১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান
মুক্তিসংগ্রাম যখন তুঙ্গে, তখন সীমান্তের ওপারে বসে সেই আগ্নেয় উপাখ্যানকে লেখনীতে রূপ দিয়েছিলেন
বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)। তাঁর ১৯৭১ উপন্যাসটি কেবল একটি যুদ্ধের দলিল নয়, বরং এটি এক বিপন্ন মানবতার ঘুরে দাঁড়ানোর আর্তনাদ ও আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক
সংকলন। তারাশঙ্করের লেখনীতে সবসময়ই প্রান্তিক মানুষ ও মৃত্তিকা-সংলগ্ন জীবন জয়গান
গেয়েছে, আর এই উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি এই
উপন্যাসে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি জাতি তার অস্তিত্বের সংকটে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে
বিস্ফোরিত হয়। উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের
অবরুদ্ধ জনপদ, পাক হানাদার বাহিনীর নির্মমতা এবং তার
বিপরীতে বাংলার দামাল ছেলেদের মরণপণ লড়াই। লেখক এখানে কেবল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে
উপজীব্য করেননি, বরং মানুষের মনের গহীনে থাকা দেশপ্রেম ও
ত্যাগের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। উপন্যাসের চরিত্রগুলো যেন
এক-একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হ’য়ে ওঠে, যারা শান্তির নীড় হারিয়ে যুদ্ধের
দাবদাহে পুড়ে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। তারাশঙ্করের গদ্যের ওজস্বিতা এবং বর্ণনার নিখুঁত
বুনন পাঠককে একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় অথচ গর্বিত দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি
চিত্রিত করেছেন গ্রামবাংলার সহজ-সরল মানুষের বীরত্বকে, যারা
আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে কেবল বুকের পাটা দিয়ে প্রতিরোধ গ’ড়ে তুলেছিল। শরণার্থী শিবিরের সেই করুণ দৃশ্যপট, স্বজন হারানোর হাহাকার এবং দেশ স্বাধীন করার অদম্য সংকল্প, সবই এই উপন্যাসে এক মহাকাব্যিক মাত্রা পেয়েছে। লেখক দেখাতে চেয়েছেন যে,
স্বৈরাচারী শক্তি সাময়িকভাবে জনপদকে ছারখার করতে পারলেও একটি
জাতির আত্মাকে অবদমিত করতে পারে না। এই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেই
অমর স্লোগান 'জয় বাংলা', যা
তৎকালীন সাত কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন হ’য়ে উঠেছিল।
তারাশঙ্কর তাঁর জীবনের সায়াহ্নে এসে এই উপন্যাসের মাধ্যমে দুই বাংলার নাড়ির টানকে
নতুন ক’রে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও
তিনি মানবধর্মকে ঊর্ধ্বে তু’লে ধরেছেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক অবিচ্ছেদ্য সত্তায় পরিণত হয়। ১৯৭১
কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি চেতনার স্ফুরণ যা তারাশঙ্কর
অত্যন্ত নিপুণভাবে তাঁর কলমের ডগায় ধারণ করেছেন। এই উপন্যাসটি পড়ার সময় অনুভব করা
যায় সেই উত্তাল দিনগুলোর উত্তাপ, শোনা যায় কামানের গোলার
পাশে বাঁশের বাঁশির সুর, যা মুক্তির গান গায়। পরিশেষে বলা
যায়, তারাশঙ্করের ১৯৭১ বাংলা সাহিত্যের এমন একটি আকর
গ্রন্থ যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ত্যাগের মাধ্যমেই পরম
প্রাপ্তি সম্ভব এবং ন্যায়ের লড়াইয়ে জয় অনিবার্য। পদ্মাপাড়ের
সেই রক্তাক্ত দিনলিপি আর অগ্নিঝরা সময়ের আবর্তে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর '১৯৭১'
উপন্যাসে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেছেন, তা মূলত এক বিশাল জনযুদ্ধের বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবি। এই উপন্যাসের পটভূমি
রচিত হয়েছে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি ও বীরত্বগাথাকে কেন্দ্র করে,
যেখানে ২৫শে মার্চের কালরাত থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধিকার
আন্দোলনের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়,
লেখক কেবল একটি যুদ্ধকে দেখেননি, বরং
দ্বিজাতি তত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করে ভাষার ভিত্তিতে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র
গঠনের যে দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা তাকেই উপজীব্য করেছেন। সাতই মার্চের সেই তর্জনী হেলানো
অমোঘ আহ্বান কীভাবে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের লাঙলকে রাইফেলে রূপান্তরিত করেছিল,
তারাশঙ্কর তাঁর লেখনীতে সেই ঐতিহাসিক রূপান্তরকে অত্যন্ত
মুন্সিয়ানার সঙ্গে তু’লে ধরেছেন। উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে
অপারেশন সার্চলাইটের সেই বীভৎসতা, যেখানে ছাত্রাবাস থেকে
শুরু করে বস্তি এলাকা পর্যন্ত নির্বিচারে চালানো হয়েছিল গণহত্যা। এই ঐতিহাসিক
সত্যকে লেখক সাহিত্যের মোড়কে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, ইতিহাস এখানে কেবল শুষ্ক তথ্য হ’য়ে থাকেনি,
বরং হ’য়ে উঠেছে এক জীবন্ত অনুভূতি।
অন্যদিকে, চরিত্র বিশ্লেষণের দিকে তাকালে দেখা যায়,
তারাশঙ্কর তাঁর চিরাচরিত ঘরানায় মাটির মানুষদের এখানেও নায়ক
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র যেন এক একটি জ্বলন্ত প্রতীক।
এখানে যেমন আছে সাধারণ গ্রামীণ যুবক যারা দেশমাতৃকার টানে সবকিছু বিসর্জন দিয়ে
মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠেছে, তেমনি আছে সেইসব মা ও বোন যারা
হানাদারদের পাশবিকতার শিকার হয়েও মাথা নত করেনি। চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক
টানাপোড়েন—ভয়, দ্বিধা এবং শেষ
পর্যন্ত দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, তারাশঙ্কর
অত্যন্ত নিপুণভাবে এঁকেছেন। কোনো নির্দিষ্ট প্রথাগত নায়কের চেয়েও এখানে 'জনগণ' বা 'সমষ্টি'
নিজেই এক বিশাল মহাকাব্যিক নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ
করে নারী চরিত্রগুলোর আত্মত্যাগ ও লড়াইয়ের চিত্রায়ণে লেখক দেখিয়েছেন যে, মুক্তিযুদ্ধ কেবল রণাঙ্গনের লড়াই ছিল না, তা
ছিল প্রতিটি ঘরে ঘরে গ’ড়ে তোলা এক একটি দুর্গ। কুচক্রী
রাজাকারদের চরিত্রায়নের মাধ্যমে লেখক সেই সময়ের সামাজিক অস্থিরতা ও বিশ্বাসঘাতকতার
দিকটিও উন্মোচন করেছেন, যা ঐতিহাসিক সত্যেরই প্রতিফলন।
তারাশঙ্করের সৃষ্ট এই চরিত্রগুলো কেবল কাল্পনিক অবয়ব নয়, বরং
তারা একাত্তরের সেই উত্তাল সমুদ্রের একেকটি ঢেউ, যারা
নিজেদের জীবন দিয়ে স্বাধীনতার তরীকে তীরের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঐতিহাসিক দলিল আর
মানবিক সংবেদনশীলতার এই বিরল মিশেলই '১৯৭১' উপন্যাসটিকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। ১৯৭১
সালের সেই রক্তক্ষয়ী কালবেলার প্রেক্ষাপটে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই
উপন্যাসের ব্যাপ্তি ও গভীরতা অপরিসীম যা কেবল যুদ্ধের খণ্ডচিত্র নয় বরং এক বিশাল
ঐতিহাসিক ও মানবিক বিবর্তনের আখ্যান। এই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে অসহায়
মানুষের বুকফাটা হাহাকার আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার
অদম্য সংকল্প যা সেই সময়ের প্রতিটি বাঙালির ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছিল। লেখক এখানে
যুদ্ধের যে ভয়াবহতা চিত্রিত করেছেন তা কেবল গোলা বারুদের শব্দে সীমাবদ্ধ থাকেনি
বরং তা পৌঁছে গেছে বাংলার নিভৃত পল্লীর সেইসব সাধারণ মানুষের কুটিরে যারা রাজনীতি
বুঝত না কিন্তু দেশমাতৃকার সম্ভ্রম রক্ষায় নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সেই পাশবিক নির্যাতন, গ্রামকে
গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, আর অগণিত মানুষের দেশান্তরী
হওয়ার যে করুণ চিত্র তারাশঙ্কর এঁকেছেন তা পাঠ করলে আজও গায়ে কাঁটা দেয় এবং
চোখের কোণে জল আসে। শরণার্থী শিবিরের সেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খাদ্যাভাব আর প্রিয়জন হারানোর শোকের মধ্যেও মানুষের মনে যে আশার প্রদীপ
জ্বলছিল তা লেখক অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন যা এই উপন্যাসের এক
অন্যতম প্রধান শক্তি। উপন্যাসের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য
সাহসিকতা আর গেরিলা যুদ্ধের সেই রোমাঞ্চকর বর্ণনা পাঠককে সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা
মনে করিয়ে দেয় যেখানে লাঙল ধরা হাত আচমকাই স্টেনগান ধরতে শিখে গিয়েছিল।
তারাশঙ্কর তাঁর এই সৃষ্টিতে দেখিয়েছেন যে যুদ্ধ কেবল সীমানা রক্ষার লড়াই নয় বরং
তা ছিল একটি সংস্কৃতি, একটি ভাষা আর একটি জাতিসত্তাকে
নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড প্রতিরোধ। এই উপন্যাসের
চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে ক্ষুদ্র
শক্তিও অজেয় হয়ে উঠতে পারে এবং শোষকের পতন অনিবার্য। বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
যখন এগিয়ে আসে তখন উপন্যাসের বর্ণনায় এক স্বর্গীয় আনন্দ আর তৃপ্তির আবেশ
ছড়িয়ে পড়ে যা দীর্ঘ নয় মাসের রক্তস্নাত অধ্যায়ের এক সার্থক পরিণতি। লেখক
এখানে কেবল জয়গান গাননি বরং আগামীর এক সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন
বুনে দিয়েছেন যা একাত্তরের মূল চেতনা হিসেবে আজও প্রদীপ্ত। তাঁর গদ্যের সেই
চিরচেনা ওজস্বিতা আর শব্দের মায়াজালে '১৯৭১' উপন্যাসটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে নয় বরং এক মহাকাব্যিক দলিল
হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে
দেশপ্রেমের প্রেরণা জোগাবে। মানুষের আত্মত্যাগের যে মহিমা তিনি এখানে বর্ণনা
করেছেন তা বিশ্বসাহিত্যেও বিরল যেখানে প্রতিটি সাধারণ মানুষই এক একজন অনন্য সাধারণ
নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য
ঐক্যবদ্ধ জনশক্তির কোনো বিকল্প নেই। উপন্যাসের শেষলগ্নে বিজয়ের যে রক্তিম আভা
ফুটে উঠেছে তা মূলত সেইসব শহীদের রক্তঋণের স্বীকৃতি যারা হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ
করে নিয়েছিল কেবল একটি স্বাধীন পতাকার আশায়। তারাশঙ্করের এই কালজয়ী সৃষ্টি তাই
কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয় বরং এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক ধ্রুবতারা যা
সংকটের মুহূর্তে আমাদের পথ দেখাবে এবং মনে করিয়ে দেবে যে স্বাধীনতার চেয়ে
মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন