সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কবি ও কবিতা-৫

 

রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ব্যক্তিগত মতের মধ্য সীমাবদ্ধ রাখেননি কবি নামের মানুষটিকে। মানুষ নামের মানুষটি কখন কবিহয়  তা- তিনি আমাদের দেখিয়েছেন। কবি নামের নতুন সংজ্ঞাটি রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি আবেগ-আপ্লুত ক’রেতোলে। কবি শিরোনামের নতুন নামটি রবীন্দ্রনাথকে বুঝিয়ে দেয়, কে কবি বা কবি নয়। প্রচলিত সংজ্ঞাকে তিনি কতটা মেনে নেন তা আমাদের জ্ঞাত নয়। ভাব, দুঃখ, সুখ- এসব যার মধ্য রয়েছে তাঁকে কবি ব’লে মেনে নেয়া যেতে পারে। টেনে আনেন নতুনদের, কবি নামের নতুন শিরোনামটি। মনোবৃত্তি, যার আছে সেই কবি। পূর্বেই বলেছি, এই মনোবৃত্তি অন্য কিছু নয়, ভাব-ভাবনা আর চেতনার উজ্জ্বল প্রকাশই কবির সূচনা। মেনে নেননি ‘নীরব কবি’ নামের কবিদের। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, কবি হবেন কবি, মনোলোকের চেতনায় জন্ম নেয়া কোনো ধারণা থেকে তিনি জেগে উঠবেন না। তিনি জেগে উঠবেন মানুষের মধ্য থেকে, যাকে আমরা সহজেই ‘কবি’ নামে আখ্যায়িত করবো।
            
একই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আবার বলেনঃ
                                      
       (খ)... “যখন বিভিন্ন ব্যক্তিকে  বিভিন্ন লোকে কবি বলিয়া থাকে, তখন কি করিয়া বলা যাইতে পারে যে    কবি বলিতে সকলেই এক অর্থ বুঝে? আমি বলি কি, একই অর্থ বুঝে! যখন পদ্যপুণ্ডরীকের  গ্রন্থকার শ্রীযুক্ত রামবাবুকে তুমি কবি বলিতেছ, আমি কবি বলিতেছি না ও কবিতাচন্দ্রিকার গ্রন্থকার শ্রীযুক্ত শ্যামবাবুকে আমি কবি বলিতেছি তুমি বলিতেছ না, তখন  তোমাতে আমাতে এই তর্ক যে, “রামবাবু কি এমন কবি যে তাঁহাকে  কবি বলা যাইতে পারে?” বা, “শ্যামবাবু কি  এমন কবি যে  তাঁহাকে  কবি বলা যাইতে পারে?” রামবাবু ও শ্যামবাবু এক স্কুলে  পড়েন, তবে তাঁহাদের মধ্য  কে ফাস্ট  ক্লাসে পড়েন কে লাস্ট ক্লাসে পড়েন তাহা লইয়া কথা। রামবাবু ও শ্যামবাবু যে এক স্কুলে পড়েন, সে স্কুলটি কি ? না, প্রকাশ করা। তাঁহাদের মধ্য সাদৃশ্য কোথায় ? না, প্রকাশ করা লইয়া। বৈসাদৃশ্য কোথায় ? কিরূপে প্রকাশ করা হয় তাহা লইয়া। তবে, ভালো কবিতাকেই আমরা কবিতা বলি, কবিতা খারাপ হইলে  তাঁহাকে আমরা মন্দ কবিতা বলি, সুকবিতা  হইতে আরও দূরে গেলে তাঁহাকে আমরা কবিতা না বলিয়া শ্লোক বলিতে পারি, ছড়া বলিতে পারি, যাহা ইচ্ছা। পৃথিবীর মধ্য সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ জীবকে আমরা মানুষ বলি, তাহার কাছাকাছি  যে আসে তাঁহাকে বনমানুষ বলি, মানুষ হইতে আরও তফাতে গেলে তাহাকে মানুষ ও বলি না , বনমানুষ ও বলি না, তাহাকে বানর বলি, এমন তর্ক কখনো  শুনিয়াস  যে, Wordsworth শ্রেষ্ঠ কবি না ভজহরি ( যে ব্যত্তি লেখনীর আকার কিরুপ জানে না) শ্রেষ্ঠ কবি ?  অতএব এটা দেখিতেছ, কবিতা প্রকাশ না করিলে কাহাকে ও কবি বলা যাই না। তোমার মতে তো বিশ্ব -সুদ্ধ লোককে চিত্রকর বলা যাইতে পারে। এমন ব্য িত নাই, যাহার মনে অসংখ্য চিত্র অঙ্কিত না রহিয়াছে , তবে কেন মনুষ্যজাতির আর এক নাম রাখ না চিত্রকর ? আমার কথাটি অতি সহজ কথা। আমি বলি যে, যে ভাব বিশেষ ভাষায় প্রকাশ হয় নাই তাহা কবিতা নহে ও যে ব্যত্তি ভাব বিশেষ ভাষায় প্রকাশ করে না সেও কবি নহে। যাঁহারা ‘নীরব কবি’  কথার সৃষ্টি করিয়াছেন  তাঁহারা বিশ্বচরাচরকে কবিতা বলেন।  এ সকল কথা কবিতাতেই শোভা পায়। কিন্তু অলঙ্কারশূন্য  গদ্য অথবা তর্কস্থলে বলিলে কি ভালো শুনায়? একটা নামকে এরূপ নানা অর্থে ব্যবহার  করিলে দোষ হয় এই যে, তাহার দুইটা ডানা বাহির হয়, এক স্থানে ধরিয়া  রাখা যায় না ও ক্রমে ক্রমে  হাতছাড়া  এবং সকল কাজের বাহির  হইয়া বুনো হইয়া  দাঁড়ায়।“

রবীন্দ্রনাথ, তাঁর কবি ভাবনায় শুধু যে কবিকে নিয়ে ভেবেছেন তা নয়, কবি কি শিক্ষিত হবেন, না অ-শিক্ষিত হবেন তা নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন। যদিও শিক্ষা কবি হওয়ার নিচ্ছয়তা  প্রদান ক’রে না, কিন্তু কবি হবেন শিক্ষিত। শিক্ষা বা অ-শিক্ষা  কবিতা নিধাররনের  মাপ কাঠি নয়, কবিতা কতটা কবিতা হ’য়ে উঠলো তা কবির একান্ত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। যে চেতনার ভাব বিশ্লেষণ থেকে রচিত হ’তে পারে কবিতার পর কবিতা। যে সকল কবিতা টিকে থাকতে পারে শতাপদ্দির পর শতাপদি। কবিতায় কতটা সত্য বা মিথ্যা থাকবে তা নিয়ে-ও ভেবেছেন। কবিতা হ’তে পারে সত্য আবার একই সাথে আবার তা হ’তে পারে মিথ্যা। আবার একই সাথে তা কখনো  দেখা দিতে পারে সত্য-মিথ্যা রূপে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...