সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিষিদ্ধ সম্পর্ক

 


নিষিদ্ধ সম্পর্ক মানবজীবনের এক গভীর, জটিল, দ্বিধাবিভক্ত এবং বহুমাত্রিক বাস্তবতা। সমাজ, ধর্ম, নৈতিকতা, পরিবার, রাষ্ট্র, শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ, ক্ষমতা এবং ব্যক্তিসত্তার অসংখ্য স্তর যখন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন সম্পর্কের একটি বিশেষ রূপ ‘নিষিদ্ধ’ হ’য়ে ওঠে। এই নিষিদ্ধতা কেবল বাহ্যিক নিয়মের তৈরি নয়; এর ভেতরে থাকে ভয়, আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, প্রতিরোধ, স্মৃতি, এবং অবদমিত অনুভবের এক দীর্ঘ ইতিহাস। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সম্পর্ক-নির্ভর জীব, সে ভালোবাসে, আশ্রয় খোঁজে, সঙ্গ চায়, মানসিক উষ্ণতা চায়, আবার একই সঙ্গে সমাজ তাকে শেখায় কোন সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক অগ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক পবিত্র, কোন সম্পর্ক অপবিত্র, কোন সম্পর্ক কলুষিত, কোন সম্পর্ক প্রকাশযোগ্য, কোন সম্পর্ক গোপনীয়। এই শিক্ষা ও অভ্যাসের সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় নিষিদ্ধ সম্পর্কের নাটক। যার মধ্যে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা এবং সমাজের শাসন একই সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ায়। নিষিদ্ধ সম্পর্ক তাই শুধু কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি, মানুষের অবদমিত চাহিদার প্রতিফলন, এবং নৈতিকতার বহিরাবরণে লুকিয়ে থাকা মানবিক দুর্বলতার প্রকাশ। সাহিত্যে, ইতিহাসে, দর্শনে এবং সমাজতত্ত্বে নিষিদ্ধ সম্পর্ক বারবার ফিরে এসেছে, কারণ এটি মানুষের ভিতরের অন্ধকার ও আলোর সীমারেখাকে স্পষ্ট ক’রে। নিষিদ্ধ সম্পর্ককে অনেকে কেবল নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে দেখতে চান, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এর পেছনে থাকে অসম্পূর্ণতা, একাকিত্ব, মানসিক ক্ষুধা, ক্ষমতার অসম বণ্টন, সামাজিক নিষ্ঠুরতা, অথবা এমন এক নিঃসঙ্গতা যা মানুষকে প্রচলিত সীমারেখা অতিক্রম করতে বাধ্য ক’রে। সম্পর্ক যখন নিষিদ্ধ হয়, তখন সেখানে আকর্ষণ আরও তীব্র হয়। কারণ নিষেধ মানুষের কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলে, দমন আকাঙ্ক্ষাকে আরও প্রবল ক’রে, আর অধরা বস্তু আরও কাম্য হ’য়ে ওঠে। এই মানসিক সত্যটি মানবসভ্যতার বহু স্তরে বিদ্যমান। নিষিদ্ধ সম্পর্ক তাই কেবল ‘ভুল’ বা ‘পাপ’ নয়; এটি একাধিক প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষ কেন নিষিদ্ধের দিকে ঝোঁকে, সমাজ কেন কিছু সম্পর্ককে নিষিদ্ধ ঘোষণা ক’রে, আর নিষেধাজ্ঞা কি সত্যিই নৈতিকতার সুরক্ষা, নাকি ক্ষমতারই একটি রূপ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দেখি যে নিষিদ্ধ সম্পর্কের ধারণা সব সমাজে এক নয়। কোথাও রক্তসম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা নিষিদ্ধ, কোথাও জাতিগত বা ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করা নিষিদ্ধ, কোথাও বয়সের অসাম্য সম্পর্ককে সমস্যাজনক ক’রে তোলে, কোথাও শ্রেণিগত বৈষম্য, লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা, অথবা পারিবারিক কর্তৃত্ব সম্পর্ককে অননুমোদিত ক’রে তোলে। সমাজ এই নিষেধ তৈরি ক’রে মূলত শৃঙ্খলা, উত্তরাধিকার, পিতৃত্ব, পরিচয়, এবং নিয়ন্ত্রণ রক্ষার জন্য। ‘পরিবার’ নামক প্রতিষ্ঠান মানুষের প্রাথমিক সমাজীকরণ ঘটায়, এবং পরিবারই প্রথম শেখায় কাকে আপন ভাবতে হবে, কাকে দূরে রাখতে হবে, কার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য। কিন্তু মানুষ কেবল নিয়মের প্রাণী নয়; সে বাসনারও প্রাণী। ফলে নিয়মের বাইরে যে টান, নিষেধের বিরুদ্ধে যে গোপন আকর্ষণ, তা মানবচেতনার স্বাভাবিক অথচ জটিল বৈশিষ্ট্য। নিষিদ্ধ সম্পর্কের গল্প তাই আমাদের মনে তীব্র উত্তেজনা জাগায়, কারণ সেখানে ব্যক্তি-ইচ্ছা, সামাজিক বিধান, নৈতিক ভয়, এবং গোপন আবেগ একসঙ্গে কাজ ক’রে। সাহিত্যে নিষিদ্ধ সম্পর্কের উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বসাহিত্য থেকে বাংলা সাহিত্য, সবখানেই এ-বিষয়টি নানা আঙ্গিকে এসেছে। কখনো তা প্রেমের রূপ নিয়ে, কখনো ট্র্যাজেডির রূপ নিয়ে, কখনো বিদ্রোহের প্রতীক হ’য়ে, আবার কখনো আত্মবিনাশের শোকগাঁথা হ’য়ে। সাহিত্য নিষিদ্ধ সম্পর্ককে কেবল কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখে না; বরং এর ভেতরের মানবিক বেদনা, আকাঙ্ক্ষা, পরাজয়, ও সামাজিক সংঘাতকে শিল্পরূপে প্রকাশ ক’রে। নিষিদ্ধ সম্পর্ক নিয়ে লেখা সাহিত্যিক সৃষ্টিগুলো পাঠককে আনন্দ দেয় কেবল রোমাঞ্চের কারণে নয়, বরং এই কারণে যে, সেগুলো মানুষের গভীরতম দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত ক’রে। যখন দু’টি মানুষ সমাজের নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তখন সেখানে শুধু প্রেম থাকে না; থাকে ভয়, গোপনতা, ঝুঁকি, অপমান, প্রত্যাখ্যান, এবং আত্মসম্মানের সংকট। এই অনুভূতিগুলিই সাহিত্যকে গভীর ক’রে। নিষিদ্ধ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি প্রায়ই ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। সব নিষিদ্ধ সম্পর্ক সমান নয়। কিছু সম্পর্ককে সমাজ নিষিদ্ধ ক’রে শুধু ঐতিহ্য রক্ষার জন্য; কিছু সম্পর্ক নিষিদ্ধ হয় কারণ সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার থাকে; কিছু সম্পর্ককে নিষিদ্ধ বলা হয় কারণ তা লিঙ্গ-অসমতার শিকার; কিছু সম্পর্ক সমস্যা তৈরি ক’রে, কারণ সেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক, অন্যজন অপ্রাপ্তবয়স্ক; আবার কিছু সম্পর্ক সামাজিক পরিচয়ের সংঘাতে নিষিদ্ধ হ’য়ে ওঠে। তাই নিষিদ্ধ সম্পর্ককে বিচার করতে হলে আবেগের ঘূর্ণির পাশাপাশি ন্যায্যতার মাপকাঠিও বিবেচনা করতে হয়। শুধুমাত্র ‘প্রেম আছে’ বলেই যে কোনো সম্পর্ক বৈধ হ’য়ে যায় না। আবার কেবল ‘সমাজ মানে না’ বলেই যে কোনো সম্পর্ক অবৈধ হয়ে যায় না। এখানে মানবিক অধিকার, সম্মতি, বয়ঃপ্রাপ্তি, ক্ষমতার ভারসাম্য, এবং মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতির প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ সম্পর্ক অনেক সময় ভয়াবহ বলে বিবেচিত হলেও, ইতিহাস বলে যে সমাজ নিজেই বারবার তার নৈতিকতার সীমা বদলেছে। অতীতে যে সম্পর্ক অসম্ভব বা অগ্রহণযোগ্য ছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেক ক্ষেত্রেই স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থাৎ নিষিদ্ধের ধারণা চিরস্থায়ী নয়; এটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে নির্মিত। যে সমাজ আজ এক সম্পর্ককে ঘৃণা ক’রে, কাল তা-ই হয়তো ভিন্ন চোখে দেখবে। এই কারণেই নিষিদ্ধ সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি ঐতিহাসিকও। মানুষের অনুভূতি যেমন বদলায়, তেমনি সামাজিক স্বীকৃতির মানদণ্ডও বদলায়। আবার কিছু নিষেধ মানবকল্যাণের স্বার্থে জরুরি, বিশেষত যেখানে জবরদস্তি, শোষণ, বা ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং নিষিদ্ধ সম্পর্কের আলোচনায় একদিকে মানবিক স্বাধীনতা, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা, দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করা জরুরি। বাস্তব জীবনে নিষিদ্ধ সম্পর্ক প্রায়ই কাহিনিকে টেনে নেয় গোপনতার অন্ধকারে। গোপনতা এখানে কেবল বাহ্যিক লুকোনো নয়, বরং মানসিক দ্বৈততা। যে মানুষ সমাজের চোখ এড়িয়ে সম্পর্ক গ’ড়ে তোলে, সে একই সঙ্গে ভালোবাসে এবং ভয় পায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে সন্দেহ, প্রতিটি সাক্ষাতে থাকে আতঙ্ক, প্রতিটি স্মৃতিতে থাকে বিচ্ছেদের আশঙ্কা। এই দোদুল্যমান মানসিক অবস্থা মানুষের চরিত্রকে ভেঙে ফেলে, আবার নির্মাণও ক’রে। অনেক সময় নিষিদ্ধ সম্পর্ক মানুষকে নিজের সত্যের কাছে নিয়ে যায়; আবার কখনো তা মানুষকে আত্মপ্রবঞ্চনার দিকে ঠেলে দেয়। সম্পর্ক যখন নিষিদ্ধ, তখন প্রেমের সাধারণ সৌন্দর্যও নাটকীয় হ’য়ে ওঠে, কারণ প্রতিটি মুহূর্তে ঝুঁকি যুক্ত থাকে। এই ঝুঁকি সম্পর্ককে গাঢ় ক’রে, কিন্তু একই সঙ্গে বিধ্বংসীও ক’রে তুলতে পারে। মানবমনের এই বৈপরীত্যই নিষিদ্ধ সম্পর্ককে এত আকর্ষণীয় ও এত ভয়ংকর ক’রে তোলে। পরিবারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবার প্রেমের নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে, আবার তা কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও হতে পারে। অনেক নিষিদ্ধ সম্পর্কের জন্ম হয় ঠিক তখনই, যখন পরিবার শিশুকে, তরুণকে বা নারীকে ব্যক্তিসত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, বরং সম্পত্তি, সম্মান, বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে। তখন নিষিদ্ধ সম্পর্ক হ’য়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা। ব্যক্তি চায় নিজের পছন্দ, নিজের আবেগ, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। এই বিদ্রোহ কখনো ন্যায়সংগত, কখনো আত্মঘাতী। কিন্তু যেকোনো ক্ষেত্রেই এটি দেখায় যে মানুষের স্বাধীন সত্তা সহজে দমন করা যায় না। নিষিদ্ধ সম্পর্কের ভেতরে তাই অনেক সময় রাজনৈতিক সুরও থাকে। বিশেষত যখন সমাজের বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণি, বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সম্পর্ককে নিষিদ্ধ ঘোষণা ক’রে, তখন প্রেম কেবল প্রেম থাকে না; তা প্রতিবাদে পরিণত হয়। দু’জন মানুষের ভালোবাসা তখন বৃহত্তর অন্যায়ের বিরুদ্ধে মৌন বিদ্রোহ হ’য়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে এই বিষয়টি নানা লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। সামাজিক বিধি ভেঙে জন্ম নেওয়া সম্পর্ক, অবদমিত নারীচেতনা, শ্রেণিগত অসমতা, এবং পারিবারিক প্রাচীরের বিরুদ্ধে মানুষের মানসিক প্রতিরোধ বহু উপন্যাস, নাটক ও কবিতায় উ’ঠে এসেছে। এসব রচনায় নিষিদ্ধ সম্পর্কের চিত্রায়ণ কখনো করুণ, কখনো ক্ষোভপূর্ণ, কখনো রোমান্টিক, আবার কখনো নির্মম বাস্তববাদী। সাহিত্য আমাদের শেখায় যে, নিষিদ্ধ সম্পর্কের গল্পে কেবল প্রেমিক-প্রেমিকা থাকে না; সেখানে থাকে সমাজের মুখ, পরিবারের শাসন, সময়ের রূঢ়তা, এবং মানবমনের অজানা গহ্বর। একটি নিষিদ্ধ সম্পর্কের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাধারণত অন্যদের মতো সহজে বাঁচতে পারে না। তার জীবন দ্বিধাবিভক্ত হ’য়ে যায়, একদিকে সামাজিক পরিচয়, অন্যদিকে গোপন আবেগ। এই বিভাজন তাকে ধীরে-ধীরে ক্লান্ত ক’রে, নিঃশেষ ক’রে, অনেক সময় ভেঙে ফেলে। কখনো সে মিথ্যার জালে বন্দী হয়, কখনো অপরাধবোধে কাতর হয়, কখনো আত্মসম্মান হারায়। তবুও সে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না। কারণ সম্পর্কটি তার কাছে কেবল আকর্ষণ নয়, একটি আশ্রয়, একটি ঘর, একটি অন্যরকম সত্য ও অন্যরকম সৌন্দর্য। এ-কারণে নিষিদ্ধ সম্পর্কের সাহিত্যিক বিশ্লেষণ মানে কেবল নৈতিক বিচার নয়, মানে এক মানবিক পাঠ। কেন মানুষ নিজের ক্ষতির সম্ভাবনা জেনেও একটি সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়? কেন প্রেম কখনো যুক্তির চেয়েও শক্তিশালী হয়? কেন নিষেধের বোধ আকাঙ্ক্ষাকে আরও উসকে দেয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মানুষের সহজ, সরল, একরৈখিক স্বভাবের মধ্যে মেলে না। মানুষের স্বভাবই জটিল, এবং সেই জটিলতার শিল্পরূপ হলো নিষিদ্ধ সম্পর্ক। সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখলে, নিষিদ্ধ সম্পর্কের অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক দ্বিমুখিতা প্রকট হ’য়ে ওঠে। সমাজ প্রকাশ্যে নৈতিকতার কথা বলে, কিন্তু গোপনে ক্ষমতার সঙ্গে আপস ক’রে। যা শক্তিশালী গোষ্ঠীর জন্য গ্রহণযোগ্য, তা-ই অনেক সময় দুর্বলদের ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফলে নিষিদ্ধ সম্পর্কের বিচার সব সময় সমান ন্যায়সংগত হয় না। একই সমাজ একই কাজকে কখনো রোমাঞ্চকর, কখনো লজ্জাজনক, কখনো ক্ষমাযোগ্য, কখনো অমার্জনীয় বলে দাগিয়ে দেয়। এই দ্বিচারিতা মানুষকে বিভ্রান্ত ক’রে। তাই নিষিদ্ধ সম্পর্কের আলোচনায় নৈতিকতার পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নও জরুরি। কেবল সামাজিক শিষ্টাচার দিয়ে সম্পর্কের সত্য মাপা যায় না। আবার একান্ত ব্যক্তিগত ভালো লাগাকেও অযৌক্তিকভাবে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া যায় না, যদি তাতে অন্যের ক্ষতি হয়। এই দ্বৈত সত্যকে বোঝাই একটি পরিপক্ব সমাজের লক্ষণ। মানসিক দিক থেকেও নিষিদ্ধ সম্পর্ক মানুষের অন্তর্জগতকে উন্মুক্ত ক’রে দেয়। নিষেধ যখন আরোপিত হয়, তখন অনুভূতি আরও গভীরভাবে গোপনে সক্রিয় হয়। অবদমিত বাসনা স্বপ্নে ফিরে আসে, স্মৃতিতে ফিরে আসে, ভাষায় ফিরে আসে, এবং আচরণে ছাপ ফেলে। নিষিদ্ধ সম্পর্ক অনেক সময় মানুষকে দ্বৈত জীবনযাপনে বাধ্য ক’রে। বাইরে সে একটি মুখোশ পরে, ভেতরে অন্য এক জগৎ বহন ক’রে। এই মুখোশধারী জীবনে মানুষ ক্রমে নিজের কাছেও অস্পষ্ট হ’য়ে ওঠে। কে সে, কী চায়, কোনটাকে ভালোবাসা বলে, কোনটাকে দুর্বলতা বলে, এসব প্রশ্নে সে জর্জরিত হয়। কখনো নিষিদ্ধ সম্পর্কের বেদনা মানুষকে পরিণত করে, সহিষ্ণু করে, সংবেদনশীল করে; আবার কখনো তা তাকে চিরকালীন অবিশ্বাসী, কড়া, ও ভঙ্গুর ক’রে তোলে। ফলে নিষিদ্ধ সম্পর্ক একদিকে আবেগের তীব্রতা, অন্যদিকে আত্মিক ক্ষয়ের একটি পরীক্ষাগার। ধর্মীয়, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটেও নিষিদ্ধ সম্পর্ককে বোঝা জরুরি। প্রায় প্রতিটি সমাজেই কিছু সম্পর্ক ধর্মীয় কারণে, কিছু সামাজিক কারণে, কিছু সাংস্কৃতিক কারণে সীমাবদ্ধ। এই সীমা অনেক সময় পরিবার ও সম্প্রদায়ের স্থিতি রক্ষার জন্য গৃহীত হয়, আবার অনেক সময় এটি স্বার্থরক্ষার উপকরণ হ’য়ে ওঠে। ধর্ম মানবজীবনকে শৃঙ্খলিত করতে চায়, নৈতিকতা মানুষকে সংযত করতে চায়, সংস্কৃতি মানুষকে অভ্যাসে বাঁধতে চায়। কিন্তু মানুষের অনুভূতি এই সব সীমানার ভিতর দিয়েই ক্রমাগত পথ খোঁজে। নিষিদ্ধ সম্পর্ক সেই পথের একটি কাঁটায়-ভরা মোচড়। কোথাও তা আত্মসংযমের পরীক্ষা, কোথাও সামাজিক বিদ্রোহ, কোথাও দুর্বলতার সুযোগ, কোথাও নিষ্পাপ ভালোবাসার বিপর্যয়। এই বিভিন্নতা না বোঝা গেলে নিষিদ্ধ সম্পর্কের প্রকৃত বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সাহিত্যিক দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ সম্পর্কের শক্তি নিহিত আছে তার দ্বন্দ্বে। যেখানে দ্বন্দ্ব নেই, সেখানে কাহিনি নেই; যেখানে বাধা নেই, সেখানে তীব্রতা নেই। নিষিদ্ধতা প্রেমকে তাত্ক্ষণিকভাবে উচ্চতর আবেগের স্তরে নিয়ে যায়, কারণ সেখানে অর্জনের ঝুঁকি, হারানোর ভয়, এবং উন্মোচনের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সাহিত্য আবার কেবল আকর্ষণের গল্পও বলে না; সে বলে পতনের গল্প, ক্ষতির গল্প, বিচ্ছেদের গল্প, এবং কখনো উদ্ধার পাওয়ার গল্প। নিষিদ্ধ সম্পর্কের চরিত্রগুলো পাঠকের চোখে কখনো করুণ, কখনো দোষী, কখনো সাহসী, কখনো অনিশ্চিত, আবার কখনো স্পষ্টতই শোষিত মনে হতে পারে। এই বহুমাত্রিকতা সাহিত্যকে নান্দনিকভাবে সমৃদ্ধ ক’রে। একটি ভালো প্রবন্ধ, বিশেষত সাহিত্যিক প্রবন্ধ, নিষিদ্ধ সম্পর্ককে সরল নৈতিক বাক্যে বন্দী করতে পারে না; তাকে অনুভূতি, সমাজ, ইতিহাস, ও মানবচেতনার জালে রেখে বিচার করতে হয়। সমকালীন সমাজে নিষিদ্ধ সম্পর্কের ধারণা আরও জটিল হ’য়ে উঠেছে। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নগরজীবন, পারিবারিক ভাঙন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং দ্রুত বদলে যাওয়া মূল্যবোধের যুগে সম্পর্কের ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। গোপনতা এখন আর আগের মতো নয়, আবার জনসমক্ষে এসে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। মানুষ এখন একে অপরকে দ্রুত জানে, দ্রুত বিচার করে, দ্রুত নিন্দা ক’রে। ফলে নিষিদ্ধ সম্পর্কের সংকটও বহুগুণ বেড়ে গেছে। অতীতে যা নীরবে লুকিয়ে রাখা যেত, এখন তা প্রায়ই উন্মোচিত হ’য়ে প’ড়ে। এই উন্মোচন সম্পর্ককে আরও বিপদগ্রস্ত ক’রে তোলে, আবার সমাজের দ্বিমুখিতা ও কৌতূহলও প্রকাশ ক’রে। আধুনিক যুগে নিষিদ্ধ সম্পর্ক কেবল ব্যক্তি-নাটক নয়; এটি মিডিয়া, জনমত, আইন, মানসিক স্বাস্থ্য, এবং অধিকার-চেতনার একটি যৌথ ক্ষেত্র। মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আজ অধিক স্বীকৃত, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও সমান জরুরি। তাই নিষিদ্ধ সম্পর্ককে বিচার করতে হলে আবেগের ওপর না ভর দিয়ে সুষম মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হয়। সব সম্পর্ককে এক মাপে মাপা যায় না। কিছু সম্পর্ক সমাজের স্থিতির জন্য ক্ষতিকর; কিছু সম্পর্ক নিছক কুসংস্কারের শিকার; কিছু সম্পর্ক স্বাধীনতার প্রশ্ন; কিছু সম্পর্ক শোষণের শৃঙ্খল। এই পার্থক্য না বুঝে নিষিদ্ধ সম্পর্কের নামে সবকিছুকে একত্রে ধিক্কার দিলে তা অগভীর হবে। আবার নিষেধ ভাঙার নাম ক’রে সব কিছু বৈধ বললেও তা দায়িত্বহীন হবে। তাই প্রজ্ঞা হলো এই দুই চরমের মাঝখানে দাঁড়ানো। নিষিদ্ধ সম্পর্কের শেষ পরিণতি প্রায়শই করুণ হয়, কারণ নিষেধ শুধু বাইরে থাকে না, ভেতরেও ঢুকে পড়ে। নিষিদ্ধতার ছায়া ভালোবাসাকে সন্দেহপ্রবণ করে, সম্পর্ককে নিরাপত্তাহীন করে, এবং অংশগ্রহণকারীদের মানসিক স্থিতি নষ্ট করে। তবুও মানুষ এই ঝুঁকি নেয়, কারণ সম্পর্ক তার কাছে জীবন-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এখানে মানবহৃদয়ের অদ্ভুত সত্য প্রকাশ পায়, মানুষ কখনো সুখের জন্য নয়, গভীরতার জন্যও ভালোবাসে; আর গভীরতা সব সময় শান্ত নয়, তা অনেক সময় দগ্ধ, বিপজ্জনক এবং নিষিদ্ধ। এই কারণেই নিষিদ্ধ সম্পর্ক কেবল সমাজবিজ্ঞানের বিষয় নয়, কবিতারও বিষয়, মনস্তত্ত্বেরও বিষয়, দর্শনেরও বিষয়। এটি দেখায় মানুষ কতটা ভঙ্গুর, কতটা সাহসী, কতটা স্বার্থপর, কতটা করুণ, কতটা অসাধারণ। নিষিদ্ধ সম্পর্কের আলোচনায় শেষ কথা হলো,মানুষের হৃদয়কে সম্পূর্ণ বন্দী করা যায় না, আবার হৃদয়ের নাম করে নৈতিক শৃঙ্খল ভাঙারও অনুমতি দেওয়া যায় না। এই দ্বন্দ্বই সভ্যতার মূল। সমাজ চায় নিয়ম, মানুষ চায় অনুভব; সমাজ চায় স্থিতি, মানুষ চায় স্বাধীনতা; সমাজ চায় পরিচ্ছন্নতা, মানুষ চায় সত্য; সমাজ চায় সীমা, মানুষ চায় অসীমতা। নিষিদ্ধ সম্পর্ক এই সব বিপরীত চাওয়ার সংঘর্ষস্থল। তাই এর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত বিচারমুখী হলেও নির্মম নয়, সংবেদনশীল হলেও অন্ধ নয়, মানবিক হলেও দায়িত্বহীন নয়। সাহিত্য এই শিক্ষাই দেয় যে, নিষিদ্ধ সম্পর্কের ভেতর দিয়ে আমরা আসলে মানুষকেই আরও ভালোভাবে বুঝি, তার ভয়, তার লোভ, তার প্রেম, তার পরাজয়, তার বিদ্রোহ, তার অপরাধবোধ, এবং তার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নিষিদ্ধ সম্পর্ক তাই শেষ পর্যন্ত কেবল এক সম্পর্কের গল্প নয়; এটি মানবজীবনের অন্তর্লীন সংঘাতের, সামাজিক বিধিনিষেধের, এবং নীরব বিদ্রোহের এক গভীর আখ্যান। এই আখ্যান আমাদের বলে, মানুষ শুধু নিয়মে বাঁচে না, সে বাসনায়ও বাঁচে; আর বাসনা যখন সমাজের দেয়ালে আঘাত ক’রে, তখন জন্ম নেয় নিষিদ্ধ সম্পর্কের সেই চিরন্তন, যন্ত্রণাময়, অথচ অবিনাশী কাহিনি।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...