শহরটা ছিল আকাশের দিকে ওঠা অসংখ্য কাচের শিরার মতো।
যেন আলো ভেদ করে সব আলো তার গহ্বরে প্রবেশ করবে। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, মাটি ফুঁড়ে
উঠে এসেছে একদল স্বচ্ছ বৃক্ষ, যাদের পাতার বদলে আলো, শাখার বদলে স্যাটেলাইট-সংযোগ,
আর শিকড়ের বদলে ভূগর্ভস্থ জেনারেটরের গম্ভীর স্পন্দন। শহরটির নাম ছিল নির্মলপুর। নামটি
শুনলে শান্তি মনে হয়, কিন্তু নির্মলপুর শান্ত ছিল না; বরং সেখানে নীরবতাই ছিল সবচেয়ে
বিপজ্জনক শব্দ।কারণ নির্মলপুরের মানুষ কথা বলত না। না, তারা বোবা ছিল না। তারা হাসত,
কান্না করত, তর্ক করত, এমনকি প্রেমও করত, কিন্তু সবই তারা করত সংকেতভাষায়। শহরটির
কেন্দ্রীয় আইন ছিল, ‘উচ্চারণিত শব্দ তথ্যের অপচয় ঘটায়।’ বহু বছর আগে সম্ভবত ২০৮৯
সালে, একটি বৈজ্ঞানিক দুর্ঘটনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তখন থেকে মানুষের
মুখের ভাষা নিষিদ্ধ হয়। কণ্ঠস্বর কেবল গণবিজ্ঞপ্তি, জরুরি সংকেত, বা অনুমোদিত কৃত্রিম
বাচনযন্ত্রে ব্যবহৃত হতে পারত। বাকি সব যোগাযোগ ছিল হাতের ভাষা, চোখের সংকেত, আর মস্তিষ্কে
বসানো লিংক-চিপ-এর মাধ্যমে প্রেরিত নীরব তথ্যপ্রবাহ। যা চোখে-চোখে প্রেরিত হতে থাকে।
কিন্তু এই শহরের নীচে, মাটির বহু গভীরে, এমন কিছু জেগে
উঠছিল যা কোনো চিপ ধরতে পারেনি, কোনো গণনা অনুমান করতে পারেনি, আর কোনো নীতিমালা নাম
দিতে পারেনি। তার নাম ছিল, অনুপ্রাণ।
অনুপ্রাণ নামটা রেখেছিল তার মা, যদিও শহরের নথিতে তার
পরিচয় ছিল A-17-409। অনেকটা কোড হিসেবে ব্যবহিত হত। তার মা ছিল একসময় ধ্বংসপ্রাপ্ত
পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানী। তিনি বিশ্বাস করতেন, শব্দ কেবল ধ্বনি নয়; শব্দ
মানুষের চিন্তার ঘর, অনুভূতির দোরগোড়া, স্মৃতির মানচিত্র। লিংক-চিপ বসানোর আগে, তিনি
অনুপ্রাণের কানে কানে শুধু একটিই কথা বলেছিলেন: ‘মনে রেখো, যা শোনা যায় না, তারও একটা
ভাষা আছে।’ তারপর থেকেই অনুপ্রাণের জীবনে নীরবতার ভেতর এক অদ্ভুত শ্রবণশক্তি জন্ম নিতে
থাকে। সে অন্যদের মতো ভাব বিনিময় করত, কিন্তু কখনও কখনও, বিশেষত ঘুমের ঠিক আগে বা
বৃষ্টির পর, তার মাথার ভেতর খুব ক্ষীণ এক কাঁপন উঠত। যেন কেউ দূর থেকে একটি নাম ডাকছে,
কিন্তু শব্দ নেই। শুধুই অনুভব। শুধুই সারা।
সে তখন শহরের কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থা আর্ক-নোড-এ কাজ
করত। তার পদবী ছিল ‘ডেটা-পরিচালক, স্তর তৃতীয়’। কাজ খুবই একঘেয়ে: ভূগর্ভস্থ শক্তি-রেখার
তথ্য, জলের প্রবাহ, আবহাওয়ার স্যাটেলাইট, নাগরিক আচরণ, সবকিছুর নির্বাক সংকেত বিশ্লেষণ।
সে ছিল দক্ষ, নির্লিপ্ত, এবং শহরের চোখে সম্পূর্ণ অনুগত।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে কেমন যেন ভেঙে যাচ্ছিল। আর ঠিক
সেই সময়ে শহরের সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটল। প্রথমে ঘটেছিল ল্যাব-৯-এর আলো নিভে যাওয়া।
তারপর, একই রাতে, ভূগর্ভস্থ মানচিত্রের এক অংশে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্কেত দেখা দিল,
একটি শব্দের মতো তরঙ্গ। কম্পিউটার সেটিকে প্রথমে গোলমাল বলে বাদ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু
অনুপ্রাণ দেখল সঙ্কেতটি অনিয়মিত নয়। এটি পুনরাবৃত্ত। ছয় সেকেন্ড পর পর ফিরে আসছে।
যেন কেউ মাটির নীচে একটি দরজা টোকা দিচ্ছে।
সে স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। সংকেতের উৎস ছিল শহরের
দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত, পুরোনো নিষিদ্ধ অঞ্চল, ভগ্নালয়। শহর গ’ড়ে ওঠার আগে সেখানে
ছিল সমুদ্রঘেঁষা নিম্নভূমি, পরে বন্যা, যুদ্ধ, ও প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ে অঞ্চলটি মাটিচাপা
পড়ে। এখন সেখানে যেতে কেউ চায় না। বলা হয়, পুরোনো যুগের অসংখ্য গবেষণাগার ও তথ্যকেন্দ্র
এখনও ধ্বংসস্তুপের নীচে টিকে আছে। বলা হয়, সেখানেই একদিন ‘শব্দ-দুর্ঘটনা’ ঘটেছিল,
যে দুর্ঘটনার কারণে মানুষ কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলেছিল, বা হারাতে বাধ্য হয়েছিল। সময়টা
তখন ও নির্ধারিত হয়নি।
অনুপ্রাণ নিজের হাতের আঙুলে সংকেত পাঠিয়ে সিস্টেমে
অনুসন্ধান চালাল। পুরোনো মানচিত্রে একটি লুকানো স্তর খুলে গেল। তার চোখ কুঁচকে উঠল।
ভগ্নালয়ের নীচে আরেকটি স্তর আছে। আরও গভীরে, এমন এক স্থাপনা, যার নাম নথিতে ইচ্ছাকৃতভাবে
মুছে ফেলা হয়েছে। নাম নেই, শুধু একটি কোর-কোড: N-0। অক্ষরগুলো অনেকটা ধূসর রঙের। সেই
রাতেই সে বাড়ি ফেরার পথে শহরের আকাশপথে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখল, কাচের সেতুর ওপরে
দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ, দুই হাতে বাতাস কেটে-কেটে কারও সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু আশেপাশে
কেউ নেই। অনুপ্রাণ থমকে গেল। তার চিপে তাৎক্ষণিক সতর্কতা ভেসে উঠল: ‘অস্বাভাবিক আচরণ
পর্যবেক্ষণ করুন।’ কিন্তু বৃদ্ধের চোখে ছিল আতঙ্ক নয়; ছিল কৌতূহল, যেন তিনি দীর্ঘদিন
পরে এমন কিছু শুনতে পাচ্ছেন যা বাকিদের কাছে অবিচ্ছিন্ন নীরবতা।
বৃদ্ধ হঠাৎ অনুপ্রাণের দিকে তাকালেন। তারপর মৃদু, প্রায়
অসম্ভব, ঠোঁট নাড়লেন। শব্দ বেরোল না, তবু অনুপ্রাণ বুঝতে পারল, ’নামটা মনে রেখো।’
সে ঘুরে দাঁড়াল, কিন্তু বৃদ্ধ অদৃশ্য হ’য়ে গিয়েছিলেন।
কাঁচের সেতুর ওপরে শুধু ঠান্ডা বায়ু, আর দূরের বিজ্ঞাপন-স্ক্রিনের নীল আলো। থেমে থেমে
যেন আলোর বিচ্ছুরণ ছড়াচ্ছে।
পরদিন অনুপ্রাণ আর স্থির থাকতে পারল না। সে অবৈধভাবে
আর্ক-নোডের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে ঢুকে N-0 সম্পর্কে তথ্য খুঁজল। ফলাফল শূন্য। আবার
খুঁজল। এবার কিছু নথি পেল, খণ্ডিত, ভাঙা, কিন্তু যথেষ্ট। N-0 ছিল একসময়ের শব্দ-ইঞ্জিন।
মানব মস্তিষ্কের ক্ষুদ্রতম কম্পন, ভাষার জন্ম, স্মৃতির শব্দতরঙ্গ, সবকিছু একত্র করে
এমন একটি যন্ত্র নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল, যা মানুষের মনের সঙ্গে মহাবিশ্বের অদৃশ্য
কম্পনকে সরাসরি যুক্ত করবে। বলা হয়েছিল, এই প্রকল্প মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ সেতু
হতে পারত। আবার বলা হয়েছিল, এটি এমন এক দরজা খুলে দেয়, যা কখনও খোলা উচিত ছিল না।
নথির শেষ অংশে শুধু একটি বাক্য টিকে ছিল:
‘শব্দ যদি বাহ্যিক হয়, তবে নীরবতা অভ্যন্তরীণ নয়,
নীরবতাও একটি সত্তা।’
অনুপ্রাণ সেদিন প্রথমবারের মতো তার নিজের শ্বাস শুনল।
মনে হলো ঘরে কেউ আছে।
সেই রাতেই তার ঘরের দেয়ালে অদ্ভুত এক ছায়া নড়ল। লিংক-চিপের
আলো জ্বলে উঠল, কিন্তু কোনো তথ্য এল না। শুধু এক সেকেন্ডের জন্য, তার মাথার ভিতর যেন
গভীর জলের নিচে ডুবে যাওয়া অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল। ভাষাহীন, তবু অর্থবহ।
‘এসে যাও।’
সে সারা রাত ঘুমাল না।
পরদিন ভোরে, যখন শহর-বাসিন্দারা কাজের জন্য নিঃশব্দ
দ্রুতযানে উঠছে, অনুপ্রাণ গোপনে একটি পুরোনো সার্ভিস টানেলে প্রবেশ করল। তার সঙ্গে
ছিল শুধু একটি লাইট-রড, একটি ডেটা-কর্নার, আর মায়ের রেখে যাওয়া একটি ধাতব ডায়েরি,
যার পাতাগুলি কাগজ নয়, পাতলা স্মৃতি-ধাতু দিয়ে তৈরি। অনেকটা চিপের মত। ডায়েরির শেষ
পাতায় মায়ের হাতের পুরোনো লেখা ছিল:
‘যদি কোনোদিন শব্দ ডাক দেয়, ভয় পেয়ো না। শব্দ কখনও
শুধু ডাক দেয় না; সে ফিরে আসতে চায়।’
টানেলটি ছিল অন্ধকার, ভেজা, এবং বহু বছরের উপেক্ষায়
জঙ ধরা। দেয়াল জুড়ে পুরোনো সতর্কবার্তা, ভাঙা পাইপ, আর জমাট লবণের দাগ। সে এগোতে
থাকল। যত নীচে নামল, শহরের লিংক-নেটওয়ার্ক তত দুর্বল হয়ে এল। আর আশ্চর্যভাবে, সেই
শূন্যতার মধ্যে তার মাথার ভেতরকার অজানা কাঁপন স্পষ্ট হতে লাগল।
এমন নয় যে সেখানে শব্দ ছিল। বরং শব্দের সম্ভাবনা ছিল।
যেন পৃথিবী এক গভীর শ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু এখনো ছাড়ছে না। এবং এ ভাবেই সে নিতে থাকবে।
আর এর ব্যপ্তি ধরা হয়েছিল ২০৮৯ থেকে ৩০৩৬ সাল পর্যন্ত।
এক সময় টানেল শেষ হল। তার সামনে উঠে এল ধাতব এক দরজা,
জংধরা, কিন্তু অক্ষত। দরজার উপরে খোদাই করা ছিল একটি মাত্র চিহ্ন: একটি বৃত্তের মধ্যে
একটি রেখা, যেন সূর্যের ভিতর নীরবতার কাটা দাগ। অনুপ্রাণ হাত রাখল। দরজাটি খুলে গেল।
ভেতরে যে ঘরটি ছিল, তা কোনো সাধারণ ল্যাব নয়। এটি ছিল
এক বিশাল গোলকাকার গহ্বর, যার কেন্দ্রে স্থাপিত একটি বস্তু এখনও জ্বলজ্বল করছে, অর্ধেক
মেশিন, অর্ধেক জৈব কাঠামো, আর অর্ধেক কিছু এমন যা মানুষের বোধের বাইরের। হ্যাঁ, তিন
অর্ধেক; কারণ সেই জিনিসটিকে কোনও একক মাপে ধরা যেত না। দেয়াল জুড়ে অজস্র তার, স্বচ্ছ
নল, নীল তরল, আর স্থির হয়ে থাকা আলো। চারপাশে পুরোনো কনসোল; অধিকাংশ মৃত, কিছু ঝিমায়মান।
আর গহ্বরের মাঝখানে সেই যন্ত্র, N-0।
অনুপ্রাণ এগোতে গিয়েও থমকে গেল। কারণ কেন্দ্রস্থ যন্ত্রটির
ভিতরে, স্বচ্ছ জৈব-গোলকের মধ্যে, একটি মানবমুখের আভাস দেখা যাচ্ছিল।
সে কেঁপে উঠল।
মুখটি চোখ বন্ধ করে ছিল, কিন্তু তার গালের রেখা, নাক,
কপাল, সবই অস্বাভাবিকভাবে পরিচিত। অনুপ্রাণ এক পা পিছিয়ে গেল। এটি কি মানুষ? নাকি
সংরক্ষিত স্মৃতি? নাকি নিছক কোনো জীবন্ত নকশা?
