কবি, যা রচনা করেন তা-ই কি কবিতা ? ইন্দ্রিয়ের একগুচ্ছ অপার সৌন্দর্য প্রকাশ পায় কবিতায়। কবিতা হ’য়ে ঊ’ঠে ইন্দ্রিয়য়ের এক বহিঃপ্রকাশ। কি-কি জিনিস থাকতে হয় কবিতায় ? বা কোন কোন উপাদান থাক’লে তাঁকে আমরা একটি ভালো বা উৎকৃষ্ট কবিতা বলতে পারি ? আমি একটি কাঠামো তৈরি করবো, তাঁর জন্য মৌলিক কিছু উপাদান প্রয়োজন। যে সব উপাদান না থাকলে কোনো ভাবেই কাঠামোর একটি স্থাপত্য দাড় করানো সম্ভাবপর হ’য়ে উ’ঠে না। যদিও, স্থাপত্যটির জন্য প্রস্তুতকারির রয়েছে পূর্বপরিকল্পনা । তাহ’লে কি কবিতা রচনা করার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা রয়েছে একজন কবির ? না, ভাব-ভাবনা আর ভাষার নিটোল বহিঃপ্রকাশ হল কবিতা, যার কোনও কাঠামো নেই। একটি সুন্দর ভাবনা আর একগুচ্ছ জ্যোতির্ময় শব্দের প্রকাশ হ’ল কবিতা। কখনও তা প্রকাশ পেতে পারে স্থিরভাবে; আবার তা হ’তে পারে ইন্দ্রিয়ের গলিত সুখ হ’য়ে । কবে লেখা হ’য়ে ছিল বাঙলায় প্রথম কবিতাটি ? একশো-দুশো-তিনশো বছর পূর্বে ? না, তাঁর ও পূর্বে ? যা পড়া বা দেখা মাত্র মানুষের ইন্দ্রিয়ে সুখ জাগিয়েছিল, দ্রুতি খেলা করেছিল মন ও মগজে। অনুভব করলো এটা গদ্য বা পদ্য নয়, অন্য কিছু। যার নামকরণ তখনো স্থির হয় নি, যা ইন্দ্রিয়ে সুখকর হ’য়ে দেখা দিবে, তাঁর নাম হবে কবিতা, শুধুই কবিতা। কে রচনা করবে কবিতা বা যিনি কবিতা রচনা করবেন তাঁকে কি নামে আখ্যায়িত করবো আমরা ? যিনি কবিতা রচনা করবেন তিনি-ই কবি । আবার, কবি’র অন্যতম কাজ কি কবিতা রচনা করা ? কবি, কবিতা রচনা করবেন। কবিতা-ই তাঁর একমাত্র আরাধ্য। কবি কবিতার রাজা, এক আদিম দেবতা, যিনি; যে আধার আলোর অধিক-এর মাঝে খুঁজে নিবেন ঝ’রে পড়া তীব্র সৌন্দর্যবোধকে। কবিতার জন্ম নিয়ে তিরিশি অন্যতম কবি সুধীদ্রনাথ দত্ত বলেনঃ
“কাব্যের জন্ম বৃতান্তে আমাদের প্রয়োজন নেই, সে-সন্ধান নৃতত্ত্ব বিদদের। আমরা শুধু এইটুকু জানলেই সন্তুষ্ট যে কাব্য কবির পূর্বপুরুষ , কবি কাব্যের জন্মদাতা নয়। প্রথম কবিতার আবির্ভাব হয়েছিল কোনও ব্যক্তি বিশেষের মনে নয়, একটা মানব সমষ্টির মনে, প্রথম কবিতার প্রসার শুধু একটি মানুষের উপরে নয়, সমগ্র জীবনের উপরে, প্রাথমিক কবিতার উদ্দেশ্য বিকলন নয়, সঙ্কলন। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত কাব্যের বিশ্বম্ভর মূর্তি কেবল ক্ষয়ে গেছে, তাঁর সেই নীহারিকার মতো আয়তন সৃষ্টির রীতিতে আজ কবি-রুপ উল্কা খণ্ডের মধ্য আবদ্ধ । আমার তাই বিশ্বাস। আমি মনে করি এই ধরনের একটা অধ্যায় পুর্নচ্ছেদ পরেছে। এর পরেও আবার যদি কাব্যের মধ্য একটা তীব্র জ্যোতি দেখা যায়, তবে বুজবো সে জ্যোতি পথ চ্যুত উল্কার চিতাগ্নি।“ [স্বগতঃ ১৩৪৫,পৃঃ ১৩]
সুধীদ্রনাথ দত্ত মনে করেন ‘ভাব’, ‘ভাষা’ আর ‘ছন্দ’- এই তিনে গ’ড়ে উঠে কাব্য। আমি কাব্য বলতে চাই না, বলতে চাই গ’ড়ে উঠে কবিতা । কবিতা নিয়ে কালে কালে বিভিন্ন জন, বিভিন্ন রকম সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। আসলে কবিতা কি ? বা কবিতা কি নয়। চীনা কবি গাউজঙ, কবিতা নিয়ে চমৎকার একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। সাহিত্যর অনেক গুলো শাখা রয়েছে, কবিতা তাঁর মধ্য অন্যতম, এবং কবিতা হল তাঁর আদিমতম শাখা। এক কথায় বলতে চেয়েছেন, কবি ভাবনার ছন্দবদ্ধ ও শিল্পিত ভাব প্রকাশ হল কবিতা । যে ছন্দের কথা আমরা সুধীদ্রনাথে-ও পাই। তাহ’লে কি বলতে পারি, কবিতায় থাকতে হবে “ ছন্দ” এবং তা-প্রকাশ হ’তে হবে শিল্প মণ্ডিত ভাবে। কবিতার কি রয়েছে একক কোনও সর্বজনীন সংজ্ঞা ? যে ভাবে বা সংজ্ঞায় স্থির করা যাবে কবিতাকে। বলতে পারবো কোনটা কবিতা বা বলতে পারবো কবিতা নয় কোনটা? মহা কাব্যের রচনাকারী বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর –তাঁদের একক কোনও মানদণ্ড রয়েছে কবিতা নির্ধারণের ? এলিয়ট, ইয়েটস, অডেন, কামিংস, লারকিন, গিন্সবার্গ বা এজরা পাউন্ড কেউ কি দেখিয়েছেন কবিতা নির্ধারণের পথ গুলো? যে পথে গেলে ও গুলো শুধুই কবিতা হ’বে বা হবে না অন্য কিছু । জীবনানন্দ দাস-যখন ব’লে উঠেন “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি”। মানব মনের ভাবনা না বলে, কবি মনের শিল্প মণ্ডিত ভাবনা যখন ভাষা- ছন্দ এবং দ্রুতিময় কিছু শব্দের সংমিশ্রণ রয়েছে সেটা-ই কবিতা, এরকম বলেছেন অনেকে।
ফরাসি কবি গিয়োম আপোলিন [১৮৮০-১৯১৮]-কবি সম্পর্কে বলেছেনঃ
“সেই ব্যক্তি কবি বা সাহিত্যিক যিনি কবিত্ব শক্তির অধিকারী এবং কবিতা রচনা করেন। কবি তাঁর মৌলিক সৃষ্টকে লিখিত বা অলিখিত উভয় ভাবেই প্রকাশ করতে পারেন। কবিতা রচিত হতে পারে প্রেক্ষাপট, ঘটনার রূপকধর্মী এবং নান্দনিকতার সহযোগে। কবিতায় বিভাজন থাকতে পারে বিভিন্ন ভাবে”।
গিয়োম আপোলিন এখানে কবি এবং সাহিত্যিককে এক ক’রে ফেলেছেন। আমি বলতে প্রস্তুত নই,কবি এবং সাহিত্যিক এক। আমরা সকল কবি কে সাহিত্যিক বলতে পারি এই অর্থে, তাঁরা কোন না কোন সময় গদ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং রচনা করেন কোন না কোন গদ্যধর্মী রচনা। পুরো জীবনে একটি বাক্য হ’লেও তিনি স্পর্শ করেন। কোন ক্ষতি নেই, যদিও তিনি রচনা না করেন একটি গদ্যও। কবি হ’য়ে উঠেন কবি। সাহিত্যিক কখনও কবি হয়ে উঠেন না, যদি না তিনি রচনা করেন একটি অপার সুশোভিত পঙক্তি। সাহিত্যিককে কবি হ’তে হ’লে রচনা করতে হবে অন্তত পক্ষে একটি উৎকৃষ্ট মানের কবিতা, যা হবে শুধুই কবিতা, অন্য কিছু নয়।
ফরাসি আরেক কবি আর্থার রিমবোঁদ [১৮৫৪-১৮৯১]...কবি’ শব্দের অর্থ ব্যাখা করেনঃ
“একজন কবি দর্শনীয় মাধ্যম হিশেবে নিজেকে অন্যর চোখে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি একটি দীর্ঘ,সীমাহীন এবং পদ্ধতিবিহীন, অনিন্ত্রিত অবস্থায় সকলের দৃষ্টিগ্রাহ্যর বাইরে অবতীর্ন হয়ে কবিতা রচনা করেন। সকল স্তরের ভালোবাসা,দুঃখ-বেদনা, উন্মত্ততা–উম্মাদনার মাঝে নিজেকে খুঁজে পান তিনি। তিনি সকল ধরনের বিষবাস্পকে নিঃশেষ করতে পারেন। সেই সাথে পারেন এগুলোর সারাংশকে কবিতা আকারে সংরক্ষণ করতে। অকথ্য দৈহিক অমানসিক যন্ত্রণাকে সাথে নিয়ে তিনি অকুণ্ঠ বিশ্বাসবোধ রচনা করে যখন,যেমন,যেখানে খুশী অগ্রসর হন। একজন অতি মানবীয় শক্তিমত্তার সাহায্যে তিনি সকল মানুষের মধ্য সর্বশ্রেষ্ঠ হিশেবে বিবেচিত হন। একজন বড় ধরনের অকর্মণ্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে কুখ্যাত অপরাধী, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিসম্পাতগ্রস্থ ব্যক্তিও, এমনকি সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হিসেবেও তিনি অভিহিত হতে পারেন । যদি তিনি অজানা ,অজ্ঞাত থেকে যান কিংবা যদি তিনি বিকৃত, উন্মাত্ত, বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন- তারপরও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সেগুলো দেখতে পাবেন। তাই, কি হয়েছে যদি তিনি উৎফুল্লে ভেসে অ-শ্রুত , নাম বিহীন অজানা বিষায়াদি ধ্বংস করেন, অন্যান্য আদি ভৌতিক কর্মীরা তখন ফিরে আসবে এবং তারা পুনরায় সমান্তরাল রচনা শুরু করবে যা পূর্বেই নিপতিত হয়েছিল”।
কবি গ’ড়ে তুলেছেন আপন ভুবন, ভাব-ভাষা আর তাঁর ছন্দ দিয়ে। কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ, এবং তাঁর সম-সাময়িক পর্যন্ত যে সকল কাব্য বা মহাকাব্য রচিত হয়েছিল ,তাঁর সব কিছুই ছিল এই ভাব আর ভাষার মধ্য। কখনো কখনো এই সব ভাব আর ভাষা হ’য়ে উঠে নিজস্ব একটি পথ, যে পথে কবি এগিয়ে যান তাঁর নিজস্ব গন্তব্যয়। এই জন্য এটা হ’য়ে উঠে রবীন্দ্রনাথের কবিতা,ওটা জীবনানন্দ দাসের কবিতা, সুধীদ্রনাথের কবিতা, বুদ্ধদেব বসুর কবিতা। প্রত্যকের তো ছন্দ রয়েছে, কিন্তু ভাষা ? এই ভাষা–ই পৃথক ক’রে কবিকে। সব কবিতাই রচিত হয় বাঙলায়, কিন্তু প্রবাহিত হ’তে থাকে স্ব-স্ব ভাষায়। রবীন্দ্রনাথ যখন নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ-তে বলেনঃ
“ আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান!
না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ”।
[প্রভাত সংগীতঃ ১৮৮৩]
রবীন্দ্রনাথের এই কবিতা, তাঁর কবিতা ক’রে তোলে তাঁর প্রকাশ ও ভাষার জন্য। আমরা দেখলেই বলতে পারি বা শূনেও বলতে পারি এটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা, আমরা বলি না এটা জীবনানন্দ বা সুধীদ্রনাথের কবিতা। তাঁরা সকলেই কবিতা লিখেছেন।
সুধীদ্রনাথ যখন প্রকাশ করেনঃ
“ জনমে জনমে, মরণে মরণে,
মনে হয় যেন তোমারে চিনি।
ও-শরমার্ত অরূপ আনন
দেখেছি কোথায়, হে বিদেশিনী” ?
[অর্কেস্ট্রাঃ ১৯৩৫,‘চপলা’]
এই কবিতাটা পড়া মাত্রই আমরা বলি না এটা জীবনানন্দ বা বুদ্ধদেবের বা রবীন্দ্রনাথের কবিতা। আমরা জানি, এটা সুধীদ্রনাথের কবিতা। এই জানাটা কিসের? বলতে পারি,তাঁদের কবিতা পড়তে পড়তে আমরা চিনে গেছি কার কবিতা কোনটা ? আমরা আরও জেনে গেছি, রবীন্দ্রনাথের কবিতা কোনগুলো বা তাঁর কবিতার ভাষা কি রকম হয়। একই ভাবে আমরা বলতে পারি, জীবনানন্দ দাসের ভাষা কি রকম,বুদ্ধদেব বসুর ভাষা কি রকম বা সুধীদ্রনাথের ভাষা কি রকম বা বিষ্ণু দে’র ভাষা কি রকম। অক্ষর বিন্যাস কবিতাকে এক করে না, বরং ভিন্নতা প্রকাশ ক’রে। পূর্বেই বলেছি, কবিদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা বা তাঁর প্রকাশ ভঙ্গি, তাই বিভিন্ন জনের কবিতা হ’য়ে উঠে ভিন্ন-ভিন্ন কবিতা। আর প্রয়োগ করেন সর্ব প্রিয় উজ্জ্বল শব্দগুলো, যে সব শব্দগুলো কখনও হ’য়ে উ’ঠে রবীন্দ্রনাথের শব্দ আবার কখনও বা সুধীদ্রনাথের শব্দ। অনেক ক্ষেত্রে কবিতার শব্দ দেখেও আমরা বলে দিতে পারি, কোনটা কার কবিতা বা এ কবিতার রচয়িতা কে? সুধীদ্রনাথ দত্ত যখন বলেনঃ
“মহাকবিরা নিজেদের ভাষা নিজেরা বানিয়ে যান বটে,কিন্তু সে – ভাষা যখন চূড়ান্তে পৌঁছয়, তখন তাঁর মধ্য শোনা যায় নিত্ত-নৈমিত্তিক উক্তি-প্রত্যুক্তির প্রতিধ্বনি, প্রাক্কিত ভাষার সবল, সরল ও সজীব পদক্ষেপ, তখন আর শেক্সপিওর –এর ভাষা ব’লে কিছু থাকে না, ধরা পরে যে শেক্সপিওর জনসাধারনের সাবলীল ভাষা ধার নিয়েছেন। অথচ এতখানি আত্মত্যাগ স্বতঃও শেক্সপিওর–এর পৃথক পরিচয় হারায় না, বরং উজ্জলতর রূপে দেখা দেয়, দুটো- চারটে অসংলগ্ন ছত্র পড়লেই বুঝি , সে রচনা শেক্সপিওর –এর কিনা। এই অঘটনসংঘটনে যে দৈব প্রসাদ নেই , এমন মত পোষণের মতো তথ্য আজও আমাদের আয়ত্তে আসেনি, কিন্তু এটা নিঃ সন্দেহ যে মহা শিল্পীরা কোনও অলৌকিক শক্তির প্রসাদ পান বা না পান, অন্তত লৌকিক বুদ্ধিতে ও তাঁরা নিতান্ত নগণ্য নন”।
[স্বগতঃ ১৩৪৫, পৃঃ ১৪৫]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন