বনমালীপুর নামটি প্রথম শুনি এক
বর্ষার রাতে, যখন শহরের আকাশে বৃষ্টি নেমেছিল এমনভাবে, যেন
কারও পুরনো কান্না গলিপথ বেয়ে নেমে আসছে। আমি তখন ঢাকায় থাকি; কাগজের পাতায় শব্দ সাজাই, কাটা-ছেঁড়া
বাক্যকে সমান করি, আর নিজের জীবনকে যতটা সম্ভব শৃঙ্খলাবদ্ধ
রাখার ভান করি। কিন্তু মনের ভিতরে এমন কিছু জায়গা থাকে, যা
কখনও শৃঙ্খলার অধীন হয় না। বনমালীপুর সেরকমই একটি নাম হ’য়ে
উঠল, অজানা অথচ পরিচিত, দূরের
অথচ অসম্ভব নিকটবর্তী।
এই নামটি আমাকে দিলেন আমার মা।
তিনি খুব কমই অতীতের কথা বলতেন। তাঁর মুখ ছিল এমনই শান্ত, যেন জীবনের
বড় বড় ঢেউ বহু আগেই তাঁর ওপর আছড়ে পড়েছে, আর তার পর
তিনি শুধু ভিজে কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় বসে আছেন। একদিন হঠাৎ তিনি বললেন, ‘তোর নানার বাড়ি ছিল বনমালীপুরে।’ এতটুকুই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন গ্রাম?’ মা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নদীর
কাছাকাছি। কাঁঠালগাছ আর বকুলফুলের গন্ধ থাকত। আর ছিল এক মেয়ে, যে গান গাইত।’ তারপর তিনি চুপ ক’রে গেলেন।
সেই ‘এক মেয়ে’
শব্দটি আমার ভেতরে অনেকদিন ধ’রে বেঁচে
রইল। কে সে? কী তার নাম? কেন
মায়ের কণ্ঠে সেই স্মৃতি এত ধীরে, এত সতর্কভাবে ফিরে এল?
আমি তখন বুঝতে পারিনি, একটি গ্রামের
নামের ভিতর কখনও কখনও একটি মানুষের সমস্ত অসমাপ্ত জীবন লুকিয়ে থাকে।
বছরের শেষে আমার খালা মারা গেলেন।
তাঁর রেখে যাওয়া পুরনো কাগজপত্র, ভাঙা অ্যালবাম, চাবির
গুচ্ছ, আর একটি জংধরা লোহার সিন্দুক আমাকে দেওয়া হল।
সিন্দুকের ভিতরে কিছু মূল্যবান কিছু ছিল না, জমির দলিল,
স্কুলের সনদ, কয়েকটি চিঠি, আর হলদেটে হ’য়ে যাওয়া এক নীলখাতা। খাতার
মলাটে কালি-ফিকে হাতে লেখা: ‘বনমালীপুর, ১৯৭১’। ভেতরে কিছু পাতায় ছিল
গ্রামের মাটির গন্ধ,
কিছু পাতায় ছিল এক তরুণীর হাতের লেখা, আর
কোথাও কোথাও এমন সব বাক্য যা কেবল প্রেমের মানুষেরাই লেখে যে বাক্যের অর্থের চেয়ে তার
কাঁপন বেশি সত্য।
নীলখাতাটি পড়ে আমার মনে হল, বনমালীপুরে
আমাকে যেতে হবে।
আমি গিয়েছিলাম ফাল্গুনের শেষে।
শহর থেকে দূরত্ব যত বাড়ছিল, ততই আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা জমতে লাগল।
ট্রেন, বাস, নৌকা, এই তিনটি বাহন যেন আমাকে ধীরে ধীরে বর্তমানের বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল।
নদীর পারে পৌঁছোতেই বিকেল পড়ে গেছে। জল ছিল ঘোলা, আকাশ
ছিল ধূসর, আর বাতাসে কচুরিপানার আর্দ্র গন্ধ। সেখান থেকে
হেঁটে, কখনও বালুর উপর, কখনও
কাঁচা রাস্তার উপর, আমি বনমালীপুর গ্রামে পৌঁছোলাম।
গ্রামটি প্রথম দেখায় খুব সাধারণ।
নোংরা নয়, সুন্দরও নয় কিন্তু একধরনের নীরব মহিমা ছিল তার মধ্যে। ঘরের ছাউনি খড়ের, উঠোনে কলাগাছ, চারপাশে ধানের জমি। এখানে
প্রকৃতি যেন নিজের সৌন্দর্য নিয়ে চিৎকার করে না; সে
চুপচাপ থাকে, অথচ তার উপস্থিতি সর্বত্র। দূরে একটি পুকুর,
পুকুরের ধারে কাশবন, আর তার পাশেই একটি
পুরনো, অর্ধভাঙা বাড়ি। বাড়িটির দেয়ালের রঙ মুছে
গিয়েছিল, কিন্তু জানালার কাঠামোয় এখনও একসময়ের
রুচিশীলতার ছাপ ছিল। মনে হল, এখানে এক সময় কেউ বই পড়ত,
কেউ সন্ধ্যায় গান করত, কেউ ফুল সাজাত এবং
সেইসব আচরণ বাড়ির ইটের সঙ্গে মিশে এখনো কোথাও র’য়ে
গেছে।
বাড়িটির পাশে এক বৃদ্ধ বসেছিলেন।
হাতে বাঁশের লাঠি, চোখে গভীর ক্লান্তি, কিন্তু মুখের রেখায় এমন
এক ধৈর্য ছিল যে মানুষটির দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তিনি এই
গ্রামের বহু ঋতুর সঙ্গে আলাপ করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই বাড়িটা কার ছিল?’
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখন কারও
নয়। আগে ছিল রায়বাবুদের।’
‘আর এখন?’
তিনি হেসে ফেললেন। ‘এখন স্মৃতির।’
এই উত্তরটি এতটাই সহজ অথচ এতটাই
নিখুঁত ছিল যে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম, ‘আমি
বনমালীপুর নিয়ে কিছু পুরনো কাগজ খুঁজছি।’
‘কাগজ? তাহলে
শিমুলতলার বাড়িতে যান,’ বৃদ্ধ বললেন। ‘ওখানে তামান্ন থাকে। পুরনো বই, খাতা, চিঠি সব
ওর কাছে যায়।’
তামান্ন নামটি আমার কানে কেমন যেন
বাজল। হয়তো কারণ, নামটির মধ্যেই ছিল বসন্তের গন্ধ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ তামান্ন কে?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘স্কুলের
মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে। পড়াশোনায় ভালো। মুখে কম কথা, মাথায়
বেশি। আর চোখে যেন সারাদিনের আলো জমে থাকে।’
সন্ধ্যায় আমি শিমুলতলার বাড়ির
দিকে গেলাম।
বাড়িটি ছোট, কিন্তু উঠোনে
শিমুলগাছ ছিল, আর সেই গাছের নিচে একখানা কাঠের বেঞ্চ।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমি কড়া নাড়তে যাব, এমন সময় ভিতর
থেকে এক নারীকণ্ঠ শুনতে পেলাম, ‘কে?’
‘আমি... শহর থেকে এসেছি,’ বললাম। ‘বনমালীপুরের পুরনো ইতিহাস জানতে চাই।’
দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়াল যে
মেয়েটি, সে প্রথম দেখায় সাধারণ মনে হলেও, দ্বিতীয়বার
তাকাতেই বোঝা গেল, সে সাধারণ নয়। মুখশ্রী অনাড়ম্বর,
কিন্তু চোখ দুটি অদ্ভুত গভীর। শাড়ি পরে আছে ম্লান নীল রঙের,
কপালে একটুও প্রসাধন নেই। তবু তাঁর উপস্থিতি ঘরের বাতাসকে যেন
বদলে দিল।
‘আপনি কাগজপত্রের জন্য এসেছেন?’ সে জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ।’
‘ভেতরে আসুন।’
আমি ভেতরে ঢুকলাম। ঘরের এক কোণে
বইয়ের তাক, আর পাশে পুরনো একটি টেবিল। টেবিলের ওপর খোলা ছিল একটি স্কুলের খাতা,
তাতে কচি হাতের লেখা, ত্রুটি-সংশোধন,
লাল কালি। দেয়ালে একটি বড় আয়না, যার
কাচে সামান্য দাগ। জানালা দিয়ে পুকুরের দিকটা দেখা যাচ্ছিল।
তামান্ন আমাকে বসতে বলল। তারপর চা দিয়ে, শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি কিসের খোঁজে এসেছেন?’
আমি সিন্দুকের কথা বললাম, নীলখাতার কথা
বললাম, আর শেষ পর্যন্ত খাতার একটি পাতা খুলে তার সামনে
ধরলাম। পাতার ওপর লেখা ছিল:
‘তামান্ন যদি একদিন বড় হ’য়ে ওঠে, তবে সে বুঝবে প্রেম কখনও সহজ নয়, কিন্তু সত্য। সে আরও
বুঝবে, গ্রামের মেয়েদের হাসির নিচে কত না-হাসা জমে থাকে।’
তামান্ন পাতা পড়ে তৎক্ষণাৎ কিছু
বলল না। শুধু জানালার বাইরে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর নরম স্বরে বলল, ‘এই লেখা আমার
মায়ের।’
‘আপনার মা?’
‘হ্যাঁ। তিনি ছিলেন এই গ্রামের
স্কুলশিক্ষিকা। আমি যখন খুব ছোট, তিনি মারা যান। বাবার
কাছেই শুনেছি, তাঁর খাতায় এমন অনেক লেখা ছিল।’
আমি চমকে গেলাম। খাতার পাতায় যে ‘ তামান্ন’
ছিল, সে কি এই মেয়েই? নাকি কোনও পুরনো যুগের আরেক তামান্ন? আমি
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নাম কি তামান্ন?’
সে মাথা নাড়ল। ‘হ্যাঁ।’
এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস যেন স্থির
হ’য়ে
গেল। মনে হল, বহু বছর আগে লেখা একটি অসমাপ্ত চিঠির শেষ
ঠিকানা হঠাৎ পেয়ে গেছে।
তারপর আমরা কথা বলতে শুরু করলাম।
তামান্ন খুব দ্রুত কথা বলত না।
প্রতিটি বাক্য যেন একটু ভেবে, একটু চেখে, তারপর বেরোত।
আমি বুঝলাম, সে এমন একজন মানুষ যার নীরবতার ভিতরেও জেগে
থাকে তীক্ষ্ণ বোধ। সে আমাকে বলল, ‘আপনি শহর থেকে এসেছেন,
তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘শহরের লোকেরা গ্রামকে দেখে কীভাবে,
জানেন?’
‘কীভাবে?’
‘একটি স্থির ছবি হিসেবে। যেন এখানে সময়
নেই, কষ্ট নেই, জটিলতা নেই। অথচ
এই গ্রামেও মানুষ প্রেমে পড়ে, প্রতীক্ষায় থাকে, হারায়, জেদ করে, মিথ্যে
বলে, আবার সত্যও বলে। পার্থক্য শুধু এই যে, এখানে সবকিছু একটু বেশি শোনা যায় মাটির শব্দ, জলের শব্দ, মানুষের ভিতরের শব্দ।’
আমি তাঁর দিকে তাকালাম। এই
মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু ছিল যা আমাকে অস্থির করে তুলল। সৌন্দর্য নয় কেবল
বরং সংযমের গভীরতা। যেন কেউ খুব যত্নে একটি আগুন ঢেকে
রেখেছে, কিন্তু তার উত্তাপ ঠিকই অনুভব করা যায়।
সেই রাতেই আমি তাঁর বাড়িতে থেকেই
গেলাম। তিনি বললেন, শহরে ফেরার মতো রাত হয়নি। বাইরের আকাশে মেঘ জমেছিল, আর মাঝে মাঝে দূরে বাজ পড়ছিল। তাঁর বাবা স্কুলমাস্টার, সেদিন গ্রামের বাইরে কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। ঘরটি নির্জন।
ল্যাম্প জ্বলছিল। আমি আমার নোটবই খুলে কিছু লিখতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছু লেখা গেল না। তামান্ন টেবিলের পাশে বসে পুরনো খাতা
মিলাচ্ছিল। মাঝে মাঝে তার আঙুলের স্পর্শে পাতাগুলোর শুকনো শব্দ উঠছিল।
আমি বললাম, ‘এই খাতাগুলো
আপনি কেন রাখেন?’
সে একটু হেসে উত্তর দিল, ‘কারণ,
মানুষ তার জীবন শেষ করে যায়, কিন্তু
তার হাতের লেখা রেখে যায়। হাতের লেখা অনেকটা নিঃশ্বাসের মতো। মুছে গেলেও তার
উষ্ণতা থাকে।’
তার এই কথায় আমার বুক কেঁপে উঠল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি কখনও এই গ্রামের বাইরে যেতে চাননি?’
‘চেয়েছি,’ সে
বলল। ‘কিন্তু প্রত্যেকে যে জায়গা ছেড়ে যেতে পারে,
তা নয়। কারও কারও জন্য গ্রামটা শুধু ঠিকানা নয়, শিকড়।’
‘আর আপনার জন্য?’
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর
মাথা নিচু করে বলল, ‘আমার জন্য এ গ্রামটা একটা অপূর্ণ গান।’
এই বাক্যটি বহু বছর পরেও আমি
ভুলিনি।
পরদিন ভোরে আমি উঠোনে এসে
দাঁড়ালাম। চারপাশে কুয়াশা। দূরে মোরগ ডেকে উঠছে। পুকুরের ওপর ভেসে আছে ধূসর
হালকা চাদর। তখনই তামান্ন এল, হাতে দু’কাপ চা। চায়ের
গন্ধে ভোর আরও তীক্ষ্ণ হ’য়ে উঠল।
‘আজ আমাকে নিয়ে চলুন,’ সে বলল।
‘কোথায়?’
‘যেখানে আপনার খাতা পাওয়া গেছে।’
আমরা দু’জন ভাঙা
বাড়িটার দিকে হাঁটতে লাগলাম। পথিমধ্যে সে আমাকে বনমালীপুরের ইতিহাসের কিছু টুকরো
বলল। এই গ্রামে একসময় নৌকা চলত, কারণ নদী তখন কাছেই ছিল।
পরে নদী সরে যায়। তারপর হাট বসে, অনেকে বাগেরহাট বলতো। এখন হাট নেই, বাজার
বসে, তাও খানিক দূরে, অন্যখানে। তারপর স্কুল তৈরি হয়। তারপর
একখণ্ড জমিতে রেললাইন বসে। গ্রামটি যেন বদলেছে, অথচ বদলায়নি। মানুষের জীবনেও তেমনই কিছু ক্ষত শুকিয়ে যায়,
কিন্তু তার প্রান্তর বদলায় না।
ভাঙা বাড়ির ভিতরে ঢুকে আমরা একটি
ঘরের দেয়ালে ভাঙা তাকের নিচে চাপা পড়া একটি কাঠের বাক্স পেলাম। বাক্সটি খুলে
বেরোল তিনটি জিনিস একটি বেহালার ভাঙা ধনুক, একটি কবিতার খাতা, আর একটি চিঠি, সিল করা কিন্তু পাঠানো হয়নি।
চিঠির ওপর লেখা:
‘তামান্নকে’
তামান্ন বাক্সটা দেখে থমকে গেল।
তার মুখের উপর দিয়ে যেন হালকা বাতাস ব’য়ে গেল। আমি চুপ করে চিঠিটি তুলে
নিলাম। তারিখ পঞ্চাশ বছরেরও পুরনো।
চিঠিটি পড়ে জানা গেল, এটি লিখেছিলেন
এক তরুণ। গ্রামের স্কুলে তিনি সামান্য সময়ের জন্য শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন। চিঠিতে
লেখা ছিল, তামান্নর
মাকে, অর্থাৎ তৎকালীন তরুণী, তামান্ন-কে,
তিনি ভালোবাসেন। কিন্তু গ্রামের মানুষ, সামাজিক
সংকোচ, এবং একটি অঘোষিত পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা তাঁকে বাধা
দিয়েছে। তিনি লিখেছেন:
‘আমি চলে
যাচ্ছি। তোমাকে নিয়ে যেতে পারলাম না। তবু জেনে রেখো, এই
গ্রামে যতদিন বকুলফুল ফুটবে, ততদিন তোমার নাম উচ্চারিত
হবে বাতাসে।’
তামান্ন চিঠিটি পড়ে দীর্ঘক্ষণ
চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, ‘আমার মা কখনও এর কথা বলেননি।’
আমি বললাম, ‘কখনও কখনও
প্রেম প্রকাশ পেলে সে আর প্রেম থাকে না, ইতিহাস হ’য়ে যায়।’
সে মাথা নাড়ল। ‘হয়তো তাই।’
সে মুহূর্তে আমি বুঝলাম, এই চিঠির
মধ্যে কেবল একটি পুরনো প্রেম নেই; আছে একটি মেয়ের
অসম্পূর্ণ জীবন, একটি গ্রামের ভিতরে জমে থাকা লজ্জা,
আর একটি সত্য কিছু প্রেম সফল না হয়েও মানুষের অস্তিত্বকে
উজ্জ্বল করে রাখে।
আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে
পুকুরপাড়ে এসে বসলাম। বাতাসে কচুরিপানার গন্ধ, দূরে একটি কদমগাছ থেকে পাখি উড়ে গেল। তামান্ন
বলল, ‘কোথায় গিয়েছিলেন,
‘না।’
‘শুনেছি তিনি শহরে ফিরে লেখক হয়েছিলেন।
কিন্তু বিয়ে করেননি।’
আমি তাঁর দিকে তাকালাম। ‘আপনি দুঃখ
পাচ্ছেন?’
‘দুঃখ?’ সে
হালকা হাসল। ‘না। আমি ভাবছি, মানুষ
কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় বাক্যটি অর্ধেক বলে ফেলে। বাকি অর্ধেক সে নিজের
ভিতরেই বহন করে।’
সেদিন দুপুরে আমি গ্রামে ঘুরে
বেড়ালাম। শিমুলতলা,
কাঁঠালবাগান, স্কুলঘর, পুকুরের পাড়, বাজার। দেখতে দেখতে মনে হল,
বনমালীপুরের প্রতিটি জায়গা যেন কোনও পুরনো কবিতার স্তবক। বিকেলে
আবার তামান্নর সঙ্গে দেখা হল স্কুলঘরে। সে
পড়াচ্ছিল ছোটদের। সে লিখছে, ‘মাটির গন্ধ।’ বাচ্চারা উচ্চারণ করছে, ‘মা-টির গন্ধ।’
আর আমার মনে হচ্ছিল, সত্যিই, শব্দ যদি কোথাও সবচেয়ে ভালোভাবে জন্মায়, তবে
তা এইখানে গ্রামের
ক্লাসঘরে, মেয়েদের স্নিগ্ধ গলায়, ধুলো-মাখা বক্সের পাশে।
পড়ানো শেষ হলে সে বলল, ‘আপনি শহরে কী
করেন?’
‘লেখালেখি। একটু সম্পাদনাও।’
‘তাহলে আপনার জীবনে সত্যিই কম ভাঙা জিনিস
আছে,’ সে মৃদু কৌতুকে বলল।
আমি হাসলাম। ‘এতটা নয়। ভাঙা
আছে। শুধু শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে।’
সে আমার দিকে তাকাল। ‘লেখকরা দুঃখকে
সাজিয়ে রাখতে জানে।’
‘আর গ্রামের মেয়েরা?’
‘গ্রামের মেয়েরা,’ সে ধীরে বলল, ‘দুঃখকে চুপ করিয়ে বাঁচতে শেখে।’
এই কথোপকথনের পর থেকেই আমাদের
মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হল। আমরা প্রতিদিন দেখা করতাম। কখনও পুকুরপাড়ে, কখনও
বাঁশঝাড়ের কাছে, কখনও স্কুলের উঠোনে। আমি তাকে শহরের
বইয়ের কথা বলতাম, সে আমাকে গ্রামের ঋতুর পরিবর্তনের কথা
শোনাত। আমি জানতাম, আমি এখানে অতিথি; তবু তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেই সীমারেখা অস্পষ্ট হ’য়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু প্রেম এমনই; সে একবারও এসে
বলে না, ‘আমি প্রেম।’ সে আগে এসে
বসে। তারপর চুপ ক’রে থাকে। তারপর হঠাৎ বুঝতে দেওয়ার আগেই
মানুষের ভেতরে বাসা বাঁধে।
একদিন বর্ষা এলো।
বনমালীপুরে বর্ষা এমনভাবে নামে
যেন আকাশ নিজের সমস্ত জল নামিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হয় না, বরং মাটির
সঙ্গে নতুন ক’রে বিবাহ করতে আসে। সন্ধ্যাবেলায় আমি তামান্নর
বাড়িতে ছিলাম। বাইরে বৃষ্টি, জানালায় জল, মাটিতে কাদার গন্ধ। ঘরের ভেতরে ল্যাম্প জ্বলছে। সে একটি বই পড়ছিল। আমি
তাকিয়ে দেখছিলাম তার মুখ। বইয়ের পাতার আলো তার চোখে পড়ছিল, আর সে চোখে তখন এমন এক প্রশান্ত তীব্রতা ছিল, যা
দেখে মনে হল, এ-মেয়ে যদি কথা
না-ও বলে, তবু তার নীরবতায় অনেক কিছু বলা হয়ে যাবে।
হঠাৎ সে বই বন্ধ করল।
‘আপনি আমাকে এত দেখে কী ভাবেন?’ সে জিজ্ঞেস করল।
প্রশ্নটি এমন অকস্মাৎ এলো যে আমি
প্রথমে উত্তর দিতে পারলাম না। তারপর বললাম, ‘ভাবি, আপনি
যেন কোনও অসমাপ্ত কবিতার শেষ পঙ্ক্তি।’
সে মৃদু হাসল। ‘আর আপনি?’
‘আমি?’
‘আপনি কী?’
আমি একটু ভেবে বললাম, ‘আমি বোধহয়
সেই পাঠক, যে পঙ্ক্তির শেষে এসে বুঝতে পারে, কবিতাটা তার নিজেরই ছিল।’
সে চুপ করে রইল। বৃষ্টির শব্দ তখন
জানালায় আরও জোরে পড়ছিল। ঘরের ভিতরে, আমাদের মধ্যবর্তী নীরবতায়, হঠাৎ এমন একটি ঘনত্ব এল যা ভাষাকে প্রায় অপ্রয়োজনীয় করে দিল। তারপর তামান্ন খুব আস্তে বলল, ‘আমি শহরে যেতে চাই। কিন্তু ভয় পাই।’
‘কীসের ভয়?’
‘যদি চলে গিয়ে বুঝি, বনমালীপুরের চেয়ে শহর বেশি বড় নয়; শুধু
বেশি শব্দ করা।’
আমি কিছু বললাম না। সে নিজের
হাতের আঙুলে পড়ে থাকা সাদামাটা চুড়িটা ঘুরাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ বলল, ‘আপনি কি আবার
আসবেন?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘আসব।’
এই প্রতিশ্রুতিটি উচ্চারণ করার
সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝলাম,
প্রতিশ্রুতি সব সময় ভবিষ্যতের জন্য নয়। অনেক সময় তা
বর্তমানকেই বদলে দেয়।
কিন্তু জীবনের রূঢ় সত্য হল, প্রতিশ্রুতি
যতই নরম হোক, সময় তার চেয়ে বেশি কঠোর।
আমার শহরে ফেরার দিন এল।
বনমালীপুরের সকালের আলো তখন কেমন একধরনের বিষণ্ন সোনালি রঙে ভরা। রওনা হওয়ার আগে
আমি তামান্নর বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে
ছিলাম। সে হাতে একটি বই নিয়ে বেরিয়ে এল। বইয়ের মধ্যে একটি শুকনো বকুলফুল গুঁজে
দিল।
‘এটা রাখুন,’ সে
বলল। ‘ফেরার পথের জন্য।’
‘ফুল তো শুকিয়ে যাবে।’
‘মানুষের খুব কম জিনিসই শুকিয়ে না,’
সে উত্তর দিল। ‘তবু আমরা রাখি।’
আমি তার দিকে তাকালাম। সেই
মুহূর্তে তার মুখে কোনও নাটকীয়তা ছিল না। ছিল শুধু শান্তি, আর সেই
শান্তির নিচে একটি এমন আবেগ, যা উচ্চস্বরে বলার নয়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি কষ্ট
পাচ্ছেন?’
সে বলল, ‘কষ্ট নেই।
আছে অভাব। আর অভাবকে কষ্টের চেয়ে বেশি সত্যি লাগে।’
আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে
রইলাম। তারপর আমি চলে এলাম।
শহরে ফিরে আমি নিজের পুরনো জীবনকে
আগের মতো আর খুঁজে পেলাম না। বইয়ের পাতায় চোখ পড়ত, কিন্তু মন
বনমালীপুরে পড়ে থাকত। কাগজের কলমে শব্দ লিখতাম, কিন্তু
মনে হত সেই শব্দগুলি সেদিনের বৃষ্টি, পুকুরের জল, আর তামান্নর মুখকে যথেষ্ট
ধারণ করতে পারছে না। আমি মাঝে মাঝে তাকে চিঠি লিখতাম। সে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিত কখনও
স্কুলের কথা, কখনও নতুন বই, কখনও
একটিমাত্র লাইন: ‘আজ বকুলফুল ফুটেছে।’ তার চিঠির
মধ্যে এমন কোনও বাড়াবাড়ি ছিল না, যা প্রেমকে সস্তা করে।
বরং ছিল আরও গভীর কোনও অপেক্ষার সুর।
দুই মাস পরে আমি আবার গেলাম।
এইবার বনমালীপুর আমাকে আগের মতো
গ্রহণ করল না। গ্রামে ঢুকতেই দেখলাম, পুকুরপাড়ের অনেক গাছ কাটা হয়েছে।
শুনলাম, একটি নতুন পাকা রাস্তা বানানো হবে। স্কুলের পাশের
ফাঁকা মাঠে ইট রাখা হয়েছে। গ্রামের লোকজন উত্তেজিত, কেউ
খুশি, কেউ ক্ষুব্ধ। তামান্নর মুখ দেখে বুঝলাম, সে ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত।
‘সব বদলে যাচ্ছে,’ সে বলল।
‘ভালোর দিকে না?’
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর
বলল, ‘জানি না। পরিবর্তন হয়তো প্রয়োজন। কিন্তু কিছু জায়গা আছে, যেখানে পরিবর্তন আসার আগে মাটি একটু কেঁপে ওঠে।’
আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে সেই কাঁপন
টের পেলাম। তাকে তখন আমার আরও কাছের মনে হল, কারণ সে কোনও রোম্যান্টিক অবাস্তবতায়
বাস করছিল না। সে দেখছিল গ্রাম বদলাচ্ছে, মানুষ বদলাচ্ছে,
আর তবু নিজের অন্তর্গত সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
সেই রাতে আমরা পুকুরপাড়ে
হাঁটছিলাম। আকাশে মেঘ নেই,
তারা আছে। দূরে কোনও বাজনার শব্দ ভেসে আসছিল বোধহয় বিয়েবাড়ি। হঠাৎ তামান্ন
থমকে দাঁড়াল।
‘আমি কি আপনাকে ভালোবাসি?’ সে খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল।
আমার বুকের ভেতর যেন সমস্ত শব্দ
একত্রে থেমে গেল। আমি হয়তো উত্তর দিতে চাইনি, কিন্তু সত্য লুকিয়ে রাখা গেল না।
বললাম, ‘আমি জানি না। কিন্তু আপনার কাছে এলেই আমার ভেতরের
জিনিসগুলো পরিষ্কার হ’য়ে যায়।’
সে একটু হাসল। ‘এটাও বোধহয়
ভালোবাসা।’
তারপর, বহুক্ষণ পরে,
আমরা প্রথমবার হাতে হাত রাখলাম। সে স্পর্শ ছিল খুব আলগা, খুব সাবধানী, কিন্তু তার মধ্যে বিদ্যুৎ ছিল।
গ্রামের নীরব পুকুরপাড়ে, রাতের কাঁচা আলোর নিচে, আমরা দু’জন ঠিক সেইভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম,
যেন সময়কে আর তাড়াহুড়ো করতে হবে না।
কিন্তু প্রেম যতই গভীর হোক, জীবনের
শর্তগুলি নিজের পথ ছাড়ে না।
কয়েক মাস পরে তামান্ন জানাল, সে ঢাকায় পড়তে যাবে। শিক্ষকতা ছেড়ে নয়, কিন্তু
নিজের জীবনটাকে বড় ক’রে দেখতে। আমি প্রথমে চুপ করে
রইলাম। তারপরে বললাম, ‘যাও।’
‘আপনি কষ্ট পাবেন?’
‘পাব,’ বললাম। ‘কিন্তু কষ্ট না পেলে প্রেমের খবরও কী করে রাখি?’
সে আমার কথা শুনে চোখ নামাল।
তার যাত্রার আগের সন্ধ্যায় আমরা
আবার সেই ভাঙা বাড়ির পুকুরপাড়ে গেলাম, যেখানে আমি প্রথম বনমালীপুরকে
সত্যিকারভাবে চিনেছিলাম। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, পুকুরের জলে
লাল আভা, আর কাশবনের ডগায় বাতাসের কম্পন। সে একটি ছোট
ব্যাগ সঙ্গে এনেছিল। আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘আপনি
কি ফিরে আসবেন?’
সে বলল, ‘ফেরার জন্যই
তো যাচ্ছি।’
‘অর্থাৎ?’
‘যাতে বুঝতে পারি, ফেরা কী।’
তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে এমন
এক হালকা, বিষণ্ন, অথচ উজ্জ্বল হাসি দিল, যা আমি আজও ভুলতে পারিনি। সেখানে কোনও নাটক ছিল না। ছিল শুধু জীবনের
কঠিন সত্যের মধ্যে প্রেমের একটি ক্ষীণ কিন্তু অমলিন রেখা।
সে চলে গেল।
বছর ঘুরে গেল। আমি শহরে আমার কাজ
করি, বই পড়ি, লিখি, আর
মাঝে মাঝে এমনভাবে থমকে যাই, যেন জানালার বাইরে হঠাৎ
বকুলফুলের গন্ধ এসেছে। তামান্ন চিঠি পাঠাত। প্রথমে নিয়মিত, পরে বিরল, কিন্তু যত বিরল, ততই মূল্যবান। এক চিঠিতে সে লিখেছিল, ঢাকা
তাকে শিখিয়েছে মানুষের
কণ্ঠ যত জোরে হয়, ভেতরের নিঃশব্দতা ততই জরুরি। আরেক
চিঠিতে লিখেছিল, সে একদিন বইয়ের দোকানে পুরনো কবিতার
সংকলন দেখে এক কবির কবিতা পেয়েছে; সেই কবিতায় নাকি
বনমালীপুরের মতো এক নদী ছিল। আমি বুঝলাম, মানুষ তার
প্রেমকেও নিজের মতো ক’রে নতুন ক’রে
প’ড়ে।
দুই বছর পরে আমি খবর পেলাম, বনমালীপুরে
নতুন রাস্তা হয়েছে, স্কুল বড় হয়েছে, পুকুরের ধারে কংক্রিটের পয়েন্ট বসানো হয়েছে। অনেক বদল। কিন্তু একটি
খবর আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল: তামান্ন স্থায়ী চাকরি পেয়েছে। সে আর গ্রামের
স্কুলে পুরোপুরি ফিরে আসবে না।
আমি সেই খবর পড়ে দীর্ঘক্ষণ
বসেছিলাম। বিস্ময় নয়,
আনন্দ নয়, কেবল একধরনের শান্ত ব্যথা
অনুভব করলাম। তারপর একদিন হঠাৎ আমি বেরিয়ে পড়লাম বনমালীপুরের পথে।
এইবার গ্রামকে চেনা সহজ ছিল না।
পাকা রাস্তা এসেছে, দোকান বেড়েছে, পুকুরের পাড়ে নতুন বাড়ি
উঠেছে। কিন্তু কাঁঠালগাছগুলি ছিল, শিমুলগাছ ছিল, আর সবচেয়ে বড় কথা বকুলগাছটি ছিল। আমি সেই পুরনো ভাঙা বাড়ির কাছে
পৌঁছালাম। এখন তার অর্ধেক ভেঙে গেছে, বাকি অর্ধেক নতুন
ইটের ভিতরে মিশে গেছে। সময় কখনও কিছু ভাঙে না, কেবল অন্য
কিছুর সঙ্গে জুড়ে দেয়।
সন্ধ্যায় তামান্ন এল।
আমি যখন তাকে দেখলাম, মনে হল সে আরও
পরিণত, আরও শান্ত, আর সেই সঙ্গে
আরও দূরবর্তী। শহরের অভ্যাস তার কাঁধে এসে পড়েছে, কিন্তু
চোখের ভিতর বনমালীপুর এখনও জেগে আছে। সে আমাকে দেখে একটু থমকাল, তারপর হাসল।
‘এসে গেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘একা?’
‘হ্যাঁ।’
সে পুকুরপাড়ে এসে বসল। আমি পাশে
দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর বললাম, ‘আপনি কি এখানে আর থাকবেন না?’
‘না,’ সে বলল। ‘আমার জীবন এবার অন্যখানে।’
এই বাক্যটি শুনে আমার বুক ভ’রে গেল এক
অদ্ভুত স্বচ্ছ বেদনায়। আমি বললাম, ‘তাহলে বনমালীপুর?’
‘বনমালীপুর?’ সে
ধীরে হাসল। ‘এটা তো আমার ভিতরে আছে।’
এরপর আমরা অনেকক্ষণ কথা বললাম।
পুরনো মানুষ, পুরনো বই, পুরনো পথ, পুরনো
গান। মাঝে মাঝে চুপও করলাম। সেই নীরবতায় আর বিচ্ছেদ ছিল না; ছিল পরিণতি। প্রেমের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোধহয় এই যে, সে সবসময় মিলনের দখল চায় না। অনেক সময় সে কেবল দুটো মানুষের জীবনে
একটি উজ্জ্বল সত্য হ’য়ে ওঠে, যা
পরে আলাদা পথের আলো জ্বালায়।
রাত নামল। দূরে ঝিঁঝিঁ ডেকে উঠল।
পুকুরে জোনাকির ঝিলিক। তামান্ন হঠাৎ বলল, ‘আপনি কি জানেন, আমি আপনাকে কেন ভালোবাসি?’
আমি চুপ করলাম।
সে বলল, ‘কারণ আপনি
আমাকে কখনও গ্রাম হিসেবে দেখেননি। দেখেছেন মানুষ হিসেবে। আর মানুষ হিসেবে দেখা খুব
কঠিন।’
আমি কিছু বললাম না। কারণ তখন কথার
চেয়ে নীরবতাই বেশি সত্য ছিল। আমরা দু’জন বকুলগাছের তলায় দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম, সে একটু ঝুঁকে আমার কাঁধে মাথা
রাখল। সেই স্পর্শে কোনও অগ্নি ছিল না, ছিল একটি দীর্ঘ,
সুশীতল বিকেলের মতো নিশ্চিন্ততা। মনে হল, এটাই বোধহয় প্রেম যে প্রেম চিৎকার করে না, কিন্তু মানুষের ভিতরে
থাকা অন্ধকারকে আলতো করে ছুঁয়ে দেয়।
পরদিন সে আবার শহরে ফিরে গেল। আমি
আর ডাকলাম না। কারণ বুঝে গিয়েছিলাম যে ভালোবাসা সত্যি, সে সব সময় একসঙ্গে থাকা
দিয়ে প্রমাণিত হয় না। কখনও কখনও দু’জন মানুষ ভিন্ন জীবন
বেছে নিয়েও একই স্মৃতির ভিতরে বেঁচে থাকে।
আজ এত বছর পরে আমি যখন
বনমালীপুরের কথা মনে করি,
তখন প্রথমে কোনও মুখ মনে পড়ে না, কোনও
বাড়িও না। মনে পড়ে এক বিকেল, পুকুরের জলে লাল আলো,
আর এক মেয়ের শান্ত কণ্ঠে বলা শব্দ ’আমার জন্য এ গ্রামটা একটা
অপূর্ণ গান।’
হয়তো প্রেম সেই অপূর্ণ গানই। তার
সবচেয়ে সুন্দর অংশ মাঝখানে থেকে যায়, তার শেষটা কখনও পুরোপুরি বাজে না।
কিন্তু তাতেই তার সৌন্দর্য। পূর্ণ হলে সে আর হৃদয়ে থেকে যেত না; অসম্পূর্ণ বলেই তা স্মৃতিতে, শ্বাসে, নীরবতায়, এবং জীবনের ক্ষুদ্রতম ফাঁকে ফাঁকে
বেঁচে থাকে।
বনমালীপুর গ্রাম, আমাকে একদিন শুধু একটি মেয়ের কাছে নিয়ে যায়নি;
আমাকে এনে দাঁড় করিয়েছিল আমার নিজের অসম্পূর্ণতার সামনে। আমি
শিখেছিলাম, মানুষ প্রেমে পড়ে শুধু আরেকজন মানুষের মধ্যে
নয়, অনেক সময় একটি গ্রামের ভিতরেও। তার মাটি, জল, গাছ, বৃষ্টি,
এবং হারিয়ে যাওয়া সময়ের মধ্যে। বনমালীপুর তাই আমার কাছে আর
কোনও গ্রাম নয়। এটি একটি প্রেম, একটি স্মৃতি, একটি দীর্ঘ নীরব বাক্য যার শেষাংশ আজও কোথাও লেখা হয়নি।
আর আমি, সেই অপূর্ণ
বাক্যের মতো, আজও অপেক্ষা করি কখন আবার ফাল্গুনের
হাওয়ায় বকুলফুলের গন্ধ উঠবে, আর মনে হবে, তামান্ন কোনও দূরের জানালায় দাঁড়িয়ে আমার নাম নিচ্ছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন