সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ'রে বৃষ্টি’

  বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু উপন্যাস আছে , যেগুলো কেবল গল্প বলে না , বরং পাঠকের মনের ভিতর এক ধরনের নীরব আবহ তৈরি করে। বুদ্ধদেব বসু ’ র ( ১৯০৮-১৯৭৪) ‘ রাত ভরে বৃষ্টি ’ তেমনই একটি উপন্যাস। এটি বাহ্যিক ঘটনাবহুল কাহিনি নয় ; বরং মানুষের অন্তর্জগতের সূক্ষ্ম কাঁপন , সম্পর্কের অনিশ্চয়তা , স্মৃতির চাপ , এবং অপূর্ণতার মর্মন্তুদ সৌন্দর্যের এক শিল্পিত রূপ। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয় , লেখক যেন কাহিনি না বলে এক ধরনের অনুভব নির্মাণ করছেন। এই অনুভবের কেন্দ্রেই আছে বৃষ্টি , রাত , নিঃসঙ্গতা , এবং মানুষের অস্থির মন। ‘ রাত ভরে বৃষ্টি ’ শিরোনামটিই উপন্যাসের কাব্যিক আত্মা প্রকাশ করে। রাত ও বৃষ্টি , দুটোই এমন দুইটি উপাদান , যেগুলো দৃশ্যমান বাস্তবতার চেয়ে মানসিক আবহকেই বেশি ধারণ করে। রাত মানে শুধু অন্ধকার নয় ; রাত মানে অন্তর্গত নির্জনতা , নিজের সঙ্গে নিজের মুখোমুখি হওয়ার সময় , এবং মনে চাপা পড়ে থাকা কথাগুলোর জেগে ওঠা। আবার বৃষ্টি মানে কেবল জল পড়া নয় ; বৃষ্টি স্মৃতিকে নাড়ায় , বেদনাকে নরম করে , এবং অনুভূতিকে ছড়িয়ে দেয়। এই উপন্যাসে বৃষ্টি যেন মানুষের না-বলা কথার ভাষা। রাতভর বৃষ্...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

বিরহের অভ্যন্তরীণ জ্যামিতি

  আমি এখন তাকে কোনো অনুভূতি বলে মানি না , সে এক জটিল জ্যামিতি , যেখানে প্রতিটি রেখা শুরু হয় তোমার কাছে , কিন্তু কোনো রেখাই আর তোমার কাছে পৌঁছায় না ; সবগুলো পথ মাঝপথে থেমে গিয়ে নিজেকেই ঘিরে ফেলে এক অনন্ত বৃত্তের ভেতরে। তোমার অনুপস্থিতি আমার ভেতরে এমন এক স্থিরতা তৈরি করেছে , যেখানে সময়ও প্রবেশ করতে ভয় পায় , ঘড়ির কাঁটা চলে , কিন্তু আমার ভেতরের সময় এক বিন্দুতে আটকে থাকে , যেন কোনো অমীমাংসিত সমীকরণ আমি এখন অনুভব করি , বিরহ আসলে কোনো শূন্যতা নয় , বরং অতিরিক্ত উপস্থিতি , এত বেশি তোমার উপস্থিতি যে তা সহ্য করা যায় না , তাই তাকে আমরা ‘ না থাকা ’ বলে ভুল করি। রাত গভীর হলে আমার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা হেঁটে যায় , সে শব্দহীন , তবু তার পদচারণা আমি শুনতে পাই , যেন সে প্রতিটি কোষে গিয়ে তোমার অনুপস্থিতির সীলমোহর বসিয়ে দেয় আমি ঘুমোতে গেলে স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে একটা অস্পষ্ট সীমানা খুলে যায় সেখানে তুমি কখনো পুরোপুরি আসো না , কখনো পুরোপুরি যাওও না , শুধু এক অর্ধেক উপস্থিতির মতো আমাকে বিভ্রান্ত করে রাখো , বিরহের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলোতে আমি নিজের ভেতরে একটি অ...

এই নিঃসঙ্গতার অলঙ্কার

তোমাকে হারানোর পর আমি ধীরে ধীরে , প্রায় গোপনে , নিজের ভেতর এক অদ্ভুত শিল্পের জন্ম হতে দেখেছি , যেখানে দুঃখ কোনো সরল অনুভূতি নয় , বরং বহুস্তর বিশিষ্ট , সূক্ষ্মভাবে বিন্যস্ত এক স্থাপত্য , যার প্রতিটি দেয়ালে খোদাই করা আছে তোমার অনুপস্থিতির অনিবার্য ছায়া তুমি ছিলে , কেবল একজন মানুষ হিসেবে নয় , বরং আমার দিনগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি নিরবচ্ছিন্ন অর্থের স্রোত হিসেবে , যা আমার প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতিকে একটি কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখত ; আর এখন তুমি নেই , কিন্তু এই ‘ না থাকা ’ এমন এক তীব্র উপস্থিতি , যা সমস্ত উপস্থিতিকেই ছাপিয়ে গিয়ে নিজেকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করে আমি যখন শহরে হাঁটি , মানুষের অসংখ্য মুখের মধ্যে হঠাৎ কোনো অচেনা ভঙ্গি , কোনো অর্ধেক হাসি , কিংবা একটি অবহেলিত দৃষ্টির ভেতর তোমার অস্পষ্ট প্রতিরূপ দেখতে পাই , এবং সেই মুহূর্তে পুরো শহরটাই যেন এক বিভ্রম হয়ে ওঠে , যেখানে তুমি নেই , তবু তুমি ছড়িয়ে আছো সর্বত্র বিকেলের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে নেমে আসে বারান্দার নিঃশব্দ প্রান্তে , আমি অনুভব করি , এই আলো , এই বাতাস , এই স্তব্ধতা একসময় তোমার শরীরের খুব কাছে ছিল ...

অনুপস্থিতির গোপন নক্ষত্রপুঞ্জ

  তোমার চলে যাওয়ার পর আমার ভেতরে এক অদ্ভুত ভূগোল জন্মেছে যেখানে মানচিত্রে কোনো দেশ নেই , শুধু তোমার অনুপস্থিতির বিস্তীর্ণ মরুভূমি , আর সেখানে বালুকণার বদলে ঝ ’ রে প ’ ড়ে ভাঙা উচ্চারণ , অসমাপ্ত বাক্য , আর নিঃশব্দ কান্নার ক্ষুদ্র কণিকা আমি এখন শব্দের ভিতর বাস করি না , শব্দগুলো এখন আমার ভেতর বাস ক ’ রে তারা তোমার নামের চারপাশে ঘুরতে থাকে মঙ্গল গ্রহের মতো , কিন্তু কোনো কক্ষপথ খুঁজে পায় না , কোনো কেন্দ্র নেই , কারণ তুমি তো সেই কেন্দ্র ছিলে না রাত হলেই আমার ঘুমের দরজায় এসে দাঁড়ায় কিছু অদেখা ছায়া ,   তারা তোমার গন্ধে ভেজা , তোমার হাসির ভাঙা প্রতিধ্বনি ব ’ য়ে আনে , আর আমি অন্ধের মতো সেই প্রতিধ্বনিকে স্পর্শ করতে চাই , কিন্তু স্পর্শের আগেই সবকিছু গ ’ লে যায় এক অদৃশ্য শূন্যতায় আমি এখন আর কাঁদি না কান্নাগুলো বদলে গেছে অভ্যন্তরীণ ঝ ’ ড়ের ভাষায় , যেখানে কোনো শব্দ নেই , কেবল বু ’ কের গভীরে একটা নীরব বজ্রপাত ঘটে বারবার , তোমার স্মৃতি এখন কোনো সরল স্মৃতি নয় , এটা এক বহুমাত্রিক গোলকধাঁধা , যেখানে আমি প্রতিদিন হারিয়ে যাই , নিজেকেই খুঁজতে খুঁজতে তোমার আরও কাছে...

গভীর রাতে

  গভীর রাতে বাতাস বাজছে একান্তরে , আমি ধরি তোমার হাত , হাত ধরে বেয়ে যাই নদীর কিনারায় জলরাশি হেসে ওঠে কতবার বলেছে তোমার নাম , আমি শুনি কতবার হারিয়েছে নিজের গহীনে-গহীনে পাতার নিচে দাঁড়িয়ে দেখি তোমার প্রতিচ্ছবি , চোখে আলো , মুখে ছায়া , হৃদয়ে হারিয়ে যাওয়ার গান প্রকৃতির শরীরে ভালোবাসা খোঁজে এক নিঃশব্দ স্পন্দন , আমি খুঁজি তা তোমার ভেজা চুলের রেখায় , আমার অশ্রুর বিন্দুতে তুমি যদি হয়েছো এক ফুল , আমি হতাম মধুর ফুলশয্যায় , সুদূর আকাশের নীল থেকে এনে তোমায় সজ্জিত করতাম আজ বলি , আমি থাকব তোমার সঙ্গে , যে বর্জ্য মিটিয়ে দেবে সব একাকিত্বের ব্যথা প্রকৃতি বলবে ভালোবাসো , তোমার ও আমার মাঝে , এবং রাতের কবলে আলোর স্পন্দন হ ’ য়ে উঠবে নতুন প্রভাত।  

আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘২৩ নম্বর তৈলচিত্র’

  আলাউদ্দিন আল আজাদের   ‘ ২৩ নম্বর তৈলচিত্র ’   ( ১৯৬০) বাংলা সাহিত্যের একটি মনস্তাত্ত্বিক ও শিল্পতাত্ত্বিক মাইলফলক। এটি কেবল একজন চিত্রশিল্পীর জীবনসংগ্রামের আখ্যান নয় , বরং মানুষের অবদমিত কামনা , শিল্পসত্তা এবং সামাজিক সংস্কারের এক জটিল রসায়ন। উপন্যাসটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শিল্পী জাহেদ। তার কাছে চিত্রকর্ম কেবল রেখা বা রঙের বিন্যাস নয় , বরং জীবনের গূঢ় সত্য উন্মোচনের মাধ্যম। উপন্যাসের নাম ‘ ২৩ নম্বর তৈলচিত্র ’ প্রতীকীভাবে সেই বিশেষ শিল্পকর্মটিকে নির্দেশ করে , যা জাহেদের জীবনের চরম সত্যকে ধারণ ক ’ রে আছে। জাহেদ এমন এক শিল্পী যিনি ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তার ক্যানভাসে ফু ’ টে ওঠে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং অবচেতনের অন্ধকার অলিগলি। আলাউদ্দিন আল আজাদ এই উপন্যাসে মানুষের অবচেতন মনের এক নিপুণ ময়নাতদন্ত করেছেন। জাহেদ তার ভাই ও ভ্রাতৃবধূর সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে নিজের শিল্পীসত্তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা ক ’ রে। জাহেদের বড় ভাই শরিফ এবং তার স্ত্রী সুরাইয়ার দাম্পত্য জীবনের ফাঁকফোকর দিয়ে জাহেদের মনে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় , তা-ই এই উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি। সু...

কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও ‘১৯৭১’ উপন্যাস

  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রাম যখন তুঙ্গে , তখন সীমান্তের ওপারে বসে সেই আগ্নেয় উপাখ্যানকে লেখনীতে রূপ দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১) । তাঁর ১৯৭১ উপন্যাসটি কেবল একটি যুদ্ধের দলিল নয় , বরং এটি এক বিপন্ন মানবতার ঘুরে দাঁড়ানোর আর্তনাদ ও আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক সংকলন। তারাশঙ্করের লেখনীতে সবসময়ই প্রান্তিক মানুষ ও মৃত্তিকা-সংলগ্ন জীবন জয়গান গেয়েছে , আর এই উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি জাতি তার অস্তিত্বের সংকটে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে বিস্ফোরিত হয়। উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের অবরুদ্ধ জনপদ , পাক হানাদার বাহিনীর নির্মমতা এবং তার বিপরীতে বাংলার দামাল ছেলেদের মরণপণ লড়াই। লেখক এখানে কেবল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করেননি , বরং মানুষের মনের গহীনে থাকা দেশপ্রেম ও ত্যাগের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। উপন্যাসের চরিত্রগুলো যেন এক-একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হ ’ য়ে ওঠে , যারা শান্তির নীড় হারিয়ে যুদ্ধের দাবদাহে পুড়ে খাঁটি সোনায়...