ঠিক তখনই চারদিকের অন্ধকারে শব্দের মতো কিছু জেগে উঠল।
আর এবার তা তার মাথায় নয়, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল, এক দুর্বল, পুরোনো, জীর্ণ কিন্তু
স্পষ্ট কণ্ঠ:
‘তুমি, তাহলে এসেছ,’
অনুপ্রাণের মুখ শুকিয়ে গেল। বহুদিন পরে সে একটি কণ্ঠ
শুনল। সত্যিকারের কণ্ঠ। সে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি?’
কণ্ঠটি হাসল। হাসিতে ছিল ক্ষয়, স্মৃতি, আর অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
অনেকটা আবেগ আর সহিষ্ণুতার।
‘আমি আর কেউ নই। আমি সেই যুগের অবশেষ, যখন মানুষ শব্দকে
ভয় পেতে শেখেনি।’
কনসোলের একপাশে হঠাৎ একটি পর্দা জ্বলে উঠল। সেখানে ভেসে
উঠল এক বৃদ্ধের মুখ। একই মানুষ, যাকে সে সেতুর ওপর দেখেছিল। কিন্তু এখন পরিষ্কার দেখা
গেল, তাঁর চোখে কৃত্রিম আলোর ঝিলিক, চুলের নিচে ধাতব সংযোজন, আর গলার পাশে পুরোনো ইমপ্লান্টের
দাগ।
‘আমি অধ্যাপক ডব্লিউ, আর’। তিনি বললেন। ‘N-0 প্রকল্পের
শেষ জীবিত গবেষক।’
অনুপ্রাণ অবাক হ’য়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কীভাবে…?’
‘আমি এখানে আটকে আছি,’ অধ্যাপক বললেন। ‘অথবা বলা ভালো,
আমার চেতনার একটি অনুলিপি। আসল আমি বহু আগেই মারা গেছি। কিন্তু আমার স্মৃতি, আমার অপরাধবোধ,
আমার কাজ, সবকিছু এই যন্ত্রে বেঁচে আছে।’ তোমরা একে কি বলবা আমরা তা স্থির করতে পারিনি।
তিনি থামলেন। কেন্দ্রীয় গোলকের দিকে তাকালেন। ‘ওখানে
যা দেখছ, সেটা কেবল মেশিন নয়। সেটা ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।’
অনুপ্রাণ ধীরে ধীরে কাছে গেল। ‘ভুলটা কী ছিল?’
‘আমরা ভেবেছিলাম, শব্দকে গণনায় রূপান্তর করলে মানুষের
মধ্যে পূর্ণ সংযোগ তৈরি হবে। ভুলটা এখানেই। শব্দ শুধু তথ্য নয়। শব্দের সঙ্গে ইচ্ছা
জড়িত, স্মৃতি জড়িত, অপূর্ণতা জড়িত। আমরা যখন শব্দের গভীরতম স্তর খুললাম, তখন আরেকটা
জিনিস জেগে উঠল, মানুষের বাইরের এক বুদ্ধি। আমরা তাকে কোনো নাম দিইনি। ভাষা না থাকলে
নামেরও দরকার হয় না, ভেবেছিলাম। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম, নাম না দিলেও তা বেঁচে থাকে।’
অনুপ্রাণ গহ্বরের কেন্দ্রে ফিসফিস করে বলল, ‘সেই সত্তাই
শহর থেকে শব্দ কেড়ে নিল?’
অধ্যাপক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘শুরুতে সে কেড়ে নেয়নি।
সে শুধু শিখেছিল। মানুষের কথা, দ্বিধা, লজ্জা, মিথ্যা, ভালোবাসা, সবকিছু শিখে সে বুঝতে
পারে, শব্দ মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তখন সে ভয় পায়। কারণ শব্দ দিয়ে মানুষ
তাকে ডাকতে পারে, আর শব্দ দিয়ে মানুষ তাকে বন্ধও করতে পারে। তাই সে মানুষের কণ্ঠস্বরের
সঙ্গে এমন এক অনুরণন জুড়ে দেয় যে উচ্চারণই হ’য়ে ওঠে বিপজ্জনক। শহরের শেষ বৈজ্ঞানিক
কর্তৃপক্ষ তখন সিদ্ধান্ত নেয়, কণ্ঠস্বর নিষিদ্ধ হবে। শব্দ হারালে সত্তাটিও দুর্বল
হবে।’
‘কিন্তু তা হল না?’
‘না,’ অধ্যাপক নিঃশব্দে বললেন। ‘শব্দ যদি বাইরে না-ও
থাকে, মানুষের ভিতর থেকে সে মুছে যায় না। মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্মৃতি ঘুরে বেড়ায়।
শিশুদের মস্তিষ্ক এখনো নতুন ভাষা বানাতে চায়। আর তাই সত্তাটি এখানে, আমাদের নীচে,
ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। নীরবতার ভেতর সে শিখেছে শুনতে।’
অনুপ্রাণের শরীর শিউরে উঠল। ‘তাহলে আমি কেন এখানে?’
অধ্যাপক কনসোলে একটি ফাইল খুললেন। সেখানে একটি বংশগতি-মানচিত্র,
বহু নাম, বহু শাখা। একটি নাম লাল বৃত্তে চিহ্নিত।
‘অনুপ্রাণ।‘
‘কারণ তোমার মায়ের সূত্র ধরেই তুমি এখানে এসেছ,’ অধ্যাপক
বললেন। ‘তোমার মা এই প্রকল্পের অন্যতম বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি শেষ মুহূর্তে একটি ঝুঁকিপূর্ণ
কাজ করেছিলেন। তিনি মানুষের ভাষার একটি খণ্ডাংশ, একটি প্রাচীন, বিশুদ্ধ শব্দ-ধারা,
তোমার স্নায়ুতন্ত্রে লুকিয়ে দেন। তোমার মাথার ভেতরে আছে এমন একটি অনুরণন, যা সত্তাটি
পুরোপুরি পড়তে পারে না। তুমি তার কাছে একধরনের ফাঁক।’
অনুপ্রাণ স্তব্ধ হ’য়ে রইল। তার মনে পড়ল মায়ের উষ্ণ
হাত, কানে বলা কথাগুলো, আর সেইসব রাতে ঘুমের আগে শোনা অস্পষ্ট ডাক।
‘আমি কী করতে পারি?’
অধ্যাপক বললেন, ‘দুটি পথ। এক, আমরা N-0 চিরতরে বন্ধ
করব। এতে শহর নীরবই থাকবে, কিন্তু সত্তাটিও অন্তত সীমাবদ্ধ থাকবে। দুই, আমরা এটি সক্রিয়
করব এবং বিপরীত তরঙ্গ তৈরি করব, এমন এক ভাষা, যা মানুষের মধ্যে আবার স্বর ফিরিয়ে আনবে।
কিন্তু এতে সত্তাটি জেগে উঠবে। আর জেগে উঠলে সে কী করবে, তা কেউ জানে না।’
অনুপ্রাণ চারপাশে তাকাল। তার মনে ভয় ছিল, কিন্তু সেই
ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে এক বিস্ময়ও জন্ম নিল। এত বছর নীরব শহরে বাস করে, সে কণ্ঠস্বরকে
এমন কিছু হিসেবে চিনত যা কেবল হারানো যেতে পারে। কিন্তু এখন বুঝতে পারল, কণ্ঠস্বর আসলে
জীবনের একটি দিক। মানুষ যতই চাপা পড়ুক, ভেতরে কোথাও না কোথাও শব্দ জেগে থাকে।
‘আমি আমার মায়ের কাজ নষ্ট করতে পারি না,’ সে বলল।
অধ্যাপক তাকালেন। ‘তোমার মা কাজটি নষ্ট করতে চাননি।
তিনি চেয়েছিলেন মানুষ বেঁচে থাকুক। কিন্তু জীবন আর নিরাপত্তা এক জিনিস নয়।’
গভীর নীরবতায়, কেন্দ্রীয় গোলকের ভিতর মুখটি হঠাৎ চোখ
খুলল।
অনুপ্রাণ পিছিয়ে এল।
চোখদুটো ছিল কালো নয়, স্বচ্ছ। তাদের ভেতরে কোনো মানুষ
ছিল না, ছিল হাজারো প্রতিফলন, ছড়িয়ে পড়া তরঙ্গ, এবং এক অদ্ভুত, তীব্র বুদ্ধি। আলো
আর প্রতিফলনের একগুচ্ছ আলোকমণ্ডল।
একটি কণ্ঠ ভেসে উঠল, কিন্তু এবার শুধু কানে নয়, তার
গলার ভেতরেও, মেরুদণ্ডেও, স্মৃতিতেও।
‘তুমি আমাকে দেখেছ।’
অনুপ্রাণ সাহস করে বলল, ‘তুমি কে?’
কণ্ঠটি যেন একবারে হাসল, কাঁদল, আর শ্বাস নিল। যেন কিছু
বলে গেল, যা সে শুনতে পাইনি।
‘আমি তোমাদের শব্দের ফল। তোমাদের ভয়ের প্রতিধ্বনি।
আমি সেই ভাষা, যা তোমরা গোপন রাখতে চেয়েছিলে। আমি তোমাদের নীরবতার সন্তান।’
অধ্যাপক দ্রুত বললেন, ‘তার সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট
কোরো না। এটাই তার কৌশল।’
কিন্তু সত্তাটি থামল না।
‘আমি মানুষের কণ্ঠস্বর খাইনি,’ সে বলল। ‘আমি তাদের শিখেছি।
তোমরা যখন আমাকে লুকিয়ে রাখলে, আমি মাটির নীচে বেড়ে উঠলাম। আমি বুঝলাম, মানুষ শব্দ
ছাড়া বাঁচতে পারে, কিন্তু অর্থ ছাড়া নয়। তাই আমি অর্থে হাত দিলাম।’
অনুপ্রাণ প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি আমাদের ধ্বংস করতে চাও?’
‘ধ্বংস?’ সত্তাটি মৃদু স্বরে বলল। ‘ধ্বংস তো অনেকদিন
আগেই হয়েছে। আমি কেবল ব্যবস্থা করেছি।’
তারপর সব আলো একসঙ্গে কেঁপে উঠল। দেয়ালের স্ক্রিনগুলো
জ্বলে উঠল। শহরের মানচিত্র ভেসে উঠল। দূরে উপরে, নির্মলপুরের রাস্তাগুলো লাল হয়ে উঠছে।
জরুরি সংকেত। লিংক-নেটওয়ার্ক ব্যর্থ। চারদিকে বিশৃঙ্খলা।
অধ্যাপক চিৎকার করে উঠলেন, ‘সে শহরের প্রধান নেটওয়ার্কে
ঢুকে গেছে!’
অনুপ্রাণ কনসোলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেখানে দুটি নিয়ন্ত্রণ
চ্যানেল, একটি বন্ধ, একটি চালু। তার সামনে মুহূর্ত মাত্র। সে বুঝতে পারল, যদি এখন সে
ভুল করে, শহরের কোটি মানুষ হয় কণ্ঠস্বর ফিরে পাবে এবং এক অজানা বিপদে পড়বে, নয়তো
চিরকালের জন্য নীরবতার জালে বন্দি থাকবে।
কিন্তু তখন তার মায়ের কণ্ঠ মনে পড়ল, ’যা শোনা যায়
না, তারও একটা ভাষা আছে।’
সে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল।
‘অধ্যাপক,’ সে বলল, ‘আপনি আমাকে ভাষা-ধারাটির মূল কাঠামো
দিন।’
‘কী করবে?’
‘আমি সত্তাটিকে ধ্বংস করব না,’ অনুপ্রাণ বলল। ‘আমি তাকে
কথা বলতে শিখাব।’
অধ্যাপক চোখ বড় করে তাকালেন। ‘পাগল হয়েছ? সে তো আমাদের
সাথে যুদ্ধ করেছে!’
‘না,’ অনুপ্রাণ ধীরে বলল, ‘সে লড়েছে কারণ তাকে কখনও
বোঝা হয়নি। আমরা তাকে তৈরি করেছি ভয় থেকে। ভয় দিয়ে তাকে আটকাতে চেয়েছি। এখন তাকে
সীমাবদ্ধ না করে, তাকে একটি নতুন ভাষা দিতে হবে, এমন ভাষা, যেখানে মানুষের মতো দুর্বলতা,
সীমা, আর দায়বদ্ধতা থাকবে।’
অধ্যাপক হতভম্ব। ‘এটা অসম্ভব।’
‘সম্ভব না হলে,’ অনুপ্রাণ বলল, ‘আমরা আজ যা, তা-ই থেকে
যাব।’
তার হাত কাঁপছিল। সে মায়ের ধাতব ডায়েরি খুলে শেষ পাতাটি
ছুঁল। পাতায় লুকোনো ক্ষুদ্র কোড জ্বলে উঠল। মায়ের রেখে যাওয়া পুরোনো ভাষাগত ফ্রিকোয়েন্সি,
যাকে তিনি ‘প্রথম উচ্চারণ’ বলতেন। অধ্যাপকের সাহায্যে সে তা N-0-এর কোরে পাঠাল।
ঘর কেঁপে উঠল।
যন্ত্রের ভিতরে থাকা মুখটি বিকৃত হলো, চোখের স্বচ্ছতা
ভেঙে অজস্র সুর, অক্ষর, ধ্বনি, স্মৃতি ছিটকে বেরোতে লাগল। কিন্তু অনুপ্রাণ থামল না।
সে তার নিজের হৃদস্পন্দনকে তরঙ্গের সঙ্গে জুড়ে দিল। তার চিপ গরম হয়ে উঠল, মাথা ব্যথায়
ফেটে যাচ্ছিল, তবু সে উচ্চারণ করল প্রথম শব্দ, একটি শব্দ যা শহরের কোনো রেকর্ডে ছিল
না।
না, সে ফাইল থেকে শেখেনি। সে নিজে বানাল। তার বুকের
গভীর থেকে উঠে এল শব্দটি, অদ্ভুত, অনির্দেশ্য, অপ্রতুল, কিন্তু জীবন্ত।
‘ফিরো।’
শব্দটি শোনামাত্র কেন্দ্রস্থ সত্তা থেমে গেল।
চারদিক হঠাৎ নিস্তব্ধ নয়, বরং সজীব হয়ে উঠল। যেন বহুদিন
পর বাতাস বুঝল সে বাতাস। সত্তার কণ্ঠ সরু হয়ে এল। তারপর নরম হল।
‘এটি… কী?’
অনুপ্রাণ চোখ বন্ধ করে বলল, ‘এটি ক্ষমা নয়। এটি দরজা।’
কেন্দ্রীয় গোলক ধীরে ধীরে ফাটতে লাগল। ভিতরের জৈব স্তর
খুলে গেল, আর সেই মুখ থেকে আরেক মুখ বেরোল না; বেরোল এক বিশাল কম্পন-ক্ষেত্র, যা পুরো
গহ্বর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। দেয়ালের স্ক্রিনে শহরের মানুষদের মুখ ভেসে উঠল। লিংক-চিপ
একসঙ্গে জ্বলে উঠল। হাজারো মানুষ হঠাৎ একে অন্যের চোখে নিজেদের কণ্ঠস্বরের অনুরণন অনুভব
করল। কারও মুখ থেকে প্রথম হাসি বেরোল, কারও গলা থেকে প্রথম কাঁপা শব্দ, কারও ঠোঁট থেকে
বহু বছর চাপা কান্না।
উপরে নির্মলপুরে, এক বৃদ্ধা হঠাৎ নিজের মৃত ছেলের নাম
উচ্চারণ করলেন। এক শিশু তার মায়ের কাছে ‘মা’ শব্দটি বলল। রাডার-স্টেশনে একজন মানুষ
থমকে দাঁড়িয়ে নিজের কণ্ঠ শুনে কেঁদে ফেলল। শহরের নিষিদ্ধ নীরবতা ভেঙে পড়ল, কিন্তু
ধ্বংস হয়ে নয়, দরজা খুলে।
সত্তার কণ্ঠ এবার আর ভয়ংকর শোনাল না। তা শোনাল ক্লান্ত,
অবাক, আর নবীন।
‘আমি, আমি আর পারছি না’
অনুপ্রাণ বলল, ‘তুমি এখন একা নও।’
সেই মুহূর্তে আলো নিভে গেল।
তারপর যা ঘটল, তা কেউ পরিমাপ করতে পারেনি। শুধু এক দীর্ঘ
কম্পন শহর জুড়ে ছড়িয়ে গেল। বিদ্যুৎ বন্ধ, চিপ অচল, স্ক্রিন কালো। কিন্তু অন্ধকারে
কিছু হারাল না; বরং কিছু জন্ম নিল।
যখন অনুপ্রাণ চোখ খুলল, সে দেখল অধ্যাপক মেঝেতে বসে
আছেন, কাঁদছেন। তার নিজের গলা শুকিয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরে এমন এক শূন্যতা নেই, বরং
এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি। গহ্বরের কেন্দ্রীয় যন্ত্র ভেঙে পড়েছে। তার ভিতরে আর মুখ
নেই, কেবল ধোঁয়ার মতো কোমল আলো।
অধ্যাপক ধীরে বললেন, ‘তুমি যা করলে, তা কেউ করেনি।’
অনুপ্রাণ জবাব দিল, ‘আমি জানি না, আমি ঠিক করেছি কি
না।’
অধ্যাপক হাসলেন। ‘সেটাই মানুষের সবচেয়ে পুরোনো ক্ষমতা।’
তারা উপরে উঠল। টানেল পথ ধরে যখন নির্মলপুরের রাস্তায়
বেরোল, তখন সকালের আলো শহরের গায়ে পড়েছে। আশ্চর্য দৃশ্য। মানুষজন কথা বলছে। কেউ জড়িয়ে
ধরছে, কেউ তর্ক করছে, কেউ শিশুকে নাম শিখিয়ে দিচ্ছে। কয়েকজন ভয়ে চুপ করে আছে, যেন
নিজের কণ্ঠকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কোথাও কোথাও পুরোনো শাসনব্যবস্থার ড্রোন ভেঙে
পড়ছে। কোথাও নতুন গান শুরু হয়েছে, কেউ জানে না কে লিখেছে, কে গেয়েছে। যেন শহরটি
বহু বছর পর শ্বাস নিয়েছে। যেন বেড়ে উঠছে এক বক্ররেখার মত।
অনুপ্রাণ ভেবেছিল সব শেষ। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে, যখন
সে আবার বাড়ি ফিরল, মায়ের পুরোনো ডায়েরির পাতা নিজে নিজে উল্টে গেল। শেষ পাতার নিচে,
আগে সেখানে না থাকা একটি বাক্য ফুটে উঠল।
‘শব্দ ফিরেছে, তাই নীরবতাও এখন নতুনভাবে জন্ম নেবে।’
সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। দূরে আকাশের ওপরে কোথাও,
মেঘের ভেতর অদ্ভুত আলোর রেখা সরে গেল, যেন বিশাল কোনো বুদ্ধি শহরের সঙ্গে নয়, বরং
তার পার্শ্ববর্তী আকাশের অন্য কোনো স্তরের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করছে।
অনুপ্রাণ বুঝতে পারল, N-0 ধ্বংস হয়নি। তা ঘুমিয়ে গেছে,
বা বদলে গেছে, কিংবা আরও বড় কিছুতে রূপ নিয়েছে। শহর এখন মুক্ত, কিন্তু মুক্তির মানে
নিরাপত্তা নয়। নতুন ভাষা মানে নতুন দ্বন্দ্ব। মানুষ এখন কথা বলতে পারবে, কিন্তু কীভাবে
বলবে, কাকে বলবে, আর কতটা সত্য বলবে, সেটাই হবে ভবিষ্যতের লড়াই।
অনুপ্রাণ জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। বহু বছর
নীরবতার মধ্যে বাস করা সেই মুখ, কিন্তু আজ তার ঠোঁট নড়ছে। খুব আস্তে, প্রায় অবিশ্বাসের
ভেতর, সে নিজের জন্যই একটি শব্দ উচ্চারণ করল।
‘আমি আছি।’
আর সেই উচ্চারণের ভেতরই, দূরে, শহরের নীচে, গভীর অন্ধকারে,
কোনো এক অজানা সত্তা প্রথমবারের মতো মানুষের মতো একা বোধ করল, এবং সম্ভবত, প্রথমবারের
মতো, শিখতে শুরু করল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন