বর্ষার পরে অজস্র দিন কেটে গেলেও ওই সন্ধ্যেটির কথা আমার মনে এমনভাবে রয়ে গেছে , যেন বৃষ্টির জল শুকিয়ে গেলেও মাটির ভিতর থেকে একটুকরো সোঁদা গন্ধ উ ’ ঠে আসে। শহরের বাইরের পুরনো বাসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম দেখেছিলাম তাকে , একটি অল্পবয়সী মেয়ে , কাঁধে সাদা চাদর , হাতে কিছু বই , আর চোখে এমন এক অস্বচ্ছল উজ্জ্বলতা , যা মানুষের ভিতরের ক্লান্তিকে হঠাৎ অপমান ক ’ রে। তার নাম মীরা। নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল , এই নামের ভিতরে যেন এক ধরনের নরম কাচ আছে ; আলো পড়লে ঝিলমিল ক ’ রে , কিন্তু হাত দিলে আঙুল কাটে। আমার নিজের বয়স তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। বয়সের এই পর্যায়ে মানুষ হয় দৃঢ় হয়ে ওঠে , না হয় ভেতরে ভেতরে ভেঙে যেতে শুরু ক ’ রে। আমি দ্বিতীয় দলে ছিলাম। বাইরে থেকে আমাকে শান্ত , সুশৃঙ্খল , হয়তো কিছুটা নিরাসক্ত বলেই মনে হত। ভেতরে , সে সময় , এক পুরনো ক্ষত ক্রমাগত জেগে থাকত , সেই ক্ষতটি কোনো প্রেমের সম্পূর্ণ ভাঙন নয় , আবার কেবল বিচ্ছেদও নয় ; বরং এক এমন অসমাপ্ততার যন্ত্রণা , যেখানে হারানোর চেয়ে বেশি কষ্ট থাকে হারানোর আগের দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। এই অসমাপ্ততাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে , আবার ধীরে ...
শহরের পুরোনো রেকর্ডঘরটির জানালা খুব নিচু ছিল , এত নিচু যে দুপুরের রোদ সোজা এসে ফাইলের ধুলোয় গলতে গলতে স্তিমিত হ ’ য়ে পড়ত , আর সেই ধুলোর ভেতর দিয়ে বসে থাকা মানুষটিকে দেখে মনে হতো সে যেন আলো নয় , সময়ের ভেতর বসে আছে ; তার নাম ছিল তাজউদ্দিন , বয়স ষাট ছুঁইছুঁই , জীবনের অর্ধেকেরও বেশি কেটেছে জন্মনিবন্ধন , জমির দলিল , মৃত সনদ , নাগরিক পরিচয় , আর নানান কাগজের মাঝখানে , যেখানে মানুষের কান্না প্রায়ই কালি হয়ে আসে , স্বাক্ষর হয়ে জমে , আর সিলের শব্দে জীবনের গোপন দিকগুলো আরও বেশি নির্জীব হয়ে ওঠে ; তাজউদ্দিনের কাজ ছিল লিখে রাখা , অথচ লিখে রাখতে রাখতে সে এমন এক মানুষ হয়ে উঠেছিল যে বাস্তব আর নকলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারত না , কারণ কাগজে যা থাকে তা অনেক সময় মানুষে থাকে না , আর মানুষে যা থাকে তা কাগজে লেখা যায় না। একদিন সকালে , যখন অফিসের দরজায় দাঁড়ানো চৌকিদার জব্বার চা খেতে খেতে একটা ছেঁড়া খবরের কাগজ উল্টাচ্ছিল , তাজউদ্দিন দেখল তার টেবিলের উপর একটি বাদামি খাম পড়ে আছে ; খামের গায়ে কোনো প্রেরকের নাম নেই , প্রাপকের নামও নেই , শুধু একটামাত্র বাক্য লেখা: যদি আপনি এখনো নিজের ছায়া দ...