সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অনুপস্থিতির গোপন নক্ষত্রপুঞ্জ

 

তোমার চলে যাওয়ার পর
আমার ভেতরে এক অদ্ভুত ভূগোল জন্মেছে
যেখানে মানচিত্রে কোনো দেশ নেই,
শুধু তোমার অনুপস্থিতির বিস্তীর্ণ মরুভূমি,
আর সেখানে বালুকণার বদলে
রে পড়ে ভাঙা উচ্চারণ,
অসমাপ্ত বাক্য,
আর নিঃশব্দ কান্নার ক্ষুদ্র কণিকা

আমি এখন শব্দের ভিতর বাস করি না,
শব্দগুলো এখন আমার ভেতর বাস ক
রে
তারা তোমার নামের চারপাশে
ঘুরতে থাকে
মঙ্গল গ্রহের মতো,
কিন্তু কোনো কক্ষপথ খুঁজে পায় না,
কোনো কেন্দ্র নেই
, কারণ তুমি তো সেই কেন্দ্র ছিলে না

রাত হলেই আমার ঘুমের দরজায় এসে দাঁড়ায়
কিছু অদেখা ছায়া
,  তারা তোমার গন্ধে ভেজা,
তোমার হাসির ভাঙা প্রতিধ্বনি ব
য়ে আনে,
আর আমি অন্ধের মতো
সেই প্রতিধ্বনিকে স্পর্শ করতে চাই,
কিন্তু স্পর্শের আগেই
সবকিছু গলে যায় এক অদৃশ্য শূন্যতায়

আমি এখন আর কাঁদি না কান্নাগুলো বদলে গেছে
অভ্যন্তরীণ ঝ
ড়ের ভাষায়, যেখানে কোনো শব্দ নেই,
কেবল বু
কের গভীরে একটা নীরব বজ্রপাত ঘটে
বারবার
, তোমার স্মৃতি এখন কোনো সরল স্মৃতি নয়,
এটা এক বহুমাত্রিক গোলকধাঁধা,
যেখানে আমি প্রতিদিন হারিয়ে যাই,
নিজেকেই খুঁজতে খুঁজতে
তোমার আরও কাছে পৌঁছে যাই,
কিন্তু কখনো ছুঁতে পারি না
আমার দিনগুলো এখন
সময় দিয়ে নয়,
তোমার অনুপস্থিতির ঘনত্ব দিয়ে মাপা হয়
যেদিন বেশি মনে পড়ে,
সেদিন সময় ভারী হয়,
ঘণ্টাগুলো ঝু
লে থাকে অসহ্য দীর্ঘতায়

আমি যখন আকাশের দিকে তাকাই,
তারাগুলোকে আর তারা মনে হয় না
তারা যেন তোমার রেখে যাওয়া
ক্ষুদ্র আলোক-দাগ,
যা দিয়ে তুমি আমার রাতগুলোতে
একটা গোপন সংকেত লিখে গেছো
যার ভাষা আমি বুঝি না,
তবু অনুভব করি
তুমি চলে যাওয়ার পর
আমার ছায়াটাও
অনেক বদলে গেছে
সে আর আমাকে অনুসরণ করে না,
সে দাঁড়িয়ে থাকে
তোমার শেষ দেখা জায়গাটায়,
যেন সে এখনো অপেক্ষা করছে
তোমার ফিরে আসার

আমি এখন বাতাসকে জিজ্ঞেস করি

তুমি কি কোথাও তাকে ছুঁয়ে এসেছো?
বৃষ্টি হলে মনে হয়,
এই জলকণাগুলো হয়তো
তোমার চোখ থেকে ঝ
রে পড়েছে

আর আমি সেগুলো ধরে রাখতে চাই
আমার
হাতের গোপন ভাঁজে,

তুমি কি জানো, আমি এখনো তোমার জন্য
একটা ভাষা তৈরি করছি
যেখানে কোনো শব্দ থাকবে না,
শুধু অনুভূতির তরঙ্গ,
যা সরাসরি পৌঁছে যাবে
তোমার অদেখা অস্তিত্বে
আমার হৃদয় এখন
একটা ভাঙা বাদ্যযন্ত্র
তারগুলো ছিঁড়ে গেছে,
তবু কোনো অদৃশ্য স্পর্শে
সেখানে থেকে যায়
একটা অস্পষ্ট সুর,
যা কেবল তুমি শুনতে পারতে

তুমি না থাকলেও তোমার অনুপস্থিতি
আমাকে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি ক
রে
আমি প্রতিদিন একটু একটু ক
রে নতুন করে ভেঙে যাই,
নতুন করে গ
ড়ে উঠি এক অচেনা মানুষ হিসেবে

আমি জানি, এই বিরহের কোনো সমাপ্তি নেই
এটা কোনো গল্প নয়,
যার শেষে মিলন লেখা থাকে
এটা এক অনন্ত প্রক্রিয়া,
যেখানে হারানোই
একমাত্র সত্য
আর তবু
এই অসীম শূন্যতার মাঝেও
আমি তোমাকে খুঁজি,
কারণ খোঁজাটুকুই এখন
আমার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়

তুমি নেই,  তবু তুমি এক অদৃশ্য নক্ষত্রপুঞ্জ হয়ে
আমার ভেতরের আকাশে জ্বলছো,
আর আমি
এক অনন্ত রাত্রির যাত্রী,
যে পথ হারিয়েও
তোমার আলোয়
অন্ধ হ
য়ে থাকতে রাজি।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...