রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে ‘এলা’ চরিত্রটি কেবল একটি কাহিনির কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র নয়, বরং এটি রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তা, মানবতাবাদ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আধুনিক নারীর আত্মসচেতনতার এক গভীর শিল্পরূপ। যেখানে ব্যক্তি ও আদর্শ, প্রেম ও কর্তব্য, বিপ্লব ও মানবিকতা এই সবকটি শক্তি একসঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে একটি জটিল অথচ অত্যন্ত অর্থবহ চরিত্ররূপ সৃষ্টি করেছে। ‘এলা’ উপন্যাসে প্রথমে আবির্ভূত হয় এক শিক্ষিত, সংবেদনশীল, চিন্তাশীল তরুণী হিসেবে, যার মনে দেশপ্রেম আছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আছে, কিন্তু সেই ক্ষোভ কখনোই অন্ধ উন্মাদনায় রূপ নেয় না; তার দেশপ্রেম প্রশ্নবোধক, অনুসন্ধানী এবং নৈতিক দায়বদ্ধতায় পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ, এখানে ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘এলা’কে বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেছেন, যাতে বিপ্লবের বাহ্যিক রোমান্টিকতা নয়, তার অন্তর্গত নৈতিক সংকট উন্মোচিত হয়, এবং এই উন্মোচনের প্রধান মাধ্যম হ’য়ে ওঠে ‘এলা’র চেতনা। ‘ইন্দ্রনাথে’র সঙ্গে ‘এলা’র সম্পর্ক প্রথমে প্রেমের মতো মনে হলেও ধীরে ধীরে তা এক ধরনের নৈতিক সংলাপে পরিণত হয়, যেখানে ‘এলা’ কেবল প্রেমিকা নয়, বরং বিচারক, প্রশ্নকর্তা এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যানকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ‘ইন্দ্রনাথে’র বিপ্লবী সত্তা প্রথমে ‘এলা’র কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে হয়, কারণ সেখানে সে দেখে আত্মত্যাগের সংকল্প, ব্যক্তিগত স্বার্থবর্জনের ঘোষণা এবং দেশের মুক্তির স্বপ্ন, কিন্তু খুব দ্রুতই ‘এলা’ উপলব্ধি করে যে এই বিপ্লবী চেতনার ভেতরে এক ধরনের কঠোরতা, ক্ষমতালোভ এবং মানুষের জীবনকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমে দানা বাঁধছে। ‘এলা’র রূপধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার সংবেদনশীলতা; সে কেবল তত্ত্ব দিয়ে বিচার করে না, বরং মানুষের মুখ, ভয়, দ্বিধা, যন্ত্রণা এবং মৃত্যুর বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে আদর্শকে মাপে। যখন বিপ্লবের নামে নির্দোষ মানুষের প্রাণনাশের পরিকল্পনা সামনে আসে, তখন ‘এলা’ সেই মুহূর্তে বুঝতে পারে যে আদর্শ যদি মানবিকতার সীমা অতিক্রম করে, তবে সেই আদর্শ আসলে আর আদর্শ থাকে না, বরং এক ধরনের নৈতিক স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ‘এলা’ চরিত্রের মাধ্যমে বিপ্লবী রাজনীতির সেই অন্ধ দিকটিকে উন্মোচন করেছেন, যেখানে লক্ষ্য মহৎ হলেও পদ্ধতি নিষ্ঠুর, এবং যেখানে ব্যক্তির বিবেক দলীয় শৃঙ্খলার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হয়। ‘এলা’ এই পরাজয় মেনে নেয় না; এখানেই তার চরিত্রের মূল শক্তি নিহিত। সে প্রেমকে ব্যবহার করে নিজেকে নির্বিচারে সমর্পণ করে না, বরং প্রেমের মধ্যেই সে প্রশ্ন তোলে, যাচাই করে, এবং প্রয়োজন হ’লে প্রেমের বিরুদ্ধেও দাঁড়ায়। ‘এলা’র ‘না’ বলার ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই ‘না’ কোনো আবেগী অভিমান নয়, বরং সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান, যেখানে সে বলে দেয় যে মানুষের জীবন, মানুষের ভয়, মানুষের দুর্বলতা এই সবকিছু অগ্রাহ্য করে কোনো সংগ্রাম ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। উপন্যাসের চারটি অধ্যায় আসলে ‘এলা’র চেতনার চারটি স্তরকেও নির্দেশ করে; প্রথম অধ্যায়ে সে আদর্শে বিশ্বাসী, দ্বিতীয় অধ্যায়ে সে প্রেমে আবদ্ধ, তৃতীয় অধ্যায়ে সে দ্বন্দ্বগ্রস্ত ও প্রশ্নমুখর, আর চতুর্থ অধ্যায়ে সে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এক আত্মসচেতন মানুষ। যে নিজের সত্যকে বেছে নেয় নিঃসঙ্গতার বিনিময়ে। ‘এলা’র এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক নাটকীয়তা নয়, বরং ধীরে-ধীরে গ’ড়ে ওঠা এক গভীর মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রত্যেকটি ঘটনা তার চিন্তাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন যে নারী কেবল আবেগের আধার নয়, বরং চিন্তার ধারক, এবং সেই চিন্তা রাজনৈতিক পরিসরেও সমানভাবে কার্যকর। ইন্দ্রনাথের চরিত্র যেখানে বিপ্লবী সংগঠনের কাঠামোর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, সেখানে ‘এলা’ সেই কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে তার নৈতিক বৈধতা যাচাই করে। এই অবস্থান ‘এলা’কে উপন্যাসের সবচেয়ে আধুনিক চরিত্রে পরিণত করে, কারণ সে কোনো কর্তৃত্বকে অন্ধভাবে মেনে নেয় না, না প্রেমের কর্তৃত্ব, না দলের কর্তৃত্ব, না ইতিহাসের কথিত অনিবার্যতার কর্তৃত্ব। ‘এলা’র প্রেম আসলে এক ধরনের নৈতিক প্রেম, যেখানে ভালোবাসা মানে অপরকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানো; সে ‘ইন্দ্রনাথ’কে ভালোবেসেই তার পথের ভুল দেখাতে চায়, কিন্তু যখন সে বুঝতে পারে যে ‘ইন্দ্রনাথ’ ক্রমে আদর্শের বদলে ক্ষমতার দিকে ঝুঁকছে, তখন সে সেই প্রেম থেকে সরে আসে। এই সরে আসা ‘এলা’র পরাজয় নয়, বরং তার নৈতিক বিজয়। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন যে প্রকৃত শক্তি অস্ত্রধারণে নয়, বরং অস্ত্র প্রত্যাখ্যানের সাহসে। ‘এলা’র চরিত্রে এই সাহস নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর; সে কোনো নাটকীয় আত্মাহুতি দেয় না, কোনো বিপ্লবী মৃত্যুকে মহিমান্বিত করে না, বরং বেঁচে থাকার কঠিন দায়িত্বকে গ্রহণ করে। যেখানে প্রতিদিন নিজের সিদ্ধান্তের ভার নিজেকেই বহন করতে হয়। ‘চার অধ্যায়’-এর শেষ পর্যায়ে এসে ‘এলা’ যে নিঃসঙ্গতায় উপনীত হয়, তা কোনো রোমান্টিক বিষাদ নয়, বরং এক গভীর অস্তিত্ববাদী অবস্থান, যেখানে সে জানে যে সত্যের পথে চলা মানেই সমাজ, সংগঠন এবং অনেক সময় প্রিয় মানুষের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। এই নিঃসঙ্গতা ‘এলা’র চরিত্রকে ট্র্যাজিক করে তোলে, কিন্তু সেই ট্র্যাজেডির মধ্যেই নিহিত থাকে তার মহত্ত্ব। রবীন্দ্রনাথ ‘এলা’র মাধ্যমে আমাদের দেখান যে বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের শাসক নয়, বরং ভেতরের অমানবিকতা, এবং সেই অমানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রথম শর্ত হলো ব্যক্তিগত বিবেককে অক্ষুণ্ণ রাখা। ‘এলা’ তাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতীক নয়, বরং সে এক নৈতিক মানদণ্ড, যার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি বিপ্লব, প্রতিটি প্রেম এবং প্রতিটি আদর্শকে নিজেকে যাচাই করতে হয়। বাংলা উপন্যাসে এমন চরিত্র বিরল, যেখানে নারী কেবল গল্পের অনুষঙ্গ নয়, বরং চিন্তার কেন্দ্র, এবং রবীন্দ্রনাথ এই চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি কেবল ঘটনা বর্ণনায় নয়, বরং মানবচেতনার সূক্ষ্মতম দ্বন্দ্বকে শিল্পরূপ দেওয়ার ক্ষমতায়। ‘এলা’ সেই শিল্পরূপ, যেখানে প্রেম আছে কিন্তু আত্মবিলোপ নেই, আদর্শ আছে কিন্তু অন্ধতা নেই, সংগ্রাম আছে কিন্তু নিষ্ঠুরতা নেই, এবং এই কারণেই ‘এলা’ ‘চার অধ্যায়’ এর সীমা ছাড়িয়ে আধুনিক মানবিক চেতনার এক চিরন্তন প্রতিমূর্তিতে পরিণত হয়।
বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন