তোমাকে হারানোর পর
আমি ধীরে ধীরে, প্রায় গোপনে,
নিজের ভেতর এক অদ্ভুত শিল্পের জন্ম হতে দেখেছি,
যেখানে দুঃখ কোনো সরল অনুভূতি নয়,
বরং বহুস্তর বিশিষ্ট, সূক্ষ্মভাবে
বিন্যস্ত এক স্থাপত্য,
যার প্রতিটি দেয়ালে খোদাই করা আছে
তোমার অনুপস্থিতির অনিবার্য ছায়া
তুমি ছিলে, কেবল একজন মানুষ হিসেবে নয়,
বরং আমার দিনগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত
একটি নিরবচ্ছিন্ন অর্থের স্রোত হিসেবে,
যা আমার প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতিকে
একটি কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখত;
আর এখন তুমি নেই,
কিন্তু এই ‘না থাকা’ এমন এক তীব্র উপস্থিতি,
যা সমস্ত উপস্থিতিকেই ছাপিয়ে গিয়ে
নিজেকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করে
আমি যখন শহরে হাঁটি, মানুষের অসংখ্য মুখের মধ্যে
হঠাৎ কোনো অচেনা ভঙ্গি, কোনো অর্ধেক
হাসি,
কিংবা একটি অবহেলিত দৃষ্টির ভেতর
তোমার অস্পষ্ট প্রতিরূপ দেখতে পাই,
এবং সেই মুহূর্তে পুরো শহরটাই যেন এক বিভ্রম হয়ে ওঠে,
যেখানে তুমি নেই, তবু তুমি ছড়িয়ে আছো
সর্বত্র
বিকেলের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে নেমে আসে
বারান্দার নিঃশব্দ প্রান্তে, আমি অনুভব
করি,
এই আলো, এই বাতাস, এই স্তব্ধতা
একসময় তোমার শরীরের খুব কাছে ছিল,
তোমার ত্বকের উষ্ণতা ছুঁয়ে
তার নিজস্ব অর্থ খুঁজে পেয়েছিল;
আর আজ তারা ফিরে এসেছে,
কিন্তু তাদের সেই অর্থ আর নেই,
শুধু আছে স্মৃতির এক অনির্বচনীয় অবশেষ।
আমি প্রায়ই ভাবি,
ভালোবাসা কি সত্যিই দুইজন মানুষের মধ্যে
একটি সমান ভাগে বিভক্ত অভিজ্ঞতা,
নাকি তা আসলে একক,
একজন মানুষের অন্তর্লোকে জন্ম নেওয়া
একটি গভীর, নির্জন প্রতিধ্বনি,
যেখানে অন্যজন কেবল উপলক্ষ মাত্র?
তুমি চলে যাওয়ার পর আমি আবিষ্কার করেছি,
সংলাপেরও একাকীত্ব আছে;
আমি এখনো তোমার সঙ্গে কথা বলি,
কিন্তু সেই কথোপকথনে তুমি কোনো উত্তর দাও না,
তবু আশ্চর্যভাবে এই একতরফা বিনিময়েই
এক ধরনের পূর্ণতা অনুভূত হয়
রাত নামলে আমার ঘরের কোণে কোণে
একটি মৃদু, প্রায় অদৃশ্য নীল আলো জমে
ওঠে,
আমি জানি না তার উৎস কোথায়,
কিন্তু সেই আলোয়
তোমার অনুপস্থিতি আরও সুস্পষ্ট, আরও
স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে,
যেন অন্ধকারও আজকাল
তোমার অভাবকে ধারণ করার জন্য
নিজেকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে।
এ এক বিস্ময়কর সম্পর্ক, যেখানে তুমি অনুপস্থিত,
তবু তোমার অনুপস্থিতিই
সমস্ত উপস্থিতির মান নির্ধারণ করে;
তুমি নেই বলেই সবকিছু অসম্পূর্ণ,
আর এই অসম্পূর্ণতাই এক ধরনের পূর্ণতা সৃষ্টি করে
আমি জানি, তোমার কাছে পৌঁছানোর কোনো পথ নেই আর,
সমস্ত রাস্তা, সমস্ত সম্ভাবনা
এক অদৃশ্য বিন্দুতে এসে থেমে গেছে;
তবু প্রতিদিন আমি সেই পথেই হাঁটি,
কারণ এই অসম্ভব যাত্রাটুকুই
আমার অস্তিত্বকে কোনোভাবে সচল রাখে
তোমাকে ফিরে পাওয়ার আশা নেই,
এ কথা আমি বহুবার স্বীকার করেছি নিজের কাছে;
তবু তোমাকে হারানোরও যেন কোনো শেষ নেই,
প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ আমি নতুন করে
তোমাকে হারাই,
নতুন করে তোমার অভাবকে অনুভব করি
এই যে দীর্ঘ বিরহ, এটা আর কেবল এক অনুভূতি নয়,
এটা আমার সত্তার অবিচ্ছেদ্য অলঙ্কার,
একটি নীরব গৌরব, যা আমাকে ধ্বংস করেও
এক অদ্ভুত মর্যাদা দিয়ে যায়
আর আমি, এই
অদৃশ্য, অথচ তীব্র আলোর নিচে
একাকী দাঁড়িয়ে থাকি দীর্ঘ সময়,
যেন কোনো প্রাচীন বৃক্ষ, যার শিকড় গভীরে
প্রোথিত
এক হারানো নামের অনন্ত প্রতিধ্বনির মধ্যে,
যে নাম আমি উচ্চারণ করি না,
তবু যার ভারে আমার সমগ্র অস্তিত্ব নত হয়ে থাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন