সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কফির পেয়ালায় বিষাদ ও বৃষ্টির অরাজকতা


কফির পেয়ালায় চুমুক দিতেই বৃষ্টি ঝরল, তবে এ কোনো স্নিগ্ধ শ্রাবণ নয়,

এ হলো আকাশের নীল বিষণ্ণতা থেকে ঝরে পড়া এক গন্ধরাজ;  

যা ধুয়ে দিতে চায় আমাদের এই মেকআপ করা নাগরিক মুখের যাবতীয় কৃত্রিম হাসি

আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো নক্ষত্র খুঁজিনি,

খুঁজেছি এক অন্ধকার নর্দমার গভীরতা ও তার পথ

যেখানে ডুবে আছে আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট সব বীভৎস আকাঙ্ক্ষা

এই বৃষ্টি যখন কংক্রিটের দেয়ালে কামের মতো আছড়ে পড়ছে,

তখন আমার কফির ধোঁয়া হয়ে ওঠে এক একটি নিষিদ্ধ ইশতেহার;

যা অস্বীকার করে তোমার ওই সুগন্ধী শরীর আর পবিত্রতার ভণ্ডামিকে

আমি চেয়েছি এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা এক একটি কুঠার হয়ে

আমাদের মাথার খুলি চিরে ফেলুক, যাতে বেরিয়ে আসে সেইসব আদিম অন্ধকার,

যা আমরা লুকিয়ে রাখি ইস্ত্রি করা সাদা পোশাকের ভাঁজে

প্রেম তো আসলে এক ধরণের ধীরগতির ঝড় হাওয়া;  

যেখানে চুম্বনের চেয়ে দংশন বেশি সত্য আর স্পর্শের চেয়ে ঘর্ষণ বেশি তীব্র

তুমি চেয়েছিলে এক পেয়ালা গরম কফি আর কিছু নিরাপদ ছোঁয়া

অথচ আমি দিতে চেয়েছিলাম এক মুঠো স্বপ্ন

যা দিতে পারে এই শহরের সমস্ত তীব্র রাজনীতি আর জ্যামিতিক শৃঙ্খলাকে

বৃষ্টির শব্দে যখন চারপাশ মূর্ছিত, তখন আমার জিভ খুঁজে

ফেরে তোমার গ্রীবায় লুকানো সেই তীব্র আকর্ষণ,

যা কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র কখনও পবিত্র করতে পারেনি

আমি তোমার গভীরে এক সৌন্দর্যের জন্ম দিতে চাই,

যা বড় হয়ে ডালপালা মেলবে এই পচা সমাজের প্রতিটি দেয়ালে

ধিক্কার দিই তোমার ওই জানালার কাঁচকে,

যা তোমাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচায়; আমি চাই তুমি ভিজে নগ্ন হও,

শরীরের নগ্নতা নয়, বরং আত্মার সমস্ত সংস্কার উপড়ে ফেলা সেই ভয়ঙ্কর নগ্নতা;

আমাদের এই কফি-বিলাস আসলে এক ধরণের ল্যাভেন্ডার মাখানো মৃত্যু,

যেখানে আমরা প্রতিদিন নিজেদের দ্রোহকে চিনি মিশিয়ে গিলে ফেলি

আমি চাই এই বৃষ্টি না থামুক, যতক্ষণ না এই  শহর এক বিশাল নষ্ট নর্দমায় পরিণত হয়

যেখানে কেবল জেগে থাকবে আমাদের দুই জোড়া অস্থির মাংসপিণ্ডের চূড়ান্ত অরাজকতা

তুমি যখন কফির শেষ চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকাবে,

তখন দেখবে আমার চোখে কোনো ভালোবাসা নেই;

আছে কেবল এক অবিনাশী ধ্বংসের হাতছানি, যার প্রথম শিকার তুমি

বিদায় হে আমার ব্যক্তিগত বধ্যভূমি!

তুমি ভালো থেকো তোমার ওই সুসজ্জিত ড্রয়িংরুম আর বৃষ্টির সৌন্দর্য নিয়ে

আমি চললাম সেই ঝড়ের অভিমুখে,

যেখানে কবিতা মানেই হলো এক একটা ধারালো ছুরিকা,

যা বিদীর্ণ করে দেয় প্রতিটি সাজানো প্রজ্বলিত আলো  

মনে রেখো, চরম প্রেম আর চরম ঘৃণা দুটোরই শেষ গন্তব্য হলো

এই বৃষ্টির মতো এক নাছোড়বান্দা ও বিধ্বংসী নীরব নিঃসঙ্গতা

ভাল থেক কফির পেয়ালায় চুমুক দেওয়া আমার প্রিয়তমা। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...