত সত্যের শিল্প , দ্বিতীয়ত সংহতির শিল্প , তৃতীয়ত সংবাদের নয় , অনুভবের শিল্প , এবং চতুর্থত কৃত্রিম চাকচিক্যের নয় । জীবনের অন্তর্গত স্পন্দনের শিল্প ; যেখানে অনুভূতি নেই...

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য চিন্তা

  আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পরিসরে বুদ্ধদেব বসু ( ১৯০৮ - ১৯৭৪ ) এমন এক নাম , যাঁকে শুধু কবি , ঔপন্যাসিক , নাট্যকার বা প্রাবন্ধিক হিসেবে আলাদা ভাবে বন্দি করলে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন সাহিত্যচিন্তার এমন এক নির্মাতা , যিনি সাহিত্যের ভিতরকে দেখেছেন , সাহিত্যের বাইরের শোরগোলের চেয়ে অনেক গভীরে। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল ভাষার অলংকার ছিল না , কেবল সমাজের দর্পণও ছিল না , আবার কেবল ব্যক্তিগত অনুভবের বিলাসও ছিল না । সাহিত্য ছিল জীবনের অন্তর্গত এক জটিল সৃজনশীল সত্য , যেখানে রূপ , অনুভূতি , বোধ , ইতিহাস , স্বপ্ন , সংকট , নৈঃশব্দ্য এবং বিদ্রোহ , সব একত্রে কাজ ক ’ রে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই যে , তিনি সাহিত্যকে কখনোই একমাত্রিক ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনেননি। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন , সাহিত্য মানুষের অস্তিত্বের এমন এক শর্ত , যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গেই নতুন ক ’ রে পরিচিত হয়। বুদ্ধদেব বসুর চিন্তাজগৎ গ ’ ড়ে উঠেছে একদিকে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তরপর্বে , অন্যদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতার সংস্পর্শে । ফলে তাঁর সাহিত্যদৃষ্টি একান্ত দেশীয়ও নয় , আবার নিছক পা...

ব্যর্থ স্বপ্ন, সার্থক স্বপ্ন

  স্বপ্ন মানুষের অস্তিত্বের প্রথম আলোকরেখা; জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যে অদৃশ্য হাত আমাদের চোখের পাতায় নরম আলো এঁকে দেয়, সেই হাতই আবার জীবনভর আমাদের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলে রাখে। মানুষ কেবল খাদ্য, আশ্রয়, শ্রম কিংবা সময়ের প্রবাহে বাঁচে না; মানুষ বাঁচে স্বপ্নে, আশা দিয়ে, আকাঙ্ক্ষার ভিতরে জ্বলে থাকা এক অন্তর্গত অগ্নিশিখায়। তবু সব স্বপ্ন সফল হয় না, সব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতার মুখ দেখে না, সব প্রতিজ্ঞা বাস্তবতার কঠিন শিলায় গিয়ে অক্ষত থাকে না। জীবনের পথ এমনই; সেখানে কোথাও আশাভঙ্গের দীর্ঘ ছায়া, কোথাও অপূর্ণতার তীব্র কাঁটা, কোথাও ব্যর্থতার নীরব আঘাত, আবার কোথাও সার্থকতার উজ্জ্বল উন্মেষ। ব্যর্থ স্বপ্ন এবং সার্থক স্বপ্ন, এই   দুই বিপরীত অবস্থানকে মানুষ জীবন-নাট্যের দুই প্রধান দৃশ্য হিসেবে বহন ক’রে; একটিতে বেদনার ভাঙন, অন্যটিতে পূরণের দীপ্তি, একটিতে হতাশার স্রোত, অন্যটিতে অর্জনের আনন্দ। কিন্তু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, ব্যর্থ স্বপ্নও সম্পূর্ণ ব্যর্থ নয়, সার্থক স্বপ্নও সব সময় নিখুঁত সাফল্যের নাম নয়; বরং উভয়েই মানুষের চরিত্র, জীবনবোধ, সংগ্রাম এবং আত্মঅনুসন্ধানের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। স্ব...

নিষিদ্ধ সম্পর্ক

  নিষিদ্ধ সম্পর্ক মানবজীবনের এক গভীর, জটিল, দ্বিধাবিভক্ত এবং বহুমাত্রিক বাস্তবতা। সমাজ, ধর্ম, নৈতিকতা, পরিবার, রাষ্ট্র, শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ, ক্ষমতা এবং ব্যক্তিসত্তার অসংখ্য স্তর যখন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন সম্পর্কের একটি বিশেষ রূপ ‘নিষিদ্ধ’ হ’য়ে ওঠে। এই নিষিদ্ধতা কেবল বাহ্যিক নিয়মের তৈরি নয়; এর ভেতরে থাকে ভয়, আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, প্রতিরোধ, স্মৃতি, এবং অবদমিত অনুভবের এক দীর্ঘ ইতিহাস। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সম্পর্ক-নির্ভর জীব, সে ভালোবাসে, আশ্রয় খোঁজে, সঙ্গ চায়, মানসিক উষ্ণতা চায়, আবার একই সঙ্গে সমাজ তাকে শেখায় কোন সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক অগ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক পবিত্র, কোন সম্পর্ক অপবিত্র, কোন সম্পর্ক কলুষিত, কোন সম্পর্ক প্রকাশযোগ্য, কোন সম্পর্ক গোপনীয়। এই শিক্ষা ও অভ্যাসের সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় নিষিদ্ধ সম্পর্কের নাটক। যার মধ্যে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা এবং সমাজের শাসন একই সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ায়। নিষিদ্ধ সম্পর্ক তাই শুধু কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি, মানুষের অবদমিত চাহিদার প্রতিফলন, এবং নৈতিকতার বহিরাবরণে লুকিয়ে থাকা মানবিক দুর্বলতার প্রক...

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী

  বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, আন্দোলন, রাষ্ট্রগঠন আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস নয়; এটি বুদ্ধির, বিবেকের, ভাষার এবং আত্মমর্যাদারও ইতিহাস। এই ইতিহাসে যে গোষ্ঠীটি সবচেয়ে গভীরভাবে উপস্থিত থেকেছে, সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে, আবার সবচেয়ে বেশি দায়িত্বও বহন করেছে, তারা হলো বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী। ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি এখানে কেবল পেশাগত শিক্ষিত মানুষদের নির্দেশ করে না; এটি এমন এক মানসিক ও নৈতিক অবস্থান, যেখানে মানুষ সমাজকে দেখে, সমাজের পক্ষে কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সত্যকে রক্ষা ক’রে এবং নিজের বুদ্ধিকে কেবল জীবিকার অস্ত্র না বানিয়ে বিবেকের আলোতে রূপান্তরিত ক’রে। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী তাই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মী নন; তিনি ইতিহাসের সাক্ষী, সমাজের অন্তর্জাগতিক অনুবাদক, জাতির চেতনার রক্ষক এবং সংকটের মুহূর্তে নীরব বা উচ্চকিত এক নৈতিক কণ্ঠস্বর। এই দেশের বুদ্ধিজীবীকে বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, এই ভূখণ্ডে বুদ্ধিজীবী হওয়া কখনোই নিরাপদ ছিল না; এটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, বিরোধপূর্ণ, প্রায়শই নিঃসঙ্গ এবং অনেক সময় প্রাণঘাতী এক অবস্থান। উপনিবেশি...