সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কবি ও কবিতা-২

 

মহাকবিরা তৈরি করেন তাঁদের নিজেদের ভাষা, যে ভাষায় তাঁদের কবিতা, কবিতা হ’য়ে রয়। সে সব উচ্চ মানের ভাষা দেখে বুঝতে বাকি থাকে না কোন কবি কোনটা রচনা করেছেন। একদা এই সব কবিতা হ’য়ে ঊঠে মহাকাব্য বা কালের কবিতা, যার প্রাণ থাকে কয়েকশো বছর যাবৎ। কবি, কবিতাকে ক’রে তোলে শুধুই কবিতা, যা অন্য কিছু নয়, প্রাণ পায় কবিতা ব’লে। তিনি শেষ না হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বলতে পারেন না, তিনি যা লিখছেন তা-কি রূপ পাচ্ছে কবিতা বলে, না হচ্ছে অন্য কিছু।  

মানুষের চাহিদা রয়েছে অনেক কিছুর, তাঁর বেঁচে থাকার জন্য। মানুষ কখন,প্রথম উপলব্ধি করলো কবিতা-ও প্রয়োজন তাঁর বেঁচে থাকার জন্য? যার প্রয়োজনীয়তা থেকে কবিরা রচনা করলেন কবিতা। কবিতা, কতটা সুখী ক’রে তো’লে সেই সব মানুষদের, যাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন কবিতা! না, কবির প্রয়োজন কবিতার ? কবি কে? তিনি কেন কবিতা লিখবেন ? কবিতা কি তাঁকে অন্য মানুষে পরিণত করবে ? আমরা যা ভাবি, তিনি কি তা ভাব্বেন না! না-কি, তিনি অন্য কিছু ভাববেন, যা আমরা ভাবনা বা কল্পনায়  নিতে পারি না, আর এর জন্য তিনি কবি।
বুদ্ধদেব বসু এ- সম্পর্কে  বলেনঃ

“যদি মানুষ তাঁর স্থলমান মুহূর্ত গুলির অব্যবহিত  প্রভাবের  মধ্যই  আবদ্ধ  থাকতো , তাহ’লেও  ভ্রুনাবস্তায়  রুপকথা  সম্ভাব হ’তো না তা নয়, কিন্তু বিজ্ঞান  হ’তো না। তাঁর ই নাম কবি, যিনি  আবেগের  দৈহিক অভিঘাত থেকে যাএা   করে  সেই দৈহিক অভিঘাত থেকে  মুক্তি দেন মানুষকে, ইন্দ্রিয় গত  সংবেদনকে রুপান্তরিত  করেন সেই আধ্যাত্মিক সামগ্রীতে , যা কে আমরা অভিজ্ঞতা ব’লে থাকি। আমাদের এই আদি কবি একাধারে কাব্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের জনকঃ তাঁর চিত্তে আবেগ থেকে জ্ঞান নিষ্কাশিত হ’য়ে জ্ঞান আবার সঞ্জীবিত  হয়েছে  আবেগ; বিশ্বপুরাণ থেকে মানবেতিহাস বিশ্লিষ্ট হবার পর ইতিহাস আবার পুরাণের স্রোতে মিশ্রিত হ’য়ে নতুন ক’রে প্রাণ পেয়েছে। এবং তাঁর ও ভাষার জন্ম একই লগ্নে ; তাঁর সত্তা একান্ত রূপে ভাষানির্ভর। মানুষের ভাষা আছে, এতেই প্রমাণ হয় যে সারাৎসার কবির,মানুষ যদি কবি না হ’তো তাহ’লে তাঁর ভাষার প্রয়োজন হতো না। এই জন্য জার্মান দার্শনিক হামান্‌ বলেছিলেন যে, ‘কবিতাই মানবজাতির মাতৃভাষা’।“

[বুদ্ধদেব বসু প্রবন্ধ সঙ্কলনঃ মাঘ ১৩৮৮;“ভাষা,কবিতা ও মনুষ্যত্ব”,পৃঃ ২১০-২১১]

