রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ‘শেষের কবিতা’ বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে আধুনিকতার এক মৌলিক তাত্ত্বিক দলিল। যেখানে প্রেম কেবল ব্যক্তিগত আবেগের অভিজ্ঞতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অস্তিত্ব নৈতিকতা স্বাধীনতা আত্মপরিচয় ও নান্দনিকতার এক জটিল বোধপ্রক্রিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ ক’রে এই উপন্যাসকে উচ্চ-স্তরের পূর্ণ আলোচ্য অধ্যায় হিসেবে পাঠ করতে গেলে একে একই সঙ্গে সাহিত্যিক আখ্যান দার্শনিক ভাষ্য এবং আধুনিক মননের দলিল হিসেবে বিবেচনা করতে হয়। ‘শেষের কবিতা’য় রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে এমন এক মানবিক অভিজ্ঞতায় উন্নীত করেছেন যা ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার দাবি তোলে। এখানে প্রেম কোনো সামাজিক পরিণতির দিকে ধাবিত আবেগ নয়, বরং এক সচেতন নৈতিক অনুশীলন যেখানে ব্যক্তি নিজের সত্তাকে রক্ষা করেই অন্য সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ক’রে। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূলেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদী মানবতাবাদ যেখানে মানুষের মর্যাদা নির্ভর ক’রে তার স্বাধীন সত্তার উপর। শেষের কবিতার তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মিত হয়েছে এই ধারণার ভিত্তিতে যে প্রকৃত মানবিক সম্পর্ক কখনোই অধিকার বা দখলের উপর দাঁড়াতে পারে না। প্রেম এখানে আত্মবিলয়ের নাম নয় বরং আত্মসংযমের মধ্য দিয়ে আত্মোন্নতির পথ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অমিত রায় ও লাবণ্যকে এই থিসিস অধ্যায়ে দুটি ভিন্ন অস্তিত্বগত অবস্থান হিসেবে পাঠ করা প্রয়োজন। অমিত আধুনিক শিক্ষিত বুদ্ধিবাদী কবি যার সত্তা গ’ড়ে উঠেছে ভাষা শিল্প ও আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে সে নিজের চিন্তা অনুভব ও প্রেমকে ভাষায় ধরতে চায় বিশ্লেষণ করতে চায় এবং সেই বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই নিজের আধুনিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু এই আত্মপ্রকাশের ভেতরেই নিহিত থাকে আধুনিক মানুষের অহং আত্মমুগ্ধতা ও আধিপত্যের প্রবণতা অমিতের প্রেম অনেকাংশে আত্মপ্রতিফলনের ক্ষেত্র, যেখানে লাবণ্য কখনো কখনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং তার নান্দনিক অনুশীলনের অবলম্বন হ’য়ে ওঠে। এই প্রবণতাই তার প্রেমের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে লাবণ্য এক অন্তর্মুখী আত্মস্থিত সত্তা যার শক্তি তার নীরবতায় সংযমে ও আত্মমর্যাদায়, তার কাছে প্রেম কোনো ভাষিক ঘোষণা বা রোমান্টিক উচ্ছ্বাস নয় বরং এক গভীর নৈতিক উপলব্ধি। লাবণ্য প্রেমের মধ্যেও নিজের সত্তাকে বিসর্জন দেয় না, সে ভালোবাসে কিন্তু দখল হতে দেয় না এই অবস্থান। ‘শেষের কবিতা’কে কেবল প্রেমকাহিনি নয় বরং আধুনিক মানুষের অস্তিত্বগত সংকটের শিল্পরূপ ক’রে তোলে। প্রেমের তাত্ত্বিক রূপ এখানে অধিকারহীন সম্পর্কের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে, প্রকৃত প্রেম কখনো দাবি ক’রে না চূড়ান্ত দখল চায় না সামাজিক স্বীকৃতির নামে অন্যের স্বাধীনতাকে গ্রাস ক’রে না। এই ধারণা হেগেলীয় স্বীকৃতি-তত্ত্বের সঙ্গে তুলনীয় যেখানে আত্মসচেতনতা। অন্য সত্তার স্বাধীন স্বীকৃতি ছাড়া পূর্ণতা পায় না, আবার অস্তিত্ববাদী দর্শনের সঙ্গেও এর গভীর সাযুজ্য রয়েছে। যেখানে স্বাধীনতাই মানব অস্তিত্বের মৌল শর্ত লাবণ্য। এই তাত্ত্বিক অবস্থানের সবচেয়ে পরিণত রূপ সে অমিতকে ভালোবাসে, কিন্তু অমিতের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যকে নিজের উপর প্রতিষ্ঠিত হ’তে দেয় না তার নীরব প্রত্যাখ্যান আসলে প্রেমের ভেতর থেকেই প্রেমকে অতিক্রম করার এক নৈতিক সিদ্ধান্ত। এই নীরবতা কোনো দুর্বলতা নয় বরং এক শক্তিশালী আত্মঘোষণা। এখানে রবীন্দ্রনাথ নারীর সত্তাকে প্রেমের ভেতরেই স্বাধীন ক’রে তুলেছেন যা তৎকালীন পিতৃতান্ত্রিক রোমান্টিক সাহিত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত শেষের কবিতার ভাষা ও আঙ্গিক এই অধ্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দাবি ক’রে। কারণ এখানে কাহিনি প্রায়ই গৌণ হ’য়ে ওঠে, এবং সংলাপ আত্মবক্তব্য চিঠি ও কবিতা প্রধান হ’য়ে ওঠে। এই আঙ্গিক আধুনিকতাবাদী উপন্যাসের লক্ষণ যেখানে ঘটনা নয় চেতনাই মুখ্য হ’য়ে দাঁড়ায়। অমিতের ভাষা আধুনিক মানুষের আত্মপ্রচারী স্বভাবের প্রতীক সে নিজের অনুভূতিকে ভাষায় ধরতে গিয়ে অনুভবকেই প্রায়শই অতিক্রম ক’রে যায়। ভাষা এখানে সত্যের বাহন নয় বরং কখনো কখনো সত্য আড়াল করার মাধ্যম অন্যদিকে লাবণ্য ভাষাহীনতার মধ্য দিয়ে এক গভীর নৈতিক সত্য ধারণ ক’রে। এই ভাষা বনাম নীরবতার দ্বন্দ্ব, ‘শেষের কবিতা’র অন্যতম মৌলিক দার্শনিক সুর প্রকৃতি-চিত্রণ। এই উপন্যাসে নিছক রোমান্টিক অলংকার নয় শিলং-এর পাহাড় কুয়াশা আকাশ ও নির্জনতা মানুষের অস্তিত্বগত নিঃসঙ্গতার প্রতীক প্রকৃতি মানুষের অনুভূতির প্রতিধ্বনি নয় বরং তার সহচর। যা চরিত্রদের আত্মউন্মোচনের ক্ষেত্র তৈরি ক’রে, রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-দর্শন এখানে মানবকেন্দ্রিক হলেও মানবাধিক্য নয় বরং মানব ও প্রকৃতির সহাবস্থানের নৈতিক শিক্ষা বহন ক’রে। ‘শেষের কবিতা’র বিচ্ছেদতত্ত্ব এই আলোচ্য অধ্যায়ের একটি কেন্দ্রীয় অধ্যায় দাবি ক’রে, এখানে বিচ্ছেদ কোনো ব্যর্থতা নয় বরং এক পরিণত নৈতিক উপলব্ধি মিলনের চেয়ে আত্মমর্যাদাকে উচ্চতর স্থানে স্থাপন করাই এই উপন্যাসের দার্শনিক সিদ্ধান্ত। প্রেম এখানে গন্তব্য নয় বরং এক যাত্রা, যেখানে শেষ মানে সমাপ্তি নয় বরং গভীরতর উপলব্ধি, ‘শেষের কবিতা’ নামটি তাই এক তাত্ত্বিক ইঙ্গিত। শেষ শব্দ উচ্চারিত হয় নীরবতায়, যেখানে ভাষা থেমে গিয়ে বোধ গভীরতর হয়, সাহিত্যতত্ত্বের দিক থেকে ‘শেষের কবিতা’ বাংলা উপন্যাসে আধুনিকতার এক বাঁক, এখানে রোমান্টিকতা মনস্তত্ত্ব অস্তিত্ববাদ নারীবাদী আত্মচেতনা ও নৈতিক দর্শন একসূত্রে মিলিত হয়েছে। এই উপন্যাস প্রেমকে ব্যক্তিগত আবেগের স্তর থেকে তুলে এনে মানবিক সম্পর্কের এক নৈতিক মডেল হিসেবে উপস্থাপন ক’রে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে, প্রেম তখনই মানবিক যখন তা মুক্ত ক’রে দাবি ক’রে না, অধিকার কায়েম ক’রে না, ‘শেষের কবিতা’ তাই প্রেমের শেষ নয় বরং প্রেম সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক পুনর্বিবেচনার নাম, যা আধুনিক মানুষের আত্মঅনুসন্ধানের এক পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক আলোচ্য হিসেবে বিবেচিত হ’তে পারে।
বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন