সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কবি ও কবিতা-৬

 

রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ‘সমালোচনা’’ গ্রন্থে [২৬ মার্চ, ১৮৮৮] কবিতার সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে বলেনঃ
                      
“সত্য যত কবিতা আছে , মিথ্যায়  তেমন নাই। শত সহস্র  মিথ্যার দ্বারে দ্বারে কল্পনা বিচরণ  করিতে পারে, কিন্তু এক মুষ্টি কবিতা সঞ্চয়  করিতে পারে কি না সন্ধেহ ; কিন্তু একটি সত্যর কাছে যাও , তাহার দশগুণ  অধিক কবিতা পাও কি না দেখো দেখি। কেনই বা তাহার ব্যতিকক্রম হইবে বলো ? আমরা তো প্রকৃতির  কাছেই কবিতা  শিক্ষা করিয়াছি, প্রকৃতি কখনো মিথ্যা কহেন না । আমরা কি  কখনো কল্পনা করতে পারি যে, লোহিতবর্ন ঘাসে  আমাদের চক্ষু  জুড়াইয়া যাইতেছে ? বলো দেখি, পৃথিবি নিশ্চল রহিয়াছে  ও  আকাশে অগণ্য তারকারাজি নিশ্চলভাবে  খচিত রহিয়াছে , ইহাতে অধিক কবিত্ব, কি সমস্ত তারকা নিজের পরিবার  লইয়া ভ্রমণ করিতেছে, তাহাতে অধিক কবিত্ব; এমনি তাহাদের তালে তালে পদক্ষেপ যে, একজন জ্যোতির্বিদ বলিয়া দিতে পারে-  কাল যে গ্রহ অমুক স্থানে  ছিল আজ সে কোথায় আসিবে। প্রথম কথা এই যে, আমাদের কল্পনা প্রকৃতি  অপেক্ষা কবিত্বপূর্ণ বস্তু সৃজন  করিতে অসমর্থ; দ্বিতীয় কথা এই যে, আমরা যে অবস্থার মধ্য  জন্ম  গ্রহণ করিয়াছি  তাহার বহির্ভূত সৌন্দর্য  অনুভব করিতে পারি না। অনেক মিথ্যা, কবিতায়  আমাদের মিষ্ট লাগে।  তাহার কারণ এই যে,  যখন সেগুলি প্রথম লিখিত হয়  তখন  তাহা সত্য  মনে করিয়া লিখিত হয়, ও সেই অবধি বরাবর সত্য বলিয়া চলিয়া আসিতেছে।আজ তাহা আমি মিথ্যা বলিয়া জানিয়াছি, অর্থাৎ জ্ঞান  হইতে তাহাকে দূর করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছি; কিন্তু হৃদয়ে সে এমনি শিকর বসাইয়াছে যে, সেখান হইতে তাহাকে উৎপাটন করিবার জো নাই। কবি যে ভূত বিশ্বাস না করিয়াও  ভূতের বর্ণনা করেন, তাহার তাৎপর্য কী ? তাহার অর্থ এই যে, ভূত বুস্তত সত্য না হইলেও আমাদের  হৃদয় সে সত্য। ভূত আছে বলিয়া কল্পনা করিলে যে আমাদের মনের কোন খানে আঘাত লাগে, কত কথা জাগিয়া উঠে, অন্ধকার, বিজনতা, শ্মশান, এক অলৌকিক পদার্থের নিঃশব্দ অনুসরণ, ছেলেবেলাকার  কত কথা মনে উঠে- এ সকল সত্য যদি কবি না দেখেন  তো কে দেখিবে ? সত্য এক হইলেও যে দশ জন কবি সেই এক সত্যর মধ্য দশ প্রকার বিভিন্ন কবিতা দেখিতে পাইবেন না তাহা তো নহে। এক সূর্যকিরণে পৃথিবি  কত  বিভিন্ন বর্ণ ধারণ  করিয়াছে দেখো দেখি ! নদী যে বহিতেছে, এই  সত্যটুকুই কবিতা নহে। কিন্তু এই বহমানা নদী দেখিয়া  আমাদের হৃদয়ে যে ভাব বিশেষের জন্ম হয়, সেই সত্যই যথার্থ  কবিতা। এখন বলো দেখি, এক নদী দেখিয়া সময়ভেদে কত বিভিন্ন ভাবের উদ্রেক হয়! কখনো নদীর কণ্ঠ হইতে বিষণ্ণ গীতি শুনিতে পাই; কখনো বা  তাহার উল্লাসের কলস্বর, তাহার শত তরঙ্গের নৃত্য আমাদের মনকে মাতাইয়া তোলে। জউস্না  কখনো  সত্য- সত্যই  ঘুমায় না, অর্থাৎ সে দুটি চক্ষু মুদিয়া পড়িয়া থাকে না ও জসস্নার  নাসিকাধবনিও কেহ  কখনো শুনে নাই। কিন্তু নিস্তব্দধ রাত্রে জস্না দেখিলে মনে হয় যে জস্না ঘুমাইতেছে, ইহা সত্য। জস্নার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তন্ন তন্ন রূপে আবিষ্কৃত হউক, এমনও প্রমাণ হউক যে জস্না একটা পদার্থই নহে, তথাপি লোকে বলিবে জস্না ঘুমাইতেছে। তাহাকে কোন বৈজ্ঞানিক-চূড়ামণি মিথ্যা কথা বলিতে সাহস করিবে ? “  

রবীন্দ্রনাথ; অনুবাদ করেছেন অনেক কবিতা। বেঁছে নিয়েছেন Victor Hugo, Shelley, Browning, Ernes Myers, Moore, Marston, Christina Rossetti, Swinburne, Hood- ইত্যাদি কবিদের। Victor Hugo- এর রয়েছে “The Poet” কবিতা, যা রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেন “কবি”  শিরোনামেঃ

“ওই যেতেছেন  কবি কাননের পথ দিয়া,
কভু বা অবাক, কভু ভকতি – বিহ্বল হিয়া।
নিজের প্রাণের মাঝে
একটি যে বিনা বাজে,
সে বীণা শুনিতেছেন হৃদয় মাঝারে গিয়া।
বনে যত গুলি ফুল আলো করি ছিল শাখা,
কারো কচি তনুখানি নীল বসনেতে ঢাকা,
কারো বা সোনার মুখ,
কেহ রাঙা টুকটুক,
কারো বা শতেক রঙ যেন ময়ূরের পাখা,
কবিরে আসিতে দেখি হরষেতে হেলি দুলি
হাব ভাব করে কত রূপসী সে মেয়েগুলি।
বলাবলি করে, আর ফিরিয়া ফিরিয়া চায়,
“প্রণয়ী মোদের ওই দেখ লো চলিয়া যায়।“

কবিতার ব্যবহারিক  অর্থ বিভিন্ন জন, বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন স্থানে দিয়েছেন। যার একক কোনো  অর্থ বিরাজ ক’রে  না সর্বত।“সাহিত্যর শব্দার্থকোশ” [১৯৯৯], সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়-এর গ্রন্থে  ‘কবিতা’  শব্দের ব্যাখ্যা করা হয় এভাবেঃ
“ইংরেজিতে ‘পোয়েম’ (Poem); মূল গ্রিক ‘পোয়েইমা’(Poiema)-এর আক্ষরিক অর্থ  হল ‘সৃষ্টি করা  কোনও বস্তুু। ছন্দে বা অমিত্রাক্ষর ছন্দে  লেখা কোনও রচনা। যেটি  গদ্য সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভাব নয় এমন এক নান্দনিক  অনুভূতি ব্যক্ত করার  উদ্দেশ্য আবেগসমৃদ্ধ ও  অলংকিত ভাষায় সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম।“ এই সংজ্ঞা থেকে বুঝা যায় ; তাকেই কবিতা বলা যাবে যার মধ্য থাকবেঃ ১. লেখাটা হ’তে হ’বে ছন্দ নির্ভর বা  অমিত্রাক্ষর ছন্দে ; ২. গদ্যয় যার ভাব প্রকাশ করা যাবে না; ৩. ভাব প্রকাশের ধরণ হ’বে  নান্দনিক বা শিল্পনির্ভর; ৪. রচনাটিতে থাকতে হ’বে আবেগের সংমিশ্রণ; ৫. এবং আবেগের ভাষা হ’বে সৌন্দর্যময়। এ গুলো থাকলেই তাকে আমরা একটা উৎকৃষ্ট রচনা বা কবিতা বলবো! না, উৎকৃষ্ট রচনার মধ্য থাকবে ভাষা-সৌন্দর্য- অলংকার আর ছন্দের খেলা।

“কবি ও কবিতা”-সম্পর্কে বোদলেয়ারের রয়েছে ব্যাপক রচনা। যেখানে তিনি পৃথকভাবে ব্যাখা করেছেন কবি ও কবিতা নিয়ে। বোদলেয়ার মনে করেন কবিতা একটি মাধ্যম বা যন্ত্র নয়, এর একটি নিদিষ্ট বিষয় ও রয়েছে। কবি একজন স্বপ্নদাতা, যিনি স্বপ্নের রাজ্যয় আমাদের বিচরণ করান, তাঁর মতো ক’রে। কখনো আবার হ’য়ে উঠেন একজন জ্ঞানবান ধ্যানী একাকী মানুষ। যে মানুষ তাঁর সৌন্দর্যগুলো ছড়িয়ে দিতে চান সকলের মাঝে; যেখানে আলো-অন্ধকার এক হ’য়ে রয়।

সমকালীন কবি ও সমালোচক ‘Jules Janin’- এর উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে “বোদলেয়ার” বলেনঃ        
“Pourquoi le poete ne serait-il pas un broyeur depoisons aussi
  bien qu’un confiseur, un eleveur de serpents pour miracles et spectacles, un psylle amoreux de ses reptiles...”

অর্থাৎ, “কবি একজন বিষমন্থনকারী, ৈধয্যবান  শিক্ষক হতে পারেন, হতে পারেন একজন দক্ষ সাপুড়ে অথবা একজন ‘Confessor’(পাপীদের পাপ-এর কথা শোনেন যে পুরোহিত)।“  
[দ্রঃশার্ল বোদলেয়ারঃ অনন্য দ্রষ্টা (১৯৯২),সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়;পৃঃ ৮১]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...