সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’

 

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের(১৯৪৩-১৯৯৭) ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এমন একটি রচনা যেখানে রাজনৈতিক আন্দোলন কেবল ঘটনাপঞ্জি হিসেবে নয়, বরং মানুষের চেতনার ভেতরকার দীর্ঘ, জটিল ও দ্বিধাপূর্ণ রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং এই কারণেই উপন্যাসটির মূল বিষয় কোনো একক রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং ইতিহাস, শ্রেণি, ব্যক্তিসত্তা, ভয়, সংশয়, আদর্শ এবং আত্মপরিচয়ের সংঘর্ষে নির্মিত এক বহুমাত্রিক বাস্তবতা। এই উপন্যাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান একটি দৃশ্যমান পটভূমি হলেও প্রকৃত অর্থে ইলিয়াস দেখাতে চেয়েছেন, একটি সমাজ কীভাবে ভেতর থেকে ফেটে পড়ে এবং সেই ফাটলের শব্দ একজন সাধারণ মানুষের অন্তর্জগতে কীভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। ওসমান গণি বা রঞ্জু নামের যে চরিত্রটিকে উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে রাখা হয়েছে, সে কোনো ঘোষিত বিপ্লবী নয়, কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মীও নয়, বরং সে সেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি; যারা ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে অথচ ইতিহাসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তাদের থাকে না। এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানই চিলেকোঠার সেপাই’-এর মূল বিষয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করে, কারণ ইলিয়াস বিশ্বাস করেন ইতিহাস কেবল সাহসী নেতাদের দ্বারা গঠিত হয় না, বরং ইতিহাসের প্রকৃত ভার বহন করে সেইসব মানুষ যারা প্রথমে ইতিহাসকে এড়িয়ে যেতে চায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারে না। চিলেকোঠা এখানে নিছক একটি বসবাসের জায়গা নয়, এটি একটি প্রতীকী অবস্থান, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের সামাজিক ও মানসিক অবস্থানকে নির্দেশ করে, নিচের জনজীবনের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, আবার ক্ষমতার কেন্দ্র থেকেও বিচ্ছিন্ন, এমন এক উচ্চতায় যেখানে মানুষ সবকিছু দেখতে পায় কিন্তু সবকিছুর অংশ হতে সাহস পায় না। এই চিলেকোঠায় বসে থাকা মানুষটি ইতিহাসের আওয়াজ শোনে, মিছিলের স্লোগান শোনে, পুলিশের গুলির শব্দ কল্পনা করে, কিন্তু নিজে রাস্তায় নামবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে তার দীর্ঘ সময় লাগে, আর এই দীর্ঘ সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়াই উপন্যাসের গভীরতম স্নায়ু। ইলিয়াস এই দ্বিধাকে কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রিত করেননি, বরং এটিকে একটি শ্রেণিগত বাস্তবতা হিসেবে দেখিয়েছেন, কারণ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারবাহী সমাজে মধ্যবিত্ত সবসময় দ্বিমুখী চাপে থাকে, একদিকে সে শোষিত ও বঞ্চিত, অন্যদিকে সে তার সামান্য নিরাপত্তা ও সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চায়। উপন্যাসে রাজনৈতিক কর্মী, বামপন্থি চিন্তক, আপাতবিপ্লবী ও সুবিধাবাদী চরিত্রদের উপস্থিতি এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তোলে এবং দেখায় যে আন্দোলন কখনো একক আদর্শে পরিচালিত হয় না, বরং নানা মত, স্বার্থ ও ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশের সংঘর্ষে তা এগোয়। ‘সেপাই’ শব্দটি উপন্যাসে যে প্রতীকী অর্থ বহন করে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সেপাই মানে কোনো মহান নায়ক নয়, বরং সেই সাধারণ মানুষ যে ইতিহাসের যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই ঠেলে দেওয়া হয় এবং যে আদর্শের পূর্ণ ব্যাখ্যা না জেনেও লড়াইয়ের অংশ হয়ে যায়। ইলিয়াস এই সেপাইকে মহিমান্বিত করেন না, আবার তুচ্ছও করেন না; তিনি দেখান এই সেপাইয়ের ভয় আছে, সংশয় আছে, স্বার্থ আছে, আবার একই সঙ্গে তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক ধরনের অনিবার্য দায়বোধ। উপন্যাসটির মূল বিষয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ যে কোনো আকস্মিক আলোকপ্রাপ্তির ফল নয়, বরং এটি একটি ধীর, কষ্টসাধ্য ও প্রায়শই যন্ত্রণাময় প্রক্রিয়া। ওসমান গণির চেতনার পরিবর্তন কোনো নাটকীয় মুহূর্তে ঘটে না, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, কথোপকথন, ভয়, অপমান ও আশঙ্কার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয়, যা উপন্যাসটিকে গভীরভাবে বাস্তববাদী করে তোলে। ইলিয়াস এখানে বিপ্লবকে রোমান্টিক করে তোলেননি, বরং বিপ্লবের ভেতরের ক্লান্তি, বিভ্রান্তি ও আদর্শচ্যুতির সম্ভাবনাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এবং এই কারণে চিলেকোঠার সেপাইএকটি নির্দিষ্ট সময়ের উপন্যাস হয়েও সব সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ভাষার দিক থেকেও উপন্যাসটির মূল বিষয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, কারণ ইলিয়াসের ভাষা অলংকারময় নয়, বরং সংযত, তীক্ষ্ণ ও বাস্তবের ভারে নুয়ে পড়া, যা চরিত্রদের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। ঢাকা শহরের অলিগলি, ভাড়া বাসা, বস্তি, মিছিল, কারফিউ ও পুলিশের উপস্থিতি মিলিয়ে যে দমবন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল পটভূমি নয়, বরং চরিত্রদের মানসিক সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। এই পরিবেশের ভেতর দিয়ে উপন্যাসটি দেখায় যে নিরপেক্ষতা একটি ভ্রান্ত ধারণা, কারণ ইতিহাসের সংকটময় মুহূর্তে নিরপেক্ষ থাকার অর্থও এক ধরনের অবস্থান গ্রহণ। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ মূলত এই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠা করে যে মানুষ চাইলেও ইতিহাস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না, ইতিহাস তার ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশ করবেই এবং তাকে কোনো না কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবেই। এই উপন্যাসে তাই রাজনীতি ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে এবং ব্যক্তিগত জীবন রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশে পরিণত হয়, যা আধুনিক উপন্যাসের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ইলিয়াস এখানে ইতিহাসকে কোনো মহাকাব্যিক গৌরবে তুলে ধরেননি, বরং ইতিহাসের ভেতরের অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা ও অসম্পূর্ণতাকে তুলে ধরেছেন, কারণ তার দৃষ্টিতে ইতিহাস কোনো সমাপ্ত গল্প নয়, বরং চলমান এক সংকট। ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর মূল বিষয় শেষ পর্যন্ত এই উপলব্ধিতে এসে পৌঁছায় যে মানুষের ব্যক্তিগত মুক্তি ও সামাজিক মুক্তি আলাদা কিছু নয়, বরং এই দুইয়ের সংঘর্ষ ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই প্রকৃত চেতনার জন্ম হয়। এই উপন্যাস পাঠককে কোনো সহজ উত্তর দেয় না, বরং তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, আমি কি চিলেকোঠায় বসে ইতিহাস দেখছি, নাকি ইতিহাসের রাস্তায় নামার সাহস করছি, এবং এই প্রশ্নই ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর মূল শক্তি ও স্থায়ী মূল্য।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...