সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাংলাদেশে খুন ও ধর্ষণ: এক নির্মম ঘটনা

 

বাংলাদেশের সমাজ আজ এক অদ্ভুত দ্বৈরথের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে; একদিকে মানুষের স্বপ্ন, উন্নয়ন, অগ্রগতির গল্প, অন্যদিকে প্রতিদিনের সংবাদপত্রের ভাঁজে ভাঁজে রক্তের দাগ, নারীর আর্তনাদ, নিভে যাওয়া জীবনের শোক, আর বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া। খুন ও ধর্ষণ এমন দুটি অপরাধ, যা কেবল আইনভঙ্গ নয়, বরং মানবতার ওপর সরাসরি আঘাত। এ-দুটি ঘটনা ঘটলে শুধু একজন মানুষের জীবনই ধ্বংস হয় না, একটি পরিবার ভেঙে পড়ে, একটি সমাজের বিবেক কেঁপে উঠে, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে খুন ও ধর্ষণের ঘটনা তাই নিছক অপরাধতত্ত্বের বিষয় নয়; এটি সমাজবিজ্ঞান, নৈতিকতা, রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, মনস্তত্ত্ব এবং সাহিত্যেরও গভীর আলোচ্য। কারণ সাহিত্য মানুষের ভিতরের অন্ধকারকে যেমন ধারণ ক’রে, তেমনি সমাজের অসুখকেও আয়নার মতো প্রতিফলিত ক’রে। এই দেশ, যার ইতিহাস রক্ত, ত্যাগ, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ এবং আত্মমর্যাদার ইতিহাস। সেই দেশের বুকে আজও কেন মানুষ মানুষকে হত্যা করে, কেন নারীর শরীরকে ক্ষমতার ক্ষেত্র বানানো হয়, কেন ভয়ের সংস্কৃতি ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক হ’য়ে উঠছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল অপরাধীদের দিকে তাকালেই চলবে না; তাকাতে হবে সমাজের গভীর অসুখের দিকে, যেখানে অবিচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক অবক্ষয়, দারিদ্র্য, মাদক, পারিবারিক অসংলগ্নতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা একত্রে মিলে এক বিষাক্ত বাস্তবতা তৈরি করেছে। খুনের পেছনে অনেক সময় ব্যক্তিগত ক্ষোভ, আর্থিক বিরোধ, সম্পর্কের টানাপড়েন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক হিংসা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, পারিবারিক কলহ কিংবা দখলদারির মতো কারণ কাজ ক’রে। কিন্তু এই কারণগুলোর গভীরে যে নৈতিক শূন্যতা, সেটাই সবচেয়ে ভয়াবহ। মানুষ যখন অপর মানুষের প্রতিপক্ষ নয়, বরং শিকার হিসেবে দেখতে শেখে, তখন সভ্যতার সমস্ত অর্জন এক মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ হ’য়ে যায়। আর ধর্ষণ? ধর্ষণ কেবল যৌন অপরাধ নয়, এটি ক্ষমতার, বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ; এটি এমন এক সহিংসতা, যেখানে অপরাধী শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক আঘাতও সঞ্চার ক’রে। ধর্ষণের মাধ্যমে একজন নারী, কিশোরী, শিশু বা কখনও পুরুষও, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা ভুক্তভোগী হয়, তার শরীরের অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান হারায়। তবে আসল প্রশ্ন হলো, সমাজ কেন এখনো ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে, অপরাধীকে নয়? কেন মেয়েটি কী পোশাক পরেছিল, কোথায় গিয়েছিল, কাদের সঙ্গে ছিল, এসব প্রশ্নকে সমাজ কখনো কখনো অপরাধীর চেয়েও বড় করে তোলে? এই মানসিকতার ভিতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সাংস্কৃতিক অসুস্থতা। বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনাকে যখন শুধু ‘দুর্ঘটনা’ বা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, তখন আসলে আমরা সমস্যাটিকে আরও গভীর করি; কারণ প্রতিটি ঘটনা একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ, যেখানে নারীর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশ, চলাফেরা এবং সম্মান বারবার সংকুচিত হয়। নারীকে যদি সমাজ মানুষ হিসেবে না দেখে ‘সম্ভাব্য ভুক্তভোগী’ বা ‘নিয়ন্ত্রণের বস্তু’ হিসেবে দেখতে শেখে, তবে ধর্ষণের বীজ সেখানেই রোপিত হয়। আর যখন সেই বীজকে আইন, শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক নিন্দা যথাসময়ে উপড়ে ফেলতে পারে না, তখন তা ভয়ংকর বৃক্ষে পরিণত হয়। খুনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। হত্যা কেবল একজনের জীবন শেষ করা নয়, এটি ভবিষ্যৎকে ছিঁড়ে ফেলা। এক জনপদে যখন বারবার লাশ পড়ে, মানুষ অভ্যস্ত হ’য়ে যায়; আর এই অভ্যস্ত হ’য়ে যাওয়াই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ তখন সমাজ আর কাঁদে না, কেবল সংবাদ পড়ে; রক্ত দেখে, কিন্তু রুদ্ধশ্বাস প্রতিবাদ গ’ড়ে তোলে না। এই নির্লিপ্তি অপরাধীর সবচেয়ে বড় সহায়ক। বাংলাদেশে খুন ও ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি বড় কারণ। আইন আছে, মামলা আছে, তদন্ত আছে, আদালত আছে, তবু ন্যায়বিচার অনেক সময় দীর্ঘসূত্রিতায়, প্রভাবের চাপে, সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতায়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে কিংবা প্রশাসনিক উদাসীনতায় আটকে থাকে। মানুষ যখন দেখে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া যায়, তখন অপরাধের সাহস বাড়ে। সমাজের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে এক বিপজ্জনক বার্তা নির্মম হও, কারণ তুমি হয়তো রক্ষা পাবে। এই বার্তা শুধু অপরাধীদের নয়, সাধারণ মানুষের মনেও বিষ ঢালে; ফলে সহমর্মিতা কমে, সন্দেহ বাড়ে, নিরাপত্তা সংকুচিত হয়, আর পারস্পরিক আস্থা ভেঙে পড়ে। পরিবারও এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ঘরেই শিশুকে শৈশব থেকেই সম্মান, সংযম, সহমর্মিতা, নারীর মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সীমারেখা, সম্মতির ধারণা শেখানো হয় না। ফলে বড় হয়ে তারা সমাজের নৈতিক ভাষা না শিখে শক্তির ভাষা শেখে। কোথাও মাদকসেবন, কোথাও পর্নোগ্রাফির বিকৃত প্রভাব, কোথাও সহিংস পুরুষত্বের ভ্রান্ত মডেল, কোথাও হতাশা আর অসন্তোষ-এসব মিলেই তৈরি করে এমন এক মানবিক বিকৃতি, যেখানে অন্যের সম্মতি, ব্যথা বা জীবন কোনো গুরুত্ব পায় না। একইভাবে শহরায়ন, বস্তি বিস্তার, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, আয়ের অসমতা, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, অস্ত্রের সহজলভ্যতা, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রসারও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। কেউ কেউ অপরাধকে কেবল ব্যক্তির নৈতিক পতন বলে ব্যাখ্যা করেন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যক্তি কখনো সমাজের বাইরে জন্মায় না। সে পরিবার, বিদ্যালয়, রাস্তা, গণমাধ্যম, রাজনীতি, ধর্মীয় বয়ান, অর্থনৈতিক কাঠামো সবকিছুর দ্বারা গঠিত হয়। তাই অপরাধ প্রতিরোধও বহুমাত্রিক হতে হবে। কেবল শাস্তি দিয়ে সব কিছু সমাধান হয় না; শিক্ষা, সচেতনতা, সামাজিক ন্যায়বোধ, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগী সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নারীবান্ধব পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি, এসব মিলেই একটি প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি গ’ড়ে তুলতে হবে। তবে এ কেবল বাস্তব সমাজবিজ্ঞান নয়, সাহিত্যের ভূমিকাও অত্যন্ত গভীর। সাহিত্য আমাদের শেখায় কীভাবে মানুষের ভেতরকার অন্ধকারকে দেখা যায়, কীভাবে বেদনা শব্দে রূপ পায়, কীভাবে নিপীড়িতের নীরবতা ইতিহাসের ভাষা হ’য়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাহিত্যেও রক্ত, সহিংসতা, নিপীড়ন, নারীর প্রতি অবমাননা, আর সামাজিক অবিচারের প্রতিবিম্ব বারবার এসেছে। কবি ও কথাসাহিত্যিকেরা দেখিয়েছেন, অপরাধ শুধু থানার কেস নয়; এটি মানুষের আত্মার ক্ষয়। একটি সমাজ যখন শোষণ, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নিমজ্জিত হয়, তখন সাহিত্যের কাজ হয় সেই ক্ষয়কে উন্মোচন করা। খুনের পর লাশ যেমন মাটিতে পড়ে থাকে, তেমনি ধর্ষণের পর পড়ে থাকে একটি আত্মার ভাঙা কাচ; এই কাচ জোড়া লাগে না সহজে। সমাজ হয়তো কিছুদিন সংবাদে উত্তপ্ত থাকে, কিছুদিন মানববন্ধন হয়, কিছুদিন নিন্দার ঝড় ওঠে; তারপর আবার জীবন স্বাভাবিক হ’য়ে যায়, অথচ ভুক্তভোগীর জীবন আর স্বাভাবিক হয় না। এই অসমতা আমাদের সবচেয়ে বেশি কাঁদায়। যে সমাজে একজন নারীর রাতের পথ নিরাপদ নয়, শিশুর স্কুলফেরত যাত্রা নিরাপদ নয়, কর্মজীবী তরুণীর ঘরে ফেরা নিরাপদ নয়, সেখানে উন্নয়নের স্লোগানও এক ধরনের ভঙ্গুর আলংকারিকতা মাত্র। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নও সম্পূর্ণ নয়; কারণ অর্থনীতির চালিকা শক্তি মানুষ, আর মানুষ যদি ভীত হয় তবে অগ্রগতি টেকসই হয় না। খুন ও ধর্ষণের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো এগুলোর সামাজিক প্রতিক্রিয়া। অনেক সময় ভুক্তভোগী নিজেই সামাজিক অপমান, লজ্জা, ভয় ও কলঙ্কের বোঝা বহন করে। তার বদলে সমাজকে জবাবদিহি করতে হয় না। এটা উল্টো বিচার। অপরাধীর লজ্জা যেখানে হওয়া উচিত, সেখানে ভুক্তভোগীর কণ্ঠরোধ করা হয়। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের পথে এগোতে ভয় পায়, অনেক ঘটনা প্রকাশই পায় না, আর অপরাধীরা আরও সাহসী হয়। এই নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙা দরকার। স্কুলে, কলেজে, পরিবারে, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরে সম্মতি, শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, নারীর অধিকার, মানবিক মর্যাদা, এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা শেখাতে হবে। পাশাপাশি পুলিশের প্রশিক্ষণ, তদন্তের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, দ্রুত ফরেনসিক সহায়তা, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা, এবং কঠোর কিন্তু ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন করে হবে না; আইনের প্রয়োগে নৈতিকতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। আরেকটি বাস্তবতা হলো মিডিয়ার ভূমিকা। সংবাদমাধ্যম কখনো অপরাধকে অতিরঞ্জিত করে ভয়ের বাজার তৈরি করে, কখনো আবার সংবেদনশীলতার অভাবে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা নষ্ট করে; সুতরাং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা অপরিহার্য। অপরাধের খবর প্রচার করতে গিয়ে যেন ভুক্তভোগী আবারও নিপীড়নের শিকার না হন। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানি, ঘৃণা ও ন্যায়বিচারবহির্ভূত জনরোষও বিপজ্জনক। মানুষের ক্ষোভ যেন আইনশাসিত বিচারব্যবস্থার সহায়ক হয়, প্রতিস্থাপক না হয়। খুন ও ধর্ষণ-বিষয়ক আলোচনায় নারীকে কেবল দুর্বল, অসহায় বা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে দেখাও সমস্যাজনক; কারণ এতে নারীর সংগ্রাম, প্রতিরোধ, সক্ষমতা এবং নাগরিক অধিকার আড়াল হ’য়ে যায়। নারীকে রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় বিবেচনায় আনতে হবে। নারীর নিরাপত্তা মানে কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়; এটি নাগরিকত্বের প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র নারীকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ, সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা তো আরও ভয়াবহ; কারণ সেখানে শরীরের ক্ষতের সঙ্গে ভেঙে যায় ভবিষ্যৎ, ভরসা ও নির্ভরতার ভিত্তি। শিশুরা সমাজের সবচেয়ে নিরীহ অংশ, আর তাদের ওপর অপরাধ মানে সভ্যতার সর্বনিম্ন স্তরে পতন। এইসব অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজের সব স্তরে প্রতিরোধ গ’ড়ে তুলতে হবে- মসজিদ, মন্দির, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পাড়া-মহল্লা, কর্মক্ষেত্র, পরিবার সবখানে। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, সাংস্কৃতিক কর্মী, সমাজকর্মী, চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী সবার সম্মিলিত ভূমিকা দরকার। কারণ অপরাধের শেকড় যেমন বহুমুখী, প্রতিকারও তেমন বহুমুখী হতে হবে। তবু সব আলোচনার শেষে একটি গভীর সত্য র’য়ে যায়: খুন ও ধর্ষণ মানবিকতার পরাজয়। যখন মানুষ আর মানুষ থাকে না, তখন সমাজে সভ্যতার চিহ্ন শুধু কাগজে থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের সাহসী করেছে; ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন, আত্মত্যাগ এসবের মধ্য দিয়ে এই জাতি মানবিক মর্যাদার অর্থ শিখেছে। তাই আজকের সময়ের দাবি হলো সেই মর্যাদাকে নতুন করে রক্ষা করা। আমরা যদি চাই যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয় ছাড়া বাঁচুক, নারীরা অন্ধকারে নয়, আলোতে পথ চলুক, শিশুরা নিরাপদে স্বপ্ন দেখুক, মানুষ নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরুক, তবে খুন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে কেবল ক্ষোভ নয়, প্রয়োজন একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিদ্রোহ অসহিংসতার বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে, নীরবতার বিরুদ্ধে, এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে। এই বিদ্রোহের ভাষা হবে শিক্ষা, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও মানবিকতা। যে সমাজে একটি হত্যা হয়, একটি ধর্ষণ হয়, সেখানে শুধু একটি প্রাণ নয়, একটি সভ্যতার আত্মাও আহত হয়। তাই আমাদের চাওয়া উচিত এমন বাংলাদেশ, যেখানে রক্ত নয়, নিরাপত্তা হবে দৈনন্দিন অভ্যাস; ভয় নয়, মর্যাদা হবে জীবনযাপনের স্বাভাবিক শর্ত; আর নারী-পুরুষ-তরুণী-শিশু নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নিজের জীবন নিয়ে বাঁচতে পারবে নির্ভয়ে, সম্মানের সঙ্গে, আত্মমর্যাদার সঙ্গে। এটাই শেষ পর্যন্ত সভ্যতার ন্যূনতম দাবি, আর সাহিত্যেরও চূড়ান্ত স্বর, মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো, অমানবিকতার বিরুদ্ধে ভাষা হ’য়ে ওঠা।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...