দেয়ালের
সেই পুরনো ঘড়িটা আসলে কোনো যন্ত্র নয়,
ওটা একটা বৃদ্ধ পাহারাদার, যে অবিরাম হাতুড়ি পেটে আমার আয়ুষ্কালে
তার টিকটিক শব্দে আমি কোনো
সেকেন্ডের হিসেব পাই না,
বরং শুনতে পাই একেকটি ঝরে
পড়া নক্ষত্রের পতনধ্বনি
যা আমার ঘরের সিলিং ফুঁড়ে
অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়
ড্রয়িংরুমের
নির্জনতায় ওটা যখন বার বার শব্দ
করে,
আমি দেখি, প্রতিটি দোলক যেন একেকটি ফাঁসির দড়ির মতো দুলছে;
আর সেখানে ঝুলছে আমার
না-বলা কথা, অপূর্ণ
প্রেমের কিছু ছাই
ঘড়িটার কাঁচের ওপাশে আটকে
আছে একটা ধূসর মথ,
সে সময়ের চাকার সাথে ঘুরতে
ঘুরতে এখন নিজেই সময় হয়ে গেছে,
নিস্পন্দ, নিথর, অথচ এক অমোঘ সত্যের মতো উজ্জ্বল
মাঝে
মাঝে মনে হয়, ঘড়িটার
ওই রোমান হরফগুলো
আসলে একেকটা প্রাচীন পাথরের
সমাধিফলক
আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ি, ওরা নেমে আসে দেয়াল থেকে,
সারা ঘরময় হেঁটে বেড়ায় আমার
ফেলে আসা বিকেলের জুতো পরে
ওরা টেবিলের ওপর রাখা
আধখাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দেয়,
আর বিষণ্ণ স্বরে বলে, স্মৃতি ছাড়া মানুষের আর কোনো সম্পদ নেই,
এই যে
কাঁটা দুটোর নিরন্তর তাড়া করা, একে অপরকে ছোঁয়ার আকুলতা,
ওটা তো আসলে আমারই দুই
সত্তা; যারা
কখনোই এক হতে পারে না
একটা কেবল বর্তমানের ধুলো
ঝাড়ে, অন্যটা
ভবিষ্যতের দিকে আঙুল তোলে;
অথচ মাঝখানের যে শূন্যস্থান, সেখানেই আমার বসতি
আমি সেই শূন্যতায় দাঁড়িয়ে
দেখি, ঘড়িটার
কাঁটাগুলো এখন
একেকটা শাণিত তলোয়ার হয়ে
আমার ছায়ার ঘাড় কাটছে
একদিন
হয়তো ব্যাটারি ফুরিয়ে যাবে, স্তব্ধ হবে এই লোহা-লক্কড়,
কিন্তু সময়ের সেই রূপক
জাদুকর কি হারাবে?
দেয়ালের গায়ে ঘড়িটা যেখানে
টাঙানো ছিল, সেখানে
পড়ে থাকবে
এক চিলতে গাঢ় রঙের ছোপ ঠিক আমার বুকের ভেতরের ক্ষতের মতো
নতুন কোনো বাসিন্দা এসে
হয়তো সেখানে প্লাস্টার লাগাবে,
কিন্তু সেই নিঃশব্দ টিকটিক
শব্দ কি মুছে ফেলা যায় এই মহাকাল থেকে?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন