সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তোমার অপেক্ষা

 

তোমার শরীরের কাছে এলেই এই শহরটা হঠাৎ কুয়াশা হয়ে যায়,
বিলীন হয় ট্রাফিক সিগন্যাল, ধোঁয়াটে রেস্তোরাঁ আর নাগরিক কোলাহল
আমি দেখি, তোমার ওই গ্রীবা আসলে কোনো হাড়-মাংসের গঠন নয়
ওটা এক তপ্ত শ্বেতপাথরের পাহাড়, যার ঢালে হাত রাখলে
আমার আঙুলগুলো একেকটা তৃষ্ণার্ত যাযাবর হয়ে পথ হারায়
তোমার ত্বকের অমসৃণতায় আমি খুঁজি এক প্রাচীন গুহাচিত্র,
যেখানে আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রথম আগুনের জন্ম দিয়েছিল
তোমার নিশ্বাস যখন আমার কন্ঠনালীতে আছড়ে পড়ে,
মনে হয় ওটা কোনো বাতাস নয়, ওটা এক কালবৈশাখীর ভ্রূকুটি;
যা আমার পাঁজরের হাড়গুলোকে মড়মড় শব্দে ভাঙতে চায়
তোমার নাভিমূলের ওই নিভৃত হ্রদে যখন আমার ছায়া পড়ে,
আমি দেখি সেখানে হাজার বছরের জমাট বাঁধা এক অন্ধকার
যা কোনো সূর্য চেনে না, চেনে কেবল রক্তের নিগূঢ় টান
ওটা তো শরীর নয়, ওটা মহাকালের এক একাকী ধাবমান ধূমকেতু,
যার লেজের ঝাপটায় আমার তিল তিল করে গড়া সভ্যতা চূর্ণ হয়
তোমার আঙুলের ডগায় যখন আমার নাম লেখা হয় অলক্ষ্যে,
আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসে এক নিষিদ্ধ জলপ্রপাত
সেখানে জল নেই, আছে গলিত লাভার মতো তীব্র এক দহন;
তোমার নখের আঁচড়ে যখন পিঠের চামড়া আলগা হয়ে আসে,
আমি দেখি ওটা কোনো ক্ষত নয়, ওটা এক নতুন মানচিত্রের জন্ম
যেখানে কোনো সীমারেখা নেই, আছে কেবল লোনা ঘামের সাম্রাজ্য
তোমার প্রতিটি লোমকূপ যেন একেকটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি,
সেখান থেকে নির্গত হচ্ছে আমাদের কয়েক জনমের জমানো হাহাকার
মাঝে মাঝে তোমার ওই রক্তিম ওষ্ঠের নিবিড় সান্নিধ্যে আমি শুনি
এক হাজার বছর আগের কোনো পরিত্যক্ত মন্দিরের আরতি
সেখানে কোনো ঈশ্বর নেই, কেবল আছে এক আদিম মাংসের তৃষ্ণা;
আমরা যখন মিশে যাই একবিন্দুতে, তখন সময় তার ঘড়ি হারায়,
ল্যাম্পপোস্টের ওই মেটে আলোটা হয়ে ওঠে এক ক্লান্ত নক্ষত্র
যা টুপটাপ ঝরে পড়ছে আমাদের এই নোনা শরীরের তপ্ত জঠরে
আমাদের এই আলিঙ্গন আসলে কোনো মিলন নয়, ওটা এক যুদ্ধ
যেখানে জেতার কেউ নেই, আছে কেবল দুই শরীরী আত্মার আত্মসমর্পণ
আমি জানি, এই তীব্রতা আমাদের একদিন ছাই করে দেবে,
যেমন করে অরণ্যকে গিলে ফেলে এক সর্বগ্রাসী দাবানল
তবুও এই ধ্বংসের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আমি তোমার শরীরকেই ডাকি;
কারণ ওই নশ্বর মাংসের গভীরে যে অবিনশ্বর স্পন্দন আমি পেয়েছি
তা এই পাথুরে শহরের কোনো ইঁট-কাঠে কোনোদিন খুঁজে পাইনি
তোমার এই রক্তিম ভূগোলই এখন আমার একমাত্র বাসভূমি,
যেখানে আমি বারবার হারাই, আর বারবার নতুন করে জন্ম নিই।
 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ

সুধীন্দ্রনাথ , সাতটি কাব্যগ্রন্থের মতো সাতটি প্রবন্ধের গ্রন্থ লিখলে খারাপ হতো না , বেশ ভালোই হতো । সুধীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো হালকা মানের নয় , যদিও তাঁর কোন রচনাই হালকা নয় । সাহিত্যে বিচারে তা অনেক উঁচুমানের । তার উপর ভাষার ব্যাপারটি তো রয়েছেই । সুধীন্দ্রনাথ মাত্র দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন । গ্রন্থ দুটো ‘ স্বগত ’ ( ১৩৪৫ ঃ ১৯৩৮ ), অপরটি ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’ ( ১৩৬৪ : ১৯৫৭ ) । ‘ স্বগত ’- তে রয়েছে ষোলটি প্রবন্ধ । গ্রন্থ দুটি তিনি রচনা করেছেন দু ’ ভাগে । লরেন্স বা এলিয়ট এর প্রবন্ধ যেমন পাওয়া যাবে না ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’- এ ; তেমনি রবীন্দ্র সম্পর্কিত প্রবন্ধ নেওয়া হয়নি ‘ স্বগত ’- এ । প্রকাশ কাল অনুযায়ী ‘ স্বগত ’- এর প্রবন্ধসমূহ : ‘ কাব্যের মুক্তি ’ ( ১৯৩০ ); ‘ ধ্রুপদ পদ - খেয়াল ’ ( ১৯৩২ ), ‘ ফরাসীর হাদ্য পরিবর্তন ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লিটনস্ট্রেচি ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লরেন্স ও ভার্জনিয়া উল্ফ্ ’ ( ১৯৩২ ), ‘ উপন্যাস তত্ত্ব ও তথ্য ’ ( ১৯৩৩ ), ‘ উইলিয়ম ফকনর ’ ( ১৯৩৪ ), ‘ ঐতিহ্য ও টি , এস , এলিয়ট ’ ( ১৯৩৪ ), ...