সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সামাজিক চিত্র কতটুকু পাওয়া যায়

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) উপন্যাসে সামাজিক চিত্র কতটুকু পাওয়া যায়, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বলতে হয়, তাঁর উপন্যাসসমগ্রই সমাজের এক বিস্তৃত, নির্মম ও গভীর বিশ্লেষণ। যেখানে ব্যক্তি কখনোই সমাজের বাইরে কোনো স্বতন্ত্র নায়ক হ’য়ে উঠতে পারে না। বরং ব্যক্তি সর্বদা সমাজের অর্থনৈতিক, শ্রেণিগত, যৌন ও মানসিক কাঠামোর দ্বারা নির্মিত ও নিয়ন্ত্রিত এক সত্তা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসকে যে নতুন দিশা দিয়েছেন, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো সমাজকে রোমান্টিক কল্পনার আবরণে ঢেকে না রেখে নগ্ন বাস্তবতায় উপস্থাপন করা। যেখানে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, কামনা, শোষণ ও ক্ষমতার সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর সমাজচিত্র কোনো নৈতিক আদর্শের প্রচার নয়, বরং সমাজ কীভাবে মানুষের চরিত্র, চিন্তা ও সম্পর্ককে গ’ড়ে তোলে এবং ধ্বংস করে, তার এক অন্তর্গত অনুসন্ধান। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে যে সমাজচিত্র পাওয়া যায়, তা কেবল জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার বিবরণ নয়, বরং উপনিবেশিক বাংলার প্রান্তিক অর্থনীতির এক নির্মম প্রতিফলন। যেখানে নদী জীবনের অবলম্বন হয়েও মৃত্যুর সমার্থক, আর জীবিকা ও জীবনের মধ্যে কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা নেই। কুবেরের জীবনসংগ্রাম দেখায় যে সমাজে নৈতিকতা বা প্রেম কোনো চিরস্থায়ী মূল্য নয়; বরং ক্ষুধা ও টিকে থাকার তাগিদই মানুষের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ ক’রে। আর এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই মানিক, সামাজিক সম্পর্কের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করেন। কপিলার চরিত্রে নারীসমাজের অবস্থান বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়, কারণ তার শরীর ও শ্রম উভয়ই সামাজিক শোষণের অংশ, অথচ সমাজ তাকে নৈতিকতার দোহাই দিয়ে দোষারোপ করে, এই দ্বৈততা মানিকের সমাজচিত্রকে আরও তীক্ষ্ণ ক’রে তোলে। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে সামাজিক চিত্র আরও গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরে প্রবেশ করে। যেখানে গ্রামবাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ বাহ্যিকভাবে ভদ্র ও নৈতিক হলেও অন্তরে ভয়, যৌনদমন ও ক্ষমতার লালসায় আক্রান্ত। শশী ডাক্তারের চরিত্রের মধ্য দিয়ে মানিক দেখিয়েছেন, শিক্ষিত ও তথাকথিত সভ্য সমাজও আদিম প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত নয়।  এবং এই প্রবৃত্তিগুলিই সামাজিক সম্পর্ককে পুতুলের মতো নাড়ায়—এখানে সমাজ কোনো নির্দয় শক্তি নয় শুধু, বরং মানুষের অবচেতনে বাস করা এক নিয়ন্ত্রক কাঠামো। জননী উপন্যাসে সমাজচিত্র আরও বিস্তৃত ও ঐতিহাসিক হ’য়ে ওঠে। যেখানে গ্রামীণ সমাজের শ্রেণিবিন্যাস, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও নারীর শ্রম এক বৃহৎ সামাজিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে চিত্রিত। এখানে মাতৃত্ব কোনো কেবল আবেগের বিষয় নয়, বরং সামাজিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এক কঠিন বাস্তবতা, যেখানে নারীর শরীর ও শ্রম সমাজের ভিত্তি হলেও তার কোনো মর্যাদা নেই। এই উপন্যাসে মানিক সমাজকে দেখিয়েছেন একটি দীর্ঘস্থায়ী শোষণব্যবস্থা হিসেবে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ’রে মানুষকে দমিয়ে রাখে। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজচিত্রকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক স্তরে উন্নীত করেছেন। যেখানে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজের আদর্শবাদ, বিপ্লবী রোমান্টিসিজম ও আত্মপ্রবঞ্চনা উন্মোচিত হয়। এখানে সমাজ কেবল অর্থনৈতিক কাঠামো নয়, বরং চিন্তার কাঠামোও, যা মানুষকে বিপ্লবের কথা বলিয়েও বাস্তবে আপস ও সুবিধাবাদের পথে ঠেলে দেয়। হরিহর ও শচীশদের চরিত্রে দেখা যায়, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন কীভাবে ব্যক্তিগত কামনা ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংঘর্ষে বিকৃত হ’য়ে ওঠে, এবং এই বিকৃতিই সমাজের প্রকৃত মুখ। ‘দিবারাত্রির কাব্য’  উপন্যাসে মানিক সমাজচিত্রকে আরও নগ্ন ও নিষ্ঠুর ক’রে তুলেছেন। কারণ এখানে দাম্পত্য জীবন, প্রেম ও যৌনতা সরাসরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত। এই উপন্যাসে মানুষ একে অপরের কাছে অনুভূতির মানুষ নয়, বরং প্রয়োজনের বস্তুতে পরিণত হয়, আর এই বস্তুগত সম্পর্কই পুঁজিবাদী সমাজের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপকে প্রকাশ ক’রে। শহর ও গ্রামের সমাজচিত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি দেখিয়েছেন যে গ্রাম কোনো নিষ্পাপ আশ্রয় নয় এবং শহর কোনো মুক্তির প্রতীক নয়; উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ সামাজিক কাঠামোর দ্বারা সমানভাবে বন্দী। গ্রামে শোষণ প্রকাশ্য ও নির্মম, শহরে তা সূক্ষ্ম ও মানসিক—কিন্তু উভয়ই মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত ক’রে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাজচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা তিনি উপন্যাসে তাত্ত্বিক বক্তৃতা হিসেবে নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। শ্রেণিসংঘাত, উৎপাদন সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তাঁর চরিত্রগুলোর জীবন ও মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রণ ক’রে, এবং এই নিয়ন্ত্রণ থেকেই জন্ম নেয় নৈতিকতা, প্রেম ও বিদ্রোহের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তাঁর সমাজে নৈতিকতা কোনো চিরস্থায়ী মানদণ্ড নয়, বরং শ্রেণি ও পরিস্থিতির দ্বারা নির্মিত এক আপেক্ষিক ধারণা, এই উপলব্ধিই মানিকের সমাজচিত্রকে আধুনিক ও তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাজচিত্র একেবারে নিরাশাবাদী নয়; তাঁর উপন্যাসে মানুষের জেদ, বেঁচে থাকার শক্তি ও ক্ষীণ হলেও প্রতিরোধের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা সমাজের নির্মমতার মধ্যেও মানবিক সম্ভাবনার আভাস দেয়। তবু এই প্রতিরোধ কখনোই পূর্ণ মুক্তিতে পৌঁছায় না, কারণ সমাজের কাঠামো এতটাই গভীর ও বিস্তৃত যে ব্যক্তি তাকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতাই মানিকের সমাজচিত্রকে আরও বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য ক’রে তোলে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সামাজিক চিত্র কেবল উপস্থিত নয়, বরং তা গভীরভাবে বিশ্লেষিত, বহুমাত্রিক ও শিল্পসম্মতভাবে নির্মিত শ্রেণি, অর্থনীতি, যৌনতা, ক্ষমতা ও মনস্তত্ত্বের জটিল আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে তিনি সমাজকে এক জীবন্ত বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন, যা বাংলা উপন্যাসকে নিছক কাহিনির স্তর থেকে তু’লে এনে সামাজিক সত্যের এক গভীর অনুসন্ধানে পরিণত করেছে, এবং এই কারণেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সামাজিক চিত্রের ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব বাংলা সাহিত্যে অনন্য ও অপরিসীম।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...