সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শহুরে একাকীত্বের ছায়া


এই যে ল্যাম্পপোস্টটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে গলির মোড়ে,
ওটা আসলে কোনো লোহার থাম নয়, ওটা এক তস্কর ঋষি;
রাতের নির্জনতায় সে অন্ধকারকে ছেঁকে বের করে আনে হলদে বিষ
তার ওই ঘোলাটে আলোর বৃত্তের ভেতর কত শত ছায়া খেলে যায়
কতগুলো চোর, কতগুলো প্রেমিক, আর একরাশ মধ্যবিত্ত হাহাকার
সবাই সেখানে এসে থামে, অথচ কেউ কাউকে ভালভাবে চেনে না;
যেন এক অদ্ভুত জাদুকরী রেখা টেনে রেখেছে এই নগরীর বুক

ল্যাম্পপোস্টটার মাথায় যখন কাকেরা ঘুমিয়ে পড়ে ডানা গুটিয়ে,

আমি দেখি, ওটা আসলে একটা নিঃসঙ্গ আলোকবর্তিকা নয়,
বরং এই শহরের এক পরিত্যক্ত কঙ্কাল, যার কোনো মাংস নেই
তার ভেতরে বয়ে চলে হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস,
মাঝে মাঝে শর্ট সার্কিটে যখন স্ফুলিঙ্গ ঝরে পড়ে পিচঢালা পথে,
মনে হয় ওটা তো বিদ্যুৎ নয়, ওটা শহরের কোনো চাপা কান্না
যা কংক্রিটের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে হারিয়ে যায় ড্রেনের নরকে

আমি যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই নিস্তব্ধতার ব্যবচ্ছেদ করি,
দেখি জানলার গ্রিলগুলো একেকটা জেলের শিকের মতো বিঁধে আছে;
আর ওপাশে আমাদের যাপিত জীবন এক একটা শীতঘুমে মগ্ন ঘর
শহরটা এখন আর ইঁট-পাথরের নেই, ওটা একটা প্রাচীন অজগর,
যে গিলে ফেলেছে আমাদের শৈশবের সেই ধুলোমাখা খেলার মাঠ
ল্যাম্পপোস্টের ওই হলদে আলোয় ধুলিকণাগুলো যখন ওড়ে,
মনে হয় ওগুলো সব মৃত মানুষের না-বলা কথাদের মিছিল

অতঃপর একটা ভাঙা ট্রাক যখন গুমগুম শব্দে পার হয়ে যায়,
ল্যাম্পপোস্টটা কেঁপে ওঠে, যেন তারও কোনো অসুখ করেছে
সে হয়তো চেয়েছিল অরণ্যের কোনো শালগাছ হতে,
যার পাতায় জ্যোৎস্না পড়লে ঝিরঝির শব্দ হতো কবিতার মতো
অথচ আজ সে এক স্থবির প্রহরী, এক নাগরিক বন্দিত্বের সাক্ষী
যেখানে প্রতিটি ভোর মানেই হলো পুরনো পরাজয়ের নতুন মোড়ক

একদিন হয়তো এই মরীচিকা শহরটা আর থাকবে না,
নিভে যাবে ল্যাম্পপোস্টের সেই ক্লান্ত, মেটে রঙের আলো
কিন্তু এই যে শূন্যতা, যা আমি আর এই ল্যাম্পপোস্ট ভাগ করে নিলাম
তা কি কোনো নগর পরিকল্পনাবিদ তার নকশায় রেখেছিলেন?
শহরটা তো আসলে জ্যান্ত মানুষের নয়, ওটা এখন

কেবল রূপক আর বিমূর্ত বিষণ্ণতার এক দীর্ঘস্থায়ী প্রদর্শনী। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

আমাদের ব্যর্থতাগুলো

  বাংলাদেশের গল্প কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এ গল্পের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়াও মিশে আছে। একটি দেশ যখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন তার প্রতিটি অগ্রগতি যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমরা স্বাধীনতার পর বহু পথ পেরিয়েছি   অর্থনীতি বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অবকাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের দৃশ্যমান ভবনের আড়ালে এমন কিছু ভাঙাচোরা জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়   আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি কেবল এগিয়ে যাওয়ার চেহারাটি নির্মাণ করেছি? আমাদের ব্যর্থতাগুলো তাই কেবল কোনো সরকারের, কোনো প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক চরিত্র, রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক অভ্যাস এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের আয়না। সর্বোপরি এগুলো আমাদের নিজস্ব ব্যর্থতা। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এই যে, আমরা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান করার চেয়ে সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যাই। রাস্তায় যানজট, নদীতে দূষণ, ফুটপাতে দখল, ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিচার পেতে...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...