হিমঘরের দরজায়
দাঁড়িয়ে আমি শুনি;
নিঃশব্দেরও একটি তাপমাত্রা আছে,
যেখানে শব্দ জ’মে বরফে রূপান্তরিত হয়
শ্বাসের ভিতর ঢুকে প’ড়ে অতীতের ধুলোকণা
আর প্রেমের হারানো পুরোনো চিহ্নগুলো
যা স্পর্শ করলেই কেটে যায় পাঁচ আঙুল,
তবুও রক্ত ঝ’রে না ফিনকি দিয়ে তীব্র ক’রে
কারণ এখানে রক্তও সংরক্ষিত আপন তাপমাত্রায়
হিমঘর কোনো
ঘর নয়, তার কোন দরজা বা জানালা নেই,
এ এক স্থগিত সময়, দাঁড়িয়ে থাকে আপন শরীর
যেখানে দুপুর এসে থেমে যায়, গড়িয়ে প’ড়ে সময়
আর সন্ধ্যা কখনো জন্মায় না নিজস্ব দেয়ালে,
আমি ঢুকে পড়ি নিজের ভিতরের দরজাটি খুলে আপন আলোয়
দেখি তার মধ্যে অগণিত তাক, সাজানো ট্রে আর মসৃণ দেহ,
নারী, শিশু,
কবি, অষ্টাদশী তরুণী আর তুখোড় রাজনীতিবিদ,
যার কথায় উত্তর
আর দক্ষিণ এক বিন্দুতে মিলিত হয়-
প্রতিটি তাকে সাজানো আমার না-বলা বাক্য, গভীর প্রেম
অর্ধসমাপ্ত চুম্বন, প্রাক্তনের কালো ছায়া, শতাব্দীর গাঢ় দুঃখ,
ভেঙে পড়া বিশ্বাসের মাংসপিণ্ড, ফাল্গুনের নরম হাওয়া
আর সেইসব স্বপ্ন, আমার কালো চোখে যা গেঁথে থাকে
যাদের কখনো মিথ্যা ক’রে হাসতেও হয় না,
এই হিমঘরে আলোও
সাবধানে হাঁটে, পায়ে পা রেখে
কারণ বেশি উষ্ণ হলেই স্মৃতিগুলো গ’লে প’ড়ে বিন্দু-বিন্দু ফোঁটায়
আর আমি ভয় পাই; যদি তারা জীবিত হ’য়ে কথা বলে
তাহ’লে আমাকে আবার ভালোবাসতে হবে, তার মত ক’রে
আবার ভুল করতে হবে, আবার মানুষ হতে হবে স্বপ্নের সাথে,
আমার এই মৃত
শহরের মতো, এই হিমঘরও একান্ত নাগরিক,
এখানে প্রেম মানে সংযম, বেদনা মানে শালীনতা,
কামনা মানে গভীর রাতের অপরাধবোধে ভেজা একাকীত্ব,
কেউ চিৎকার করে না, সব আর্তনাদ এখানে ফিসফিস,
বরফের ভেতর বন্দি এক দীর্ঘ শ্বাস কোমল আলোয় ঝ’ড়ে প’ড়ে
আমি দেখি, এক
কোণে রাখা আছে আমার কৈশোর,
এখনো তাতে তাড়াহুড়ো, এখনো তাতে বিদ্রোহের কাঁচা গন্ধ
আরেক কোণে মধ্যবয়স, পরিমিত, সংযত,
নিজেকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত আমি নিজের মধ্যে
সবচেয়ে নিচের তাকে প’ড়ে আছে আমার ভবিষ্যৎ,
প্যাকেটবন্দি, তারিখহীন, যেন কেউ জানে না
কবে এটি ব্যবহারযোগ্য হ’য়ে উঠবে,
হিমঘরের বাতাসে প্রেম টেকে বেশি,
কারণ এখানে পচন নেই,
কিন্তু উষ্ণতাও নেই; আমার শরীর আরও হিম হ’য়ে উঠে
আমি তোমাকে এখানে রেখে দিতে চাই;
একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায়, যাতে তুমি বদলে না যাও,
যাতে তোমার চোখের প্রশ্নগুলো আর উত্তর না খোঁজে
কিন্তু আমি জানি,
প্রেমকে সংরক্ষণ করলেই সে মৃত হয়,
এই ঘরে আয়না নেই, কারণ মুখ দেখলে
বরফ ফেটে যাবে!
তবু আমি জানি, আমি ক্রমশ জ’মে যাচ্ছি টুকরো বরফের মত
আমার অনুভূতির ওপর এক স্তর, তার ওপর আরেক স্তর,
শেষে আমি নিজেই এক সংরক্ষিত বস্তু;
লেবেল লাগানো, নাম লেখা, কিন্ত ব্যবহারের অযোগ্য
হিমঘরের বাইরে জীবন অপেক্ষা ক’রে,
উষ্ণ, বিশৃঙ্খল, ঘাম আর ভুলে ভরা
কিন্তু আমি দেরি করি, কারণ এই ঠান্ডায়
অন্তত কিছুই আমাকে শীতল ক’রে তুলে না
এখানে দুঃখ সুন্দর, কারণ সে শৃঙ্খলিত,
এখানে নিঃসঙ্গতা মার্জিত, কারণ সে উচ্চস্বরে কাঁদে না
তবুও একদিন; কোন ঝ’ড়ে পড়া একদিন
হয়তো খুব সাধারণ একদিন বিদ্যুৎ চলে যাবে,
হিমঘর অকার্যকর হ’য়ে উঠবে তখন সব স্মৃতি একসাথে গলবে,
রাস্তায় নামবে জল, রক্ত, প্রেম, ঘাম আর একঝাক ব্যর্থ
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকব নিজের ধ্বংসের সামনে,
ভিজে, উষ্ণ, অসহনীয়ভাবে জীবিত সেই দিনের অপেক্ষাতেই
আমি আজও হিমঘরে আছি, নিজেকে হিম ক’রে ঠান্ডা রাখি,
কারণ জানি; যে মানুষ একবার গ’লে যায়,
সে আর কখনো আগের মতো সংরক্ষিত থাকতে পারে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন