সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

নিঃসঙ্গ মেঘ ও আমরা তিনজন -ছোট গল্প

  শহরটা দিনশেষে এমন এক রঙে ডুবে যেত , যেন কেউ আকাশের ওপর পুরোনো তামার পাত বসিয়ে দিয়েছে। জানালার কাচে শেষ বিকেলের আলো লেগে থাকত কিছুক্ষণ , তারপর ধীরে - ধীরে নেমে আসত ধোঁয়ার মতো নীল অন্ধকার। সেই শহরে , ঠিক এমন এক ঋতুর সন্ধ্যায় , অয়ন প্রথমবার বুঝেছিল , কিছু প্রেম মানুষকে সম্পূর্ণ ক ’ রে না , বরং ভেঙে ভেঙে নতুন ক ’ রে গ ’ ড়ে তোলে। অয়ন ছিল স্থির চোখের একজন মানুষ। সে কম কথার মানুষ।   ভাবনায় গভীর , চেতনায় আধুনিক , ভাবনায় অনেকটা অগ্রগামী । বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত ; স্লোগান বানাত , ব্র্যান্ডকে মানুষের স্বপ্নের মতো দেখাতে শিখত , অথচ নিজের জীবনের জন্য কোনো স্লোগান তার কাছে ছিল না। অফিসের কাচঘেরা তলাটিতে সবাই যখন ভেসে চলত দ্রুততা আর উচ্চাভিলাষের মধ্যে , তখন অয়ন চুপচাপ নোটবুকের পেছনের পাতায় লিখত , ‘ মানুষ যা চায় , তা সবসময় মানুষ যা প্রয়োজন , তা নয়। ’ এই একটি বাক্যই যেন তার ভিতরের বেঁচে থাকাকে ব্যাখ্যা করত।তার জীবনে প্রথম ঢুকেছিল মেঘলা। নামের মতোই সে ছিল অনিশ্চিত , ছায়াময় , অথচ আশ্চর্য উজ্জ্বল। মেঘলার হাসি ছিল এমন , যেন ব্যস্ত একটি গলি হঠাৎ একফোঁটা বৃষ্টিতে ধু ’ য়ে গেলে যে স্বস্তি ন...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

অনুপস্থিতির নীল সৌন্দর্য

  তুমি চলে যাওয়ার পর , আমি আবিষ্কার করেছি মানুষের ভেতরেও একটি আবহাওয়া থাকে , সেখানে হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি নামে কোনো মেঘ ছাড়া সেখানে বজ্রপাত হয় কিন্তু আকাশে র কোনো শব্দ শোনা যায় না সেখানে শীত কাল নেমে নামে এমনভাবে , যেন একটি মৃত নক্ষত্র তার শেষ আলোটুকু ফিরিয়ে নিয়েছে তুমি চলে যাওয়ার পর , আমার ঘরের দেয়ালগুলো অদ্ভুত হ ’ য়ে উঠেছে রাতের বেলা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে , যেন তারা জেনে গেছে কতবার আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি তোমার নামের শব্দের চারপাশে ঘুরে বেড়াই এখন আর আমি তোমাকে ডাকি না , কারণ ডাকলে যদি ফিরে আসতে , তবে পৃথিবীর সমস্ত নদী শুধু উৎসের দিকে ই ব’য়ে যেত আমি শুধু তোমার অনুপস্থিতিকে ডাকি খুব নীরব আর শান্ত হ’য়ে আমি আজকাল মানুষের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে হারাই কারণ , তোমাকে হারানোর পরনিজেকে খুঁজে পাওয়ার আর কোনো প্রয়োজন বোধ করি না , কখনো কখনো গভীর রাতে আমি জানালার পাশে বসে থাকি। শহর তখন নিঃশব্দে গাঢ় ঘুমে মগ্ন রাস্তার বাতিগুলো জেগে থাকে একদল ব্যর্থ কবির মতো আর আমি ভাবি , তুমি কি কখনো হঠাৎ ঘুম ভেঙে আমার কথা মনে করো ? মনে পড়ে কি সেইসব দিন , যখন পৃথিবী আমাদের কাছে ...

ঘাস ফড়িঙের ছায়া-ছোট গল্প

  বর্ষার পরে অজস্র দিন কেটে গেলেও ওই সন্ধ্যেটির কথা আমার মনে এমনভাবে রয়ে গেছে , যেন বৃষ্টির জল শুকিয়ে গেলেও মাটির ভিতর থেকে একটুকরো সোঁদা গন্ধ উ ’ ঠে আসে। শহরের বাইরের পুরনো বাসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম দেখেছিলাম তাকে , একটি অল্পবয়সী মেয়ে , কাঁধে সাদা চাদর , হাতে কিছু বই , আর চোখে এমন এক অস্বচ্ছল উজ্জ্বলতা , যা মানুষের ভিতরের ক্লান্তিকে হঠাৎ অপমান ক ’ রে। তার নাম মীরা। নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল , এই নামের ভিতরে যেন এক ধরনের নরম কাচ আছে ; আলো পড়লে ঝিলমিল ক ’ রে , কিন্তু হাত দিলে আঙুল কাটে। আমার নিজের বয়স তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। বয়সের এই পর্যায়ে মানুষ হয় দৃঢ় হয়ে ওঠে , না হয় ভেতরে ভেতরে ভেঙে যেতে শুরু ক ’ রে। আমি দ্বিতীয় দলে ছিলাম। বাইরে থেকে আমাকে শান্ত , সুশৃঙ্খল , হয়তো কিছুটা নিরাসক্ত বলেই মনে হত। ভেতরে , সে সময় , এক পুরনো ক্ষত ক্রমাগত জেগে থাকত , সেই ক্ষতটি কোনো প্রেমের সম্পূর্ণ ভাঙন নয় , আবার কেবল বিচ্ছেদও নয় ; বরং এক এমন অসমাপ্ততার যন্ত্রণা , যেখানে হারানোর চেয়ে বেশি কষ্ট থাকে হারানোর আগের দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। এই অসমাপ্ততাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে , আবার ধীরে ...

যে লোকটি নিজের ছায়া হারিয়েছিল-ছোট গল্প

  শহরের পুরোনো রেকর্ডঘরটির জানালা খুব নিচু ছিল , এত নিচু যে দুপুরের রোদ সোজা এসে ফাইলের ধুলোয় গলতে গলতে স্তিমিত হ ’ য়ে পড়ত , আর সেই ধুলোর ভেতর দিয়ে বসে থাকা মানুষটিকে দেখে মনে হতো সে যেন আলো নয় , সময়ের ভেতর বসে আছে ; তার নাম ছিল তাজউদ্দিন , বয়স ষাট ছুঁইছুঁই , জীবনের অর্ধেকেরও বেশি কেটেছে জন্মনিবন্ধন , জমির দলিল , মৃত সনদ , নাগরিক পরিচয় , আর নানান কাগজের মাঝখানে , যেখানে মানুষের কান্না প্রায়ই কালি হয়ে আসে , স্বাক্ষর হয়ে জমে , আর সিলের শব্দে জীবনের গোপন দিকগুলো আরও বেশি নির্জীব হয়ে ওঠে ; তাজউদ্দিনের কাজ ছিল লিখে রাখা , অথচ লিখে রাখতে রাখতে সে এমন এক মানুষ হয়ে উঠেছিল যে বাস্তব আর নকলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারত না , কারণ কাগজে যা থাকে তা অনেক সময় মানুষে থাকে না , আর মানুষে যা থাকে তা কাগজে লেখা যায় না। একদিন সকালে , যখন অফিসের দরজায় দাঁড়ানো চৌকিদার জব্বার চা খেতে খেতে একটা ছেঁড়া খবরের কাগজ উল্টাচ্ছিল , তাজউদ্দিন দেখল তার টেবিলের উপর একটি বাদামি খাম পড়ে আছে ; খামের গায়ে কোনো প্রেরকের নাম নেই , প্রাপকের নামও নেই , শুধু একটামাত্র বাক্য লেখা: যদি আপনি এখনো নিজের ছায়া দ...