হুমায়ুন আহমেদের (১৯৪৮-২০১২) উপন্যাস
বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের নাম, যেখানে ভাষা তার দৈনন্দিন স্বাভাবিকতায়
ফিরে এসে আবার নতুন ক’রে কাব্যিক হ’য়ে ওঠে। যেখানে গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সাধারণ মানুষ অথচ সেই সাধারণতার মধ্যেই ধরা পড়ে জীবনের
গভীরতম দার্শনিক সংকেত। তাঁর উপন্যাস পড়তে গিয়ে মনে হয় তিনি কোনো কৃত্রিম সাহিত্যিক
উচ্চতায় দাঁড়িয়ে কথা বলেন না বরং পাঠকের পাশে বসে গল্প শোনান। গল্প বলতে বলতে কখন যে
হাস্যরসের ভেতর দিয়ে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী বেদনা ঢুকে পড়ে তা পাঠক নিজেও টের পায় না,
এই সহজতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে তাঁর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক কৌশল। কারণ সহজ ভাষায় গভীর কথা বলা বাংলা উপন্যাসে সবসময়ই
কঠিন কাজ ছিল। হুমায়ুন আহমেদ সেই কঠিন কাজটিকে
এত স্বাভাবিক ক’রে তুলেছিলেন যে একসময় পাঠকের কাছে তা স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে হতে শুরু
করে। তাঁর উপন্যাসে প্লট প্রায়ই ঢিলেঢালা, নাটকীয় সংঘর্ষ কম, বড় কোনো ঘটনা না ঘটেও
পৃষ্ঠা পর পৃষ্ঠা পাঠক আটকে থাকে। কারণ এখানে ঘটনার চেয়ে চরিত্র বেশি গুরুত্বপূর্ণ,
চরিত্ররা কথা বলে, হাসে, নীরব থাকে, ভুল করে, আবার সেই ভুলের ভেতর দিয়েই নিজেদের চিনে
নেয়। মিসির আলি, হিমু, শুভ্র, বাকের ভাই কিংবা মধ্যবিত্ত কোনো নামহীন বাবা-মা, সবাই
আলাদা আলাদা মনে হলেও তাদের ভেতরে এক ধরনের মানসিক আত্মীয়তা আছে, এই আত্মীয়তা গ’ড়ে
ওঠে মানুষের অন্তর্গত ভয়, প্রেম, একাকিত্ব, কৌতুকবোধ ও স্বপ্নভঙ্গের অভিজ্ঞতা থেকে।
হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসে শহর ও গ্রাম কোনো রোমান্টিক পোস্টকার্ড নয় বরং জীবন্ত পরিসর,
ঢাকার রাস্তাঘাট, ভাড়া বাসা, অফিস, হাসপাতাল কিংবা গ্রামের উঠান, পুকুরপাড়, সন্ধ্যার
আলো, সবকিছুই গল্পের অংশ হ’য়ে ওঠে; তাঁর বর্ণনায়
প্রকৃতি কখনো নিছক সৌন্দর্যের উপাদান নয়, বরং মানুষের মনের অবস্থার প্রতিধ্বনি, বৃষ্টির
শব্দ মানে শুধু বর্ষা নয় বরং অপেক্ষা, অস্থিরতা কিংবা স্মৃতির ভার, রাত মানে শুধু অন্ধকার
নয় বরং আত্মসমালোচনার সময়। এই প্রতীকী অথচ অতিরিক্ত জটিল নয় এমন বর্ণনাশৈলীই তাঁকে
ব্যাপক পাঠকপ্রিয় ক’রে তুলেছে; তবে জনপ্রিয়তা কখনো তাঁর সাহিত্যিক মানকে হালকা ক’রে
দেয়নি বরং তিনি প্রমাণ করেছেন যে, গণমানুষের পাঠও গভীর হ’তে পারে। তাঁর উপন্যাসে হাসি
একটি বড় উপাদান কিন্তু সেই হাসি কখনো শূন্য বিনোদন নয়, হাসতে হাসতেই পাঠক বুঝে ফেলে
জীবনের অসারতা, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা কিংবা মানুষের স্বার্থপরতা,
বিশেষ ক’রে মধ্যবিত্ত জীবনের যে সূক্ষ্ম সংকট, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক ভণ্ডামি, নৈতিক
দ্বিধা, সেগুলো তিনি এমনভাবে তু’লে ধরেছেন যে পাঠক নিজের জীবনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
যায়। হুমায়ুন আহমেদের নারী চরিত্রগুলোও লক্ষ করার মতো, তারা একমাত্রিক নয়, কখনো তারা
নিঃশব্দ সহনশীল, কখনো বিদ্রোহী, কখনো রহস্যময়, কখনো আবার অসম্ভব স্বাভাবিক, তাদের অনুভূতি
পুরুষ চরিত্রদের মতোই জটিল ও বহুমাত্রিক, তাঁর উপন্যাসে প্রেম আছে কিন্তু সেই প্রেম
সিনেমার চেনা কাঠামোয় বন্দি নয়, অনেক সময় প্রেম অপূর্ণ, নীরব, অসম্ভব অথবা সময়ের কাছে
পরাজিত। তবু সেই অপূর্ণতাই প্রেমকে আরও মানবিক ক’রে তোলে; হুমায়ুন আহমেদের আরেকটি বড়
বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তব ও অবাস্তবের মিশ্রণ, কোথাও অতিপ্রাকৃত, কোথাও মানসিক বিভ্রম,
কোথাও নিছক কাকতালীয় ঘটনা, সব মিলিয়ে বাস্তবতার সীমানা একটু ঝাপসা হ’য়ে যায়, কিন্তু
এই ঝাপসা ভাব কখনো পাঠককে বিভ্রান্ত ক’রে না বরং ভাবতে শেখায় যে, বাস্তবতা নিজেই কতটা
অনিশ্চিত; মিসির আলির যুক্তিবাদী মন আর হিমুর যুক্তিহীন ভবঘুরে দর্শন, এই দুই বিপরীত
সত্তাও আসলে একই প্রশ্নের দুই রকম উত্তর। মানুষ কীভাবে বাঁচবে, যুক্তি দিয়ে না অনুভূতি
দিয়ে, সমাজের নিয়ম মেনে না নিজের অন্তর্গত ডাক শুনে, হুমায়ুন আহমেদ এই প্রশ্নের কোনো
চূড়ান্ত উত্তর দেন না। তিনি প্রশ্নটাকেই জীবন্ত রাখেন, তাঁর উপন্যাসের ভাষা আলাদা ক’রে
বিশ্লেষণযোগ্য, কারণ এই ভাষা সাহিত্যিক ভারে নুয়ে পড়ে না, সংলাপ ছোট, ছন্দময়, প্রায়
কথ্য অথচ তাতে আছে সূক্ষ্ম নির্মাণ। এই ভাষার মাধ্যমেই তিনি পাঠকের সঙ্গে এক ধরনের
গোপন চুক্তি করেন, পাঠক অনুভব ক’রে লেখক তাকে বোঝেন, তার দৈনন্দিন হাসি-কান্না জানেন,
তাই পাঠক লেখকের ওপর বিশ্বাস রাখে, এই বিশ্বাসই হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্যিক শক্তি, সমালোচকেরা
অনেক সময় তাঁর সহজতাকে অবমূল্যায়ন করেছেন, কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে যে এই সহজতার মধ্যেই
ছিল দীর্ঘস্থায়িত্ব, কারণ তাঁর উপন্যাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পাঠক বদলায় কিন্তু পাঠের
আনন্দ ফুরোয় না। সময় বদলায়, সামাজিক বাস্তবতা বদলায়, তবু তাঁর চরিত্রদের অনুভূতি পুরোনো
হয় না, কারণ মানুষের মৌলিক সংকটগুলো একই থেকে যায়, একাকিত্ব, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা,
নিরাপত্তার খোঁজ, মৃত্যুভয়, স্বপ্ন দেখার সাহস, এই চিরন্তন বিষয়গুলোকেই তিনি গল্পে
রূপ দিয়েছেন। হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস তাই শুধু গল্প নয়, তা এক ধরনের মানসিক আশ্রয়,
যেখানে পাঠক নিজের ক্লান্ত মন রেখে একটু জিরোতে পারে, আবার একই সঙ্গে নিজের জীবনকে
নতুন ক’রে দেখতে শেখে। এই দ্বৈত ক্ষমতাই তাঁকে বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে অনন্য ক’রে
তুলেছে। তিনি কোনো সাহিত্যিক আন্দোলনের ঘোষক ছিলেন না, কোনো তাত্ত্বিক ম্যানিফেস্টো
লেখেননি, তবু তাঁর উপন্যাস নিজস্ব এক নীরব আন্দোলন গ’ড়ে তুলেছে, যেখানে পাঠক আবার গল্পে
ফিরে আসে, ভাষার প্রতি আস্থা পায়। মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, এবং শেষ পর্যন্ত
বুঝতে শেখে যে, সাহিত্য মানে কেবল উচ্চবর্গীয় বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়, সাহিত্য মানে
মানুষের পাশে দাঁড়ানো। হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস সেই পাশে দাঁড়ানোর উজ্জ্বল দলিল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন