সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ'রে বৃষ্টি’

 

বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু উপন্যাস আছে, যেগুলো কেবল গল্প বলে না, বরং পাঠকের মনের ভিতর এক ধরনের নীরব আবহ তৈরি করে। বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) রাত ভরে বৃষ্টিতেমনই একটি উপন্যাস। এটি বাহ্যিক ঘটনাবহুল কাহিনি নয়; বরং মানুষের অন্তর্জগতের সূক্ষ্ম কাঁপন, সম্পর্কের অনিশ্চয়তা, স্মৃতির চাপ, এবং অপূর্ণতার মর্মন্তুদ সৌন্দর্যের এক শিল্পিত রূপ। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক যেন কাহিনি না বলে এক ধরনের অনুভব নির্মাণ করছেন। এই অনুভবের কেন্দ্রেই আছে বৃষ্টি, রাত, নিঃসঙ্গতা, এবং মানুষের অস্থির মন। রাত ভরে বৃষ্টিশিরোনামটিই উপন্যাসের কাব্যিক আত্মা প্রকাশ করে। রাত ও বৃষ্টি, দুটোই এমন দুইটি উপাদান, যেগুলো দৃশ্যমান বাস্তবতার চেয়ে মানসিক আবহকেই বেশি ধারণ করে। রাত মানে শুধু অন্ধকার নয়; রাত মানে অন্তর্গত নির্জনতা, নিজের সঙ্গে নিজের মুখোমুখি হওয়ার সময়, এবং মনে চাপা পড়ে থাকা কথাগুলোর জেগে ওঠা। আবার বৃষ্টি মানে কেবল জল পড়া নয়; বৃষ্টি স্মৃতিকে নাড়ায়, বেদনাকে নরম করে, এবং অনুভূতিকে ছড়িয়ে দেয়। এই উপন্যাসে বৃষ্টি যেন মানুষের না-বলা কথার ভাষা। রাতভর বৃষ্টির এই দীর্ঘতা আসলে মানুষের দীর্ঘতর মানসিক যাত্রার প্রতীক। এক রাতের বৃষ্টি যেমন থামে না, তেমনি মানুষের ভিতরের সংকটও সহজে শেষ হয় না। বুদ্ধদেব বসু এই উপন্যাসে কাহিনির চেয়ে মনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আধুনিক উপন্যাসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে বাহ্যিক ঘটনার চেয়ে চেতনার গতিবিধি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাত ভরে বৃষ্টিসেই ধারারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে চরিত্ররা কেবল কাজ করে না; তারা ভাবে, দ্বিধা করে, স্মৃতিতে ফিরে যায়, নিজের অনুভূতিকে প্রশ্ন করে। এই প্রশ্ন করার মধ্যেই উপন্যাসের প্রকৃত নাটক ঘটে। বাইরের দুনিয়ায় হয়তো খুব বেশি কিছু ঘটে না, কিন্তু ভেতরের পৃথিবীতে একটানা সংঘাত, আকর্ষণ, প্রতিরোধ, অনিশ্চয়তা এবং অনুতাপ চলতে থাকে। এই ভেতরের নাটকই বইটিকে গভীর করে তোলে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যিক শক্তি হলো তিনি খুব সাধারণ পরিস্থিতিকেও অসাধারণ মানসিক মাত্রা দিতে পারেন। রাত ভরে বৃষ্টিতে সম্পর্কের মুহূর্তগুলোকে তিনি দৈনন্দিনতা থেকে তুলে এনে এক অস্তিত্বগত স্তরে স্থাপন করেছেন। প্রেম এখানে কেবল রোমান্টিক আবেগ নয়; প্রেম এখানে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, একাকীত্ব ভাঙার চেষ্টা, এবং অন্যকে বুঝতে গিয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার প্রক্রিয়া। কিন্তু এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হয় না। কারণ মানুষকে বোঝা যেমন কঠিন, তেমনি নিজের মনকেও পুরোপুরি বোঝা যায় না। এই অপূর্ণতাই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় সুর।

 

