সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

ইমদাদুল হক মিলনের 'নুরজাহান'

  ইমদাদুল হক মিলনের (১৯৫৫-) নুরজাহান উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যে এক গভীর মানবিক ও সামাজিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে , যেখানে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি আসলে একটি সামষ্টিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এই উপন্যাসকে কেবল একটি নারীর করুণ জীবনের বিবরণ হিসেবে পড়লে এর গভীরতা ধরা পড়ে না ; বরং এটি এক ধরনের নীরব সামাজিক নথি , যেখানে পিতৃতন্ত্র , ক্ষমতার কাঠামো , নৈতিক ভাঙন এবং ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি মিলিত হয়ে এক নির্মম বাস্তবতা নির্মাণ ক ’ রে। এখানে সাহিত্য কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয় , এটি একটি প্রতিবাদের ভাষা , একটি সাক্ষ্য। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নুরজাহানকে যদি আমরা কেবল ব্যক্তি হিসেবে দেখি , তাহলে তার জীবনের বেদনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ; কিন্তু লেখক তাকে এমনভাবে নির্মাণ ক ’ রেছেন যে সে হয়ে ওঠে একটি প্রতীকী সত্তা। সে যেন গ্রামীণ বাংলাদেশের হাজারো অবদমিত কণ্ঠের প্রতিনিধি , যাদের জীবনের ওপর সমাজের নিয়ম আর ক্ষমতার ভারী ছায়া পড়ে থাকে। তার জীবন শুরু হয় সম্ভাবনার আলো নিয়ে , কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আলো নিভে যেতে থাকে সামাজিক বাস্তবতার কঠোরতায়। এই নিভে যাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় ; বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে সমাজ-বাস্তবতার উপস্থিতি

  সেলিনা হোসেন (১৯৪৭-) বাংলা কথাসাহিত্যের এমন এক প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক , যাঁর রচনাবলিতে সমাজ-বাস্তবতা কেবল একটি বিষয় নয় , বরং সাহিত্যসৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি। তাঁর উপন্যাসে ব্যক্তি ও সমাজ , ইতিহাস ও বর্তমান , শোষণ ও প্রতিরোধ , সবকিছু এমনভাবে মিশে থাকে যে তা পাঠককে এক গভীর অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে যায়। এই প্রবন্ধে তাঁর উপন্যাসে সমাজ-বাস্তবতার উপস্থিতি বিস্তৃতভাবে আলোচিত হবে , যেখানে আমরা তাঁর বিষয়বস্তু , চরিত্র নির্মাণ , ভাষাশৈলী , ইতিহাসচেতনা , নারীর অবস্থান , শ্রেণিসংগ্রাম এবং সামগ্রিক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করব। সেলিনা হোসেনের সাহিত্যজগৎ মূলত সমাজের ভেতরের বাস্তবতাকে কেন্দ্র ক ’ রে গ ’ ড়ে উঠেছে। তিনি কখনোই কল্পনার অতিরঞ্জিত জগতে আশ্রয় নেন না ; বরং বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন , মানুষের দুঃখ-দুর্দশা , আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সংগ্রামকে তাঁর লেখার উপজীব্য করেছেন। তাঁর উপন্যাস পড়লে মনে হয় , তিনি যেন সমাজের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী , যিনি মানুষের জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ক ’ রে তা শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। এই বাস্তবতার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা তাঁকে অন্য অনেক লেখকের থেকে আলাদা ক ’ রে তোলে। ...

প্রতিশোধ

  নিশীথের নীরবতায় আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি ধীরে , যেন ভাঙা তারারাও শুনে ফেলে গোপন এই আকাঙ্ক্ষা , জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিরে লিখি অদৃশ্য চিঠি তুমি পড়ো কি না , তা জানার অধিকারও নেই আমার শহরের আলো নিভে গেলে যে অন্ধকার জেগে ওঠে , তার ভেতরেই তোমার মুখ খুঁজি , অনবরত , একাগ্রতায় , ভালোবাসা যেন এক প্রাচীন নদীনামহীন , দিকহীন , যার স্রোতে ভেসে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই আমি জানি , তুমি আসবে না কোনোদিন এই পথে , তবু প্রতিটি পদধ্বনি শুনলেই মনে হয়তুমিই বুঝি! এমন এক বিভ্রমে বেঁচে থাকা কি পাপ , নাকি কবিতা ? তোমার নীরবতাই যেন আমার একমাত্র উত্তর দূর আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদটিও আজ ক্লান্ত লাগে , যেন সে-ও জানে এই অসমাপ্ত প্রেমের ইতিহাস , আমার বু ’ কের ভেতর যে আগুন জ্বলে অবিরত , তা কোনো জলেই নেভে না , না বৃষ্টিতে , না অশ্রুতে তোমার অনুপস্থিতি এক অদ্ভুত উপস্থিতি হ ’ য়ে থাকে , প্রতিটি শব্দে , প্রতিটি নিশ্বাসে তার ছায়া পড়ে , আমি যত দূরে যেতে চাই , তত কাছে টানে সে , এ এক অদ্ভুত বন্দিত্বস্বেচ্ছায় গড়া , তবু অনিবার্য হয়তো কোনোদিন তুমি বুঝবে না এই গভীরতা , হয়তো এই কবিতাও পৌঁছাবে না তো...

বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ'রে বৃষ্টি’

  বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু উপন্যাস আছে , যেগুলো কেবল গল্প বলে না , বরং পাঠকের মনের ভিতর এক ধরনের নীরব আবহ তৈরি করে। বুদ্ধদেব বসু ’ র ( ১৯০৮-১৯৭৪) ‘ রাত ভরে বৃষ্টি ’ তেমনই একটি উপন্যাস। এটি বাহ্যিক ঘটনাবহুল কাহিনি নয় ; বরং মানুষের অন্তর্জগতের সূক্ষ্ম কাঁপন , সম্পর্কের অনিশ্চয়তা , স্মৃতির চাপ , এবং অপূর্ণতার মর্মন্তুদ সৌন্দর্যের এক শিল্পিত রূপ। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয় , লেখক যেন কাহিনি না বলে এক ধরনের অনুভব নির্মাণ করছেন। এই অনুভবের কেন্দ্রেই আছে বৃষ্টি , রাত , নিঃসঙ্গতা , এবং মানুষের অস্থির মন। ‘ রাত ভরে বৃষ্টি ’ শিরোনামটিই উপন্যাসের কাব্যিক আত্মা প্রকাশ করে। রাত ও বৃষ্টি , দুটোই এমন দুইটি উপাদান , যেগুলো দৃশ্যমান বাস্তবতার চেয়ে মানসিক আবহকেই বেশি ধারণ করে। রাত মানে শুধু অন্ধকার নয় ; রাত মানে অন্তর্গত নির্জনতা , নিজের সঙ্গে নিজের মুখোমুখি হওয়ার সময় , এবং মনে চাপা পড়ে থাকা কথাগুলোর জেগে ওঠা। আবার বৃষ্টি মানে কেবল জল পড়া নয় ; বৃষ্টি স্মৃতিকে নাড়ায় , বেদনাকে নরম করে , এবং অনুভূতিকে ছড়িয়ে দেয়। এই উপন্যাসে বৃষ্টি যেন মানুষের না-বলা কথার ভাষা। রাতভর বৃষ্...

বিরহের অভ্যন্তরীণ জ্যামিতি

  আমি এখন তাকে কোনো অনুভূতি বলে মানি না , সে এক জটিল জ্যামিতি , যেখানে প্রতিটি রেখা শুরু হয় তোমার কাছে , কিন্তু কোনো রেখাই আর তোমার কাছে পৌঁছায় না ; সবগুলো পথ মাঝপথে থেমে গিয়ে নিজেকেই ঘিরে ফেলে এক অনন্ত বৃত্তের ভেতরে। তোমার অনুপস্থিতি আমার ভেতরে এমন এক স্থিরতা তৈরি করেছে , যেখানে সময়ও প্রবেশ করতে ভয় পায় , ঘড়ির কাঁটা চলে , কিন্তু আমার ভেতরের সময় এক বিন্দুতে আটকে থাকে , যেন কোনো অমীমাংসিত সমীকরণ আমি এখন অনুভব করি , বিরহ আসলে কোনো শূন্যতা নয় , বরং অতিরিক্ত উপস্থিতি , এত বেশি তোমার উপস্থিতি যে তা সহ্য করা যায় না , তাই তাকে আমরা ‘ না থাকা ’ বলে ভুল করি। রাত গভীর হলে আমার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা হেঁটে যায় , সে শব্দহীন , তবু তার পদচারণা আমি শুনতে পাই , যেন সে প্রতিটি কোষে গিয়ে তোমার অনুপস্থিতির সীলমোহর বসিয়ে দেয় আমি ঘুমোতে গেলে স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে একটা অস্পষ্ট সীমানা খুলে যায় সেখানে তুমি কখনো পুরোপুরি আসো না , কখনো পুরোপুরি যাওও না , শুধু এক অর্ধেক উপস্থিতির মতো আমাকে বিভ্রান্ত করে রাখো , বিরহের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলোতে আমি নিজের ভেতরে একটি অ...

এই নিঃসঙ্গতার অলঙ্কার

তোমাকে হারানোর পর আমি ধীরে ধীরে , প্রায় গোপনে , নিজের ভেতর এক অদ্ভুত শিল্পের জন্ম হতে দেখেছি , যেখানে দুঃখ কোনো সরল অনুভূতি নয় , বরং বহুস্তর বিশিষ্ট , সূক্ষ্মভাবে বিন্যস্ত এক স্থাপত্য , যার প্রতিটি দেয়ালে খোদাই করা আছে তোমার অনুপস্থিতির অনিবার্য ছায়া তুমি ছিলে , কেবল একজন মানুষ হিসেবে নয় , বরং আমার দিনগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি নিরবচ্ছিন্ন অর্থের স্রোত হিসেবে , যা আমার প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতিকে একটি কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখত ; আর এখন তুমি নেই , কিন্তু এই ‘ না থাকা ’ এমন এক তীব্র উপস্থিতি , যা সমস্ত উপস্থিতিকেই ছাপিয়ে গিয়ে নিজেকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করে আমি যখন শহরে হাঁটি , মানুষের অসংখ্য মুখের মধ্যে হঠাৎ কোনো অচেনা ভঙ্গি , কোনো অর্ধেক হাসি , কিংবা একটি অবহেলিত দৃষ্টির ভেতর তোমার অস্পষ্ট প্রতিরূপ দেখতে পাই , এবং সেই মুহূর্তে পুরো শহরটাই যেন এক বিভ্রম হয়ে ওঠে , যেখানে তুমি নেই , তবু তুমি ছড়িয়ে আছো সর্বত্র বিকেলের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে নেমে আসে বারান্দার নিঃশব্দ প্রান্তে , আমি অনুভব করি , এই আলো , এই বাতাস , এই স্তব্ধতা একসময় তোমার শরীরের খুব কাছে ছিল ...

অনুপস্থিতির গোপন নক্ষত্রপুঞ্জ

  তোমার চলে যাওয়ার পর আমার ভেতরে এক অদ্ভুত ভূগোল জন্মেছে যেখানে মানচিত্রে কোনো দেশ নেই , শুধু তোমার অনুপস্থিতির বিস্তীর্ণ মরুভূমি , আর সেখানে বালুকণার বদলে ঝ ’ রে প ’ ড়ে ভাঙা উচ্চারণ , অসমাপ্ত বাক্য , আর নিঃশব্দ কান্নার ক্ষুদ্র কণিকা আমি এখন শব্দের ভিতর বাস করি না , শব্দগুলো এখন আমার ভেতর বাস ক ’ রে তারা তোমার নামের চারপাশে ঘুরতে থাকে মঙ্গল গ্রহের মতো , কিন্তু কোনো কক্ষপথ খুঁজে পায় না , কোনো কেন্দ্র নেই , কারণ তুমি তো সেই কেন্দ্র ছিলে না রাত হলেই আমার ঘুমের দরজায় এসে দাঁড়ায় কিছু অদেখা ছায়া ,   তারা তোমার গন্ধে ভেজা , তোমার হাসির ভাঙা প্রতিধ্বনি ব ’ য়ে আনে , আর আমি অন্ধের মতো সেই প্রতিধ্বনিকে স্পর্শ করতে চাই , কিন্তু স্পর্শের আগেই সবকিছু গ ’ লে যায় এক অদৃশ্য শূন্যতায় আমি এখন আর কাঁদি না কান্নাগুলো বদলে গেছে অভ্যন্তরীণ ঝ ’ ড়ের ভাষায় , যেখানে কোনো শব্দ নেই , কেবল বু ’ কের গভীরে একটা নীরব বজ্রপাত ঘটে বারবার , তোমার স্মৃতি এখন কোনো সরল স্মৃতি নয় , এটা এক বহুমাত্রিক গোলকধাঁধা , যেখানে আমি প্রতিদিন হারিয়ে যাই , নিজেকেই খুঁজতে খুঁজতে তোমার আরও কাছে...