সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কতটুকু সার্থক !

 

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) ‘পথের পাঁচালী’ কতটুকু সার্থক,এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই বোঝা প্রয়োজন যে এই উপন্যাসের সার্থকতা কোনো একক সাহিত্যিক মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি জীবন, প্রকৃতি, মানুষ ও সময়,এই চারটির এক গভীর সহাবস্থানের শিল্পিত প্রকাশ। ‘পথের পাঁচালী’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি এক ধরনের জীবনবীক্ষা, যেখানে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, আনন্দ, মৃত্যু ও স্বপ্ন একই সুতোয় গাঁথা হ’য়ে মানব অস্তিত্বের দীর্ঘ যাত্রাকে চিহ্নিত ক’রে। বিভূতিভূষণ এখানে কোনো মহান নায়ক বা ব্যতিক্রমী ঘটনার আশ্রয় নেননি; বরং একেবারে সাধারণ, প্রায় অবহেলিত এক গ্রামীণ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র ক’রে এমন এক সাহিত্যিক মহাকাব্য নির্মাণ করেছেন, যা তার সরলতার মধ্য দিয়েই অসাধারণ হ’য়ে উঠেছে। এই সরলতাই পথের পাঁচালী-র প্রথম ও প্রধান সার্থকতা, কারণ এতে জীবনকে রঙিন ক’রে দেখানোর কোনো প্রয়াস নেই, আছে শুধু জীবন যেমন, তেমন করেই তাকে অনুভব করার সততা।

হরিহর রায়ের পরিবার যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাস ক’রে, তা ঔপনিবেশিক বাংলার গ্রামীণ সমাজের এক প্রামাণ্য দলিল। এই সমাজে দারিদ্র্য কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়, বরং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এক স্থায়ী নিয়তি। হরিহরের ব্যর্থতা কোনো ব্যক্তিগত অযোগ্যতার ফল নয়; বরং তা একটি অব্যবস্থিত সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে শিক্ষিত কিন্তু কর্মহীন মানুষ নিজের জায়গা খুঁজে পায় না। বিভূতিভূষণ এখানে কোনো সমাজসংস্কারকের ভাষা ব্যবহার করেননি, তবু তাঁর উপন্যাস পাঠ করতে গিয়ে পাঠক অবধারিতভাবে সমাজব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয়, এই নীরব প্রশ্নোত্তরই উপন্যাসের গভীর সামাজিক সার্থকতা।

‘সর্বজয়া’ চরিত্রটি পথের পাঁচালী-র সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিতর্কিত চরিত্র, এবং একই সঙ্গে এই উপন্যাসের সার্থকতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ‘সর্বজয়া’ কোনো আদর্শ মাতৃমূর্তি নয়; সে কঠোর, সন্দেহপ্রবণ, কখনো নিষ্ঠুর, আবার একই সঙ্গে গভীরভাবে মমতাময়ী ও দায়িত্বশীল। তার রূঢ়তা আসলে অভাবের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের যুদ্ধের ফল, যেখানে নৈতিকতার চেয়ে টিকে থাকাই বড় সত্য। দুর্গার প্রতি তার কঠোরতা বা ইন্দির ঠাকরুণের প্রতি অনীহা কোনো জন্মগত নিষ্ঠুরতা নয়, বরং সীমিত সম্পদের মধ্যে বেঁচে থাকার মানসিক চাপে বিকৃত হ’য়ে ওঠা মানবিক প্রতিক্রিয়া। বিভূতিভূষণ সর্বজয়ার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি মানুষের সম্পর্ক, অনুভূতি ও নৈতিকতার উপর গভীর ছাপ ফেলে, এই উপলব্ধিই চরিত্রটিকে গভীরভাবে বাস্তব ও সাহিত্যিকভাবে সার্থক ক’রে তোলে।

‘দুর্গা’ ও ‘অপু’ , এই দুই শিশুচরিত্র পথের পাঁচালী-কে নিছক দারিদ্র্যের উপন্যাস হতে দেয়নি; বরং তারা একে পরিণত করেছে জীবনের বিস্ময় ও সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল কাব্যে। দুর্গার দুরন্তপনা, প্রকৃতির সঙ্গে তার সহজাত সম্পর্ক, চুরি করা পেয়ারা বা ফলের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা, এই সবকিছু দারিদ্র্যের নিষ্ঠুরতার বিপরীতে জীবনের এক বিকল্প সৌন্দর্য নির্মাণ ক’রে। দুর্গার মৃত্যু উপন্যাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্ত হলেও, তা কেবল শোকের নয়; এটি জীবনের অনিবার্যতার এক নির্মম স্বীকৃতি, যেখানে প্রকৃতি যেমন উদার, তেমনি নিষ্ঠুর। ‘অপু’  চরিত্রের বিকাশ উপন্যাসটির দীর্ঘস্থায়ী তাৎপর্যকে আরও গভীর ক’রে তোলে, কারণ তার চোখ দিয়েই পাঠক এই জগতকে দেখে, শেখে এবং ধীরে ধীরে জীবনের বেদনাকে উপলব্ধি করতে শুরু ক’রে। ‘অপু’  কোনো প্রতিভাবান নায়ক নয়; সে কৌতূহলী, বিস্মিত ও প্রশ্নমুখর এক শিশু, যার মধ্য দিয়েই বিভূতিভূষণ মানুষের চিরন্তন শেখার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছেন।

ইন্দির ঠাকরুণের চরিত্র পথের পাঁচালী-র মানবিক সার্থকতার এক অনন্য নিদর্শন। সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃদ্ধা নারী পরিবার ও সমাজ, দু’দিক থেকেই অবহেলিত, অথচ তার স্মৃতি, গল্প ও উপস্থিতি সংসারের এক নীরব সাংস্কৃতিক ধারক। তার মৃত্যু কোনো নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে নয়, বরং নিঃশব্দে, প্রায় অদৃশ্যভাবে ঘটে, এই নীরবতাই সমাজের নির্মম বাস্তবতাকে সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রকাশ ক’রে। বিভূতিভূষণ,  এখানে পাঠকের আবেগকে জোর ক’রে টেনে আনেননি; বরং সংযত বর্ণনার মধ্য দিয়েই এক গভীর মানবিক শূন্যতা সৃষ্টি করেছেন, যা উপন্যাসের শিল্পমূল্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

পথের পাঁচালী-তে প্রকৃতির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ প্রকৃতি এখানে কেবল পটভূমি নয়, বরং এক জীবন্ত সত্তা। ঋতুর পরিবর্তন, গ্রামের পথ, কাশবন, পুকুর, বৃষ্টির শব্দ, শরতের আলো,এই সবকিছু মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিভাজন থাকে না। প্রকৃতি এখানে মানুষের দুঃখে করুণাময় নয়, আবার আনন্দে উচ্ছ্বসিতও নয়; সে নির্বিকার, ধারাবাহিক ও চিরন্তন। এই প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শন উপন্যাসটিকে এক গভীর দার্শনিক স্তরে উন্নীত করেছে, যেখানে মানুষের ক্ষুদ্র জীবন প্রকৃতির বিশাল প্রবাহের মধ্যে অর্থ খুঁজে পায়।

ভাষা ও বর্ণনাশৈলীর দিক থেকেও ‘পথের পাঁচালী’  অসাধারণভাবে সার্থক। বিভূতিভূষণের ভাষা অলংকারমুখর নয়, বক্তৃতামূলকও নয়; এটি ধীর, স্বচ্ছ ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সংলগ্ন। এই ভাষার মধ্যেই রয়েছে উপন্যাসের কাব্যিকতা, যা শব্দের বাহুল্যে নয়, বরং অনুভূতির সূক্ষ্মতায় নির্মিত। এই সংযত ভাষাশৈলী উপন্যাসটিকে আবেগের অতিরঞ্জন থেকে রক্ষা করেছে এবং এক দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যিক মর্যাদা প্রদান করেছে।

তবে পথের পাঁচালী-র সার্থকতা বিচার করতে গেলে এর সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করতে হয়। এখানে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে কোনো সংগঠিত প্রতিবাদ নেই, নেই সামাজিক পরিবর্তনের সুস্পষ্ট আহ্বান। কিন্তু এই অনুপস্থিতিই আসলে বিভূতিভূষণের সাহিত্যদর্শনের অংশ, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন জীবনকে বোঝার জন্য আগে তাকে গভীরভাবে অনুভব করতে হয়, পরিবর্তনের স্লোগান দেওয়ার আগে মানুষের যন্ত্রণাকে সত্যভাবে তু’লে ধরাই বড় কাজ। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে মতাদর্শিক সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত রেখেছে এবং তাকে সার্বজনীন ক’রে তুলেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘পথের পাঁচালী’ তার জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা, মানবিক চরিত্রচিত্রণ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক, সংযত ভাষা ও দর্শনমূলক গভীরতার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক অসাধারণ সার্থকতা অর্জন করেছে। এটি কেবল দারিদ্র্যের কাহিনি নয়, কেবল শৈশবের স্মৃতিকথা নয়, বরং জীবনের পথচলার এক দীর্ঘ, ধীর ও গভীর পাঁচালি, যেখানে প্রতিটি বেদনা, প্রতিটি আনন্দ ও প্রতিটি নিঃশ্বাস মিলিয়ে মানুষের অস্তিত্বের এক চিরন্তন গান রচিত হয়েছে। এই কারণেই ‘পথের পাঁচালী’ আজও প্রাসঙ্গিক, আজও জীবন্ত, এবং বাংলা সাহিত্যে এক অনতিক্রম্য শিল্পসাফল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...