সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রক্তিম দহনের পাণ্ডুলিপি


তুমি আসলে কোনো মানবী নও, আমার এই দগ্ধ নগরে
তুমি এক নীল আগুনের শিখা, যা ছুঁলে পুড়ে যায় না, বরং জমে যায় বরফ
তোমার ওই চোখের অতল গহ্বরে যখন আমি তাকাই,
দেখি সেখানে কয়েকশ বছরের পুরনো এক তুষারপাত
যেখানে আমার সব যুক্তি, সব সতর্কতা মরে পড়ে আছে
একান্ত একাকী,  কোনো এক নিষিদ্ধ অরণ্যের হরিণের মতো
শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গল যখন আমার টুঁটি চেপে ধরে,
আমি তোমার গ্রীবার ভাঁজে খুঁজি এক চিলতে প্রাচীন নক্ষত্রলোক
তোমার আঙুলের স্পর্শে আমার বুকের পাজরগুলো
একেকটা সেতারের তার হয়ে বেজে ওঠে তীব্র হাহাকারে
সে সুর কোনো বসন্তের নয়, ওটা এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস;
যা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয় আমার জমানো সব নাগরিক ভদ্রতা,
আর আমি নগ্ন হয়ে দাঁড়াই তোমার ওই নির্মম সৌন্দর্যের সামনে
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের এই প্রেম এক নিষিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ব
আমরা খুঁড়ছি একে অপরের হৃদপিণ্ড সেখানে কোনো সোনা নেই,
আছে কেবল প্রাচীন কোনো যুদ্ধের ক্ষত আর ভাঙা তলোয়ার
তুমি যখন হাসো, আমার মনে হয় মাঝরাতের কারফিউ ভেঙে
একদল বিদ্রোহী স্লোগান দিচ্ছে আমার শূন্য ধমনিতে
তোমার ঠোঁটের ওই অবাধ্য তিলটা আসলে এক ব্ল্যাকহোল,
যেখানে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে আমার চব্বিশ ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস
এই যে আমাদের দেখা হওয়া, এই যে চড়ুই পাখির মতো খুনসুটি
ওটা তো আসলে এক ছদ্মবেশ; আমরা তো মূলত দুই খুনি
আমি খুন করি তোমার একাকীত্বকে, আর তুমি জবাই করো আমার সময়কে;
অথচ রক্ত ঝরে না আমাদের, ঝরে কেবল কয়েক ফোঁটা নীল বিষ
যা পান করে আমরা অমর হতে চাই এই ধূলিমলিন পৃথিবীর বুকে
তোমার শাড়ির আঁচল যখন হাওয়ায় ওড়ে এই পড়ন্ত বিকেলে,
মনে হয় ওটা কোনো কাপড় নয়, ওটা আমার পরাজয়ের এক নীল পতাকা
তুমিহীন এই শহরটা আমার কাছে এক জলজ্যান্ত শ্মশান,
যেখানে ল্যাম্পপোস্টগুলো কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে উপহাস করে
অথচ তুমি এলে, এই ধোঁয়াটে কুয়াশা চিরে বেরিয়ে আসে এক অলৌকিক রোদ
আমি জানি, এই তীব্রতা আমাকে একদিন নিঃশেষ করে দেবে,
যেমন করে মোমবাতি তার নিজের আলোতেই নিজেকে ভস্ম করে
তবুও আমি এই দহনেই থাকতে চাই, এই ধ্বংসেরই ভাগীদার হতে চাই;
কারণ তোমার ওই দুর্ধর্ষ প্রেমের চেয়ে বড় কোনো মুক্তি
আমার এই তুচ্ছ জীবনে আর দ্বিতীয়টি নেই,  কোনোদিন ছিলও না।

 

  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ

সুধীন্দ্রনাথ , সাতটি কাব্যগ্রন্থের মতো সাতটি প্রবন্ধের গ্রন্থ লিখলে খারাপ হতো না , বেশ ভালোই হতো । সুধীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো হালকা মানের নয় , যদিও তাঁর কোন রচনাই হালকা নয় । সাহিত্যে বিচারে তা অনেক উঁচুমানের । তার উপর ভাষার ব্যাপারটি তো রয়েছেই । সুধীন্দ্রনাথ মাত্র দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন । গ্রন্থ দুটো ‘ স্বগত ’ ( ১৩৪৫ ঃ ১৯৩৮ ), অপরটি ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’ ( ১৩৬৪ : ১৯৫৭ ) । ‘ স্বগত ’- তে রয়েছে ষোলটি প্রবন্ধ । গ্রন্থ দুটি তিনি রচনা করেছেন দু ’ ভাগে । লরেন্স বা এলিয়ট এর প্রবন্ধ যেমন পাওয়া যাবে না ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’- এ ; তেমনি রবীন্দ্র সম্পর্কিত প্রবন্ধ নেওয়া হয়নি ‘ স্বগত ’- এ । প্রকাশ কাল অনুযায়ী ‘ স্বগত ’- এর প্রবন্ধসমূহ : ‘ কাব্যের মুক্তি ’ ( ১৯৩০ ); ‘ ধ্রুপদ পদ - খেয়াল ’ ( ১৯৩২ ), ‘ ফরাসীর হাদ্য পরিবর্তন ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লিটনস্ট্রেচি ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লরেন্স ও ভার্জনিয়া উল্ফ্ ’ ( ১৯৩২ ), ‘ উপন্যাস তত্ত্ব ও তথ্য ’ ( ১৯৩৩ ), ‘ উইলিয়ম ফকনর ’ ( ১৯৩৪ ), ‘ ঐতিহ্য ও টি , এস , এলিয়ট ’ ( ১৯৩৪ ), ...