কালে কালে মানুষের মুখের ভাষার যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেখানেও বড় রকম ভূমিকা রেখেছে কবিতা। ভাষার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন ঘটেছে কবিতার; ভাষা প্রাণ দিয়েছে কবিতাকে আর ছন্দ তাঁকে ক’রে তু’লেছে গতিময়। ভাষার যেমন রয়েছে পরিবর্তনশীলতা, একই ভাবে তাঁর সহযোগী হ’য়ে আছে কবিতা। তাই, ভাষা আর কবিতা গেঁথে আছে একই সূত্রে, তাঁর সহোদর হ’য়ে। বাঙলা ভাষার কবিরা শুধু ভাব আর ছন্দ নিয়ে মেতে উঠেননি, বরং, চমৎকার খেলেছেন ভাষা নিয়ে; দেখিয়েছেন বাঙলা ভাষার রূপ আর তাঁর বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যগুলি। যে সৌন্দর্যর প্রথম শিকারি হলেন কবি। কবিরাই প্রথম আবিষ্কার করেন ভাষার সৌন্দর্যবোধের দিকটি, এবং মেতে উঠেন সেই সৌন্দর্য নিয়ে যা তাঁদের কাছে পরবর্তীতে হ’য়ে উ’ঠে কবিতা। কবিরা-ই প্রথম ভাষার স্তুবকারি। কারো কাছে ভালো লাগা বা না লাগা থেকে কবিতা রচিত হয় না, কবিতা রচিত হয় কবির ভালো লাগা থেকে। এই ভালো লাগা যদি অন্য কারো সাথে মিশে থাকে, তাহ’লে তা কবির প্রাপ্তি।

কি পরিমাণ লেখা লিখবেন একজন কবি ? বা, কত পরিমাণ লিখলে কবি হওয়া যায়, এ রকম অনেক প্রচলিত ধারণা রয়েছে কবির মাঝে। আমরা জানি না, একজন কবিকে কত পরিমাণ লিখতে হয়। তাঁর জীবনে কয়টি কাব্য লিখতে হবে তাঁকে? দুটি, চারটি, ছয়টি, দশটি, পনেরটি, বিশটি, তিরিশটি,পঞ্চাশটি,একশোটি না তাঁরও অধিক! কবির কয়টি কাব্য থাকলে  তাঁকে আমরা কবি বলবো ? তাঁর কি থাকতে হ’বে  হাজার-হাজার কবিতা ? হাজার হাজার কবিতা কি কবি হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান ক’রে ? না, কবিদের থাকতে হয় কয়েক হাজার কবিতা ! একজন কবি যে পরিমাণ কবিতা রচনা করেন, অপর পক্ষে দেখা যায়, কয়েকজন মিলে তাঁর সমকক্ষ কবিতা কখনও রচনা করতে পারেন না; তাহ’লে তাঁরা কি কবি নন ? একটি অনুমান নির্ভর ভাবনা থেকে কি বলা যায়, এদের মাঝে কে বড় বা প্রধান কবি? তাহ’লে কি রয়েছে বড় বা প্রধান কবি নির্ধারণের একটি  সু-নিদিষ্ট মাপকাঠি ? না, কাল আর সময় কবিকে বড় বা প্রধান করে তোলে ? এ সম্পর্কে  বুদ্ধদেব বসু প্রকাশ করেনঃ

“পৃথিবীর প্রধান লেখকেরা অনেকেই অজস্র লিখেছেন; আর সেটাই তো স্বাভাবিক, কেননা সাধারণ নিয়ম হিশেবে বলা যায় যে  রচনা পরিমাণে বেশি না  হ’লে সমসাময়িক সাহিত্য ও  সমাজে তার প্রভাব ব্যাপক কিংবা গভীর হ’তে পারে না। কোনো  কোনো ‘বাজে’ লেখকও যে বেশি লেখেন তাতেও অবাক হবার কিছু নেই; লেখা যার খারাপ, তিনি যতবারই একটি বই লিখবেন ততবারই খারাপ বই লিখবেন, এ তো সোজা কথা। বাংলাদেশে ও, উচ্ছৃঙ্খল  জীবনের  ফাঁকে- ফাঁকে মধুসূদন কিছু কম লেখেননি–রবীন্দ্রনাথের কথা কিছু না-ই বললাম। বেশি লেখা খারাপ, এই ধারণার তাহলে ভিত্তি কোথায়?”  
                                                                 [কালের পুতুলঃ ১৯৯৭,পৃঃ ৫]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...