মহাকবিরা তৈরি করেন তাঁদের নিজেদের ভাষা, যে ভাষায় তাঁদের কবিতা, কবিতা হ’য়ে রয়। সে সব উচ্চ মানের ভাষা দেখে বুঝতে বাকি থাকে না কোন কবি কোনটা রচনা করেছেন। একদা এই সব কবিতা হ’য়ে ঊঠে মহাকাব্য বা কালের কবিতা, যার প্রাণ থাকে কয়েকশো বছর যাবৎ। কবি, কবিতাকে ক’রে তোলে শুধুই কবিতা, যা অন্য কিছু নয়, প্রাণ পায় কবিতা ব’লে। তিনি শেষ না হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বলতে পারেন না, তিনি যা লিখছেন তা-কি রূপ পাচ্ছে কবিতা বলে, না হচ্ছে অন্য কিছু।
মানুষের চাহিদা রয়েছে অনেক কিছুর, তাঁর বেঁচে থাকার জন্য। মানুষ কখন,প্রথম উপলব্ধি করলো কবিতা-ও প্রয়োজন তাঁর বেঁচে থাকার জন্য? যার প্রয়োজনীয়তা থেকে কবিরা রচনা করলেন কবিতা। কবিতা, কতটা সুখী ক’রে তো’লে সেই সব মানুষদের, যাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন কবিতা! না, কবির প্রয়োজন কবিতার ? কবি কে? তিনি কেন কবিতা লিখবেন ? কবিতা কি তাঁকে অন্য মানুষে পরিণত করবে ? আমরা যা ভাবি, তিনি কি তা ভাব্বেন না! না-কি, তিনি অন্য কিছু ভাববেন, যা আমরা ভাবনা বা কল্পনায় নিতে পারি না, আর এর জন্য তিনি কবি।
বুদ্ধদেব বসু এ- সম্পর্কে বলেনঃ
“যদি মানুষ তাঁর স্থলমান মুহূর্ত গুলির অব্যবহিত প্রভাবের মধ্যই আবদ্ধ থাকতো , তাহ’লেও ভ্রুনাবস্তায় রুপকথা সম্ভাব হ’তো না তা নয়, কিন্তু বিজ্ঞান হ’তো না। তাঁর ই নাম কবি, যিনি আবেগের দৈহিক অভিঘাত থেকে যাএা করে সেই দৈহিক অভিঘাত থেকে মুক্তি দেন মানুষকে, ইন্দ্রিয় গত সংবেদনকে রুপান্তরিত করেন সেই আধ্যাত্মিক সামগ্রীতে , যা কে আমরা অভিজ্ঞতা ব’লে থাকি। আমাদের এই আদি কবি একাধারে কাব্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের জনকঃ তাঁর চিত্তে আবেগ থেকে জ্ঞান নিষ্কাশিত হ’য়ে জ্ঞান আবার সঞ্জীবিত হয়েছে আবেগ; বিশ্বপুরাণ থেকে মানবেতিহাস বিশ্লিষ্ট হবার পর ইতিহাস আবার পুরাণের স্রোতে মিশ্রিত হ’য়ে নতুন ক’রে প্রাণ পেয়েছে। এবং তাঁর ও ভাষার জন্ম একই লগ্নে ; তাঁর সত্তা একান্ত রূপে ভাষানির্ভর। মানুষের ভাষা আছে, এতেই প্রমাণ হয় যে সারাৎসার কবির,মানুষ যদি কবি না হ’তো তাহ’লে তাঁর ভাষার প্রয়োজন হতো না। এই জন্য জার্মান দার্শনিক হামান্ বলেছিলেন যে, ‘কবিতাই মানবজাতির মাতৃভাষা’।“
[বুদ্ধদেব বসু প্রবন্ধ সঙ্কলনঃ মাঘ ১৩৮৮;“ভাষা,কবিতা ও মনুষ্যত্ব”,পৃঃ ২১০-২১১]
কালে কালে মানুষের মুখের ভাষার যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেখানেও বড় রকম ভূমিকা রেখেছে কবিতা। ভাষার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন ঘটেছে কবিতার; ভাষা প্রাণ দিয়েছে কবিতাকে আর ছন্দ তাঁকে ক’রে তু’লেছে গতিময়। ভাষার যেমন রয়েছে পরিবর্তনশীলতা, একই ভাবে তাঁর সহযোগী হ’য়ে আছে কবিতা। তাই, ভাষা আর কবিতা গেঁথে আছে একই সূত্রে, তাঁর সহোদর হ’য়ে। বাঙলা ভাষার কবিরা শুধু ভাব আর ছন্দ নিয়ে মেতে উঠেননি, বরং, চমৎকার খেলেছেন ভাষা নিয়ে; দেখিয়েছেন বাঙলা ভাষার রূপ আর তাঁর বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যগুলি। যে সৌন্দর্যর প্রথম শিকারি হলেন কবি। কবিরাই প্রথম আবিষ্কার করেন ভাষার সৌন্দর্যবোধের দিকটি, এবং মেতে উঠেন সেই সৌন্দর্য নিয়ে যা তাঁদের কাছে পরবর্তীতে হ’য়ে উ’ঠে কবিতা। কবিরা-ই প্রথম ভাষার স্তুবকারি। কারো কাছে ভালো লাগা বা না লাগা থেকে কবিতা রচিত হয় না, কবিতা রচিত হয় কবির ভালো লাগা থেকে। এই ভালো লাগা যদি অন্য কারো সাথে মিশে থাকে, তাহ’লে তা কবির প্রাপ্তি।
কি পরিমাণ লেখা লিখবেন একজন কবি ? বা, কত পরিমাণ লিখলে কবি হওয়া যায়, এ রকম অনেক প্রচলিত ধারণা রয়েছে কবির মাঝে। আমরা জানি না, একজন কবিকে কত পরিমাণ লিখতে হয়। তাঁর জীবনে কয়টি কাব্য লিখতে হবে তাঁকে? দুটি, চারটি, ছয়টি, দশটি, পনেরটি, বিশটি, তিরিশটি,পঞ্চাশটি,একশোটি না তাঁরও অধিক! কবির কয়টি কাব্য থাকলে তাঁকে আমরা কবি বলবো ? তাঁর কি থাকতে হ’বে হাজার-হাজার কবিতা ? হাজার হাজার কবিতা কি কবি হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান ক’রে ? না, কবিদের থাকতে হয় কয়েক হাজার কবিতা ! একজন কবি যে পরিমাণ কবিতা রচনা করেন, অপর পক্ষে দেখা যায়, কয়েকজন মিলে তাঁর সমকক্ষ কবিতা কখনও রচনা করতে পারেন না; তাহ’লে তাঁরা কি কবি নন ? একটি অনুমান নির্ভর ভাবনা থেকে কি বলা যায়, এদের মাঝে কে বড় বা প্রধান কবি? তাহ’লে কি রয়েছে বড় বা প্রধান কবি নির্ধারণের একটি সু-নিদিষ্ট মাপকাঠি ? না, কাল আর সময় কবিকে বড় বা প্রধান করে তোলে ? এ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু প্রকাশ করেনঃ
“পৃথিবীর প্রধান লেখকেরা অনেকেই অজস্র লিখেছেন; আর সেটাই তো স্বাভাবিক, কেননা সাধারণ নিয়ম হিশেবে বলা যায় যে রচনা পরিমাণে বেশি না হ’লে সমসাময়িক সাহিত্য ও সমাজে তার প্রভাব ব্যাপক কিংবা গভীর হ’তে পারে না। কোনো কোনো ‘বাজে’ লেখকও যে বেশি লেখেন তাতেও অবাক হবার কিছু নেই; লেখা যার খারাপ, তিনি যতবারই একটি বই লিখবেন ততবারই খারাপ বই লিখবেন, এ তো সোজা কথা। বাংলাদেশে ও, উচ্ছৃঙ্খল জীবনের ফাঁকে- ফাঁকে মধুসূদন কিছু কম লেখেননি–রবীন্দ্রনাথের কথা কিছু না-ই বললাম। বেশি লেখা খারাপ, এই ধারণার তাহলে ভিত্তি কোথায়?”
[কালের পুতুলঃ ১৯৯৭,পৃঃ ৫]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন