বিভিন্ন পেশাদার মানুষের সঙ্গে বোদলেয়ার তুলনা করেছেন কবিদের। তিনি মনে করেন কবি হ’তে পারেন ঠিক একজন যাদুকরের মতো, আবার কখনো তিনি হ’তে পারেন গণিতবিদ, একজন ধাত্রীবিদ্যা বিশারদ, অসিক্রিয়াবিদের মতো অথবা, একজন ধ্যানী সঙ্গীতবিদ বা হ’তে পারেন রন্ধন শিল্পী। মানুষের চতুর দিকে যা রয়েছে তিনি তাঁর সাথেই তুলনা করেছেন কবিকে। কবি যেন আমাদের মাঝেই বসবাস কারী একজন, তা ব্যতিত অন্য কেউ নয়। হয়তো তাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি সকাল- বিকাল আর সন্ধ্যায়, কফি পান করছি এক সাথে বা পথ চলছি একত্রে। কবি কতটা বিচিত্র হ’তে পারেন আমাদের থেকে ? তিনি কি একাকী ! তিনি কি আছেন আমাদের মাঝে; না, তিনি দেখা দেন ভাবনা আর মনোবিশ্ব লোকে, যেখানে জ’মে থাকে একগুচ্ছ স্বপ্ন আর তাঁর অলৌকিক বিশ্ব, যেখানে নাগরিক হ’য়ে তিনি–ই বেঁচে আছেন অধরার মতো। তিনি কবি; তিনি কি কথা বলেন আমাদের মতো ? স্বপ্ন দেখেন আমাদের হ’য়ে, তিনি কি সফল অন্য সকলের মতো ! যারা হয়তো পৌঁছে গেছে চূড়ান্ত শিখরে। যেখানে হয়তো তিনি কোনো দিন পৌঁছেবেন না বা চেষ্টা করবেন না সামান্য মাত্র। তিনি থাকবেন হয়তো আলো- অন্ধকার থেকে অনেক দূরে। যেখানে অন্য কেউ না, তিনি থাকবেন কবি হ’য়ে। যার নিত্য কর্ম স্বপ্ন বুনে যাওয়া, স্বপ্নের ভিতরে বেঁচে থাকা।
কবিতা এক প্রকার আবেগ মণ্ডিত রচনা; স্বতস্ফুততম চিত্তাবেগচালিত কবির রচনাও হ’য়ে–ওঠা ৈনসর্গিক সামগ্রী নয়, তা রচিত শিল্পকলা। তবে অনেকের এবং অনেক কবিতা শরীর থেকে রচনাচিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে ফেলে বোধ জাগায় যেনো তা প্রাকৃতিক পুষ্প পল্লবের মতো জন্মেছে। কোনো কোনো কবিতা স্থাপত্যধর্মী, তা রচনাচিহ্ন লোপ ক’রে দিয়ে স্থাপত্যমহিমা প্রচার করে স্বপ্ন- কল্পনা-চ চেতনায়, এবং প্রচুর কবিতায় নির্মাণচেষ্টা স্পষ্ট দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নঢ্য গীতিকবিতারাশি রচনা বা নির্মাণের কোনো ছাপ শব্দ-পংত্তি- স্তবকে ধ’রে রাখে না, জীবনানন্দের আদি পরযাের কবিতাপুঞ্জ গোপন ক’রে রাখে নির্মাণকৌশল, আর অন্ত্য পরযাএর কবিতা প্রদর্শন করে নির্মাণ দউবল্ল। সুধীদ্রনাথের কবিতা নির্মাণপ্রণালি লুকিয়ে রাখে স্থাপত্যমহিমা রটায়। যে- কবিতা বারংবার সংশোধিত ও পূর্ণলিখিত, তা-ই শুধু নির্মিত বা রচিত, এমন নয়। কবি সর্বপ্রথম কবিতা রচনা করেন তাঁর মনে; কাগজের শাদা পৃষ্ঠায় স্থান পাওয়ার অনেক আগেই কবিতা বারংবার নির্মিত, পুননির্মিত ও রচিত হয়। বিভিন্ন কলা প্রকৌশলের সুখী সম্মিলনে গ’ড়ে ওঠে কবিতা। তাঁতে আছে শব্দসজ্জ, বাক্যনির্মাণ, ছন্দঅনুপ্রাস- মধ্যমিলের মতো শারীরিক প্রকৌশল,এবং উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রুপক-চিত্রকল্পের মতো অ-শারীরিক কলা। কবিতা রচিত হওয়ার পরে জৈব ও অবিভাজ্য রূপ গ্রহণ করে। কিন্তু বিভাজন সম্ভাব সবকিছু; অণু, মানব-শরীর, জটিল যন্ত্র ও কবিতা সবকিছুকে ক্ষুদ্রংসে ভাঙা সম্ভাব। ব্যবছেঁদে কবিতা কষ্ট পায়; যখন কোনো উপমাকে কেটে আনা হয় কবিতা- শরীর থেকে, উপমাটি মলিন হয়। কিন্তু কবিতা থেকে লুণ্ঠন ক’রে না- এনে দেখানোর কোনো উপায় নেই কিভাবে উপমাটি গঠিত হয়ে কবিতাটি আলো জ্বেলে দিয়েছে। কবিতার কলা প্রকৌশলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিস্লেশন, কমপক্ষে, দুটি কাজ করতে পারেঃ তা দেখিয়ে দেয় কবিতার রচনাপ্রক্রিয়া এবং চিনিয়ে দেয় কবিকে। কবিতার সৃষ্টিপ্রক্রিয়া জানলে বোঝা যায় কবিতা কোনো অলৌকিক মত্ত প্ররোচনার ফল নয়, আর কবিতার কলাপ্রকৌশল উতঘাথিত হওয়ার সঙ্গে উদঘাটিত হয় কবির অভ্যন্তর,- তাঁর মানসভুবন িস্থ মায়াবী কারখানা, যা সৃষ্টি করে কবিতা।