রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ব্যক্তিগত মতের মধ্য সীমাবদ্ধ রাখেননি কবি নামের মানুষটিকে। মানুষ নামের মানুষটি কখন কবিহয় তা- তিনি আমাদের দেখিয়েছেন। কবি নামের নতুন সংজ্ঞাটি রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি আবেগ-আপ্লুত ক’রেতোলে। কবি শিরোনামের নতুন নামটি রবীন্দ্রনাথকে বুঝিয়ে দেয়, কে কবি বা কবি নয়। প্রচলিত সংজ্ঞাকে তিনি কতটা মেনে নেন তা আমাদের জ্ঞাত নয়। ভাব, দুঃখ, সুখ- এসব যার মধ্য রয়েছে তাঁকে কবি ব’লে মেনে নেয়া যেতে পারে। টেনে আনেন নতুনদের, কবি নামের নতুন শিরোনামটি। মনোবৃত্তি, যার আছে সেই কবি। পূর্বেই বলেছি, এই মনোবৃত্তি অন্য কিছু নয়, ভাব-ভাবনা আর চেতনার উজ্জ্বল প্রকাশই কবির সূচনা। মেনে নেননি ‘নীরব কবি’ নামের কবিদের। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, কবি হবেন কবি, মনোলোকের চেতনায় জন্ম নেয়া কোনো ধারণা থেকে তিনি জেগে উঠবেন না। তিনি জেগে উঠবেন মানুষের মধ্য থেকে, যাকে আমরা সহজেই ‘কবি’ নামে আখ্যায়িত করবো।
একই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আবার বলেনঃ
(খ)... “যখন বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিভিন্ন লোকে কবি বলিয়া থাকে, তখন কি করিয়া বলা যাইতে পারে যে কবি বলিতে সকলেই এক অর্থ বুঝে? আমি বলি কি, একই অর্থ বুঝে! যখন পদ্যপুণ্ডরীকের গ্রন্থকার শ্রীযুক্ত রামবাবুকে তুমি কবি বলিতেছ, আমি কবি বলিতেছি না ও কবিতাচন্দ্রিকার গ্রন্থকার শ্রীযুক্ত শ্যামবাবুকে আমি কবি বলিতেছি তুমি বলিতেছ না, তখন তোমাতে আমাতে এই তর্ক যে, “রামবাবু কি এমন কবি যে তাঁহাকে কবি বলা যাইতে পারে?” বা, “শ্যামবাবু কি এমন কবি যে তাঁহাকে কবি বলা যাইতে পারে?” রামবাবু ও শ্যামবাবু এক স্কুলে পড়েন, তবে তাঁহাদের মধ্য কে ফাস্ট ক্লাসে পড়েন কে লাস্ট ক্লাসে পড়েন তাহা লইয়া কথা। রামবাবু ও শ্যামবাবু যে এক স্কুলে পড়েন, সে স্কুলটি কি ? না, প্রকাশ করা। তাঁহাদের মধ্য সাদৃশ্য কোথায় ? না, প্রকাশ করা লইয়া। বৈসাদৃশ্য কোথায় ? কিরূপে প্রকাশ করা হয় তাহা লইয়া। তবে, ভালো কবিতাকেই আমরা কবিতা বলি, কবিতা খারাপ হইলে তাঁহাকে আমরা মন্দ কবিতা বলি, সুকবিতা হইতে আরও দূরে গেলে তাঁহাকে আমরা কবিতা না বলিয়া শ্লোক বলিতে পারি, ছড়া বলিতে পারি, যাহা ইচ্ছা। পৃথিবীর মধ্য সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ জীবকে আমরা মানুষ বলি, তাহার কাছাকাছি যে আসে তাঁহাকে বনমানুষ বলি, মানুষ হইতে আরও তফাতে গেলে তাহাকে মানুষ ও বলি না , বনমানুষ ও বলি না, তাহাকে বানর বলি, এমন তর্ক কখনো শুনিয়াস যে, Wordsworth শ্রেষ্ঠ কবি না ভজহরি ( যে ব্যত্তি লেখনীর আকার কিরুপ জানে না) শ্রেষ্ঠ কবি ? অতএব এটা দেখিতেছ, কবিতা প্রকাশ না করিলে কাহাকে ও কবি বলা যাই না। তোমার মতে তো বিশ্ব -সুদ্ধ লোককে চিত্রকর বলা যাইতে পারে। এমন ব্য িত নাই, যাহার মনে অসংখ্য চিত্র অঙ্কিত না রহিয়াছে , তবে কেন মনুষ্যজাতির আর এক নাম রাখ না চিত্রকর ? আমার কথাটি অতি সহজ কথা। আমি বলি যে, যে ভাব বিশেষ ভাষায় প্রকাশ হয় নাই তাহা কবিতা নহে ও যে ব্যত্তি ভাব বিশেষ ভাষায় প্রকাশ করে না সেও কবি নহে। যাঁহারা ‘নীরব কবি’ কথার সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহারা বিশ্বচরাচরকে কবিতা বলেন। এ সকল কথা কবিতাতেই শোভা পায়। কিন্তু অলঙ্কারশূন্য গদ্য অথবা তর্কস্থলে বলিলে কি ভালো শুনায়? একটা নামকে এরূপ নানা অর্থে ব্যবহার করিলে দোষ হয় এই যে, তাহার দুইটা ডানা বাহির হয়, এক স্থানে ধরিয়া রাখা যায় না ও ক্রমে ক্রমে হাতছাড়া এবং সকল কাজের বাহির হইয়া বুনো হইয়া দাঁড়ায়।“
রবীন্দ্রনাথ, তাঁর কবি ভাবনায় শুধু যে কবিকে নিয়ে ভেবেছেন তা নয়, কবি কি শিক্ষিত হবেন, না অ-শিক্ষিত হবেন তা নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন। যদিও শিক্ষা কবি হওয়ার নিচ্ছয়তা প্রদান ক’রে না, কিন্তু কবি হবেন শিক্ষিত। শিক্ষা বা অ-শিক্ষা কবিতা নিধাররনের মাপ কাঠি নয়, কবিতা কতটা কবিতা হ’য়ে উঠলো তা কবির একান্ত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। যে চেতনার ভাব বিশ্লেষণ থেকে রচিত হ’তে পারে কবিতার পর কবিতা। যে সকল কবিতা টিকে থাকতে পারে শতাপদ্দির পর শতাপদি। কবিতায় কতটা সত্য বা মিথ্যা থাকবে তা নিয়ে-ও ভেবেছেন। কবিতা হ’তে পারে সত্য আবার একই সাথে আবার তা হ’তে পারে মিথ্যা। আবার একই সাথে তা কখনো দেখা দিতে পারে সত্য-মিথ্যা রূপে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন