সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

স্বর্ণকুমারী দেবী: বাঙলা সাহিত্যের প্রথম নারী ঔপন্যাসিক


রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ভাইবোন ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪০-১৯২৬), সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪২-১৯২৩), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫) এবং স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৬-১৯৩২)। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি; তাঁরা সবাই জড়িত ছিল শিল্প-সাহিত্যে ও সংস্কৃতি পরিবেশের সাথে। ভাইদের মধ্যে কেউ ছিল চিত্রশিল্পী; বোন ছিল লেখক। রবীন্দ্রনাথের জ্যোতির্ময় আলোয়; তাঁদের মেধা আর প্রাজ্ঞতা যেন অনেকটা ম্লান হ’য়ে আসে, তারপরও তাঁরা থেমে থাকেননি; এগিয়ে গেছেন আপন মহিমায়। রবীন্দ্রনাথ থেকে পাঁচ বছরের বড় ছিলেন স্বর্ণকুমারীদেবী। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারেই স্বর্ণকুমারীদেবীর জন্ম। তিনি ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮১৭-১৯০৫) চতুর্থ কন্যা। তাঁর শিক্ষা শুরু হয় তৎকালীন ঠাকুর পরিবারের রীতি অনুযায়ী। ব্রাহ্ম সমাজ প্রবর্তিত অন্তঃপুরে স্ত্রী শিক্ষা আইন তাঁর উপর অর্পিত হ’য়ে উ’ঠে অনেকটা। পরবর্তীতে, ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে গ্রহণ করেন আদর্শ শিক্ষা। এ-ছাড়াও শিক্ষকগণের মধ্যে নাম আসে তত্ত্ববোধনী পত্রিকা’র সুদীর্ঘ দিনের সম্পাদক অযোধ্যানাথ পাকড়াশী। যার কাছে শুধু স্বর্ণকুমারী দেবী নয়, জ্ঞানদানন্দিনীসহ ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য পুত্রবধূরা পড়তেন সংস্কৃত। বাঙলা সাহিত্যের পাঠ নিতেন হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে; আর ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন স্মৃতি’তে প্রকাশ পায় ছোটবেলা থেকেই লেখার অভ্যাস ছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর; এবং তা মাঝে-মাঝে এনে দেখাতেন ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। স্বর্ণকুমারীদেবীর লেখক পরিচিতি এবং বিষয় নির্বাচনের বিষয়টি বুঝতে হ’লে প্রথমে দরকার সেই সময়কার আর্থসামাজিক কাঠামো এবং শিক্ষাব্যবস্থা।

উনিশ শতকের বাঙলা তথা ‘নবজাগরণ’; এবং তার ব্যাপক বিস্তার যে আবদ্ধ ছিল একক কোনো কাঠামোর মধ্যে তা কিন্তু নয়। বরং তার আধুনিকতার প্রসারিতরূপ প্রবাহিত হয়েছিল অনেক বৈচিত্র্যময় পথে। উনিশ শতকের বাঙলা, তথাকথিত ‘নবজাগরণ’ এবং ‘আধুনিকতা’র বিস্তারের কাল। উপনিবেশের বিস্তার যেহেতু শুরু হয়েছিল বাঙলা থেকে; তাই ‘নবজাগরণ’ এবং ‘আধুনিকতা’ যেন বার-বার ফিরে আসছিল উনিশশতকেই। তাই এই শতকেই নির্দিষ্ট হ’য়ে যায় বাঙলার কাঠামোগত ভিত্তির দিকনির্দেশনার পথ। তাই নবজাগরণ, আধুনিকতা- এ রকম শব্দগুলি পূর্ণ মাত্রায় প্রয়োগ এবং প্রাক-ঔপনিবেশিক কালের সঙ্গে ঔপনিবেশের ভেদরেখা টেনে ভাল বা মন্দ, সভ্য বা বর্বরোচিত ইত্যাদি এসব বিপরীত অবস্থানের ব্যবহার এবং তার প্রতি অটল বিশ্বাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র হিশেবে উনিশশতকের প্রথম ভাগেই বাঙলার পরিচিত নির্দিষ্ট হ’য়ে যায়। এ-শতকের মধ্যে দিয়েই শিক্ষা ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ‘আধুনিক’ ; ‘বিজ্ঞান সম্মতি’ এবং ‘উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা’, বাঙলা ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার পথ সুগম ও পরিমিতি নির্ধারণ ক’রে দেয়। বাঙলায় আধুনিকতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারের যে বিষয়গুলি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব পেতে থাকে; তার মধ্যে হিন্দুধর্মের সংস্কার, স্ত্রীশিক্ষা এবং অন্তঃপুরে মেয়েদের অবস্থার পরিবর্তন অন্যতম ব’লে গণ্য হ’তে থাকে। রামমোহন রায়ের (১৭৭৪-১৮৩৩) সতীদাহ নিবারণের প্রচেষ্টা এবং বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১) প্রচেষ্টায় বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ, কুলীনদের বহুবিবাহ রোধ এবং স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের পক্ষে উদ্যোগ ঔপনিবেশিক বাঙলায় পারিবারিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বহুবিধ পরিবর্তন এবং দ্বন্দ্বের সূচনা করে। মনু প্রবর্তিত অনড় হিন্দু সমাজব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল গোঁড়া হিন্দুদের কাছে এই সমস্ত ক্ষেত্রে কোনো সংস্কারের কথা বিবেচনাও হিন্দুসমাজের প্রতি আক্রমণ হিশেবে চিহ্নিত হয়। শাসক পক্ষের সমর্থনে,  সতীদাহর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ যাও বা সহজ হয়েছিল, কিন্তু স্ত্রীশিক্ষা ও ব্রাহ্মসমাজে প্রবর্তিত সহবাস সম্মতি বিধির প্রশ্নে রক্ষণশীলরা প্রতিবাদমুখর হ’য়ে উ’ঠে। গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ ; ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ সহ রক্ষণশীলদের প্রতিনিধি, স্থানীয় কাগজগুলো এসব সংস্কারের প্রশ্নে সমালোচনা মুখর হ’য়ে উ’ঠে। ঔপনিবেশের পতনের সঙ্গে-সঙ্গেই  মিশনারীরা এ-দেশের মেয়েদের শিক্ষিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে কিছুটা সফল হলেও, বর্ণহিন্দুদের মধ্যে তারপরও সেই প্রচেষ্টা কিছুমাত্র সফল হয়নি। ১৮৩০-এর পরে, ঔপনিবেশিক আধুনিকতার শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের অগ্রণী অংশের প্রচেষ্টায় এবং তার পরে, ব্রাহ্মসমাজের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হ’তে থাকে। আধুনিকতা উদ্ভুত দ্রুত পরিবর্তনশীল পারিবারিক ও সামাজিক পরিকাঠামোর রদবদলের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীশিক্ষার ব্যাপারটি জড়িয়ে প’ড়ে। মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য ১৮৪৬ সালে বারানসতে প্যারীচরন সরকারের উদ্যোগে প্রথম মেয়েদের স্কুল চালু হয়। কিন্তু সেই স্কুল বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। এরপর ১৮৪৯ সালে, কলকাতায় তৈরি হয় ‘বেথুন স্কুল’। এর পরবর্তী সময়ে; সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলকাতা ও মফস্বলে বহু সংখ্যক নারী শিক্ষার বিদ্যালয় তৈরি হয়। ১৮৭০-এর সময়ের মধ্যে মেয়েদের স্কুলে যাওয়াটা বিশেষ আলোচনার বিষয় হিশেবে আর চিহ্নিত হ’তে থাকে না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়; শুধুমাত্র লিখতে-পড়তে জানা, হিশেব রাখা আর সন্তান পালনের স্বার্থে নারী শিক্ষার প্রয়োজন। এই ছিল নারী শিক্ষার পক্ষে সংস্কারদের প্রাথমিক প্রচার। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন টিকে থাকলো না; ২০-৩০ বছরের মধ্যে অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকলো। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার প্রবেশ এবং বিশেষ ক’রে চন্দ্রমুখী বসু, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের স্নাতক হওয়া এবং কাদম্বিনীর চিকিৎসায় ডিগ্রী অর্জন পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় নতুন একটা সমস্যা তৈরি করলো। নারীশিক্ষার পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রচারক ছিল যে ব্রাহ্মসমাজ, তারাও মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে বা পেশাগত শিক্ষায় ঢুকতে দিতে যথেষ্ট অপারগ ছিল।  

সমাজ সংস্কারদের অগ্রগণ্য দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), সেই ঠাকুর বাড়ি থেকে একমাত্র তার দ্বিতীয় কন্যা সৌদামিনী, যিনি স্বর্ণকুমারী দেবীর দিদি হন। ১৮৫১ সালে ‘বেথুন স্কুলে’ ছাত্রীর অভাব পূরণের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তারও পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, সেই সময়কার অন্য কোন মেয়ে আর স্কুলে যায়নি। সংস্কারদের এতো প্রচার সত্ত্বেও ২০ বছরে বেথুন স্কুলের উন্নতি তেমন কিছু হয়নি। ১৮৭১-৭২-এর কোনো এক রিপোর্টে দেখা যায়, বেথুন স্কুলের ছাত্রীর সংখ্যা কমছে এবং মেয়েরা বাঙলা ভাষাও ঠিকমতো শিখছে না।

মেয়েদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে বিবাদ-বিষাদের একটা নিষ্পত্তি করেন কেশবচন্দ্র সেন। ১৮৬৪ সালে তার অন্তঃপুরে স্ত্রীশিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ১৮৬৬ সাল থেকে এই দায়িত্ব পালন করেন ‘বামাবোধিনী সভা’। এর মধ্যে সমাজ জীবনে বিবিধ পরিবর্তনের ফলে অন্তঃপুরে স্ত্রীশিক্ষার ব্যাপারটা হিন্দু সমাজের অন্তর্গত অনেক পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে। একদিকে প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা, অন্যদিকে অন্তঃপুরের শিক্ষা-এই দু’য়ে মিলে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ক্রমাগত শিক্ষিত নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।  

বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পরে, এবং কেশবচন্দ্র সেন প্রবর্তিত ‘অন্তঃপুরের স্ত্রীশিক্ষা’ বিধিবদ্ধকরণের নয় বছর আগে স্বর্ণকুমারীর জন্ম। তৎকালীন ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর শহর কলকাতা। তৎকালীন সামাজিক কাঠামোর দিক থেকে অভিজাত পরিবারের মধ্যে অন্যতম জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। হিন্দু সমাজের পালে সংস্কারের হাওয়া লাগার শুরুতেই নীতিগতভাবে যারা সেই সংস্কারের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর সেই সংস্কারের প্রশ্নেই হিন্দু সমাজের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন দেবেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথের বাবা দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় থেকেই সামাজিক ও আর্থিক প্রতিপত্তির দিক থেকে ঠাকুর পরিবার কলকাতায় সবচেয়ে ক্ষমতাধর পরিবারগুলোর অন্যতম হিশেবে চিহ্নিত হয়। সেই পরিবারের প্রতিপত্তি বজায় থাকা অবস্থাতেই স্বর্ণকুমারী দেবীর জন্ম। যে পরিবারের চার দেয়ালের মধ্যকার ঘটনা নিয়ে  সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কোন শেষ ছিল না। সেই পরিবারের অনেক কিছুই সংস্কারদের কাছে ছিল অনুকরণীয়; আর গোঁড়া হিন্দুদের কাছে ছিল তীব্র সমালোচনার বিষয়।  

স্বর্ণকুমারীর প্রধান অবলম্বন এবং অনুপ্রেরণা ছিল দুইজন। একদিকে মেঝদাদা সত্যেন্দ্রনাথ আর অন্যদিকে স্বামী জানকীনাথ ঘোষাল। স্বর্ণকুমারীর স্মৃতিচারণে বিশেষ ক’রে সত্যেন্দ্রনাথের কথাই ফিরে আসে বার-বার। স্বর্ণকুমারীর মতে, প্রকৃত নারী স্বাধীনতার পথ ভাই’ই তাকে দেখিয়েছিলেন। সর্বোপরি, সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন সম্পূর্ণভাবে নারী স্বাধীনতার পক্ষে। এই স্বাধীনতা প্রসঙ্গে স্বর্ণকুমারীর মতামতের বিনির্মাণের মধ্যে না গিয়েও স্বীকার করতে কোন বাঁধা নেই। মূলত, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথের আনুকূল্যই আধুনিক চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে পরিচয় ঘটে স্বর্ণকুমারীর। পারিবারিক গুরুদায়িত্ব যেমন তার উপর ছিল, ঠিক তেমনি ছিল সময়ের স্রোতের ধারার মত জীবন। ১৮৮০-তে, স্বর্ণকুমারীর কনিষ্ঠ কন্যা যখন মারা যায়, তখন জীবিত সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সরলার বয়স আট বছর। পারিবারিক কাজ-কর্ম যখন কিছুটা সংক্ষিপ্ত হ’য়ে আসছিল, আর এই সুযোগেই চলতে থাকে তার লেখালেখি। তার প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ ‘ভূগর্ভ’ চার কিস্তিতে ভারতী’তে প্রকাশিত হ’তে থাকে। স্বর্ণকুমারী দেবী, ১৮৮৪ সালে দ্বিজেন্দ্রনাথের কাছ থেকে ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় কাজের ভার গ্রহণ করেন।
স্বর্ণকুমারী যখন ভারতী’র সম্পাদকীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ভারতী  হ’য়ে উঠে দ্বিতীয় মহিলা সম্পাদিত পত্রিকা; এবং প্রথম দীর্ঘস্থায়ী-বৃহদাকার এবং বহুল প্রচারিত মহিলা সম্পাদিত মাসিকপত্র। ১৮৮৪ থেকে ১৮৯৫ এবং ১৯০৮ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত, এই ১৯ বছর  স্বর্ণকুমারী ভারতীর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।      

[
১৮৮০ থেকে ১৮৮৯-এর মধ্যে তিনি রচনা করেন প্রায় ১৭টি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ। বিজ্ঞান বিষয়ে তিনি লিখেছিলেন ২৪টি প্রবন্ধ, তার থেকেও অনেক বেশি লিখেছেন ভ্রমন ও সমাজ বিষয়ক প্রবন্ধ। স্বর্ণকুমারী দেবী কবিতা লেখা শুরু করেন বিহারীলালকে অনুসরণ করে। তাঁর রচিত কাব্যের মধ্যে রয়েছে ‘গাথা’ ও ‘কবিতা ও গান’। ভারতীয়  পত্রিকার প্রয়োজন মেটাতেই গল্প-উপন্যাস-কবিতার পাশাপাশি তিনি লিখে উঠেন বিজ্ঞান বিষয়ক বিপুল প্রবন্ধ। স্বর্ণকুমারী দেবী রচিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে, ‘দীপ-নির্বাণ’, ‘ছিন্নমুকুল’, ‘মালতী’, ‘মিবাররাজ’, ‘হুগলীর ইমামবাড়ী, ‘বিদ্রোহ’, ‘ফুলের মালা’, ‘কাহাকে’, ‘বিচিত্রা’, ‘স্বপ্নবানী’, ‘মিলনরাত্রি’ ইত্যাদি। নাটক ‘নিবেদিতা’, ‘দিব্য কোমল’, প্রহসন ‘কনে বদল’, ‘পাকচক্র’, ছোটগল্প ‘নব কাহিনী’, কাব্যনাট্য ‘যুগান্ত’, ‘দেব কৌতুক’ ইত্যাদি। সাহিত্যেয় তাঁর দান বিপুল। বঙ্গমহিলাদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম সার্থক উপন্যাস, গাঁথা ও বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনা করেন।

১৮৮৬-তে, ‘সখি-সমিতি’ এবং মহিলা শিল্পমেলার পত্তন, ১৮৯০-এ, কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনের একমাত্র মহিলা প্রতিনিধি হিসেবে যোগদেন স্বর্ণকুমারী দেবী। লেখালেখির ক্ষেত্র হিসেবে বৈচিত্র্যময় বিষয়কেই তিনি বেঁছে নেন। বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ, জীবনী, ভ্রমনকাহিনি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লিখেছেন প্রচুর। তাঁর লেখা ৭০টির মতো প্রবন্ধ সে সময়কার ভারতীয় সহ সমসাময়িক বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘জাতীয়তাবাদে’ হাতে খড়ি হয় তাঁর পরিবারের অভ্যন্তর থেকেই। ১৮৬৬ সালে গগেন্দ্রনাথের উদ্যোগে গ’ড়ে ওঠা চৈত্রমেলা, এবং ১৮৬৭ সাল থেকে চালু হওয়া ‘হিন্দুমেলায়’ স্বর্ণকুমারীর অবাধ যাতায়াত ছিল। এর পরবর্তী সময়ে; জানকীনাথের ১৮৯০-এ; কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে সেখানেও যাতায়াত ছিল তাঁর। ১৮৯০-এ; কংগ্রেসের প্রতিনিধি পদপ্রাপ্তি সেটাকে আরও সামনের দিকে নিয়ে যায়। স্বর্ণকুমারী প্রাচ্যবাদীদের সঙ্গে তাল রেখে বিশ্বাস করতেন ‘সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি’ এবং ‘ইউরোপীয় সভ্যতার’ মিলন। এ-দেশে ইংরেজ শাসনের সুফল সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। ব্যক্তিগত ভাবে, বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছেন চরমপন্থা ও সশস্ত্র আন্দোলনের। ১৯১৫-তে, জানকীনাথের মৃত্যুর পর, তিনি ব্যক্তিগত ও কর্মজীবন থেকে ধীরে-ধীরে অবসর নিতে থাকেন। এর পরবর্তী সময়ে, মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে সম্পাদনার ভার ছেড়ে দেন।  

স্বর্ণকুমারীর লেখায়, এই উনিশশতকীয় জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটেছে অনেক জায়গাতেই। দেশীয় ভাষায়,  বিজ্ঞানচর্চা এবং তার জনপ্রিয়করণও উনিশশতকের ‘জাতীয়তাবাদী’ অন্যতম ছিল। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে সেদিকে লক্ষ্য না রেখে, স্বর্ণকুমারীর সমাজ বিষয়ক লেখাগুলি দেখলেই সেই সময়ে বহুকথিত জাতীয় পর্যায়ের নানা দিকের প্রকাশ সহজেই আমাদের চোখে পড়ে। তবে, এই জাতীয়তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশী যোগসূত্র দেখতে পাওয়া যায় তার ভ্রমণ বিষয়ক রচনাগুলোতে। সাড়া জীবনে প্রচুর ঘুরেছেন তিনি। আর সেই সব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার ভ্রমণ বিষয়ক লেখাগুলিতে। এই ভ্রমণ কাহিনিও, আবার অন্য ভ্রমণ বিষয়ক লেখা থেকে দেখা দেয় পৃথক হ’য়ে। নারীশিক্ষা ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থাভেদে ১৮৭০-এর দশক থেকেই মেয়েদের লেখা ভ্রমণ কাহিনি একটা স্বতন্ত্র  বিষয় হ’য়ে উ’ঠে। তার অধিকাংশই ছিল তীর্থভ্রমণ; অন্তঃপুরের বাঁধাধরার বাইরে তীর্থক্ষেত্রে ধর্মাচরণের ‘আনন্দ’তে প্রকাশিত হয়েছিল সেই লেখাগুলি। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে পৃথক হ’য়ে দেখা দেন স্বর্ণকুমারী। ধর্মীয় উদ্দেশে তিনি তীর্থ ভ্রমণ করেননি। তার সব ধরনের ভ্রমণের উদ্দেশে ছিল দেশ দেখার আগ্রহ। আর সেই লেখায় ছাপ ছিল উনিশ শতকের পরিকাঠামোর বিস্তৃতির বর্ণনা। স্বর্ণকুমারীর দু’চোখের দৃষ্টি যে সীমানা পর্যন্ত পৌঁচেছে, সেখানেই তিনি ঘটিয়েছেন ভাবনার বিস্তার। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে; এই ঘরাঘুরির ফলে তার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে সেখানকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। স্বর্ণকুমারী; ব্যক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন স্থানিক ও কালগত মাত্রার মধ্যে মানুষের অভ্যাস ও আচরণের সঙ্গতি ও অসঙ্গতির চিত্র। সর্বোপরি, সবকিছু মিলে স্বর্ণকুমারীর ভ্রমণ কাহিনীগুলো হ’য়ে উঠেছে স্বতন্ত্র ও বৈচিত্র্যময়। যার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই; জাতীয়তাবোধের চিত্র ও বৃহত্তর ভারতের একটি পৃথক স্বতন্ত্র রূপ খোঁজার একান্ত প্রয়াস।              

সবকিছুকে পিছে ফেলে, স্বর্ণকুমারীর ভাবনা ও চেতনাগত দিকটি এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। নারী শিক্ষার ভাবনায় তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। আবার কাঠামোগত সমাজ ভাবনায় তার যে চিত্র ফু’টে উঠেছে, আধুনিক নারীবাদী দৃষ্টিতে তা অতুলনীয়। সবশেষে বলা যেতে পারে; নারী স্বাধীনতা বিকাশের ক্ষেত্রে স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, যার চিত্র ফু’টে উঠেছে গভীর এক ভাবনাবোধ থেকে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...