[দ্রঃ হুমায়ুন আজাদঃ শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা( ১৯৯৬/১৪০২); পৃঃ ১৪৫-১৪৬]
হুমায়ুন আজাদ, তাঁর “প্রবচনগুচ্ছ”[২০০৪ : ১৪১১]...গ্রন্থে ‘কবিতা’ সম্পর্কে বলেন... “মানুষ ও কবিতা অবিচ্ছেদ্য। মানুষ থাকলে বুঝতে হবে কবিতা আছে; কবিতা থাকলে বুঝতে হবে মানুষ আছে।“ আজাদ, তাঁর এই বক্তব্যর মধ্য দিয়ে মানুষ ও কবিতাকে এক ক’রে রেখেছেন। আবার কবিতা ও মানুষকে করেছেন একই দণ্ডে দণ্ডিত, যারা সমান ভাবে অপরাধী। যারা সৌন্দর্য খোঁজেন কবিতায়, চিত্তে দোলা জাগাতে চান, অপার সুখ অনুভব করেন ইন্দ্রিয়ে; তাঁরা অন্য কেউ নয়, তাঁরা কবির সহোদর। মানুষের ইতিহাস কত বছরের তা আমার বিবেচ্য বা ভাবনার বিষয় নয়। কিন্তু, এখন বলতে পারি, কবিতার ইতিহাস ও কম নয়। যেহেতু তা জড়িয়ে রয়েছে মানুষের সাথে। যদি বলি, মানুষের ইতিহাস গত চারশো-পাঁচশো বা হাজার বছরের মতো, তাহ’লে অন্তত পক্ষে বলতে পারবো কবিতার ইতিহাস-ও কম নয়। যেহেতু তা রয়েছে মানুষের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কবিতা কি মানুষের সমান বয়সী ? মানুষ যদি বেঁচে থাকে আরও কয়েক লক্ষ বছর, তাহ’লে কি কবিতা ও বেঁচে থাকবে লক্ষ বছর ? না, হারিয়ে যাবে সন্ধ্যাতাঁরার মতো !
তিরিশি–উত্তর বাঙলা কবিতার প্রাণপুরুষ শামসুর রাহমান। কবিতা রচনা-ই যার আরাধ্য। কবিতা নিয়ে “কবে শেষ হবে কৃষ্ণপক্ষ”[২০০৬]....এ ‘আমার অভিবাদন গ্রহণ করো হে একবিংশ শতাব্দী’ শিরোনামের লেখাটিতে বলেন : “একবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে একজন প্রতিভাবান নতুন কবি টেবিলে ঝুঁকে কোন ধরনের কবিতা লিখবেন সেই ভবিষ্যদ্বাণী আমার পক্ষে বলা ভারি মুশকিল। তবে হ্যাঁ, এটুকু বলতে পারি, কবিতার ধরন যতই পালটাক, কবিতা হয়ে-ওঠার গুনটুকু আগামীর বাক্যকেও ধারণ করতে হবে। নইলে মানুষের মনে দাগ কাটতে পারবে না।“
ভাষা এক হ’লেও, একজন প্রধান কবি অন্য কোনো কবিকে দিয়ে তাঁর নিজের কথাই বলিয়ে নিতে চান; তাঁর মতো ক’রে। ভাবনার কোনো স্তরে তাদের মিল দেখলে; অ-মিলগুলো সরিয়ে তাঁর কল্পনায় জায়গা ক’রে নেন নিজের-ই সৃষ্টি বিশুদ্ধশিল্পকলায়। যেখানে অন্য কেউ নয়, তিনি-ই বিস্তৃতি ঘটান তাঁর নিজের-ই আপনসত্ত্বায়। কবি ও কবিতায় যিনি হ’য়ে উঠেন একক ত্রাতা। অন্য কেউ নয়; কবি হ’য়ে উঠেন জ্যোতির্ময় পদাবলীর নক্ষএময় উজ্জ্বল স্পন্দন, তাঁর বিধ্বস্ত হৃদয় আজ আর চন্দনের প্রলাপ নয়। সেখানে দিন- রাত্রি নেমে আসে মোহনীয় শ্রুতি হ’য়ে। সার্থক তাঁর সৃষ্টি, সার্থক ইন্দ্রিয়ের অনন্ত আলোড়ন, রুপক-প্রতীক আর চিত্রকল্পের উপলব্ধি। কামনা, বাসনা আর সৌন্দর্যবোধের মধ্য মৃত্যুর সুর যেনো প্রতিশ্রুতিশীল ভাষায় বেড়ে উ’ঠে। পূর্বপুরুষেরা যে পথে গিয়েছে সে পথ নয়, কবির পথ হ’য়ে উঠুক কবি ও কবিতার বিরামহীন বসন্ত সঙ্গীত, যার সুর গেঁথে রয়েছে কবির মানস চেতনালোকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন