সৈয়দ শামসুল হকের (১৯৩৫-২০১৬) ‘বৃষ্টি
ও বিদ্রোহীগণ’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক মনন ও শিল্পভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য
দৃষ্টান্ত, কারণ এই উপন্যাসে কেবল একটি কাহিনি বলা হয়নি, বরং মানুষের অন্তর্লোক, সময়ের
সংকট, সমাজের টানাপোড়েন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অস্তিত্বের জটিল প্রশ্নগুলো একসঙ্গে
শিল্পরূপ পেয়েছে। উপন্যাসটির শিরোনামই আমাদের জানিয়ে দেয় যে, এটি শুধু বাহ্যিক ঘটনা-নির্ভর
কোনো রচনা নয়, বরং প্রতীক, অনুভব, ইঙ্গিত এবং মানসিক অভিঘাতের একটি বিস্তৃত জগৎ, যেখানে
বৃষ্টি প্রকৃতির সাধারণ উপাদান না হয়ে, হ’য়ে ওঠে এক গভীর প্রতীক, আর বিদ্রোহীগণ কেবল
রাজনৈতিক প্রতিবাদী মানুষ না হ’য়ে দাঁড়ায় মানবচেতনার সেই অংশ, যা অন্যায়, অবদমন, ভয়,
আত্মসমর্পণ এবং স্থবিরতার বিরুদ্ধে অবিরাম প্রশ্ন তোলে। এই উপন্যাসের মৌলিক আকর্ষণ
এখানেই যে, লেখক সমাজবাস্তবতাকে সরাসরি বক্তৃতার ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেননি, বরং জীবনকে
ভাঙা-গড়া, অনিশ্চিত, দ্বন্দ্বময় এবং বহুস্তরীয় এক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখিয়েছেন, ফলে উপন্যাস
পাঠের সময় পাঠক শুধু ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করে না, বরং একটি চেতনার ভেতর দিয়ে হাঁটে, যেখানে
বাস্তব আর প্রতীক, স্মৃতি আর বর্তমান, ব্যক্তিগত ব্যথা আর সামাজিক অস্থিরতা একে অপরের
সঙ্গে মিশে যায়; সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টিশীলতার অন্যতম বড় শক্তি হলো তিনি মানুষের অন্তর্গত
দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে এমনভাবে ধরতে পারেন, যেন চরিত্রগুলো কেবল কাগজের ওপর নির্মিত নয়,
বরং সময়ের বাস্তব জীবন থেকে উঠে আসা জীবন্ত সত্তা, আর ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’-এ, সেই
সত্তাগুলোর মানসিক টানাপোড়েন, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, হতাশা, প্রত্যয় এবং পরাজয়ের অভিজ্ঞতা
এক অসাধারণ শিল্পভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। উপন্যাসের কাহিনিগত কাঠামো তুলনামূলকভাবে সরল
নয়, বরং স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং অনুভূতির স্রোতে এটি এগোয়, ফলে এখানে সময়
রৈখিকভাবে না গিয়ে কখনো অতীতে ফিরে যায়, কখনো বর্তমানকে তীক্ষ্ণ ক’রে তোলে, কখনো ভবিষ্যতের
সম্ভাবনা বা আশঙ্কাকে ইঙ্গিত করে; এই কাঠামো পাঠককে বোঝায় যে মানুষের জীবনও আসলে সরল
নয়, বরং বহুমুখী স্মৃতি, অপূর্ণতা, ব্যর্থতা ও আশা দিয়ে গঠিত এক জটিল বিন্যাস। লেখকের
এই ভঙ্গি আধুনিক উপন্যাসশিল্পের সঙ্গে উপন্যাসটিকে যুক্ত করে, কারণ আধুনিক উপন্যাসে
কেবল কি ঘটল, তা নয়, কেন ঘটল, কী অনুভূত হলো, কীভাবে মনে পড়ল, কীভাবে চেতনায় প্রতিধ্বনিত
হলো, এই সব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’-এ আমরা দেখতে পাই যে, চরিত্ররা
