সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য চিন্তা

  আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পরিসরে বুদ্ধদেব বসু ( ১৯০৮ - ১৯৭৪ ) এমন এক নাম , যাঁকে শুধু কবি , ঔপন্যাসিক , নাট্যকার বা প্রাবন্ধিক হিসেবে আলাদা ভাবে বন্দি করলে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন সাহিত্যচিন্তার এমন এক নির্মাতা , যিনি সাহিত্যের ভিতরকে দেখেছেন , সাহিত্যের বাইরের শোরগোলের চেয়ে অনেক গভীরে। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল ভাষার অলংকার ছিল না , কেবল সমাজের দর্পণও ছিল না , আবার কেবল ব্যক্তিগত অনুভবের বিলাসও ছিল না । সাহিত্য ছিল জীবনের অন্তর্গত এক জটিল সৃজনশীল সত্য , যেখানে রূপ , অনুভূতি , বোধ , ইতিহাস , স্বপ্ন , সংকট , নৈঃশব্দ্য এবং বিদ্রোহ , সব একত্রে কাজ ক ’ রে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই যে , তিনি সাহিত্যকে কখনোই একমাত্রিক ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনেননি। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন , সাহিত্য মানুষের অস্তিত্বের এমন এক শর্ত , যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গেই নতুন ক ’ রে পরিচিত হয়। বুদ্ধদেব বসুর চিন্তাজগৎ গ ’ ড়ে উঠেছে একদিকে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তরপর্বে , অন্যদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতার সংস্পর্শে । ফলে তাঁর সাহিত্যদৃষ্টি একান্ত দেশীয়ও নয় , আবার নিছক পা...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

ব্যর্থ স্বপ্ন, সার্থক স্বপ্ন

  স্বপ্ন মানুষের অস্তিত্বের প্রথম আলোকরেখা; জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যে অদৃশ্য হাত আমাদের চোখের পাতায় নরম আলো এঁকে দেয়, সেই হাতই আবার জীবনভর আমাদের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলে রাখে। মানুষ কেবল খাদ্য, আশ্রয়, শ্রম কিংবা সময়ের প্রবাহে বাঁচে না; মানুষ বাঁচে স্বপ্নে, আশা দিয়ে, আকাঙ্ক্ষার ভিতরে জ্বলে থাকা এক অন্তর্গত অগ্নিশিখায়। তবু সব স্বপ্ন সফল হয় না, সব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতার মুখ দেখে না, সব প্রতিজ্ঞা বাস্তবতার কঠিন শিলায় গিয়ে অক্ষত থাকে না। জীবনের পথ এমনই; সেখানে কোথাও আশাভঙ্গের দীর্ঘ ছায়া, কোথাও অপূর্ণতার তীব্র কাঁটা, কোথাও ব্যর্থতার নীরব আঘাত, আবার কোথাও সার্থকতার উজ্জ্বল উন্মেষ। ব্যর্থ স্বপ্ন এবং সার্থক স্বপ্ন, এই   দুই বিপরীত অবস্থানকে মানুষ জীবন-নাট্যের দুই প্রধান দৃশ্য হিসেবে বহন ক’রে; একটিতে বেদনার ভাঙন, অন্যটিতে পূরণের দীপ্তি, একটিতে হতাশার স্রোত, অন্যটিতে অর্জনের আনন্দ। কিন্তু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, ব্যর্থ স্বপ্নও সম্পূর্ণ ব্যর্থ নয়, সার্থক স্বপ্নও সব সময় নিখুঁত সাফল্যের নাম নয়; বরং উভয়েই মানুষের চরিত্র, জীবনবোধ, সংগ্রাম এবং আত্মঅনুসন্ধানের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। স্ব...

নিষিদ্ধ সম্পর্ক

  নিষিদ্ধ সম্পর্ক মানবজীবনের এক গভীর, জটিল, দ্বিধাবিভক্ত এবং বহুমাত্রিক বাস্তবতা। সমাজ, ধর্ম, নৈতিকতা, পরিবার, রাষ্ট্র, শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ, ক্ষমতা এবং ব্যক্তিসত্তার অসংখ্য স্তর যখন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন সম্পর্কের একটি বিশেষ রূপ ‘নিষিদ্ধ’ হ’য়ে ওঠে। এই নিষিদ্ধতা কেবল বাহ্যিক নিয়মের তৈরি নয়; এর ভেতরে থাকে ভয়, আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, প্রতিরোধ, স্মৃতি, এবং অবদমিত অনুভবের এক দীর্ঘ ইতিহাস। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সম্পর্ক-নির্ভর জীব, সে ভালোবাসে, আশ্রয় খোঁজে, সঙ্গ চায়, মানসিক উষ্ণতা চায়, আবার একই সঙ্গে সমাজ তাকে শেখায় কোন সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক অগ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক পবিত্র, কোন সম্পর্ক অপবিত্র, কোন সম্পর্ক কলুষিত, কোন সম্পর্ক প্রকাশযোগ্য, কোন সম্পর্ক গোপনীয়। এই শিক্ষা ও অভ্যাসের সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় নিষিদ্ধ সম্পর্কের নাটক। যার মধ্যে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা এবং সমাজের শাসন একই সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ায়। নিষিদ্ধ সম্পর্ক তাই শুধু কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি, মানুষের অবদমিত চাহিদার প্রতিফলন, এবং নৈতিকতার বহিরাবরণে লুকিয়ে থাকা মানবিক দুর্বলতার প্রক...

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী

  বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, আন্দোলন, রাষ্ট্রগঠন আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস নয়; এটি বুদ্ধির, বিবেকের, ভাষার এবং আত্মমর্যাদারও ইতিহাস। এই ইতিহাসে যে গোষ্ঠীটি সবচেয়ে গভীরভাবে উপস্থিত থেকেছে, সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে, আবার সবচেয়ে বেশি দায়িত্বও বহন করেছে, তারা হলো বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী। ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি এখানে কেবল পেশাগত শিক্ষিত মানুষদের নির্দেশ করে না; এটি এমন এক মানসিক ও নৈতিক অবস্থান, যেখানে মানুষ সমাজকে দেখে, সমাজের পক্ষে কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সত্যকে রক্ষা ক’রে এবং নিজের বুদ্ধিকে কেবল জীবিকার অস্ত্র না বানিয়ে বিবেকের আলোতে রূপান্তরিত ক’রে। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী তাই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মী নন; তিনি ইতিহাসের সাক্ষী, সমাজের অন্তর্জাগতিক অনুবাদক, জাতির চেতনার রক্ষক এবং সংকটের মুহূর্তে নীরব বা উচ্চকিত এক নৈতিক কণ্ঠস্বর। এই দেশের বুদ্ধিজীবীকে বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, এই ভূখণ্ডে বুদ্ধিজীবী হওয়া কখনোই নিরাপদ ছিল না; এটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, বিরোধপূর্ণ, প্রায়শই নিঃসঙ্গ এবং অনেক সময় প্রাণঘাতী এক অবস্থান। উপনিবেশি...

পাকিস্তানবাদী বাংলা সাহিত্য

  পাকিস্তানবাদী বাংলা সাহিত্য বলতে সাধারণভাবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) যে সাহিত্যধারা গ’ড়ে উঠেছিল এবং যেখানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শ, দ্বিজাতি তত্ত্ব, ইসলামী জাতীয়তাবাদ, এবং একটি একক ‘পাকিস্তানি পরিচয়’ নির্মাণের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে তাকে বোঝানো হয়। এই সাহিত্যধারাকে বোঝার জন্য কেবল সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং তৎকালীন ইতিহাস, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বকে একসাথে বিবেচনা করা জরুরি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ভারত বিভক্ত হ’য়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়, কিন্তু ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুই অংশ পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান-নিয়ে গঠিত এই রাষ্ট্র শুরু থেকেই অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক সংকটে জর্জরিত ছিল। ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, আর পূর্ব পাকিস্তান ছিল জনসংখ্যায় বেশি হলেও রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমত...

বাংলাদেশে খুন ও ধর্ষণ: এক নির্মম ঘটনা

  বাংলাদেশের সমাজ আজ এক অদ্ভুত দ্বৈরথের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে; একদিকে মানুষের স্বপ্ন, উন্নয়ন, অগ্রগতির গল্প, অন্যদিকে প্রতিদিনের সংবাদপত্রের ভাঁজে ভাঁজে রক্তের দাগ, নারীর আর্তনাদ, নিভে যাওয়া জীবনের শোক, আর বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া। খুন ও ধর্ষণ এমন দুটি অপরাধ, যা কেবল আইনভঙ্গ নয়, বরং মানবতার ওপর সরাসরি আঘাত। এ-দুটি ঘটনা ঘটলে শুধু একজন মানুষের জীবনই ধ্বংস হয় না, একটি পরিবার ভেঙে পড়ে, একটি সমাজের বিবেক কেঁপে উঠে, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে খুন ও ধর্ষণের ঘটনা তাই নিছক অপরাধতত্ত্বের বিষয় নয়; এটি সমাজবিজ্ঞান, নৈতিকতা, রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, মনস্তত্ত্ব এবং সাহিত্যেরও গভীর আলোচ্য। কারণ সাহিত্য মানুষের ভিতরের অন্ধকারকে যেমন ধারণ ক’রে, তেমনি সমাজের অসুখকেও আয়নার মতো প্রতিফলিত ক’রে। এই দেশ, যার ইতিহাস রক্ত, ত্যাগ, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ এবং আত্মমর্যাদার ইতিহাস। সেই দেশের বুকে আজও কেন মানুষ মানুষকে হত্যা করে, কেন নারীর শরীরকে ক্ষমতার ক্ষেত্র বানানো হয়, কেন ভয়ের সংস্কৃতি ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক হ’য়ে উঠছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল অপরাধীদের দিকে তাকালেই চলবে না; ত...

নতুন বইয়ের ঘ্রান

  নতুন বইয়ের ঘ্রান, এই একটিমাত্র ঘ্রানেই যেন সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব ক’রে তোলার গোপন ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে। পুরোনো দিনের ধুলো, ঘুমন্ত দুপুর, জানালার বাইরে থেমে-থেমে নামা রোদ, স্কুলব্যাগের কোণে সেঁটে থাকা শৈশবের নিরীহ ভয়, আর একরাশ অজানা সম্ভাবনা, সব মিলিয়ে বইয়ের সেই প্রথম গন্ধটি এমন এক অনুভব, যা শুধু নাকে আসে না, মনকেও স্পর্শ করে; মনে হয়, কেউ যেন দূর থেকে কোনো অদৃশ্য দরজা খুলে দিল, আর সেই দরজা পেরিয়ে হঠাৎ এক নতুন আলোর ঘরে প্রবেশ করলাম। নতুন বই হাতে নিলে প্রথম যে অনুভূতিটি জেগে ওঠে, তা হলো আকাঙ্ক্ষা; পাতা উল্টানোর আগে থেকেই মনে হয়, কোথাও হয়তো আমারই মতো এক নিঃসঙ্গ চিন্তা দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও হয়তো কোনো অপরিচিত লেখক শব্দের জালে লুকিয়ে রেখেছেন আমার না-বলা কথাগুলো, কোথাও হয়তো এমন এক পংক্তি অপেক্ষা করছে, যেটি আমাকে অচেনা ভোরের দিকে নিয়ে যাবে। বই কেবল কাগজের বাঁধাই নয়, কেবল ছাপার কালি নয়, কেবল মলাটের রং নয়; বই এক ধরনের নীরব যাত্রা, এক ধরনের ধীর অথচ গভীর উচ্চারণ, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরেই বারবার ফিরে আসে এবং নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার ক’রে। আর সেই যাত্রার দরজায় যে গন্ধটি প্রথম পাহারাদার হয়ে দাঁড়ায়, স...