সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কবি ও কবিতা-৩

 

কবিতা লেখা হয়েছে কালে কালে। অনেক সময় তা লেখা হয়েছে দলবদ্ধভাবে আবার কখনও তা একক ভাবে। যেভাবেই হোক, রচিত  হয়েছে কবিতা। কবিতা হ’য়ে উঠেছে কবির মনভাবনা ও চেতনার  সর্বচ্ছ  প্রকাশ। একদা কবিতা হ’য়ে উঠে, কবির  সহযোগী। সকাল, বিকাল, সন্ধা আর বিনিদ্র রজনী এক হ’য়ে আসে কবির কাছে ; তাঁর কবিতার মতো, যেখান থেকে রচিত হ’বে একটি উৎকৃষ্ট কবিতা। কবি, কতটা নিজস্ব ক’রে  নিয়েছেন কবিতাকে ? অন্য সব কিছুর মতো তিনি কি প্রস্তুত একটি অপার সু-সজ্জিত কবিতার জন্য ? যে কবিতা তাঁর হ’য়ে আসবে; তাঁরই হৃদয়ে। তিনি কি অপেক্ষা করে আছেন একটি কবিতার জন্য, যা দেখা দিতে পারে যেকোন মুহূর্তে ! কবিতা কতটা কবিতা হ’য়ে উঠেছে তা কে স্থির ক’রে দিবেন ? না , কবি যা রচনা করবেন তা-ই কবিতা হ’য়ে দেখা দিবে মানসচিত্রে ! একক; অভিভাবক শূন্য কবি হ’য়ে উঠেন কবিতার আপনপিতা। তিনি-ই কবিতাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান জ্যোতির্ময় গন্তব্যর দিকে, যেখানে কবিতা রূপান্তরিত হয় কবিতায়, অন্য কিছুতে নয়। আলো যে ভাবে দেখা দেয় আলো হ’য়ে, তদ্রুপ কবিতা ও দেখা দেয় কবিতা হ’য়ে। আলো যেভাবে দূর ক’রে অন্ধকারকে, অকবিতা কে সরিয়ে কবিতাই জাগ্রত হোক কবিতা হ’য়ে।
`
কবিদের কবিতা রচনায় একটি দিক খুব স্পষ্ট হ’য়ে উঠে, আর তা হ’লো তাঁরা যখনই কবিতা রচনা করেছেন; শিরোনাম হিশেবে বেছে নিয়েছেন ‘কবি’ নামটি। এ শিরোনামে কবিতা লিখেননি এ-রকম কবির সংখ্যা খুবই কম।
জীবনানন্দ দাস যখন বলেনঃ
‘আমি কবি,- সেই কবি,-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আনমনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙ্গুল- মেঘের পানে!
মৌন নীলের ইশারায় কোন কামনা জাগিছে প্রানে!’
                             [ঝরা পালকঃ ১৩৩৪(১৯২৭); ‘আমি কবি,-সেই কবি’]
কিংবা আবার যখন বলেনঃ  
                
                  ‘ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন
                   আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপন!
                   নিরালায় সুর সাধি,- বাঁধি মোর মানসীর বেণী,
                   মানুষ দেখিনি মোরে কনদিন,-আমারে চেনেনি!’

                                            [ঝরা পালকঃ ১৩৩৪(১৯২৭); ‘কবি’]
জীবনানন্দ দাস ‘অগ্রন্থিত কবিতায়’’ লিখেন “কবি” শিরোনামে আরও একটি কবিতাঃ
              
                  ‘কবিকে দেখে এলাম
                  দেখে এলাম কবিকে
                  আনন্দের কবিতা একাদিক্রমে লিখে চলেছে
                  তবুও পয়সা  রোজগার করবার দরকার আছে তার
                  কেউ উইল ক’রে কিছু রেখে যায়নি।‘

তাহ’লে কি কবি ও বাঁচতে চান অন্যদের মতো ক’রে ? যারা সমাজ,রাষ্ট্র আর সভ্যতায় বেঁচে আছেন মানুষ বলে ! তাঁরা মানুষ, কিন্তু কবি ব‘লে পরিচিত নয়। মানুষের মাঝে কবিদের বসবাস, যারা আছেন তাঁদের মতো ক’রে, কবি হ’য়ে। মানুষ থেকে হ’য়ে পড়লেন এক অজানা মানুষে, যাদের কবি ছাড়া অন্য কিছু আখ্য্য িয়ত করা যায় না।
সুধীদ্রনাথ; কবিতা লিখেছেন শতকের ও কিছু বেশি। তাঁর-ও রয়েছে ‘কবি’ শিরনামের চমৎকার একটি কবিতা।‘কবি’ শিরনামের কবিতা রচনা কি কবির একপ্রকার দায়বদ্ধতা  না তাঁর ভালো লাগার প্রকাশ, আমার তা জানা নেই। কবিতাটা আমি একটু পড়তে চাইঃ
              
                 ‘কেন আমি কাব্য লিখি, জানতে চাহো  সেই কথাটাই
                  অত কিছু বলা–কওয়ার  আজকে, সখা, সময় যে নাই।
                  তবু যদি নেহাৎ শুধায়, এইটুকু নয় ব’লে রাখিঃ    
                  জীবনে যে কাব্য লেখে , জীবন তারে দিল ফাঁকি।‘  
                                                               [তন্বীঃ ১৩৩৭; ‘কবি’’]

ফিরে আসা যাক সুধীদ্রনাথের শেষ পংত্তিটিতে; যেখানে তিনি প্রকাশ করেন ‘জীবনে যে কাব্য লেখে, জীবন তারে দিল    ফাঁকি’। তাহ’লে কি সম্পর্ক রয়েছে জীবন আর কবিতার মাঝে ? কাব্য লিখে যদি জীবন নিরথর্ক হ’য়ে উঠে তাহ’লে কবি কেন বেছে নেন কবিতা নামক ওই  পংত্তিগুলোকে ? তিনি কি অবগত নন জীবন আর কবিতা সম্পর্কদ্বয়ের ?জীবনটাকে ফাঁকি দিতে পারে যে কেউ, যে কোনো ভাবে;  আর সেটাই যদি হয় তাহ’লে সব দোষ কেন কবিতার উপর বর্তাবে ! নিরথর্ক জীবন নিরথর্কতাঁর জন্য দায়ী,কবিতা তাঁর উপলক্ষ মাত্র । যে কেউ, যে কারো জীবন, যে কোনো ভাবে বিষাক্ত ক’রে তুলতে পারে, কবিতা তাঁর জন্য দায়ী নয়। জীবনকে ফাঁকি দিয়ে কোনো কাব্য যদি রচিত হয়, তাহ’লে কি থাকে সেই কাব্যয়ে ? জীবন বহির্ভূত কাব্য কতটা প্রয়োজন হ’য়ে প’রে জীবনের জন্য ? কাব্যর সাথে জীবনের যদি কোনো সংমিশ্রণ  না থাকে তাহ’লে সেটা কি কবিতা হবে ? কতটুকু প্রাধান্য পাবে তা মানুষ বা কবিতার কাছে ? আর সেটা যদি না-ই হয় , তাহ’লে কবিরা কেনো রচনা করবেন কবিতা ! কবিতাকে হ’য়ে উঠতে হ’বে কবিতা রূপে, অন্য কিছু নয়। জীবনের অন্য নাম অন্য কিছু না হ’য়ে যদি কবিতা হয়, তাহ’লে কবিতাই সেখানে স্তব গাবে তাঁর হ’য়ে। জীবনকে বাদ দিয়ে কবিতা কখনও কবিতা হবে না, হ’তে পারে অন্য কিছু, কিন্তু কবিত নয়। কবিতাকে, কবিতা হ’তে হ’লে তার সাথে জীবনের থাকতে হবে নিবিড় সম্পর্ক, যে সম্পর্ক অটুট থাকবে কাল থেকে কালান্তর পর্যন্ত। কবিতায় জীবন কিভাবে আসবে তা আমাদের ভাবার বিষয় নয়, তা কবিই নির্ধারণ ক’রে নিবেন। তিনি কিভাবে জীবনকে উপাস্থাপন করবেন কবিতার মাঝে,  থেমে থেমে নয়, নিবিড় ভাবে।  
  রবীন্দ্রনাথ, কবি ও কবিতা নিয়ে লিখেছেন প্রচুর। তাঁর ব্যাপক-বিস্তৃত এ-সম্পর্কে লেখাগুলো রয়েছে কবিতা ও প্রবন্ধগুলোতে। তাঁর মতো ক’রে এ-সম্পর্কে এতো পরিমাণ লেখা কেউ লিখেছেন কি-না আমার জানা নেই। কবি ও কবিতা নিয়ে লিখেছেন বিরামহীন ভাবে; কখনও তা-কবিতায় আবার কখন তা সাহিত্যর নানা স্থানে, রয়েছে উজ্জ্বল হ’য়ে।    
রবীন্দ্রনাথ, তাঁর কবিতায় “কবি “সম্পর্কে যখন বলেনঃ
            
            
             ‘কবি, তবে উঠে এসো- যদি থাকে প্রাণ
              তবে তাই লহো সাথে, তবে তাই করো আজি দান।
              বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা- সম্মুখেতে কষ্টের সংসার  
              বড়োই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ, অন্ধকার।
              অন্য চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,
              চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল  পরমায়ু,
              সাহসবিস্তৃত বক্ষপট। এ দৈন্য মাঝারে, কবি,
              একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি।‘  
                          
                                                      [চিত্রাঃ ১৩০২ ‘এবার ফিরাও মোরে ]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...