সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কবি ও কবিতা-৪

 

রবীন্দ্রনাথ, কবিকে সাথে আসার জন্য আহ্বান করেছেন, যদি তিনি প্রাণবাণ হোন। কবির থাকতে হয় বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা আর সংসার-এ পাহাড় সমান কষ্ট। এসব যেন কবির ভাগ্যর সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এসব উপাদান না থাকলে যেন কবি হওয়া যায় না। দুঃখ, ব্যথা, দারিদ্র্য , শূন্যতা, ক্ষুদ্র, অন্ধকার এসব- ই যেন কবির আপনজন। একজন কবির জীবনে যেমন থাকে এ সব উপাদানের উপস্থিতি , আবার বলা যায় কোনো ব্যাত্তির জীবনে এ-সব থাকলেই তাঁকে কবি ব’লে আখ্যায়িত করা যাবে, তাঁর কোন কারণ নেই। কবির জীবনে ব’য়ে যাবে সে সব ঘটনা, যা ইতি পূর্বে ঘটেনি অন্যর জীবনে। জীবনের যত সব ঘটনা তাঁর প্রাক-পরীক্ষা যেন ঘটাতে হবে কবির জীবনে কারণ; এ জীবনটা এতো মূল্যবান নয় তাঁর কাছে, যা রয়েছে অন্যর কাছে। কবির জীবন হচ্ছে দুঃখ, কষ্ট পর্যবেক্ষণ করার স্বাধীন বিচরণভূমি, যেখানে- যে কেউ অনায়াসে পারে তাঁর পরীক্ষা মূলক পর্যবেক্ষণ কর্মটি সু-সম্পন্ন ক’রে নিতে। যেমন আমরা পারি মুক্ত একখণ্ড ভুমিতে ইচ্ছা মতো ফসল বুনতে। কাব্যেয় আসলে কি থাকে? যা আমাদের জানা নেই। যার জন্য কবি নিরন্তর সাধনা আর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

রবীন্দ্রনাথ এ- সম্পর্কে বলেনঃ

‘কাব্যেয় আমরা আমাদের বিকাশ উপলব্ধি করি। তাহার সহিত নূতন তত্ত্বয়ের কোনো যোগ নাই। বাল্মাকি যাহা ব্যক্ত করিয়াছেন তাহা  বাল্মাকির সময়েও একান্ত পুরাতন ছিল। রামের গুন বর্ণনা  করিয়া তিনি বলিয়াছেন ভালো লোককে আমরা ভালোবাসি। কেবল মাত্র  এই মান্দাতার আমলের তত্ত্ব  প্রচার  করিবার  জন্য সাতকাণ্ড রামায়ণ  লিখিবার  কোনো আবশ্যক ছিল না। কিন্তু ভালো যে কত ভালো, অর্থাৎ ভালোকে  যে কত ভালো লাগে তাহা  সাতকাণ্ড রামায়ণেই প্রকাশ করা যায়; দর্শনে বিজ্ঞানে কিংবা সুচতুর সমালোচনায় প্রকাশ করা যায় না।‘

                                                                                                                      [সাহিত্য ১৩৯৪ঃ‘কাব্য’পৃঃ ৬৯৩]
রবীন্দ্রনাথ, কবিতা সম্পর্কে সবচে ভালো মত প্রকাশ করেছেন “জীবনস্মৃতি” গ্রন্থেঃ

‘কিছু একটা বুঝাইবার জন্য কেহ তো কবিতা লেখে না। হৃদয়ের অনুভূতি কবিতার ভিতর দিয়া আকার ধারন করিতে চেষ্টা করে। এই জন্য কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে ‘বুঝিলাম না’ তখন বিষম মুশকিলে পড়িতে হয়। কেহ যদি ফুলের গন্ধ শুঁকিয়া বলে ‘কিছু বুঝিলাম না’ তাহাকে  এই কথা বলিতে হয়, ইহাতে বুঝিবার কিছু নাই, এ যে কেবল গন্ধ। উত্তর শুনি, ‘সে তো জানি,কিন্তু খামকা গন্ধই বা কেন, ইহার মানেটা কী।‘ হয় ইহার জবাব বন্ধ করিতে হয়, নয় খুব একটা ঘোরালো করিয়া বলিতে হয়, প্রকৃতির ভিতরকার আনন্দ এমনি করিয়া গন্ধ হইয়া প্রকাশ পায়। কিন্তু মুশকিল এই যে, মানুষকে যে কথা দিয়া কবিতা লিখিতে হয় সে কথার যে মানে আছে। এই জন্য তো ছন্দবন্ধ প্রভৃতি নানা উপায়ে কথা কহিবার স্বাভাবিক পদ্ধতি উলটপালট করিয়া দিয়া কবিকে অনেক কৌশল করিতে হইয়াছে, যাহাতে কথার ভাবটা বড়ো হইয়া কথার অর্থটাকে যথাসম্ভাব ঢাকিয়া ফেলিতে পারে। এই ভাবটা তত্ত্বও নহে, বিজ্ঞানও নহে, কোনো প্রকার কাজের জিনিস নহে, তাহা চোখের  জল ও মুখের হাসির মতো অন্তরের চেহারা মাত্র। তাহার সঙ্গে তত্ত্বজ্ঞান, বিজ্ঞান কিংবা আর কোনো বুদ্ধিসাধ্য  জিনিস মিলাইয়া দিতে পার তো  দাও কিন্তু সেটা গৌণ। খেয়ানৌকায় পার হইবার সময় যদি মাছ ধরিয়া লইতে পার তো সে তোমার বাহাদুরি কিন্তু তাই বলিয়া  খেয়ানৌকা জেলে ডিঙ্গি নয়- খেয়ানৌকায় মাছ রপ্তানি হইতেছে না বলিয়া পাটুনিকে  গালি দিলে অবিচার করা হয়।‘
                                                                                
[জীবনস্মৃতিঃ ১৩১৯,পৃঃ ৪৯৩-৪৯৪,রর,পাঠক সমাবেশ]

রবীন্দ্রনাথ, তাঁর এই লেখাটিতে স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছেন, কবিরা কেন কবিতা লেখে? তাঁর মানসলোকে জমানো গাঢ় দুখগুলো যেন আরও অনেক বেশি হৃদয় নিংড়ানো অনুভূতির হ’য়ে  প্রকাশ পায়। কবিতা সব সময় বোঝার ব্যাপার হ’য়ে আসে না, অনেক সময় তা আবার আসে মনের উপলব্ধি এবং ইন্দ্রিয়ের সুখকর হ’য়ে, একটু হলেও নাড়া দেয় মনকে, কিছুক্ষণ সময় মনকে রাখে আধার থেকে আলোকিত ক’রে। সব–সময় সব কবিতা ইন্দ্রিয়ে সুখ জাগায় না, সব কবিতা সুখ জাগাতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ, এখানে কবিতা ভালো লাগার  বিষয়টিকে নিয়ে আসেন ফুলের গন্ধের সাথে। যার সাথে কোনো যুক্তিতর্ক  মিলে না। তাহ’লে কি বলবো কবিতা সব সময় ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির বিষয়, বুঝার বিষয় না ? কবিতার পংতিতে পংতিতে রয়েছে তাঁর নিজস্ব কিছু অর্থ, যা সহজেই প্রবেশ ক’রে মনে। কবিতা কখন ও অব্যক্ত  প্রলাপ নয়, তা  সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। কবির মনের ভাব ও ভাবনার সর্বচ্ছ প্রকাশ  হল কবিতা। সেই সাথে জুড়ে বসে কিছু জ্যোতির্ময় শব্দ ও ছন্দের দোলা। যার অতপ্রত সংমিশ্রণে প্রকাশ পায় অভূতপূর্ব একটি কবিতা। এই শব্দ ও ছন্দের খেলায় মেতে উঠেন কবিরা, আর এর থেকে প্রকাশ পায় কবিতার পর কবিতা। সেই ফুলের সুঘ্রাণ এর মতো কবিতা–ও আসে এক হ’য়ে। কবি তাঁর হৃদয়ের ব্যাপক প্রসারিত মনভাবনা প্রকাশ করেছেন কবিতার মাধ্যমে। হৃদয়ের অনুভূতি বহিঃপ্রকাশের জন্য যদি কবিতা লিখা হয়, তাহ’লে ওই সকল কবিতার সাথে রয়েছে কবির অন্তঃভাবনা, যে ভাবনা বা তাঁর অনুভূতিগুলো এক হ’য়ে আসে কবিতার  সাথে। কবিতার সাথে অনেক কিছুর সংমিশ্রণ থাকতে পারে, তাঁতে কবিতা কখনও ম্লান হ’য়ে পরে না, বরং কবিতা স্থির থাকে তার নির্ভরযোগ্য আসনটিতে। যেখানে কবিতা শুধু কবিতা হ’য়ে উঠে।  

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘সমালোচনা’’ গ্রন্থে [২৬ মার্চ, ১৮৮৮]...“নীরব কবি ও অশিক্ষিত কবি” শিরোনামের লেখাটিতে প্রকাশ করেন কবির অন্তঃভাবনার বিস্তৃতরূপটি। রবীন্দ্রনাথ বলেনঃ  
                      
                        (ক)...“একটা কথা উঠিয়াছে, মানুষ মাত্রেই কবি। যাহার মনে ভাব আছে, যে দুঃখে কাঁদে, সুখে হাছে, সেই কবি। কথাটা খুব নূতনতর। সচরাচর লোকে কবি বলিতে এমন বুঝে না। সচরাচর লোকে  যাহা বলে তাহার বিপরীত একটা কথা শুনিলে অনেক সময় আমাদিকের ভারি ভালো লাগিয়া যায়। যাহার মনোবৃত্তি আছে সেই কবি, এ কথাটা এখনকার  যুবকদের মধ্য অনেকেরই মুখে শুনা যায়। কবি শব্দের ঐরূপ অতিবিস্তৃত অর্থ এখন একটা ফ্যাশন  হইয়াছে বলিলে অধিক বলা হয় না। এমন- কি নীরব–কবি বলিয়া একটি কথা বাহির  হইয়া গিয়াছে ও সে কথা দিনে দিনে খুব চলিত হইয়া আসিতেছে।এতো দূর পর্যন্ত  চলিত হইয়াছে যে, আজ যদি আমি এমন একটা পুরাতন কথা বলি যে, নিরব-কবি বলিয়া একটা কোনো পদার্থই নাই তাহা হইলে আমার কথাই লোকের নূতন বলিয়া ঠেকে। আমি বলি কি, যে নীরব সেই কবি নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, আমার যা মত অধিকাংশ লোকেরই আন্তরিক তাহাই মত।“  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...