কবিতা লেখা হয়েছে কালে কালে। অনেক সময় তা লেখা হয়েছে দলবদ্ধভাবে আবার কখনও তা একক ভাবে। যেভাবেই হোক, রচিত হয়েছে কবিতা। কবিতা হ’য়ে উঠেছে কবির মনভাবনা ও চেতনার সর্বচ্ছ প্রকাশ। একদা কবিতা হ’য়ে উঠে, কবির সহযোগী। সকাল, বিকাল, সন্ধা আর বিনিদ্র রজনী এক হ’য়ে আসে কবির কাছে ; তাঁর কবিতার মতো, যেখান থেকে রচিত হ’বে একটি উৎকৃষ্ট কবিতা। কবি, কতটা নিজস্ব ক’রে নিয়েছেন কবিতাকে ? অন্য সব কিছুর মতো তিনি কি প্রস্তুত একটি অপার সু-সজ্জিত কবিতার জন্য ? যে কবিতা তাঁর হ’য়ে আসবে; তাঁরই হৃদয়ে। তিনি কি অপেক্ষা করে আছেন একটি কবিতার জন্য, যা দেখা দিতে পারে যেকোন মুহূর্তে ! কবিতা কতটা কবিতা হ’য়ে উঠেছে তা কে স্থির ক’রে দিবেন ? না , কবি যা রচনা করবেন তা-ই কবিতা হ’য়ে দেখা দিবে মানসচিত্রে ! একক; অভিভাবক শূন্য কবি হ’য়ে উঠেন কবিতার আপনপিতা। তিনি-ই কবিতাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান জ্যোতির্ময় গন্তব্যর দিকে, যেখানে কবিতা রূপান্তরিত হয় কবিতায়, অন্য কিছুতে নয়। আলো যে ভাবে দেখা দেয় আলো হ’য়ে, তদ্রুপ কবিতা ও দেখা দেয় কবিতা হ’য়ে। আলো যেভাবে দূর ক’রে অন্ধকারকে, অকবিতা কে সরিয়ে কবিতাই জাগ্রত হোক কবিতা হ’য়ে।
`
কবিদের কবিতা রচনায় একটি দিক খুব স্পষ্ট হ’য়ে উঠে, আর তা হ’লো তাঁরা যখনই কবিতা রচনা করেছেন; শিরোনাম হিশেবে বেছে নিয়েছেন ‘কবি’ নামটি। এ শিরোনামে কবিতা লিখেননি এ-রকম কবির সংখ্যা খুবই কম।
জীবনানন্দ দাস যখন বলেনঃ
‘আমি কবি,- সেই কবি,-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আনমনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙ্গুল- মেঘের পানে!
মৌন নীলের ইশারায় কোন কামনা জাগিছে প্রানে!’
[ঝরা পালকঃ ১৩৩৪(১৯২৭); ‘আমি কবি,-সেই কবি’]
কিংবা আবার যখন বলেনঃ
‘ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন
আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপন!
নিরালায় সুর সাধি,- বাঁধি মোর মানসীর বেণী,
মানুষ দেখিনি মোরে কনদিন,-আমারে চেনেনি!’
[ঝরা পালকঃ ১৩৩৪(১৯২৭); ‘কবি’]
জীবনানন্দ দাস ‘অগ্রন্থিত কবিতায়’’ লিখেন “কবি” শিরোনামে আরও একটি কবিতাঃ
‘কবিকে দেখে এলাম
দেখে এলাম কবিকে
আনন্দের কবিতা একাদিক্রমে লিখে চলেছে
তবুও পয়সা রোজগার করবার দরকার আছে তার
কেউ উইল ক’রে কিছু রেখে যায়নি।‘
তাহ’লে কি কবি ও বাঁচতে চান অন্যদের মতো ক’রে ? যারা সমাজ,রাষ্ট্র আর সভ্যতায় বেঁচে আছেন মানুষ বলে ! তাঁরা মানুষ, কিন্তু কবি ব‘লে পরিচিত নয়। মানুষের মাঝে কবিদের বসবাস, যারা আছেন তাঁদের মতো ক’রে, কবি হ’য়ে। মানুষ থেকে হ’য়ে পড়লেন এক অজানা মানুষে, যাদের কবি ছাড়া অন্য কিছু আখ্য্য িয়ত করা যায় না।
সুধীদ্রনাথ; কবিতা লিখেছেন শতকের ও কিছু বেশি। তাঁর-ও রয়েছে ‘কবি’ শিরনামের চমৎকার একটি কবিতা।‘কবি’ শিরনামের কবিতা রচনা কি কবির একপ্রকার দায়বদ্ধতা না তাঁর ভালো লাগার প্রকাশ, আমার তা জানা নেই। কবিতাটা আমি একটু পড়তে চাইঃ
‘কেন আমি কাব্য লিখি, জানতে চাহো সেই কথাটাই
অত কিছু বলা–কওয়ার আজকে, সখা, সময় যে নাই।
তবু যদি নেহাৎ শুধায়, এইটুকু নয় ব’লে রাখিঃ
জীবনে যে কাব্য লেখে , জীবন তারে দিল ফাঁকি।‘
[তন্বীঃ ১৩৩৭; ‘কবি’’]
ফিরে আসা যাক সুধীদ্রনাথের শেষ পংত্তিটিতে; যেখানে তিনি প্রকাশ করেন ‘জীবনে যে কাব্য লেখে, জীবন তারে দিল ফাঁকি’। তাহ’লে কি সম্পর্ক রয়েছে জীবন আর কবিতার মাঝে ? কাব্য লিখে যদি জীবন নিরথর্ক হ’য়ে উঠে তাহ’লে কবি কেন বেছে নেন কবিতা নামক ওই পংত্তিগুলোকে ? তিনি কি অবগত নন জীবন আর কবিতা সম্পর্কদ্বয়ের ?জীবনটাকে ফাঁকি দিতে পারে যে কেউ, যে কোনো ভাবে; আর সেটাই যদি হয় তাহ’লে সব দোষ কেন কবিতার উপর বর্তাবে ! নিরথর্ক জীবন নিরথর্কতাঁর জন্য দায়ী,কবিতা তাঁর উপলক্ষ মাত্র । যে কেউ, যে কারো জীবন, যে কোনো ভাবে বিষাক্ত ক’রে তুলতে পারে, কবিতা তাঁর জন্য দায়ী নয়। জীবনকে ফাঁকি দিয়ে কোনো কাব্য যদি রচিত হয়, তাহ’লে কি থাকে সেই কাব্যয়ে ? জীবন বহির্ভূত কাব্য কতটা প্রয়োজন হ’য়ে প’রে জীবনের জন্য ? কাব্যর সাথে জীবনের যদি কোনো সংমিশ্রণ না থাকে তাহ’লে সেটা কি কবিতা হবে ? কতটুকু প্রাধান্য পাবে তা মানুষ বা কবিতার কাছে ? আর সেটা যদি না-ই হয় , তাহ’লে কবিরা কেনো রচনা করবেন কবিতা ! কবিতাকে হ’য়ে উঠতে হ’বে কবিতা রূপে, অন্য কিছু নয়। জীবনের অন্য নাম অন্য কিছু না হ’য়ে যদি কবিতা হয়, তাহ’লে কবিতাই সেখানে স্তব গাবে তাঁর হ’য়ে। জীবনকে বাদ দিয়ে কবিতা কখনও কবিতা হবে না, হ’তে পারে অন্য কিছু, কিন্তু কবিত নয়। কবিতাকে, কবিতা হ’তে হ’লে তার সাথে জীবনের থাকতে হবে নিবিড় সম্পর্ক, যে সম্পর্ক অটুট থাকবে কাল থেকে কালান্তর পর্যন্ত। কবিতায় জীবন কিভাবে আসবে তা আমাদের ভাবার বিষয় নয়, তা কবিই নির্ধারণ ক’রে নিবেন। তিনি কিভাবে জীবনকে উপাস্থাপন করবেন কবিতার মাঝে, থেমে থেমে নয়, নিবিড় ভাবে।
রবীন্দ্রনাথ, কবি ও কবিতা নিয়ে লিখেছেন প্রচুর। তাঁর ব্যাপক-বিস্তৃত এ-সম্পর্কে লেখাগুলো রয়েছে কবিতা ও প্রবন্ধগুলোতে। তাঁর মতো ক’রে এ-সম্পর্কে এতো পরিমাণ লেখা কেউ লিখেছেন কি-না আমার জানা নেই। কবি ও কবিতা নিয়ে লিখেছেন বিরামহীন ভাবে; কখনও তা-কবিতায় আবার কখন তা সাহিত্যর নানা স্থানে, রয়েছে উজ্জ্বল হ’য়ে।
রবীন্দ্রনাথ, তাঁর কবিতায় “কবি “সম্পর্কে যখন বলেনঃ
‘কবি, তবে উঠে এসো- যদি থাকে প্রাণ
তবে তাই লহো সাথে, তবে তাই করো আজি দান।
বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা- সম্মুখেতে কষ্টের সংসার
বড়োই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ, অন্ধকার।
অন্য চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,
চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু,
সাহসবিস্তৃত বক্ষপট। এ দৈন্য মাঝারে, কবি,
একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি।‘
[চিত্রাঃ ১৩০২ ‘এবার ফিরাও মোরে ]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন