একুশের ভোর মানে শুধু সূর্যোদয়
নয়,
মানুষের ভেতর লুকানো উচ্চারণের পুনর্জন্ম,
যে উচ্চারণ জন্মেছিল মায়ের কোলঘেঁষে
প্রথম কান্নার ভেজা স্বরে, আমার বুকের মধ্যে
যে স্বরকে থামাতে চেয়েছিল লৌহদেয়াল,
কিন্তু থামাতে পারেনি কোনো গুলি, কোনো
হুকুম, কোনো শাসন
শীতের
কাঁপা বাতাসে দাঁড়িয়ে ছিল তরুণ-তরুণীরা
তাদের চোখে ছিল না ভয়, ছিল ভাষার দীপ্তি,
তারা ভাল করেই জানতো
ভাষা মানে শুধু শব্দের সমষ্টি নয়,
ভাষা মানে আত্মপরিচয়ের শেষ আশ্রয়,
যখন
উচ্চারিত হলো সারা বাংলা বুক জুড়ে
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’
তা ছিল না তখন শুধু স্লোগান,
ছিল বুকের গভীর থেকে উঠে আসা
এক অনিবার্য সত্যের জোয়ার,
যা ভাসিয়ে নিয়েছিল শাসনের অহংকার,
গুলির
শব্দে কেঁপে উঠেছিল দুপুর আর সন্ধ্যা
রক্তে রাঙা হয়েছিল রাজপথ,
কিন্তু রক্তের প্রতিটি ফোঁটা
বর্ণমালার অক্ষর হ’য়ে
মাটির বু’কে
লিখে দিয়েছিল
আমরা আছি, আমরা থাকব বাংলার বুক জু’ড়ে
সালাম, বরকত, রফিক,
জব্বার আরও কত নাম
তারা আজ শুধু
নাম নয়,
তারা বাংলা ভাষার শিরায় প্রবাহিত রক্ত, দীর্ঘস্বর
তারা প্রতিটি কবিতার নীরব ব্যথা, অমর পঙক্তি
প্রতিটি শিশুর কণ্ঠে প্রথম শেখা ছড়া
শহীদ
মিনারের সাদা স্তম্ভ
আকাশের দিকে তু’লে ধরে নীরব প্রশ্ন
কত রক্তে জন্ম নেয় একটি ভাষার অধিকার?
কত অশ্রুতে ধু’য়ে যায় একটি জাতির অপমান?
একুশ
মানে শোক,
কিন্তু সে শোক পরাজয়ের নয়,
সে শোক শক্তির, আর ভালোবাসার
যেখানে অশ্রু রূপ নেয় অঙ্গীকারে,
আর অঙ্গীকার রূপ নেয় ইতিহাসে
খালি
পায়ে হাঁটা প্রভাত
মাটির শীতল স্পর্শে মনে করায় বুকের গভীরতা,
এই মাটি একদিন উষ্ণ হয়েছিল তরুণ রক্তে,
এই মাটি জানে আত্মত্যাগের মানে কি হতে পারে !
ভাষা
মানে আমার মায়ের ডাকা নাম,
ভাষা মানে কৃষকের মাঠে ভেসে আসা গান,
ভাষা মানে প্রেমিকের কাঁপা কণ্ঠ,
ভাষা মানে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা
একুশ
মানে মাথা নত না করা ইতিহাস,
একুশ মানে অন্যায়ের সামনে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা,
একুশ মানে শিরায় শিরায় জেগে থাকা প্রতিবাদ,
যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান নদীর মতো ব’য়ে যায়
যতদিন বাংলা ভাষা উচ্চারিত হবে বুক থেকে
পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকে, ভালোবাসার টানে
যতদিন কোনো শিশু প্রথম অক্ষর আঁকবে কাগজে,
ততদিন একুশ বেঁচে থাকবে রক্তের গভীর স্পন্দনে,
অমর, অদম্য, অনন্ত দীর্ঘ আমার বুকের গভীরে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন