ফরাসি সাহিত্য, কেবল একটি ভাষার প্রকাশ নয় বরং এটি বিশ্ব সভ্যতার চিন্তা
ও দর্শনের এক জীবন্ত ইতিহাস। যা মধ্যযুগের বীরত্বগাথা থেকে শুরু ক’রে আজকের উত্তর-আধুনিক
কাল পর্যন্ত তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। এবং ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের এই যাত্রা শুরু
হয়েছিল মূলত লাতিন ভাষার বিবর্তনের মাধ্যমে; যেখানে ওল্ড ফ্রেঞ্চ বা প্রাচীন ফরাসি
ভাষায় লেখা প্রথম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে আমরা পাই ‘স্ট্রাসবার্গ ওথস’, এবং পরবর্তীতে
একাদশ শতাব্দীতে রচিত বীরত্বব্যঞ্জক কবিতা ‘লা শানসঁ দ্য রোলঁ’ যা শার্লেমেনের বীরত্বের
কাহিনী বর্ণনা ক’রে, এবং এই সময়কালে বীরত্বের পাশাপাশি ‘কোর্টলি লাভ’ বা সভাসদীয় প্রেমের
ধারণা নিয়ে রচিত হ’তে থাকে অসংখ্য রোম্যান্স যা মূলত নাইটদের বীরত্ব ও ত্যাগের গল্প
শোনাত। এবং এরপর ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে জঁ দ্য মেন-এর ‘রোমান দ্য লা রোজ’ এর
মতো রূপক ধর্মী সাহিত্য মধ্যযুগীয় ফরাসি সমাজ ও দর্শনের দর্পণ হ’য়ে ওঠে। তবে ফরাসি
সাহিত্যের প্রকৃত আধুনিক ভিত্তি স্থাপিত হয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময়কালে; যখন ষোড়শ
শতাব্দীতে মানবতাবাদীদের আবির্ভাব ঘটে এবং ফ্রঁসোয়া রাবলে তার ‘গার্গান্তুয়া ও পান্তাগ্রুয়েল’
উপন্যাসের মাধ্যমে প্রচলিত শিক্ষা ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে ব্যঙ্গ করেন, ঠিক একই সময়ে মিশেল
দ্য মঁতেন তার ‘এসেইস’ বা প্রবন্ধের মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষের আত্মানুসন্ধানের এক নতুন
ধারা প্রবর্তন করেন। যা আধুনিক প্রবন্ধ সাহিত্যের জনক হিসেবে তাকে বিশ্বস্বীকৃতি দেয়,
এবং ষোড়শ শতাব্দীর এই কাব্যিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয় ‘প্লেয়াদ’ গোষ্ঠীর কবিরা, বিশেষ ক’রে পিয়ের দ্য রঁসার যার প্রেমের কবিতা আজও
ফরাসি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এরপর সপ্তদশ শতাব্দীতে ফরাসি সাহিত্য প্রবেশ করে তার
‘ধ্রুপদী যুগ’ বা ক্লাসিক্যাল পিরিয়ডে, যখন রাজা চতুর্দশ লুই-এর পৃষ্ঠপোষকতায় ফরাসি
একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং ভাষার শুদ্ধতা ও সাহিত্যের নিয়মনীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত
হ’তে থাকে, এই সময়কালেই আবির্ভূত হন বিশ্বখ্যাত নাট্যকার মলিয়ের, যিনি তার ‘তার্তুফ’ বা ‘দ্য মাইজার’-এর মতো প্রহসনের
মাধ্যমে সমাজের ভণ্ডামি ও সংকীর্ণতাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করেন। এবং ঠিক বিপরীত দিকে
জঁ রাসিন ও পিয়ের কর্নিল তাদের ট্র্যাজেডি নাটকে মানুষের আবেগ ও কর্তব্যের দ্বন্দ্বকে
এক উচ্চতর শৈল্পিক মানে নিয়ে যান, যা ফরাসি নাট্যসাহিত্যকে গ্রিক ট্র্যাজেডির সমকক্ষ
ক’রে তোলে, এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি সাহিত্য হ’য়ে ওঠে যুক্তি ও আলোকায়নের হাতিয়ার
যেখানে ভলতেয়ার তার তীক্ষ্ণ লেখনীর মাধ্যমে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে
রুখে দাঁড়ান; এবং জঁ-জাক রুশো তার ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ ও ‘এমিল’-এর মাধ্যমে আধুনিক
রাষ্ট্রদর্শন ও শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা প্রদান করেন; যা ফরাসি বিপ্লবের প্রধান বৌদ্ধিক
অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ ক’রে। এই একই সময়ে দ্যনি দিদরো সম্পাদনা করেন সুবিশাল ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’
যা তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাণ্ডারকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে
ফরাসি সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়, যার শুরুতে রোমান্টিক আন্দোলনের পুরোধা ভিক্টর
হুগো তার ‘লে মিজারেবল’ ও ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নটর ডেম’ উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত
মানুষের আর্তনাদ তু’লে ধরেন। এবং পরবর্তীতে এই রোমান্টিকতা থেকে বের হ’য়ে আসার প্রচেষ্টায়
অনোরে দ্য বালজাক তার ‘দ্য হিউম্যান কমেডি’ সিরিজের মাধ্যমে ফরাসি সমাজের প্রতিটি স্তরের
নিখুঁত চিত্রায়ন করেন, যাকে বাস্তববাদ বা রিয়ালিজম-এর
ভিত্তি বলা হয়; এবং এর রেশ ধরে গুস্তাভ ফ্লবেয়ার তার ‘মাদাম বোভারি’ উপন্যাসের মাধ্যমে
শৈল্পিক নিখুঁততা ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক চরম শিখরে পৌঁছান; যা আধুনিক উপন্যাসের
ব্যাকরণ বদলে দেয় এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এমিল জোলার হাত ধ’রে ন্যাচারালিজম বা
প্রাকৃতিকতাবাদের জন্ম হয়, যা বৈজ্ঞানিক নির্লিপ্ততায় সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে উন্মোচন
ক’রে, এবং ঠিক একই সময়ে ফরাসি কবিতা পায় তার শ্রেষ্ঠ রূপকারদের যেমন শার্ল বোদলেয়ার,
যার ‘লে ফ্ল্যর দ্যু মাল’ আধুনিক কবিতার পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃত, এবং পরবর্তীতে
আর্থার র্যাবো ও স্টিফেন ম্যালার্মের মাধ্যমে প্রতীকিবাদ বা সিম্বলিজম সাহিত্যের সীমানা
ছাড়িয়ে অতীন্দ্রিয় জগতের দিকে ধাবিত হয়। বিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের সাথে সাথে ফরাসি সাহিত্য
আরও জটিল ও দার্শনিক হ’য়ে ওঠে, মার্সেল প্রুস্ত তার ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’ উপন্যাসের
মাধ্যমে সময় ও স্মৃতির যে মায়াজাল তৈরি করেন, তা বিশ্ব উপন্যাসের ইতিহাসে এক অনন্য
অধ্যায় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জঁ-পল সার্ত্র ও আলবেয়ার কামুর হাত ধ’রে
অস্তিত্ববাদ বা একজিসটেনশিয়ালিজম দর্শনের জন্ম হয়। যা মানুষের নিঃসঙ্গতা ও জীবনের
অর্থহীনতাকে এক গভীর শৈল্পিক রূপ দেয়; এবং সার্ত্রের ‘নাউসিয়া’ ও কামুর ‘দ্য আউটসাইডার’
বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থের তালিকায় স্থান পায়। একই সময়ে স্যামুয়েল
বেকেট ও ইউজিন ইওনেস্কোর ‘অ্যাবসার্ড ড্রামা’ নাটকের প্রচলিত ধারণা তছনছ ক’রে দেয় এবং
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, আল্যাঁ রব-গ্রিয়ে ও নাথালি সারোত ‘নোভেল রোমান’
বা নতুন উপন্যাসের মাধ্যমে আখ্যানের প্রথাগত কাঠামোকে অস্বীকার করেন, এবং বর্তমান সময়েও
ফরাসি সাহিত্য তার বৈচিত্র্য ও সাহসিকতা ধ’রে রেখেছে, যেখানে পনেরো জন নোবেল বিজয়ী
লেখকের গৌরব নিয়ে ফ্রান্স আজও বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে; এবং এই
দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ফরাসি সাহিত্য প্রমাণ করেছে যে, এটি কেবল শিল্পের খাতিরে শিল্প নয়,
বরং এটি মানুষের স্বাধীনতা যুক্তি এবং অস্তিত্বের লড়াইয়ের এক অবিনশ্বর দলিল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন