সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিরহের অভ্যন্তরীণ জ্যামিতি

 

আমি এখন তাকে কোনো অনুভূতি বলে মানি না,
সে এক জটিল জ্যামিতি,
যেখানে প্রতিটি রেখা শুরু হয় তোমার কাছে,
কিন্তু কোনো রেখাই আর তোমার কাছে পৌঁছায় না;
সবগুলো পথ মাঝপথে থেমে গিয়ে
নিজেকেই ঘিরে ফেলে এক অনন্ত বৃত্তের ভেতরে।

তোমার অনুপস্থিতি আমার ভেতরে এমন এক স্থিরতা তৈরি করেছে,
যেখানে সময়ও প্রবেশ করতে ভয় পায়,
ঘড়ির কাঁটা চলে, কিন্তু আমার ভেতরের সময়
এক বিন্দুতে আটকে থাকে, যেন কোনো অমীমাংসিত সমীকরণ

আমি এখন অনুভব করি, বিরহ আসলে কোনো শূন্যতা নয়,
বরং অতিরিক্ত উপস্থিতি, এত বেশি তোমার উপস্থিতি
যে তা সহ্য করা যায় না, তাই তাকে আমরা না থাকাবলে ভুল করি।

রাত গভীর হলে আমার শরীরের ভেতর দিয়ে
একটা অদ্ভুত নীরবতা হেঁটে যায়,
সে শব্দহীন, তবু তার পদচারণা আমি শুনতে পাই,
যেন সে প্রতিটি কোষে গিয়ে
তোমার অনুপস্থিতির সীলমোহর বসিয়ে দেয়

আমি ঘুমোতে গেলে স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে
একটা অস্পষ্ট সীমানা খুলে যায়
সেখানে তুমি কখনো পুরোপুরি আসো না,
কখনো পুরোপুরি যাওও না, শুধু এক অর্ধেক উপস্থিতির মতো
আমাকে বিভ্রান্ত করে রাখো,

বিরহের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলোতে
আমি নিজের ভেতরে একটি অপরিচিত মানুষকে খুঁজে পাই
যে আমারই প্রতিরূপ, কিন্তু তার চোখে
অদ্ভুত এক দূরত্ব, যেন সে অনেক দূরের কোনো গ্রহ থেকে
আমার জীবনটাকে পর্যবেক্ষণ করছে

আমি এখন আর তোমাকে স্মরণ করি না,
স্মরণ তো কোনো সচেতন কাজ;
তুমি বরং আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো,
অজান্তেই ঘটে যাও,
অপরিহার্যভাবে,
নিঃশব্দে।

তোমার না-থাকা
আমার চারপাশের সবকিছুকে বদলে দিয়েছে
দেয়ালগুলো আগের মতো নেই,
আকাশের রংও বদলে গেছে,
এমনকি বাতাসও এখন
একটু ভারী,
একটু ধীর।

আমি মাঝে মাঝে অনুভব করি
বিরহ আসলে একটি ধীর বিষ,
যা একবার শরীরে প্রবেশ করলে
তা আর বের হয় না,

শুধু ধীরে ধীরে সমস্ত সত্তাকে রূপান্তরিত করে

তুমি নেই,
এই বাক্যটি এতবার বলেছি
যে এখন তা কোনো অর্থ বহন করে না;
বরং তুমি আছোবলাটাই
অধিক সত্য মনে হয়,
কারণ তোমার অনুপস্থিতিই
সবচেয়ে স্থায়ী উপস্থিতি।

আমি এখন কোনো প্রতীক্ষা করি না
প্রতীক্ষা মানে তো ফিরে আসার সম্ভাবনা;
আর আমার বিরহ সম্ভাবনাহীন,
সম্পূর্ণ, নির্দয়ভাবে চূড়ান্ত।

তবু এই চূড়ান্ততার মাঝেও একটি সূক্ষ্ম কম্পন রয়ে যায়
যেন কোথাও, কোনো স্তরে তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক
এখনো সম্পূর্ণ ভাঙেনি, শুধু দৃশ্যমানতা হারিয়েছে।

এখন আমার ভাষা,
আমার চিন্তা,
আমার অস্তিত্বের একমাত্র নির্যাস;
আমি যা কিছু অনুভব করি
সবকিছুই তার ভেতর দিয়ে আসে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...