সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’

রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস এক বিস্ময়কর বৌদ্ধিক, দার্শনিক ও মানবতাবাদী মহাকাব্য। যার ভাবস্তর এত গভীর ও বহুবর্ণ যে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক-সামাজিক উপন্যাস নয়, বরং মানুষের আত্মপরিচয় সন্ধান, জাতিগঠনের অন্তর্দৃষ্টি, ধর্মের সীমা ও মানবতার অসীমতার এক গভীর যাত্রা। ‘গোরা’ উপন্যাসের ভাববিশ্ব এমনই জটিল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত যে পাঠক যতই পরতে পরতে খুলে দেখে, ততই নতুন স্তর উন্মোচিত হয়। নতুন অর্থ বেরিয়ে আসে, আর সমগ্র ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক সংকট, ধর্মীয় বিভাজন, জাতীয়তাবাদ, সামাজিক সংস্কার এবং মনুষ্যত্বের অভ্যন্তরীণ আলো ও অন্ধকার একইসঙ্গে ফু’টে ওঠে। ‘গোরা’ উপন্যাসের প্রথম পর্বে দেখা যায় এক কঠোর, দৃঢ়বিশ্বাসী, আপসহীন যুবক। যিনি ভারতবর্ষকে ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে তিনি দেখেন একমাত্র হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করেই; তার কাছে ধর্মীয় পরিচয় মানে দেশীয় পরিচয়, জাতের পবিত্রতা মানে জাতীয় পবিত্রতা, আর হিন্দু সমাজসংস্কারের ধারাকেই তিনি মনে করেন দেশরক্ষার মৌলিক ভিত্তি। এই অবস্থান তার ব্যক্তিত্বকে যে কঠিন বর্মে আচ্ছাদিত ক’রে রাখে, তা তাকে একদিকে আত্মবিশ্বাসী ক’রে তোলে, অন্যদিকে ক’রে তোলে সংকীর্ণ ও একরৈখিক। কিন্তু এই সংকীর্ণতার মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ তৈরি করেন পরিবর্তনের বীজ। উপন্যাসের শুরু থেকেই গোরা চারপাশের মানুষদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে প’ড়ে।  বিনয়ের কোমল মানবিকতা, ব্রাহ্মসমাজের স্বাধীনচেতা নারীরা, আনন্দময়ীর মানবধর্ম; এসবই ‘গোরা’র চিন্তার গায়ে আঘাত হানতে থাকে, যেন ভেতরের দেয়ালে ফাটল ধরতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন কিভাবে একটি মতাদর্শ মানুষকে শক্তি দেয়, আবার সেই মতাদর্শই কখনো তার দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ ক’রে, তাকে অন্য মানুষের সত্য দেখতে বাধা দেয়; এই দ্বৈততার মধ্যেই ‘গোরা’ চরিত্রের দার্শনিক তীব্রতা নিহিত।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ভাব হলো; পরিচয়ের নির্মাণ ও ভাঙ্গন। গোরা নিজেকে শুরুতে যে পরিচয়ে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, পরে জানা যায় তার সেই পরিচয় জন্মগত নয়; সে জন্মেছে এক আইরিশ দম্পতির ঘরে, অর্থাৎ হিন্দু সমাজের যেসব প্রথা রক্ষার জন্য সে নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে চেয়েছিল, সেই সমাজ তাকে জন্মের ভিত্তিতে গ্রহণ ক’রে না। এই সত্য প্রকাশের পর গোরা যেন ভেঙে প’ড়ে, কিন্তু সেই ভাঙনই তাকে পুনর্গঠিত করে। তার অহং ভেঙে যায়, কিন্তু ভেঙে যাওয়ার পর যে আলো সে দেখে, তা ধর্মসংকীর্ণতার আলো নয়; তা মানবতার আলো, সত্যের আলো, আত্মজিজ্ঞাসার আলো। উপন্যাসের এই মুহূর্তই সর্বাধিক শক্তিশালী; কারণ একজন মানুষের আদর্শ তখনই সত্য হয়, যখন তা জন্মের ওপর নয়, চেতনার ওপর দাঁড়ায়; পরিচয় তখনই গভীর হয়, যখন তা বংশসূত্র নয়, অন্তর্দৃষ্টি থেকে জন্ম নেয়। ‘গোরা’র এই রূপান্তর ভারতবর্ষের পরিচয় সংকটকেও প্রতিফলিত ক’রে; এক জাতি তখনই প্রকৃত জাতি হ’তে পারে, যখন তার ভিত্তি কোনো ধর্মের একচেটিয়া মালিকানায় নয়, বরং সমান মর্যাদা, সত্য, ন্যায় ও মানবতার ওপর গ’ড়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের ভাববিশ্বকে যদি আরও তাত্ত্বিক ও গভীর দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে হয়, তবে এটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক-সামাজিক উপন্যাসের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; বরং এটিকে পাঠ করতে হয় আধুনিকতা বনাম ঐতিহ্য, জাতিগঠনের তত্ত্ব, জাতীয়তাবাদী চেতনার দ্বৈততা, উপনিবেশিত মানুষের পরিচয় সংকট, ধর্মীয় আধিপত্যের দর্শন, সাবজেক্ট-ফর্মেশন ও হিউম্যানিজমের দার্শনিক ভিত্তির আলোকে; যা ‘গোরা’কে পরিণত ক’রে ভারতীয় আধুনিকতার এক জটিল তাত্ত্বিক মানচিত্রে। ‘গোরা’ চরিত্রটি এখানে কেবল উপন্যাসের নায়ক নয়; বরং সে উপনিবেশিত সমাজের আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রতীক; এক ধরনের নির্মিত সাবজেক্ট, যাকে সমাজ ধর্মীয় জাতমানস তৈরির জন্য ব্যবহার ক’রে, যার দৃষ্টি এতটাই মতাদর্শপূর্ণ যে সে তার নিজের অস্তিত্ব, নিজের জন্ম, নিজের পরিচয় সম্পর্কে চিন্তার সুযোগ পায় না। তার নির্মিত পরিচয়কে আলোড়িত ক’রে সেই রহস্য: সে হিন্দু নয়; এক ব্রিটিশ দম্পতির সন্তান। এই তথ্যটি দার্শনিকভাবে একটি “ডিকনস্ট্রাকটিভ ব্রেক”; যা ‘গোরা’ নামক সাবজেক্টকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করে, আর সেই পুনর্গঠনের মধ্যেই উপন্যাসের মূল তত্ত্ব উন্মোচিত হয়; পরিচয় কখনোই জন্মগত বা মৌলবাদী নয়; এটি মূলত এক নির্মাণ, একটি বর্ণনামূলক কৃত্রিমতা, একটি সামাজিক চিত্রনাট্য যা মানুষকে কেন্দ্র ক’রে নয়, বরং ক্ষমতার বিন্যাসকে কেন্দ্র ক’রে তৈরি হয়।

তাত্ত্বিকভাবে ‘গোরা’ হলো ‘ন্যাশনালিস্ট সাবজেক্ট’–এর ডিকনস্ট্রাকশন। ‘গোরা’ যে প্রথমে হিন্দুত্বকে জাতীয়তা হিসেবে দেখছিল, তা ছিল একধরনের এপিস্টেমিক ইলিউশন; যেখানে ধর্ম ও জাতধর্মই সত্য, আর ভারতবর্ষ তার প্রতিরূপ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দেখান এই জাতীয়তাবোধ আসলে এক ধরনের অনুধ্যানহীন স্বরূপ; এটি জাতীয়তাবাদ নয়, বরং ধর্মীয়-সামাজিক আধিপত্যের আরেক রূপ; এটি বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের কথিত ‘imagined community’-এর ধর্মীয় সংস্করণ। ‘গোরা’র এই জাতীয়তাবোধ উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও সেটি প্রকৃত মুক্তির ধারণা নয়, বরং ধর্মকেন্দ্রিক মোহবৃত্ত। এই মোহবৃত্ত ভাঙে জন্ম-রহস্য জানা মাত্র; তার আগে ‘গোরা’ ‘subject of ideology’; পরক্ষণে সে হ’য়ে ওঠে ‘subject of truth’; একজন মানসিকভাবে উন্মুক্ত মানুষ, যে জানে পরিচয় ধর্ম নয়, জন্ম নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বোধ ও ন্যায়ের অবস্থান।

রবীন্দ্রনাথ এখানে এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ করেন। যে সমাজে পরিচয় জন্মের ওপর নির্ভর করে, সে সমাজ কখনোই প্রকৃত জাতি হতে পারে না। তাই ‘গোরা’ যখন জানতে পারে; সে ব্রাহ্ম নয়, হিন্দু নয়, বরং এক বিদেশি পিতামাতার সন্তান; তখন সে বুঝতে পারে তার সকল দাবি ছিল একটি মনগড়া কেন্দ্রের ওপর দাঁড়ানো। এই ‘কেন্দ্র’ ভেঙে পড়ার সাথে সাথে উদ্ভাসিত হয় রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম-তত্ত্ব; যাতে মানুষের পরিচয় কোনো বাহ্যিক জাত বা ধর্ম নয়, বরং সত্তাগত মমত্ব ও নৈতিকতা। আনন্দময়ীর চরিত্র এখানে দার্শনিকভাবে ‘ethical universalism’–এর প্রতীক; যেখানে ধর্ম কোনো দাবি ক’রে না, জাত কোনো সীমা আঁকে না; বরং মানুষের প্রতি নিঃশর্ত মমতা ও সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাই বাস্তব ধর্ম। আনন্দময়ী ‘গোরা’র ধর্ম-জাতিকেন্দ্রিক সংকীর্ণতাকে ভেঙে দেন, এবং সেই ভাঙনই ‘গোরা’র আত্মসাক্ষাৎ। এভাবেই তিনি ‘গোরা’ নামক নায়ককে আসলে এক ধরনের ‘post-ideological subject’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন; একজন মানুষ যিনি আদর্শ অনুসরণ করেন, কিন্তু মতাদর্শের বন্দি নন।

নারীর অবস্থানও এই উপন্যাসে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের উপাদান। সুচরিতা হলো ‘modern rational female subject’; যার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন নারী স্বাধীনতা কেবল সামাজিক মুক্তির বিষয় নয়, বরং জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তির বিষয়ও। সুচরিতা ধর্ম, জাত, সমাজ; সবকিছুকে মানবিকতার আলোয় যাচাই ক’রে দেখেন। তিনি ‘গোরা’র প্রেমিকা নন; তিনি ‘চ্যালেঞ্জ’; তার দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্গঠনের প্রথম ধাক্কা। ললিতা আবার ‘resistant female agency’; যিনি পিতৃতন্ত্র, জাতপ্রথা ও সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানেন; তার স্বাধীনতা হলো কর্মের স্বাধীনতা। আর আনন্দময়ী; উপন্যাসের নৈতিক কেন্দ্র; তিনি ‘maternal ethics’-এর প্রতীক, যেখানে মাতৃত্ব পরিবারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানবতার প্রতি এক সর্বজনীন নৈতিক দায়িত্ব। এই তিন নারী মিলে তৈরি করেন ভারতীয় নারী-অস্তিত্বের এক জটিল তাত্ত্বিক ত্রিভুজ।

আরও গভীরে গেলে দেখা যায় ‘গোরা’ হলো এক ধরনের ‘civilizational dialogue’; যেখানে ভারতীয় ঐতিহ্য, ব্রাহ্মসমাজ, আধুনিকতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, পশ্চিমা লিবারেলিজম; সব মিলেমিশে ওঠে এক জটিল আলোচনায়। রবীন্দ্রনাথ এখানে কোনো পক্ষ নেন না; বরং দেখান; সত্য কোনো পক্ষের সম্পত্তি নয়; সত্য হলো মানুষের অভিজ্ঞতা, আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিকতার যাত্রা। ব্রাহ্মসমাজ আধুনিকতার আলোকবিন্দু হলেও তাদেরও দুর্বলতা আছে; কারণ তারা এক ধরনের ভিন্ন উচ্চবর্গীয় দর্শনের প্রতীক; অন্যদিকে হিন্দু সমাজ ঐতিহ্য রক্ষা ক’রে ঠিকই, কিন্তু তারা ধর্মীয় কর্তৃত্বের হাতে নিজেদের মানবিকতা বন্ধক রাখে। এই দুইয়ের সংঘাতে জন্ম নেয় এক নতুন অবস্থান; মানবধর্ম।

‘গোরা’র চূড়ান্ত উপলব্ধি; ‘আমি কিছুই নই; তাই আমি সকলের’; এই কথাটি দার্শনিকভাবে অস্তিত্ববাদ, মানবতাবাদ ও রাজনৈতিক ন্যায়ের এক গভীর উন্মোচন; এটি রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তা-দর্শনের সূক্ষ্মতম প্রকাশ। তিনি দেখান; জাতীয়তা কোনো কর্তৃত্ব নয়, কোনো নিষেধ নয়; এটি কখনোই ধর্মীয় বা জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; বরং জাতীয়তা মানে মানুষের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব; যে দায়িত্ব কোনো ধর্ম বা মতবাদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।

রবীন্দ্রনাথ ‘গোরা’ চরিত্রের ভেতর দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন জাতীয়তাবাদ কত সহজেই ধর্মীয় উগ্রতায় রূপ নিতে পারে, এবং সেই উগ্রতা মানুষকে কোথায় কোথায় অন্ধ ক’রে দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন সত্যিকারের দেশপ্রেম কী; এটি কোন পতাকা বা ধর্মচিহ্নের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং দেশের সকল মানুষের প্রতি ন্যায় ও সমান অধিকারের প্রতি বিশ্বাস; দেশ মানে কেবল হিন্দু নয়, কেবল ব্রাহ্ম নয়, কেবল উচ্চবর্ণ নয়, বরং সকলের অস্তিত্ব। ‘গোরা’র এই উপলব্ধি উপন্যাসের ভাবধারাকে অতুলনীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়; কারণ সে বুঝতে শেখে যে দেশকে ভালোবাসতে হ’লে প্রথমে মানুষকে ভালোবাসতে জানতে হয়, আর মানুষকে ভালোবাসা মানে তার স্বাধীনতাকে স্বীকার করা, তার মর্যাদাকে সম্মান করা, তার জীবনকে মূল্য দেওয়া।

এই উপন্যাসের নারীরাও ভাবজগতের অনিবার্য অংশ। সুচরিতা এমন এক চরিত্র, যিনি স্বাধীনতা, বুদ্ধি, নৈতিকতা ও মানবতার প্রতীক; তিনি ব্রাহ্মসমাজের নারীদের আধুনিক শিক্ষার উদাহরণ, কিন্তু সেই আধুনিকতারও সীমা আছে; কারণ তিনি সমাজের দৃষ্টি ও নানান অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তাঁর সাথে ‘গোরা’র বৌদ্ধিক ও মানসিক সংঘর্ষ কেবল প্রেমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দুই ভিন্ন দর্শনের লড়াই; একদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, অন্যদিকে মানবিক মুক্তি; একদিকে চিরাচরিত সমাজসংস্কার, অন্যদিকে আধুনিক উদারবোধ। ললিতা আবার এমন এক চরিত্র, যার মধ্যে রয়েছে সাহস, বিদ্রোহ, দৃঢ়তা; ধর্ম ও সমাজের অযৌক্তিক নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি। আর আনন্দময়ী; তিনি উপন্যাসের আত্মা, মানবধর্মের জ্যোতি, যার ভালবাসা সমস্ত সীমানাকে অতিক্রম ক’রে; তাঁর বুকে কোনো জাত নেই, কোনো ধর্ম নেই, কোনো বিভেদ নেই; শুধু মানুষ আছে, মানুষকে ঘিরে আছে। ‘গোরা’ তার কাছে প্রথমে ধর্মবিদ্বেষী নারী হিসেবে দেখলেও শেষে বুঝতে পারে; এই নারীই তাকে মানবতার প্রকৃত পাঠ দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ ‘গোরা’ উপন্যাসের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কিভাবে ভারতবর্ষের জাতীয় জাগরণ কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং চিন্তার জাগরণ, মানবিকতার জাগরণ, সমাজসংস্কারের জাগরণ। বঙ্গভঙ্গ, ব্রিটিশবিরোধিতা, স্বদেশি আন্দোলন; এসব উপন্যাসে উজ্জ্বল, কিন্তু সেগুলো কখনোই অন্ধ উগ্রতার রূপ নেয় না; বরং রবীন্দ্রনাথ দেখান সত্যিকার স্বদেশপ্রেমী সে, যে মানুষকে বিভক্ত ক’রে না, বরং একত্র করে; যে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী নয়, বরং ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে সমাজ গড়তে চায়; যে যুদ্ধ চায় না, চায় জাগরণ; চায় সত্যিকারের স্বাধীনতা। ‘গোরা’ উপন্যাসের ভাবসংকেত এই যে; মানুষ জন্মসূত্রে নয়, চেতনায় বড়; সমাজের নিয়ম ভাঙা যায়, ভাঙা যায় নিজের ভুল ধারণাও, কিন্তু ভাঙা যায় না সত্যের শক্তি; ধর্ম মানুষকে কিছু দেয় ঠিকই, কিন্তু মানবতা মানুষকে সবকিছু দেয়; আর জাতীয়তাবাদ তখনই মহৎ হয়, যখন তা সকল মানুষের অধিকারের রক্ষাকবচ হ’য়ে ওঠে। গোরা শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে যে দেশের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মের পরিচয় থেকে আসেনি, এসেছে তার চেতনা থেকে; এবং সেই উপলব্ধি তাকে মুক্ত করে, তাকে মানবতার দিকে নিয়ে যায়, তাকে ক’রে তোলে সত্যিকারের মানুষ।

‘গোরা’ শেষ পর্যন্ত যে সত্য আবিষ্কার ক’রে তা এই; মানুষ তার পরিচয়ের নয়, তার মানবিকতার মালিক; জাত, ধর্ম, নিয়ম, সমাজ; এসব মানুষের উপর আরোপিত; কিন্তু সত্যিকারের দেশপ্রেম মানুষের মধ্যেই, মানুষের প্রতি ন্যায়-ভালোবাসা-সমতার মধ্যেই। এই তাত্ত্বিক উপলব্ধিই ‘গোরা’ উপন্যাসের কেন্দ্র, যা রবীন্দ্রনাথকে কেবল সাহিত্যিক নয়, এক গভীর মানবতাত্ত্বিক চিন্তকের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত ক’রে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ

সুধীন্দ্রনাথ , সাতটি কাব্যগ্রন্থের মতো সাতটি প্রবন্ধের গ্রন্থ লিখলে খারাপ হতো না , বেশ ভালোই হতো । সুধীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো হালকা মানের নয় , যদিও তাঁর কোন রচনাই হালকা নয় । সাহিত্যে বিচারে তা অনেক উঁচুমানের । তার উপর ভাষার ব্যাপারটি তো রয়েছেই । সুধীন্দ্রনাথ মাত্র দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন । গ্রন্থ দুটো ‘ স্বগত ’ ( ১৩৪৫ ঃ ১৯৩৮ ), অপরটি ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’ ( ১৩৬৪ : ১৯৫৭ ) । ‘ স্বগত ’- তে রয়েছে ষোলটি প্রবন্ধ । গ্রন্থ দুটি তিনি রচনা করেছেন দু ’ ভাগে । লরেন্স বা এলিয়ট এর প্রবন্ধ যেমন পাওয়া যাবে না ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’- এ ; তেমনি রবীন্দ্র সম্পর্কিত প্রবন্ধ নেওয়া হয়নি ‘ স্বগত ’- এ । প্রকাশ কাল অনুযায়ী ‘ স্বগত ’- এর প্রবন্ধসমূহ : ‘ কাব্যের মুক্তি ’ ( ১৯৩০ ); ‘ ধ্রুপদ পদ - খেয়াল ’ ( ১৯৩২ ), ‘ ফরাসীর হাদ্য পরিবর্তন ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লিটনস্ট্রেচি ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লরেন্স ও ভার্জনিয়া উল্ফ্ ’ ( ১৯৩২ ), ‘ উপন্যাস তত্ত্ব ও তথ্য ’ ( ১৯৩৩ ), ‘ উইলিয়ম ফকনর ’ ( ১৯৩৪ ), ‘ ঐতিহ্য ও টি , এস , এলিয়ট ’ ( ১৯৩৪ ), ...