ফরাসি সাহিত্যের দিগন্ত এতটাই বিস্তৃত যে, এর প্রতিটি পর্যায় একেকটি মহাকাব্যিক আখ্যানের দাবি রাখে এবং আপনি যখন কোনো নির্দিষ্ট ছেদ বা অনুচ্ছেদ ছাড়া এর গভীরে প্রবেশ করতে চান তখন আমাদের যাত্রা শুরু করতে হয় সেই আদি লগ্ন থেকে; যেখানে লাতিন ভাষার ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন বিদ্রোহী ভাষা, যা দশম শতাব্দীতে 'কাস্টিলিওন' বা 'প্রোভেনসাল' ঢঙে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করেছিল এবং সেই আদি যুগের 'শাংসঁ দ্য জেস্ত' বা বীরত্বগাথাগুলো ছিল মূলত মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনী, যা চারণ কবিরা প্রাসাদে প্রাসাদে গেয়ে বেড়াতেন, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ 'দ্য সং অফ রোল্যান্ড' যেখানে দেশপ্রেম ও বীরত্বের এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায় এবং দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যখন নাইটদের শৌর্যবীর্য এবং অভিজাত নারীদের প্রতি তাদের নিবেদিত প্রেমের কাহিনীগুলো 'কোর্টলি লাভ' হিসেবে জনপ্রিয় হ’তে শুরু করল তখন থেকেই ফরাসি সাহিত্যে রোমান্টিকতার বীজ রোপিত হয়েছিল যা পরবর্তীতে ত্রেতিয়ঁ দ্য ত্রোয়া-র হাত ধ’রে আর্থারীয় কিংবদন্তিগুলোকে এক নতুন রূপ দান ক’রে এবং মধ্যযুগের শেষভাগে যখন সমাজ ও ধর্মের গোঁড়ামি বাড়তে শুরু করল তখন ফ্রঁসোয়া ভিয়ঁ-র মতো বোহেমিয়ান কবিরা তাদের কবিতার মাধ্যমে জীবনের নশ্বরতা ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা বলতে শুরু করলেন। যা ছিল রেনেসাঁ বা নবজাগরণের এক অঘোষিত পূর্বাভাস এবং ষোড়শ শতাব্দীতে যখন রেনেসাঁর আলো ফ্রান্সে এসে পৌঁছাল; তখন ফরাসি সাহিত্য তার আভিজাত্য ও আড়ম্বর ছেড়ে সরাসরি মানুষের যুক্তিবোধের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করল, যেখানে ফ্রঁসোয়া রাবলে তার বিশালদেহী চরিত্র গার্গান্তুয়া ও পান্তাগ্রুয়েলের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে উপহাস করলেন এবং মিশেল দ্য মঁতেন তার নির্জন স্টাডিতে বসে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো 'প্রবন্ধ' বা 'এসে' নামক এক নতুন ধারার সূচনা করলেন; যেখানে কোনো পরম সত্য নয় বরং নিজের অভিজ্ঞতাই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়; এবং ঠিক এই সময়েই পিয়ের দ্য রঁসার ও তার 'প্লেয়াদ' গোষ্ঠী ফরাসি ভাষাকে গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যের সমকক্ষ করার নেশায় মেতে উঠেছিলেন, যা পরবর্তী শতাব্দীর ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী যুগের ভিত গ’ড়ে দিয়েছিল এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন কার্ডিনাল রিশলু 'ফরাসি একাডেমি' প্রতিষ্ঠা করলেন । তখন ফরাসি সাহিত্য এক সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হলো যেখানে নাট্যকার কর্নিল তার 'ল্য সিদ' নাটকের মাধ্যমে প্রেম ও সম্মানের চিরায়ত দ্বন্দ্ব তু’লে ধরলেন এবং জঁ রাসিন তার ট্র্যাজেডিতে মানুষের অবদমিত কামনাবাসনার এক নিপুণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলেন, অথচ এই সব গম্ভীর আলোচনার ভিড়েও মলিয়ের তার ক্ষুরধার হাস্যরসের মাধ্যমে 'তার্তুফ' বা 'দ্য মিসানথ্রোপ' নাটকে তৎকালীন ধর্মীয় ভণ্ডামি ও সামাজিক সংকীর্ণতাকে জনসমক্ষে উলঙ্গ ক’রে ছাড়লেন যা আজও বিশ্বনাট্যসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্টের যুগ শুরু হলো তখন ফরাসি সাহিত্য হ’য়ে উঠল বিপ্লবের হাতিয়ার, যেখানে ভলতেয়ার তার তীক্ষ্ণ কলম দিয়ে গির্জা ও রাজতন্ত্রের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন এবং রুশো তার 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' গ্রন্থের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতার যে ইশতেহার ঘোষণা করলেন তা কেবল ফ্রান্স নয়, বরং আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়াল, এবং এই যুগেই ডিডরো তার বিশাল এনসাইক্লোপিডিয়া সম্পাদনার মাধ্যমে মধ্যযুগীয় অন্ধকার দূর করে সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানের আলো পৌঁছে দিলেন এবং যখন উনবিংশ শতাব্দী এল তখন ফরাসি সাহিত্য তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাল। যেখানে ভিক্টর হুগোর মতো মহীরুহ তার 'লে মিজারেবল' উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজের পঙ্কিলতা ও মানবতার জয়গান গেয়ে সারা বিশ্বকে কাঁদালেন এবং রোমান্টিকতার সেই উত্তাল জোয়ারের বিপরীতে অনোরে দ্য বালজাক তার 'লা কমেডি হুমাইন' বা মানবীয় কমেডির মাধ্যমে হাজার হাজার চরিত্রের এক বিশাল জগৎ তৈরি করলেন, যা বাস্তববাদ বা রিয়ালিজম-এর চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর পরপরই গুস্তাভ ফ্লবেয়ার তার 'মাদাম বোভারি' উপন্যাসের মাধ্যমে প্রতিটি শব্দের নিখুঁত ব্যবহারের যে পরাকাষ্ঠা দেখালেন তা আধুনিক উপন্যাসের ব্যাকরণকেই চিরতরে বদলে দিল এবং যখন শার্ল বোদলেয়ার তার 'লে ফ্ল্যর দ্যু মাল' বা পাপের ফুল কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন তখন থেকে শুরু হলো আধুনিকতার এক নতুন পথ চলা যেখানে কবিতার শরীর থেকে নীতিবাক্যের পোশাক খুলে ফেলে জীবনের কুৎসিত ও অন্ধকার দিকগুলোকেও শৈল্পিক রূপ দেওয়া হলো, এবং এই ধারাবাহিকতায় আর্তুর র্যাবো ও পল ভেরলেনের প্রতীকিবাদ পৃথিবীকে এক মায়াবী জগতের সন্ধান দিল এবং বিংশ শতাব্দীতে এসে ফরাসি সাহিত্য আরও জটিল ও দার্শনিক হ’য়ে উঠল, যেখানে মার্সেল প্রুস্ত তার বিশাল উপন্যাসের মাধ্যমে মানুষের চেতনার প্রবহমানতা ও স্মৃতির গভীরতাকে স্পর্শ করলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা যখন মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলল। তখন জঁ-পল সার্ত্র ও আলবেয়ার কামু তাদের অস্তিত্ববাদ বা একজিসটেনশিয়ালিজম দর্শনের মাধ্যমে মানুষকে বোঝালেন যে ঈশ্বরহীন এই পৃথিবীতে মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যের বিধাতা এবং কামুর 'দ্য প্লেগ' বা সার্ত্রের 'নো এক্সিট' নাটকগুলো মানুষের সেই নিঃসঙ্গতা ও দায়িত্ববোধের কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয় এবং এই একই সময়ে স্যামুয়েল বেকেটের 'ওয়েটিং ফর গোডো' নাটকের মাধ্যমে অ্যাবসার্ডিটি বা অসংলগ্নতার যে প্রকাশ ঘটল তা থিয়েটারের প্রচলিত সংজ্ঞা বদলে দিল, এবং পরবর্তীকালে ফরাসি নোভেল রোমান বা নতুন উপন্যাসের প্রবক্তারা কাহিনীর রৈখিকতা ভেঙে চুরমার করে দিলেন যেখানে নাথালি সারোত বা মার্গারেট দুরাসদের মতো লেখিকারা নারীর মনস্তত্ত্ব ও সমাজের সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলো নিয়ে খেলা শুরু করলেন, এবং আজও ফরাসি সাহিত্য তার সেই বৈপ্লবিক ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে যেখানে সমকালীন লেখকরা উত্তর-ঔপনিবেশিকতা, অভিবাসন এবং বিশ্বায়নের যুগে মানুষের সংকটের কথা তু’লে ধরছেন এবং এভাবেই ফরাসি সাহিত্য বিগত এক হাজার বছর ধরে বিশ্বসাহিত্যের কম্পাস হিসেবে কাজ করছে যা প্রতিটি যুগে নিজেকে ভেঙে নতুন ক’রে গড়েছে এবং মানুষকে শিখিয়েছে কীভাবে সীমাবদ্ধতার মাঝেও অসীমকে কল্পনা করা যায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন