বনমালীপুর নামটি প্রথম শুনি এক বর্ষার রাতে , যখন শহরের আকাশে বৃষ্টি নেমেছিল এমনভাবে , যেন কারও পুরনো কান্না গলিপথ বেয়ে নেমে আসছে। আমি তখন ঢাকায় থাকি ; কাগজের পাতায় শব্দ সাজাই , কাটা-ছেঁড়া বাক্যকে সমান করি , আর নিজের জীবনকে যতটা সম্ভব শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার ভান করি। কিন্তু মনের ভিতরে এমন কিছু জায়গা থাকে , যা কখনও শৃঙ্খলার অধীন হয় না। বনমালীপুর সেরকমই একটি নাম হ ’ য়ে উঠল , অজানা অথচ পরিচিত , দূরের অথচ অসম্ভব নিকটবর্তী। এই নামটি আমাকে দিলেন আমার মা। তিনি খুব কমই অতীতের কথা বলতেন। তাঁর মুখ ছিল এমনই শান্ত , যেন জীবনের বড় বড় ঢেউ বহু আগেই তাঁর ওপর আছড়ে পড়েছে , আর তার পর তিনি শুধু ভিজে কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় বসে আছেন। একদিন হঠাৎ তিনি বললেন , ‘ তোর নানার বাড়ি ছিল বনমালীপুরে। ’ এতটুকুই। আমি জিজ্ঞেস করলাম , ‘ কেমন গ্রাম ?’ মা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন , ‘ নদীর কাছাকাছি। কাঁঠালগাছ আর বকুলফুলের গন্ধ থাকত। আর ছিল এক মেয়ে , যে গান গাইত। ’ তারপর তিনি চুপ ক ’ রে গেলেন। সেই ‘ এক মেয়ে ’ শব্দটি আমার ভেতরে অনেকদিন ধ ’ রে বেঁচে রইল। কে সে ? কী তার নাম ? কেন মায়ের কণ্ঠে সেই স্মৃতি এত ধীরে...
মামুনুর রহমান, সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অদ্বিতীয় সংবেদনশীল কণ্ঠ। তাঁর লেখায় জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোও নতুন এক আলোর আভায় ফু’টে ওঠে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, কবিতা কেবল শব্দের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি সেই নীরব ভাষা, যা অন্তরের গভীরে বাস ক’রে, পাঠকের অভ্যন্তরীণ অনুভূতির সঙ্গে মিশে এক অনন্য প্রতিধ্বনি সৃষ্টি ক’রে। তেমনি তাঁর গদ্য রচনা পাঠককে শুধু ভাবায় না, বরং অনুভব করায়, জীবনের ক্ষুদ্রতম ছোঁয়ায়ও গভীর মানসিক ধ্বনিতে স্পন্দিত ক’রে। তিনি খেয়াল রাখেন পাঠকের মন ও মননশীল দিকটি।