এই উপন্যাসে প্রেমের চেয়ে বেশি প্রবল হয়ে ওঠে বিচ্ছেদের পূর্বাভাস। অনেক সম্পর্ক এমন হয়, যেখানে মিলনের সম্ভাবনার চেয়ে বিচ্ছেদের আশঙ্কাই বেশি থাকে। রাত ভরে বৃষ্টিসেই ধরনের অনুভূতিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধরেছে। এখানে ভালোবাসা আঘাতহীন নয়; বরং ভালোবাসা নিজেই একধরনের আঘাত। কারণ, ভালোবাসা মানুষকে কাছে টানে, আবার একই সঙ্গে দূরের সম্ভাবনাও তৈরি করে। প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যকার ফাঁক যত বাড়ে, সম্পর্ক তত বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বুদ্ধদেব বসু এই ফাঁকটিকে নাটকীয় না করে নীরব করে তুলেছেন। আর নীরব এই ফাঁকই পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি তোলে।

 

উপন্যাসের একটি বিশেষ সাফল্য হলো এর আবহ নির্মাণ। বুদ্ধদেব বসু কেবল ঘটনা সাজাননি, পরিবেশও সাজিয়েছেন আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে। বৃষ্টিভেজা রাত, নির্জনতা, আলোর আবছা খেলা, ভেজা মাটির গন্ধ, আর দূরের নিস্তব্ধতা,এসব কেবল বর্ণনা নয়, মানসিক অবস্থার সম্প্রসারণ। প্রকৃতি এখানে বাইরের দৃশ্য নয়; প্রকৃতি চরিত্রগুলোর ভেতরের অবস্থার প্রতিরূপ। বৃষ্টি যখন নামে, তখন তা কেবল আকাশের ঘটনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে মনস্কতার ঘটনা। এইভাবে প্রকৃতি ও মানসিক জগৎ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের কাব্যময় গদ্য বিরল নয়, কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর নির্মাণে এটি বিশেষ সংযম ও নান্দনিকতায় উজ্জ্বল।

রাত ভরে বৃষ্টিতে সময়ের ব্যবহারও গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সময় সরলরৈখিক নয়। বর্তমানের ভেতরেই অতীত এসে ঢুকে পড়ে, আর অতীতের স্মৃতি বর্তমানকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মানুষ যখন কোনো গভীর অনুভূতির মধ্যে থাকে, তখন সময় আর ঘড়ির কাঁটায় মাপে না; তখন সময় মাপে স্মৃতিতে, হাহাকারে, প্রত্যাশায়, এবং অপেক্ষায়। এই উপন্যাসে সময় যেন থেমে থাকা এক অনুভূতির নাম। রাত যত দীর্ঘ হয়, ততই অতীত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে কাহিনি পড়তে গিয়ে মনে হয়, আমরা কেবল একটি রাতের ঘটনা পড়ছি না; আমরা পড়ছি একাধিক সময়ের সংঘর্ষ। বর্তমানের মধ্যে অতীতের প্রবেশ, এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চিত ছায়া,এই তিনটি সময়বোধ মিলেই উপন্যাসটিকে আধুনিক করে তুলেছে। চরিত্রচিত্রণেও বুদ্ধদেব বসু বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর চরিত্ররা সাধারণ অর্থে নায়ক-নায়িকানয়; তারা জীবন্ত মনস্তত্ত্ব। তাদের প্রত্যেকের ভেতরে আছে আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আত্মরক্ষার প্রবণতা, এবং অন্তর্গত দ্বন্দ্ব। একজন মানুষ একদিকে ভালোবাসতে চায়, অন্যদিকে নিজের নিরাপত্তাও হারাতে চায় না। এই দ্বন্দ্বই তাকে জটিল করে তোলে। বুদ্ধদেব বসু চরিত্রদের কেবল বাহ্যিক আচরণ দিয়ে নির্মাণ করেননি; তিনি তাদের নীরবতাকে, চুপচাপ ভাবনাকে, এবং অনুচ্চারিত কষ্টকেও চরিত্রের অংশ করেছেন। এই কারণে তাঁদের মনে হয় জীবন্ত, কিন্তু অধরা। তারা পাঠকের সামনে সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয় না; বরং একটু দূরে থেকেই নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। এই দূরত্বই তাদের বাস্তব করে। নারীচরিত্রগুলোর উপস্থাপনায়ও উপন্যাসটি তাৎপর্যপূর্ণ। বুদ্ধদেব বসু নারীকে কেবল প্রেমের বস্তু হিসেবে দেখেননি; বরং তাকে অনুভবের, সিদ্ধান্তের এবং অভ্যন্তরীণ জটিলতার একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখেছেন। নারীচরিত্রদের অনুভূতি, সংবেদন, সংশয়, এবং আত্মমর্যাদার সুর উপন্যাসে আলাদা মাত্রা যোগ করে। তারা পুরুষ চরিত্রের ছায়া হয়ে থাকে না; বরং তাদের নিজস্ব মানসিক গভীরতা আছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে আধুনিক মানবিক দৃষ্টিতে সমৃদ্ধ করেছে। ভালোবাসার সম্পর্ক এখানে একমুখী কর্তৃত্বের সম্পর্ক নয়; বরং পারস্পরিক টানাপোড়েনের সম্পর্ক, যেখানে দুজন মানুষই একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করে, আবার ভুলও বোঝে।

 

এই উপন্যাসে নীরবতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত উপন্যাসে সংলাপকে প্রধান মনে করা হয়, কিন্তু রাত ভরে বৃষ্টিতে অনেক সময় নীরবতাই সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য। মানুষ যখন সব কথা বলতে পারে না, তখন তার না-বলা কথাই বেশি সত্যি হয়। বুদ্ধদেব বসু সেই না-বলা কথার শিল্পী। চরিত্রদের মুখের ভাষার চেয়ে মুখে জমে থাকা ভাষাহীনতাই এখানে বেশি অর্থবহ। নীরবতার মধ্য দিয়ে তিনি সম্পর্কের দূরত্ব, মানসিক সংকোচ, এবং গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন। এই নীরবতা কখনো অনিচ্ছার, কখনো লজ্জার, কখনো ক্লান্তির, আবার কখনো তীব্র আবেগের ফল। ফলে উপন্যাসের আসল ভাষা অনেক সময় শব্দে নয়, বিরতিতে প্রকাশিত হয়।


বুদ্ধদেব বসুর গদ্যশৈলীও এই উপন্যাসের একটি বড় আকর্ষণ। তাঁর ভাষা সরল হলেও রিক্ত নয়; অলংকারপূর্ণ হলেও ভারী নয়। তিনি এমনভাবে বাক্য নির্মাণ করেন, যাতে ভাষা একদিকে ভাবের বাহন হয়, অন্যদিকে নিজেই শিল্প হয়ে ওঠে। তাঁর গদ্যে কাব্যিকতা আছে, কিন্তু তা আড়ম্বরপূর্ণ নয়। বরং তা অনুভূতির স্বাভাবিক বিস্তার। রাত ভরে বৃষ্টিপড়তে পড়তে মনে হয়, গদ্য এখানে যেন ছন্দের কাছাকাছি চলে এসেছে। শব্দের ভেতরে শব্দের সুর, বাক্যের ভেতরে একধরনের দুলুনি, আর বর্ণনার মধ্যে আবেগের মৃদু প্রবাহ,এসব মিলেই একটি অনন্য গদ্যভুবন তৈরি করেছে। এই গদ্যশৈলী উপন্যাসের বিষয়বস্তুর সঙ্গে এত ভালোভাবে মিশে গেছে যে, আলাদা করে ভাষা ও কাহিনিকে ভাগ করা যায় না।

 

এই উপন্যাসের আরেকটি বড় দিক হলো আধুনিক মানুষের একাকীত্ব। আধুনিকতা মানুষকে কেবল স্বাধীনতা দেয় না, বিচ্ছিন্নতাও দেয়। রাত ভরে বৃষ্টিসেই বিচ্ছিন্নতার উপন্যাস। এখানে মানুষ মানুষের কাছাকাছি থেকেও দূরে। কথা বলেও না-বলা থেকে যায়। ছুঁয়েও সম্পূর্ণ পাওয়া যায় না। সম্পর্কের এই অসম্পূর্ণতা আধুনিক নাগরিক জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। শহর, সম্পর্ক, মানসিক জটিলতা, এবং ব্যক্তিগত পরিসরের টানাপোড়েন,সব মিলিয়ে মানুষ এখানে একা। কিন্তু এই একাকীত্ব চিৎকার করে প্রকাশ পায় না; বরং নীরবতার মতো ঘিরে থাকে। এই নীরব একাকীত্বই উপন্যাসকে গভীর, সংবেদনশীল এবং আধুনিক করেছে। রাত ভরে বৃষ্টিকে যদি কেবল প্রেমের উপন্যাস বলা হয়, তবে এর বড় অংশ অনুচ্চারিত থেকে যাবে। এটি প্রেমের উপন্যাস বটে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি এটি মানুষের অস্তিত্বের উপন্যাস। এখানে প্রশ্ন উঠেছে,মানুষ কেন ভালোবাসে, কেন বিচ্ছিন্ন হয়, কেন মনে হয় কাছে এসেও অনেক দূরে থাকা যায়, কেন স্মৃতি এত শক্তিশালী, আর কেন অপূর্ণতাই অনেক সময় পূর্ণতার চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়। বুদ্ধদেব বসু এই প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর দেন না। বরং তিনি এমন একটি সাহিত্যিক আবহ তৈরি করেন, যেখানে পাঠক নিজেই উত্তর খুঁজতে বাধ্য হয়। এই উত্তর-অন্বেষণই উপন্যাসের আসল শক্তি।


বৃষ্টি এখানে একধরনের পরিষ্কার করা শক্তি হিসেবেও কাজ করে। কিন্তু সেই পরিষ্কার হওয়া বাহ্যিক নয়, ভেতরের। বৃষ্টি যেন মনে জমে থাকা ধুলো ধুয়ে দেয়, যদিও সেই ধোয়া শেষ পর্যন্ত প্রশান্তি আনে কি না, তা নিশ্চিত নয়। অনেক সময় বৃষ্টির পরে মাটি যেমন আরও কাদা হয়, তেমনি মানুষের মনও অনেক সময় আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই বিরোধাভাসই বুদ্ধদেব বসুর শিল্পচেতনার সৌন্দর্য। তিনি সরল সমাধানে বিশ্বাসী নন; তিনি জানেন জীবনের অনেক অনুভূতির কোনো সহজ নিষ্পত্তি নেই। তাই তাঁর উপন্যাসে বৃষ্টি কখনো মুক্তি, কখনো বিষাদ, কখনো স্মৃতির ডাক, আবার কখনো অনিবার্য অনিশ্চয়তার প্রতীক। রাত ভরে বৃষ্টিতে দেহ ও মনের সম্পর্কও সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে। মানুষের অনুভব কেবল বুদ্ধির স্তরে থাকে না; তা দেহের অভিজ্ঞতাতেও মিশে যায়। রাতের নীরবতা, বৃষ্টির শব্দ, ভেজা হাওয়া, স্পর্শের অনুপস্থিতি, এসব শরীরী অভিজ্ঞতাই মানসিক আবহকে গঠন করে। বুদ্ধদেব বসু এই দেহ-সংবেদনকে অত্যন্ত নরমভাবে ব্যবহার করেছেন। ফলে উপন্যাসের আবেগ কৃত্রিম মনে হয় না; তা শরীর ও মনের যৌথ সত্য হয়ে ওঠে। এই দিকটি বাংলা উপন্যাসে আধুনিক সংবেদনশীলতার পরিচায়ক। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় সুর যদি এক কথায় বলতে হয়, তবে তা হলো অপূর্ণতা। কিন্তু এই অপূর্ণতা ব্যর্থতা নয়। বরং এই অপূর্ণতাই জীবনের গভীরতম সত্য। মানুষ সবকিছু পায় না, সব সম্পর্ক টেকে না, সব অনুভূতির স্পষ্ট নাম থাকে না,এই সত্যকে বুদ্ধদেব বসু সৌন্দর্যে রূপান্তর করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে অপূর্ণতাও কাব্যিক, বিচ্ছেদও অর্থবহ, এবং না-পাওয়াও একধরনের অভিজ্ঞতা। এই দর্শন উপন্যাসটিকে কেবল আবেগময় করে না, দার্শনিকও করে তোলে। তাই রাত ভরে বৃষ্টিপড়া মানে কেবল কাহিনি জানা নয়; মানে মানবজীবনের অপূর্ণ সৌন্দর্য উপলব্ধি করা।

 

সবশেষে বলা যায়, বুদ্ধদেব বসুর রাত ভরে বৃষ্টিবাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কাব্যময় এবং মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। এতে প্রেম আছে, কিন্তু তা সহজ নয়; বৃষ্টি আছে, কিন্তু তা কেবল প্রকৃতির নয়; রাত আছে, কিন্তু তা কেবল সময়ের নয়; আর চরিত্র আছে, কিন্তু তারা কেবল কাহিনির বাহক নয়,তারা মানুষের অন্তর্গত সত্যের প্রতীক। এই উপন্যাস আমাদের শেখায় যে, জীবনের সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলো অনেক সময় উচ্চস্বরে বলে ওঠে না; তারা নীরবে বৃষ্টি হয়ে নামে, রাত হয়ে ঘিরে রাখে, আর স্মৃতি হয়ে ভেতরে থেকে যায়। এই নীরব গভীরতাই রাত ভরে বৃষ্টি’-কে বাংলা সাহিত্যের এক চিরস্মরণীয় সৃষ্টি করে তুলেছে।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...