বহির্জগতের সঙ্গে সংঘর্ষে যেমন জড়ায়, তেমনি নিজের ভেতরের সঙ্গেও এক অবিরাম দ্বন্দ্বে
লিপ্ত থাকে, এবং এই দ্বন্দ্বই তাদের মানবিক ক’রে তোলে; কারণ মানুষ সবসময়ই বাহ্যিকভাবে
একরকম, ভেতরে আরেকরকম, আর উপন্যাসটি সেই ভেতরের মানুষটিকে সামনে আনে; বৃষ্টির প্রতীক
এখানে বহুমাত্রিক, কারণ বৃষ্টি একই সঙ্গে স্নিগ্ধতা, বিষণ্ণতা, ধুয়ে-মুছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা,
পুনর্জাগরণ, স্মৃতি এবং ক্লান্তির দ্যোতক; বৃষ্টি নেমে এলে চারপাশ যেমন ধুয়ে যায়, তেমনি
মানুষের মনের ভিতরের জমে থাকা আবেগও নড়ে ওঠে, কিন্তু এই নড়াচড়া সবসময় মুক্তি দেয় না,
বরং অনেক সময় পুরনো বিষণ্ণতা আরও স্পষ্ট ক’রে তোলে; ফলে বৃষ্টি এখানে এক ধরনের দ্ব্যর্থবোধক
প্রতীক, যা একদিকে শুদ্ধির আশা, অন্যদিকে অনিবার্য দুঃখের উপস্থিতি; এই প্রতীকী ব্যবহার
সৈয়দ শামসুল হকের শিল্পরুচির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কারণ তিনি জীবনকে কেবল বস্তুগত
সত্য হিসেবে দেখেন না, বরং তার ভেতরের আলোক-অন্ধকার, শব্দ-নীরবতা, আশা-নৈরাশ্য এবং
স্থিরতা-অস্থিরতাকেও পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করেন; অন্যদিকে ‘বিদ্রোহীগণ’ শব্দটি একক
কোনো দল বা গোষ্ঠীর পরিচয় নয়, বরং এটি একটি মানসিক অবস্থা, একটি নৈতিক অবস্থান, একটি
অস্তিত্বগত প্রতিক্রিয়া; বিদ্রোহ এখানে কেবল অস্ত্রধারী আন্দোলন নয়, বরং প্রশ্ন করার
সাহস, মেনে না নেওয়ার মনোভাব, অন্তরে জমে থাকা অস্বস্তির প্রকাশ, এবং নিজেকে ও সমাজকে
পুনর্নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। এ-কারণে উপন্যাসের বিদ্রোহী চরিত্রদের বুঝতে হ’লে শুধু রাজনৈতিক
ইতিহাস পড়লেই হবে না, মানুষের মনোজগৎও বুঝতে হবে, কারণ তাদের বিদ্রোহের মূলে আছে অপমান,
বঞ্চনা, অপর্যাপ্ততা, পরাধীনতা এবং বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যন্ত্রণা। এই উপন্যাসে
সমাজের রূঢ় বাস্তবতাও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থিত, যদিও তা সরাসরি বক্তব্যের মাধ্যমে
নয়; এখানে একটি অনিশ্চিত সমাজের ছবি পাওয়া যায়, যেখানে মানুষ নিজের জায়গা, মর্যাদা
ও নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান, যেখানে ক্ষমতা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়, ন্যায়বিচার সবসময়
কার্যকর নয়, এবং সম্পর্কও সবসময় স্থিতিশীল নয়। লেখক দেখিয়েছেন যে, সামাজিক কাঠামোর
ভেতরেই মানুষের ব্যক্তিসত্তা ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে, ফলে সে এক ধরনের একাকীত্বে পড়ে
যায়; এই একাকীত্ব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও নৈতিকও; মানুষ মানুষকে পাশে পেলেও আসলে
পুরোপুরি পায় না, কারণ প্রত্যেকেই নিজের জটিলতা, ভয় ও ক্ষত বহন করে চলে; উপন্যাসের
চরিত্রগুলো তাই একে অপরের সঙ্গে সংলাপ করলেও অনেক কথা বলা হয় না, আর না-বলা কথাগুলোই
সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হ’য়ে ওঠে। এদিক থেকে সৈয়দ শামসুল হক নীরবতাকেও শিল্পরূপ দিয়েছেন,
যা আধুনিক সাহিত্যের একটি শক্তিশালী দিক; ভাষার দিক থেকে উপন্যাসটি কাব্যিক, তীক্ষ্ণ
এবং সংবেদনশীল; তাঁর গদ্যে ছন্দ আছে, অন্তর্লীন সংগীত আছে, ইঙ্গিত আছে, এবং বহুস্তর
অর্থবহ শব্দচয়ন আছে; তিনি খুব সাধারণ একটি বর্ণনাকেও এমনভাবে সাজাতে পারেন, যাতে তা
প্রতীকে রূপ নেয়; ফলে উপন্যাসের ভাষা পাঠকের কাছে কখনো সরল তথ্যের মতো আসে না, বরং
কখনো দৃশ্য, কখনো ধ্বনি, কখনো অনুভব, কখনো অন্তর্গত প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। এই ভাষাগত
শৈলী উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়; চরিত্র নির্মাণের দিক থেকেও
উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে চরিত্ররা স্থির, একমাত্রিক বা সাদাকালো নয়; তারা
দ্বিধায় ভরা, আত্মসন্দেহে আক্রান্ত, কখনো প্রতিবাদী, কখনো অসহায়, কখনো দৃঢ়, কখনো ভঙ্গুর;
এই মানবিক অসম্পূর্ণতাই তাদের বিশ্বাসযোগ্য করেছে; লেখক যেন বুঝিয়ে দিতে চান যে মানুষ
কোনো সম্পূর্ণ সমাধান নয়, বরং অসমাপ্ত এক অনুসন্ধান। উপন্যাসের চরিত্রগুলোও তাই নিজেদেরই
খুঁজছে; তাদের কাছে জীবন মানে এক ধরনের বারবার প্রশ্ন করা, বারবার হারানো, বারবার দাঁড়ানো;
আর এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেই জীবনের অর্থ খুঁজে বের করতে হয়; উপন্যাসে অস্তিত্ববাদী বোধও
লক্ষ করা যায়, কারণ এখানে মানুষের একাকীত্ব, অর্থহীনতা, ভয়, স্বাধীনতার দায় এবং অস্তিত্বের
অনিশ্চয়তা স্পষ্ট; চরিত্ররা কখনো জানতে চায় তারা কেন আছে, কোথায় যাচ্ছে, কীসের জন্য
লড়ছে, এবং তাদের এই প্রশ্নগুলো কোনো সহজ উত্তর পায় না; বরং উত্তরহীনতাই তাদের বাস্তবতা;
আধুনিক মানুষের জীবনও তাই, যেখানে নিশ্চিত আশ্রয় নেই, সম্পূর্ণ সত্য নেই, শুধু অনুসন্ধান
আছে; সৈয়দ শামসুল হকের রচনায় এই অনুসন্ধানকে তিনি নৈতিক ও মানবিক স্তরে নিয়ে যান, ফলে
উপন্যাসটি নিছক রাজনৈতিক দলিল থাকে না, হ’য়ে ওঠে মানবচেতনার দলিল; আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো উপন্যাসটির আবহ; পুরো রচনায় এক ধরনের মেঘলা, স্যাঁতসেঁতে, অনিশ্চিত, চাপা
বিষণ্ণতার সুর আছে, যা শিরোনামের বৃষ্টির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ; এই আবহ পাঠকের মনে
কেবল কাহিনির ঘটনা নয়, সেই ঘটনার আবেগও দীর্ঘসময় ধরে রেখে দেয়; আমরা বুঝতে পারি যে
লেখক কোনো সরল আশাবাদের বৃত্তে বেঁধে দেননি, বরং দেখিয়েছেন যে জীবনের পথ সবসময় কাদা,
বৃষ্টি, অন্ধকার, ঝাপসা দৃষ্টি এবং থেমে থাকা নিশ্বাসে ভরা; তবে এই অন্ধকারও পুরোপুরি
নিরাশাবাদী নয়, কারণ বিদ্রোহের অস্তিত্ব নিজেই বলে দেয় যে মানুষ এখনও আত্মসমর্পণ করেনি;
যেখানে বিদ্রোহ আছে, সেখানে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা আছে, ন্যায়ের প্রত্যাশা আছে, পরিবর্তনের
স্বপ্ন আছে; তাই এই উপন্যাসের গভীরে এক ধরনের ক্ষীণ কিন্তু অনড় আশার ধারা প্রবাহিত।
সেই আশা উচ্চকিত নয়, কিন্তু বিদ্রোহীর নীরব চোখে, বৃষ্টির শব্দে, এবং মানুষের না-বলা
প্রত্যয়ে লুকিয়ে থাকে; উপন্যাসটির আরেকটি বড় সাফল্য হলো এর সময়চেতনা; এটি কোনো একক
ঐতিহাসিক ঘটনার সীমায় আবদ্ধ না থেকে সমকালীন বাস্তবতার বৃহত্তর অর্থ নির্মাণ করে; ফলে
যে সময়েই মানুষ অন্যায়, দমন, অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক
সংকটে পড়বে, সেই সময়েই এই উপন্যাস প্রাসঙ্গিক হ’য়ে উঠবে; এ কারণেই ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’
কেবল তার রচনাকালীন বাস্তবতার দলিল নয়, আজও পাঠকের ভেতরে আলোড়ন তোলে; কারণ মানুষের
মৌলিক সংকট বদলায় খুব কম, শুধু তার প্রকাশভঙ্গি বদলায়। উপন্যাসের অন্তর্নিহিত বার্তা
হলো, ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সত্য না জেগে উঠলে বাইরের পরিবর্তনও টেকসই হয় না; বিদ্রোহ
যদি কেবল বাহ্যিক হ’য়ে থাকে তবে তা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু যদি তা আত্মচেতনাকে জাগিয়ে তোলে,
তবে তা দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থবহ হয়; সৈয়দ শামসুল হক এই উপন্যাসে বিদ্রোহকে তাই নিছক রাজনীতি
হিসেবে না দেখে এক ধরনের চেতনার রূপ দিয়েছেন; এই চেতনা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়,
নিজের অবস্থান বুঝতে শেখায়, এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করতে শেখায়; কিন্তু একই সঙ্গে
তিনি জানেন যে বিদ্রোহও সহজ নয়; বিদ্রোহের মূল্য আছে, বেদনা আছে, একাকীত্ব আছে, সম্ভাব্য
পরাজয় আছে; এই বাস্তবতাও উপন্যাসে উপস্থিত, এবং তাই বিদ্রোহ এখানে রোমান্টিক কোনো সহজ
বিজয়ের গল্প নয়, বরং সংগ্রামী মানুষের কঠিন আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। সামগ্রিকভাবে বিচার
করলে বলা যায়, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ উপন্যাসে সৈয়দ শামসুল হক একদিকে যেমন সমাজবাস্তবতার
নির্ভুল ছাপ রেখেছেন, অন্যদিকে তেমনি মানুষের ভেতরের জটিলতা, উদ্বেগ, স্বপ্ন, প্রতিবাদ
এবং নিঃসঙ্গতাকেও গভীর শিল্পবোধে রূপ দিয়েছেন; উপন্যাসটি তাই একাধারে মনস্তাত্ত্বিক,
প্রতীকী, অস্তিত্ববাদী, সামাজিক ও রাজনৈতিক; এর মূল্য কেবল কাহিনিতে নয়, কাহিনির বাইরে
যে অনুভব সৃষ্টি ক’রে, সেখানেই; এটি পাঠককে শেখায় যে বৃষ্টি সবসময় কেবল জল নয়, তা স্মৃতি,
শুদ্ধি, অস্থিরতা, কষ্ট এবং পুনরারম্ভেরও নাম হতে পারে; আর বিদ্রোহ কেবল শ্লোগান নয়,
তা মানুষের ভেতরের জাগরণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রত্যয়, এবং নিজেকে ভেঙে নতুন ক’রে
গড়ার সাহস; এই উপন্যাস সেই সাহসকেই শিল্পের ভাষায় ধ’রে রেখেছে, এবং সেখানেই তার স্থায়ী
সাহিত্য-মর্যাদা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন