আমার
পুরনো এই টেবিলটা আজকাল কথা বলে,
বড় অদ্ভুত তার সুর, কখনো ভাঙা কাঁচের
মতো তীক্ষ্ণ,
কখনো আবার শরতের শেষ দুপুরে ঝরা পাতার মতো মর্মর
এর উপর জমে থাকা ধুলোর আস্তরণ আসলে কোনো
ময়লা নয়,
বরং একেকটি বিস্মৃত বিকেলের মানচিত্র;
যেখানে আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার শৈশবের সেই হারানো মার্বেল
টেবিলটার
পায়াগুলো ঠিক মানুষের মতো অনড় দাঁড়িয়ে,
অথচ এর ড্রয়ার খুললেই বেরিয়ে আসে এক অদ্ভুত জাদুকর
সেখান থেকে ডানা মেলে উড়তে শুরু করে পুরনো সব চিঠির ঘ্রাণ,
ব্যবহৃত কালি ফুরিয়ে যাওয়া কলমগুলো সব জ্যান্ত হয়ে ওঠে
তারা যেন একেকজন বিষণ্ণ নাবিক, অনেককাল
আগে ডুবে যাওয়া
কোনো স্মৃতির জাহাজ থেকে উদ্ধার পেয়েছে অলৌকিকভাবে
মাঝে
মাঝে মধ্যরাতে যখন নিস্তব্ধতা দরজায় টোকা দেয়,
আমি দেখি টেবিলের ওপর রাখা নীলরঙা ল্যাম্পশেডটা
হয়ে উঠেছে একটি নিঃসঙ্গ বাতিঘর
তার আলোয় ছায়া পড়ে দেয়ালে ঠিক আমারই অবয়ব,
কিন্তু কেন যেন ছায়াটা আমার চেয়ে বেশি সজীব মনে হয়
সে হয়তো সেই সব কবিতার লাইন আওড়ায়, যেগুলো
আমি
কখনো কাগজে নামাতে পারিনি, কেবল বুকের
ভেতর দাড় করেছি।
এই
কাঠখণ্ড, যা
একদা অরণ্যে পাখির গান শুনতো,
আজ আমার এই নিঃসঙ্গ ঘরের নীরবতার একমাত্র ভাগীদার
টেবিলটার গায়ের ক্ষতগুলো যেন এক একটা প্রাচীন লিপি,
সেখানে আমার হাতের তালুর ঘাম আর চোখের নোনা জল
মিশে গিয়ে তৈরি করেছে এক অমোঘ পাণ্ডুলিপি
যা পড়া যায় না, কেবল মধ্যরাতের হাহাকারে
অনুভব করা যায়
আমি
জানি, একদিন
আমিও থাকবো না এই ধূসর আলোতে
কিন্তু
এই মায়াবী টেবিলটা ঠিকই থাকবে তার নিস্তব্ধতা নিয়ে
হয়তো অন্য কেউ এসে বসবে এখানে, তার তপ্ত
দীর্ঘশ্বাসে
আবার প্রাণ পাবে ড্রয়ারে রাখা সেই পুরনো জাদুকর;
আর টেবিলটা আবারও বোনা শুরু করবে নতুন কোনো নিসঙ্গতার জ্যামিতি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন