সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নতুন বইয়ের ঘ্রান

 

নতুন বইয়ের ঘ্রান, এই একটিমাত্র ঘ্রানেই যেন সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব ক’রে তোলার গোপন ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে। পুরোনো দিনের ধুলো, ঘুমন্ত দুপুর, জানালার বাইরে থেমে-থেমে নামা রোদ, স্কুলব্যাগের কোণে সেঁটে থাকা শৈশবের নিরীহ ভয়, আর একরাশ অজানা সম্ভাবনা, সব মিলিয়ে বইয়ের সেই প্রথম গন্ধটি এমন এক অনুভব, যা শুধু নাকে আসে না, মনকেও স্পর্শ করে; মনে হয়, কেউ যেন দূর থেকে কোনো অদৃশ্য দরজা খুলে দিল, আর সেই দরজা পেরিয়ে হঠাৎ এক নতুন আলোর ঘরে প্রবেশ করলাম। নতুন বই হাতে নিলে প্রথম যে অনুভূতিটি জেগে ওঠে, তা হলো আকাঙ্ক্ষা; পাতা উল্টানোর আগে থেকেই মনে হয়, কোথাও হয়তো আমারই মতো এক নিঃসঙ্গ চিন্তা দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও হয়তো কোনো অপরিচিত লেখক শব্দের জালে লুকিয়ে রেখেছেন আমার না-বলা কথাগুলো, কোথাও হয়তো এমন এক পংক্তি অপেক্ষা করছে, যেটি আমাকে অচেনা ভোরের দিকে নিয়ে যাবে। বই কেবল কাগজের বাঁধাই নয়, কেবল ছাপার কালি নয়, কেবল মলাটের রং নয়; বই এক ধরনের নীরব যাত্রা, এক ধরনের ধীর অথচ গভীর উচ্চারণ, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরেই বারবার ফিরে আসে এবং নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার ক’রে। আর সেই যাত্রার দরজায় যে গন্ধটি প্রথম পাহারাদার হয়ে দাঁড়ায়, সেটাই নতুন বইয়ের ঘ্রান। কে জানে, এ গন্ধ কিসের সঙ্গে মিশে আছে? কাগজের তন্তু, কালি, আঠা, ছাপাখানার মেশিনের গুমগুমে শব্দ, ট্রাকের পেছনে জমে থাকা দীর্ঘ পথ, বুকসেলারদের যত্ন, পাঠকের অপেক্ষা, সব মিলিয়ে যেন এক ধরণের নির্মল জন্মঘ্রান। নতুন বইয়ের ঘ্রান আমাকে সবসময় একটু থামিয়ে দেয়। পৃথিবী তখনও তার স্বাভাবিক হইচইয়ে ব্যস্ত, মানুষ তখনও দৌড়াচ্ছে, বাজার তখনও তর্কে মুখর, বাসস্ট্যান্ডে তখনও ক্লান্ত মানুষগুলো নীল ধোঁয়া আর ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে; কিন্তু বইয়ের পাতা খুললেই অন্য এক সময় এসে উপস্থিত হয়। সেই সময়ের কোনো ঘড়ি নেই, কোনো তাড়া নেই, কোনো চিৎকার নেই। সেখানে আছে শুধু ধীরতা, মনোযোগ, এবং শব্দের সঙ্গে শব্দের একান্ত আলাপ। নতুন বইয়ের ঘ্রান যেন বলে দেয়, দৌড়িও না, দাঁড়াও, দেখো, জীবনের মধ্যে এমনও কিছু আছে যা শেষ হওয়ার জন্য নয়, বারবার শুরু হওয়ার জন্য। আমি কখনো কখনো ভাবি, মানুষ কেন এত ব্যস্ত? কেন এত তাড়াহুড়ো? কেন সে নিজের চেতনার দরজায় একটু দাঁড়ায় না, নিজের ভেতরের ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেখে না? বইয়ের ঘ্রান সেই ভুলে যাওয়া থামার ডাক। এটি আমাকে জানিয়ে দেয় যে, জীবন কেবল কাজের তালিকা নয়, অর্জনের হিসাব নয়, সম্পর্কের জটিল হিসাব-নিকাশও নয়; জীবন হলো মনকে কোনো এক নিঃশব্দ মুহূর্তে বসিয়ে তার সামনে একটি নতুন পৃথিবী মেলে ধরা। নতুন বই খুললে আমার মনে হয়, আমি কোনো গোপন সম্পর্কের অংশ হ’য়ে গেলাম। পাতার ভাঁজে-ভাঁজে লুকানো আছে অচেনা মানচিত্র, আর সেই মানচিত্রে আমার নিজেরই ছায়া হাঁটছে। প্রতিটি নতুন বই যেন একটি ছোট নৌকা, আর তার ঘ্রান যেন নোনা জলের বদলে কাগজের স্নিগ্ধতা বহন ক’রে; এই নৌকা আমাকে ভাষার নদীতে ভাসিয়ে দেয়, যেখানে তীর নেই বলে ভয়ও নেই, শুধুই ভেসে চলা, শুধুই পৌঁছনোর অবিরাম চেষ্টা। বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় যে ঘ্রান আসে, তা আমার কাছে জন্মের ঘ্রানের মতো; কারণ সে ঘ্রান জানিয়ে দেয়, এখানে এখনো কিছুই বলা হয়নি, এখানেই সব বলা বাকি আছে। নতুন বইয়ের কাছে দাঁড়ালে মানুষ একটু শিশুর মতো হ’য়ে যায়। সে জিজ্ঞাসু, সে অবাক, সে বিশ্বাসী। সে চায় পাতার ভেতর থেকে ঝ’রে পড়ুক কোনো বিস্ময়, কোনো শোক, কোনো তীব্র প্রেম, কোনো নির্মম সত্য, অথবা অন্তত এমন একটি বাক্য, যা তাকে দিনশেষে নিজের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে। নতুন বইয়ের ঘ্রান সেই প্রত্যাশাকে জাগিয়ে তোলে। এই গন্ধে কোনো উদ্ধততা নেই, আছে কোমল আহ্বান; কোনো হুকুম নেই, আছে আমন্ত্রণ। মনে হয়, কেউ মৃদুস্বরে বলছে, এসো, এখানে কিছু কথা আছে, কিছু নীরবতা আছে, কিছু শব্দ আছে যা তোমার ভেতরের অন্ধকারে আলো দিতে পারে। আর সত্যি বলতে, বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক সময় প্রার্থনার মতো; মানুষ বইয়ের পাতায় মুখ রেখে জানে না সে কী খুঁজছে, কিন্তু সে জানে, কিছু একটা সে পেতে চায়, শান্তি, বোধ, উত্তাপ, শোকের ভাষা, সুখের ব্যাকরণ, অথবা অন্তত একটুখানি সঙ্গ। নতুন বইয়ের ঘ্রান সেই খোঁজকে গভীর ক’রে। কখনো মনে হয়, এ গন্ধ শুধু নতুন বইয়ের নয়, এ গন্ধ আসলে নতুন সম্ভাবনার। জীবনে যখন সবকিছুই পুরোনো লাগে, যখন একই রাস্তা, একই মুখ, একই ক্লান্তি, একই অনিশ্চয়তা মনের ভেতরে পাকা দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, তখন একটি নতুন বইয়ের গন্ধ সেই দেয়ালে সূক্ষ্ম ফাটল ধরায়। ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়ে আলো। আর আলো ঢুকলেই মানুষ জানে, সব শেষ হয়ে যায়নি। কিছু একটা এখনো লেখা যায়, বোঝা যায়, বদলানো যায়। বইয়ের গন্ধ তখন জীবনের গন্ধে মিশে গিয়ে এক নতুন মানে তৈরি ক’রে। এই মানে কখনো স্পষ্ট হয় না, তবু অনুভূত হয়। যেমন বৃষ্টির আগে বাতাসে যে অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আসে, তাকে কেউ নাম দিতে পারে না, কিন্তু সবাই বুঝতে পারে, কিছু আসছে; নতুন বইয়ের ঘ্রানও তেমন, কিছু আসছে, শব্দ, উপলব্ধি, অনুভব, হয়তো এক টুকরো মুক্তি। আমি বইয়ের দোকানে ঢুকলেই প্রথমে সেদিকেই টানে, যেখানে তাজা ছাপা বইয়ের স্তূপ রাখা আছে। একরাশ নতুন কাগজের নরম গন্ধ, কালি-ভেজা অদৃশ্য উষ্ণতা, আর তাকের মধ্যে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা নীরব সম্ভাবনা, এইসবের সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রায় ভুলে যাই কেন এসেছি। মনে হয়, আমি কোনো পাঠক নই, আমি এক ধরনের সন্ধানী; আর এই বইগুলো আমার জন্যই অপেক্ষা করছে, যদিও তারা জানে না ঠিক কোনটিকে আমি বেছে নেব। কখনো একটা বইয়ের মলাট দেখে থমকে যাই, কখনো শিরোনামে, কখনো লেখকের নামের ভিতরে জমে থাকা দীর্ঘ ইতিহাসে। কিন্তু তারও আগে, অনেক আগে, গন্ধ আমাকে ছুঁয়ে ফেলে। নতুন বইয়ের ঘ্রান এমন এক অনুভব, যা চোখের চেয়েও দ্রুত কাজ করে; চোখ তখনো মলাট পড়ছে, মন তখনো লেখকের নাম বিচার করছে, কিন্তু নাক ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, এখানে কোনো না কোনো বিস্ময় আছে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এই ঘ্রান বয়স মানে না। শিশু, কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ, সবাই বইয়ের নতুন গন্ধে একটু বদলে যায়। শিশুর চোখে এটি খেলনার মতো, কিশোরের চোখে এটি স্বপ্নের মতো, তরুণের চোখে এটি আত্মসন্ধানের আহ্বান, আর বৃদ্ধের চোখে হয়তো এটি হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর দিকে ফেরার সেতু। কারণ নতুন বইয়ের ঘ্রান শুধুই ভবিষ্যতের নয়; এতে অতীতও আছে। স্কুলের বেঞ্চ, পরীক্ষার প্রস্তুতি, রাতজাগা আলো, লাইব্রেরির ধুলো, বাবার হাতে ধরা বই, মায়ের সাজিয়ে রাখা খাতা, প্রথম পড়া গল্প, প্রথম মুখস্থ কবিতা, প্রথম প্রেমের ফাঁকে লুকোনো পাতা, সবকিছুই কোথাও গিয়ে মিশে থাকে এই ঘ্রানে। তাই নতুন বইয়ের গন্ধ মানে কেবল বর্তমানের আনন্দ নয়; এটি স্মৃতিরও উত্থান। সে স্মৃতি কখনো মিষ্টি, কখনো বিষণ্ন, কখনো অপূর্ণ, কিন্তু সবসময় জীবন্ত। বইয়ের গন্ধ মানুষকে তার হারানো সত্তার কাছে ফিরিয়ে নেয়। আমরা যতই আধুনিক হই, যতই পর্দার আলোতে জীবন কাটাই, যতই দ্রুততার পূজারি হই, তবু একটি নতুন বইয়ের গন্ধের সামনে এসে দাঁড়ালে আমাদের ভেতরের প্রাচীন মানুষটি জেগে ওঠে। সে মানুষ জানত, কাগজের পাতায় নেমে আসে সময়ের সুর; সে মানুষ জানত, শব্দ দিয়ে জগৎ গড়া যায়; সে মানুষ জানত, নীরবতার মধ্যেও একটি ভাষা আছে। নতুন বইয়ের ঘ্রান সেই প্রাচীন মানুষটিকে পুনরুদ্ধার ক’রে। সে আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি কেবল তথ্যগ্রাহক নই, আমি অনুভবের অধিকারী। কেবল চোখে দেখা, কানে শোনা, হাতে ধরা, এসবের বাইরেও আমার একটা ভেতরের ইন্দ্রিয় আছে, যা পাতার প্রথম গন্ধ পেলে খুলে যায়। সেই ইন্দ্রিয় দিয়ে আমি শব্দের তাপ, বাক্যের শীতলতা, চরিত্রের নিঃশ্বাস, কাহিনির গোপন রক্তপ্রবাহ টের পাই। নতুন বইয়ের ঘ্রান আমাকে শিখিয়েছে যে সাহিত্য কোনো অলংকার নয়; এটি জীবনেরই আরেক নাম, অন্য সুরে উচ্চারিত। আর নতুন বই সেই সুরের প্রথম সঞ্চার। কখনো মনে হয়, নতুন বইয়ের ঘ্রান আমাকে নিজের কাছেই ক্ষমা চাইতে শেখায়। কতবার পড়ার ইচ্ছাকে পিছিয়ে দিয়েছি, কতবার আত্মাকে নির্বাক রেখেছি, কতবার গভীর কোনো অনুভূতিকে অযত্নে ফেলে রেখেছি, একটি নতুন বইয়ের পাতার গন্ধ আমাকে সে সব ভুলের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবু সে গন্ধে অভিযোগ নেই, আছে পুনরারম্ভের উদারতা। বই যেন বলে, দেরি হয়ে গেলেও দরজা বন্ধ হয় না; এখনো সময় আছে; এখনো পাতা খোলা যায়; এখনো তুমি নিজেকে নতুন ক’রে পাঠ করতে পারো। এই উদারতা বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি। মানুষ যখন মানুষকে ক্লান্ত ক’রে, শহর যখন শহরকে ক্লান্ত ক’রে, সম্পর্ক যখন সম্পর্ককে ক্লান্ত ক’রে, তখন বই তার নতুন গন্ধ নিয়ে এসে এক নীরব আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। সে কিছু দাবি করে না, শুধু উপস্থিত থাকে। আর সেই উপস্থিতির মধ্যেই এক ধরনের সান্ত্বনা আছে। নতুন বইয়ের ঘ্রান আমার কাছে অনেকটা ভোরের মতো, অন্ধকার ভাঙার আগের নরম আলোকছটা, যার ঠিকানা জানা নেই, কিন্তু আগমন নিশ্চিত। এ গন্ধে ভয়ে একটু কোমলতা আসে, ক্লান্তিতে একটু জাগরণ, একাকীত্বে একটু সঙ্গ। নতুন বইয়ের পাতায় নাক রেখে আমি প্রায়শই ভাবি, মানুষ আসলে গন্ধ দিয়ে কত কিছু মনে রাখে! মায়ের আঁচল, বর্ষার মাটি, পুরোনো কাঠের আলমারি, স্কুলের ব্যাগ, জন্মদিনের কেক, প্রিয়জনের চিঠি, এসবের মতোই বইয়ের নতুন ঘ্রানও মনের ভেতর স্থায়ী খোপ তৈরি ক’রে দেয়। বহু বছর পরেও কোনো লাইব্রেরি, কোনো বইমেলা, কোনো ছাপাখানা, কোনো পুরোনো আলমারি খুললে সেই গন্ধ আবার ফিরে আসে এবং মনে হয়, আমি যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। এই গন্ধ আমাকে শেখায়, সব নতুন জিনিসই কেবল নতুন থাকে না; তাদের ভেতরে আগের কোনো গোপন উত্তরাধিকারও লুকানো থাকে। একটি নতুন বইয়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ যেমন থাকে, তেমনি থাকে ইতিহাসও। কী গভীর আশ্চর্য! একটি পাতার জন্মের ভেতর বহু হাতের শ্রম, বহু ভাবনার ভাঁজ, বহু স্বপ্নের জেগে থাকা, বহু নির্ঘুম রাত, বহু সংশোধন, বহু দ্বিধা, বহু অপেক্ষা মিশে থাকে। সেই শ্রমের নির্যাসই হয়তো বইয়ের ঘ্রান। তাই যখন আমরা বলি, নতুন বইয়ের গন্ধ ভালো লাগে, তখন আমরা আসলে মানুষের শ্রম, সাহিত্যের জন্ম, কল্পনার গৃহনির্মাণ, সব কিছুকেই একসঙ্গে ভালোবাসি। কখনো কখনো আমি একটি নতুন বইকে খুব ধীরে হাতে নিই, যেন সে ভেঙে যাবে, যেন সে শব্দের পাখির মতো উড়ে যাবে। পাতাগুলো আলতো ক’রে ছুঁই, তারপর নাকে তুলে ধরি, তারপর চোখ বুজে থাকি। সেই মুহূর্তে মনে হয়, পৃথিবীর সব কোলাহল দূরে সরে গেছে। আছে শুধু এক নতুন গ্রন্থ, এক নতুন গন্ধ, আর আমার ভেতরে জেগে উঠতে থাকা এক জিজ্ঞাসু নীরবতা। আমি বুঝি, মানুষ যত দিন কাগজকে স্পর্শ করতে জানবে, যত দিন বইয়ের গন্ধকে চিনবে, তত দিন সে একেবারে যান্ত্রিক হ’য়ে যেতে পারবে না। কারণ বই তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে যে, ভাবনা কেবল গতি নয়, গভীরতাও; জ্ঞান কেবল তথ্য নয়, অনুভূতিও। নতুন বইয়ের ঘ্রান তাই কোনো সাধারণ ঘ্রান নয়; এটি একধরনের নৈতিক নরমতা, একধরনের মানসিক সংস্কার, একধরনের আত্মিক সৌজন্য। যে মানুষ বইয়ের নতুন ঘ্রানকে ভালোবাসে, সে সম্ভবত বিস্ময়কে ভালোবাসতে জানে, অজানাকে ভয় না পেয়ে তাকে আলিঙ্গন করতে জানে, আর নিজের ভেতরের শূন্যতাকে শব্দ দিয়ে ভরাট করতে জানে। নতুন বইয়ের ঘ্রান আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, পড়া মানে কেবল চোখের কাজ নয়, এটি সমগ্র অস্তিত্বের কাজ। মন পড়ে, স্মৃতি পড়ে, অভিজ্ঞতা পড়ে, আশা পড়ে, বিষণ্নতা পড়ে। আর এই পড়ার শুরুতেই থাকে সেই নিরব অথচ উজ্জ্বল ঘ্রান। আমি চাই, জীবনের শেষে যখন কোনোদিন আমার স্মৃতির আলমারি খোলা হবে, তখন যেন সেখানে নতুন বইয়ের গন্ধের মতো কিছু বেঁচে থাকে। হয়তো সেটাই হবে আমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উত্তরাধিকার, একটি গন্ধ, যা আমাকে পড়তে শেখায়, ভাবতে শেখায়, মানুষ হতে শেখায়। কারণ বইয়ের গন্ধের ভেতরে এমন এক অনন্ত আহ্বান আছে, যা বারবার বলে, জ্ঞানকে ভয় পেয়ো না, অনুভূতিকে লুকিও না, শব্দের কাছে যাও, কারণ শব্দই শেষ পর্যন্ত তোমাকে তোমার নিজের কাছে ফিরিয়ে দেবে। নতুন বইয়ের ঘ্রান তাই আমার কাছে কেবল আনন্দ নয়, একটি দর্শন; কেবল অনুভব নয়, একটি শিক্ষা; কেবল সৌন্দর্য নয়, একটি জীবনের পুনর্নিমাণ। এ গন্ধ আমাকে জানায়, পৃথিবী যতই কঠিন হোক, মানুষের ভাবনা ততই কোমল হতে পারে; সময় যতই রুক্ষ হোক, বাক্য ততই স্নিগ্ধ হতে পারে; আর জীবন যতই অনিশ্চিত হোক, একটি নতুন বইয়ের পাতায় থাকে শুরু করার অধিকার। সেই অধিকার নিয়েই আমি বারবার বই খুলে বসি, গন্ধ নিই, পাতা উল্টাই, আর মনে মনে বলি, হে নতুন শব্দ, হে নতুন বোধ, হে নীরব আলোক, তুমি এসো; তুমি আমার ক্লান্ত দিনকে একটু বদলে দাও; তুমি আমার অচেনা রাতকে একটু কম ভয়ংকর করো; তুমি আমাকে শেখাও, প্রতিটি নতুন বই আসলে নতুন ক’রে বেঁচে ওঠারই নাম।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...