লেখক ও
প্রকাশক, এই দুই সত্তা যেন একই
নদীর দুই তীর, একে অন্যকে ঘিরেও আলাদা, একে অন্যকে ছুঁয়েও
ভিন্ন। সাহিত্যজগতে তাদের সম্পর্ক কেবল ব্যবসা ও সৃষ্টির সম্পর্ক নয়, তা নির্ভরতা, সহযোগিতা, দ্বন্দ্ব, প্রত্যাশা, বিশ্বাস এবং কখনো কখনো অদৃশ্য এক চুক্তির সম্পর্ক; যে চুক্তি কাগজে লেখা থাকে না, কিন্তু বইয়ের
প্রতিটি পাতায় তার ছায়া পড়ে। প্রশ্নটি যখন ওঠে, লেখক ও প্রকাশক, কে কার উপর
নির্ভর, তখন সহজ উত্তর দেওয়া কঠিন, কারণ সম্পর্কটি একমুখী নয়। লেখক
ছাড়া প্রকাশক অর্থহীন, প্রকাশক ছাড়া লেখক অপূর্ণ। আবার পাঠক ছাড়া উভয়েই
নিঃসঙ্গ। তবু যদি গভীরে যাই, দেখি এই নির্ভরতা সমান নয়, বরং সময়, সমাজ, অর্থনীতি,
প্রযুক্তি, বাজার, খ্যাতি, সৃজনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার
তারতম্যে বদলে যায়। একসময় লেখক প্রকাশকের মুখাপেক্ষী ছিলেন, আবার কখনো প্রকাশক লেখকের প্রতীক্ষায় থাকেন। কখনো লেখকের জন্য প্রকাশক
দরজা, কখনো প্রকাশকের জন্য লেখক প্রাণ; কখনো লেখক সৃষ্টি করেন, প্রকাশক তাকে আকার দেন,
আর কখনো প্রকাশক কাঠামো তৈরি করেন, লেখক
তার ভেতর আত্মা ঢেলে দেন। এই পারস্পরিক নির্ভরতার ইতিহাস সাহিত্যচর্চার ইতিহাসের
মতোই পুরোনো, একই সঙ্গে জটিল ও মনোমুগ্ধকর। লেখক জন্ম দেন
শব্দের, প্রকাশক সেই শব্দকে সমাজের সামনে নিয়ে আসেন। লেখক
লিখে যান নীরবে, প্রকাশক প্রচারের আলো জ্বালান। লেখক
ভাবনায় ডুবে থাকেন, প্রকাশক বাস্তবতার হিসাব করেন। লেখক
কল্পনার ভিত গ’ড়ে,
প্রকাশক সেই ভিতের উপর বইয়ের ঘর তোলে। কিন্তু এই তুলনা কোনো সহজ
শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা নয়, বরং এক গভীর সহযাত্রার স্বীকৃতি।
লেখকের কাছে প্রকাশক কখনো সহযাত্রী, কখনো অভিভাবক,
কখনো বাজার-সেতু, কখনো প্রয়োজনীয় বাধা;
প্রকাশকের কাছে লেখক কখনো সোনার খনি, কখনো
ঝুঁকি, কখনো ব্র্যান্ড, কখনো
শিল্পী, কখনো অনিশ্চিত বিনিয়োগ। এই দু’টি মানুষের ভেতর
সম্পর্ককে বুঝতে হলে শুধু বই নয়, বইয়ের পেছনের সময়টাও বুঝতে হবে। আদিম কালে যখন
পাণ্ডুলিপি হাতে লিখে কপি করা হতো, তখন লেখকই ছিল মূল;
কারণ তার হাতে ছিল সৃষ্টি, তার হাতে ছিল
একচ্ছত্র বৌদ্ধিক মালিকানা। কিন্তু মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের পর এই চিত্র বদলে
যায়। বই আর একক শিল্পসত্তার হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা
বাজারের, ছাপাখানার, বিতরণের এবং
পাঠকের বৃহৎ জগতে প্রবেশ ক’রে। তখন প্রকাশকের ভূমিকা বাড়ে।
কারণ লেখার সঙ্গে-সঙ্গে এখন বইকে বেঁচে থাকারও ব্যবস্থা করতে হয়। প্রকাশক
শুধু মুদ্রণকারী নয়,
সে হ’য়ে ওঠে বাছাইকারী, সংরক্ষণকারী,
সম্পাদক, বিপণনকারী এবং অনেক ক্ষেত্রে
সাহিত্যিক রুচির নীরব নির্মাতা। কিন্তু এ-ও সত্য যে, প্রকাশক নিজে সাহিত্য
সৃষ্টি করেন না; তার হাতে শব্দ নেই, আছে অবকাঠামো। লেখক শব্দ
সৃষ্টি করেন, প্রকাশক শব্দকে জনপরিসরে পৌঁছে দেন। সুতরাং
নির্ভরতা এখানে দ্বিমুখী, কিন্তু উৎসের দিক থেকে লেখকই
প্রথম। একখানা বইয়ের বীজ লেখকের মনেই জন্ম নেয়; প্রকাশক
সেই বীজকে অঙ্কুরিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি ক’রে। তবু বাস্তবে অনেক
সময় লেখকই প্রকাশকের উপর বেশি নির্ভরশীল হ’য়ে পড়েন। কেননা তার সৃষ্টির
পরিণতি, মুদ্রণ, বাজারজাতকরণ,
পরিবেশন, বিজ্ঞাপন, মজুদ, বিক্রি, রয়্যালটি,এসবের অধিকাংশই প্রকাশকের হাতে। একজন কবি কিংবা ঔপন্যাসিক যতই
প্রতিভাবান হোন, যদি তিনি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে না পারেন,
তবে তাঁর প্রতিভা অনেকটা অরণ্যের নিঃশব্দ বৃক্ষের মতো, সুগন্ধি আছে, কিন্তু কোনো
পথচারী নেই। প্রকাশক এই পথচারীর ব্যবস্থা করেন। তিনি বইকে দোকানে, মেলায়, লাইব্রেরিতে, অনলাইন
শেলফে, পাঠকের হাতে পৌঁছে দেন। ফলে লেখক তার ভাবনার
স্বাধীনতা বজায় রাখলেও বাস্তব জগতের সঞ্চালনে প্রকাশকের উপর নির্ভরশীল হন। আবার
প্রকাশকও লেখকের উপর নির্ভরশীল। কারণ প্রকাশনা শিল্পের মূল সম্পদ কাগজ, ছাপা, প্রচার নয়, মূল সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্য, শক্তিশালী,
পাঠক-আকর্ষণকারী লেখা। যদি লেখক না থাকেন, প্রকাশকের গুদাম কাগজে ভরে যাবে, কিন্তু বই
হবে না। বই না হলে প্রকাশনা কেবল একটি খালি প্রতিষ্ঠান। প্রকাশকের দোকানে যতই আলো
থাকুক, সেখানে বিক্রির জন্য যদি প্রাণহীন লেখা থাকে,
তবে সে আলো অচিরেই ফিকে হ’য়ে যাবে। তাই প্রকাশক
লিখিত সত্তার উপর নির্ভর করেন, বিশেষত এমন লেখকের উপর, যিনি
পাঠককে ধ’রে রাখতে পারেন, বাজারকে নাড়িয়ে দিতে পারেন, সমালোচককে ভাবাতে পারেন, আর দীর্ঘকাল পাঠযোগ্য
হতে পারেন। একজন সফল প্রকাশক জানেন, বইয়ের ভেতরের ভাষা, চরিত্র,
আখ্যান, তর্ক, আবেগ,
বুদ্ধি,এসবই তাঁর ব্যবসার ভিত। ফলে
প্রকাশকের অর্থনৈতিক সাফল্য, সাংস্কৃতিক মর্যাদা, এমনকি সুনাম পর্যন্ত লেখকের উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে লেখকের সামাজিক
প্রতিষ্ঠা, পাঠকপ্রাপ্তি এবং কখনো জীবিকা প্রকাশকের উপর
নির্ভরশীল। এই দ্বৈত নির্ভরতার মাঝে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা কার? তত্ত্বগতভাবে
লেখকই কেন্দ্র, কারণ তিনি সৃষ্টি করেন। কিন্তু বাস্তবে
প্রকাশক অনেক সময় নিয়ন্ত্রণকারী হ’য়ে ওঠেন, কারণ তাঁর
হাতে মুদ্রণ ও প্রচারের চাবি। সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিতরণের মধ্যে এই
ক্ষমতা-বিভাজন সবসময় সমান থাকে না। কোনো কোনো যুগে লেখক নিজেই প্রকাশক হয়েছেন,
আবার কোনো কোনো যুগে প্রকাশক লেখকের সৃষ্টির প্রাথমিক বিচারক হ’য়ে দাঁড়িয়েছেন।
সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত,
বাজারের চাপ, পাঠকের রুচি, বিনিয়োগের ঝুঁকি,এসবের কারণে প্রকাশক কখনো
লেখা বদলাতে বলেন, শিরোনাম পাল্টাতে চান, কভার নির্ধারণ করেন, এমনকি বিষয়বস্তুর ঝুঁকি
এড়াতে লেখককে সংযত করেন। তখন প্রশ্ন ওঠে, লেখক কি স্বাধীন?
না কি প্রকাশকের সন্তুষ্টি-নির্ভর? বাস্তবতা
হলো, পূর্ণ স্বাধীনতা বিরল। লেখক মনের স্বাধীনতায় লিখলেও
বই যখন বাজারে আসে, তখন তা কেবল সাহিত্য নয়; দ্রব্যও বটে। আর দ্রব্যের সঙ্গে বাজারের শর্ত জুড়ে যায়। প্রকাশক সেই
শর্তের প্রতিনিধি। তাই লেখক অনেকসময় ভাবেন, প্রকাশক কি
কেবল ক্রেতা ও প্রযোজকের মাঝখানের ব্যক্তি? না, সে কি সাহিত্য-গেটকিপার? উত্তর দুটিই আংশিক
সত্য। প্রকাশক বাজারেরও মানুষ, আবার সংস্কৃতিরও মানুষ।
ভালো প্রকাশক এমন হন যিনি কেবল লাভ দেখেন না, রুচি দেখেন;
কেবল বিক্রি দেখেন না, সম্ভাবনাও দেখেন;
কেবল লাভজনক বই ছাপেন না, নতুন
কণ্ঠস্বরও তু’লে ধরেন। কিন্তু কমজোরি প্রকাশনা ব্যবস্থা লেখককে অনেক সময়
আস্থাহীনতায় ফেলে দেয়। তিনি নিজের বই মুদ্রণের জন্য অনুনয় করেন, ফেরত পান দেরি
ক’রে,
রয়্যালটির হিসাব বুঝতে পারেন না, প্রচারের
প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না। তখন লেখকের কাছে প্রকাশক হ’য়ে ওঠেন একধরনের
অপরিহার্য অসুবিধা। তবু লেখককে প্রকাশকের কাছে যেতে হয়, কারণ বই
মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য এই সেতু প্রয়োজন। আবার একথাও ভুলে গেলে চলবে না,
প্রকাশকও সবসময় শক্তিশালী নন। বড় লেখক, জনপ্রিয়
নাম, অনন্য কণ্ঠস্বর, পুরস্কারপ্রাপ্ত
সাহিত্যিক, এঁদের কাছে প্রকাশকও অনেক সময় নির্ভরশীল হ’য়ে পড়েন। একজন
প্রতিষ্ঠিত লেখকের নতুন বই মানে প্রকাশকের সম্ভাব্য বিক্রি, তাঁর
ক্যাটালগের মান, মেলায় আকর্ষণ, মিডিয়ার
নজর, পাঠকের আগ্রহ। ফলে খ্যাতিমান লেখক চাইলে শর্ত দিতে
পারেন, বিশেষ সুবিধা নিতে পারেন, এমনকি এক প্রকাশনা থেকে আরেকটিতে চলে যেতে পারেন। তখন প্রকাশক লেখককে
আঁকড়ে ধরেন। অর্থাৎ নির্ভরতার মানচিত্র বদলাতে থাকে। একজন নবীন লেখকের ক্ষেত্রে
প্রকাশক কর্তৃত্বশীল, কিন্তু একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের
ক্ষেত্রে লেখকই হ’য়ে ওঠেন শক্তির উৎস। তবে এ-শক্তি সবসময় সমান
অর্থনৈতিক শক্তি নয়;
কখনো এটি নৈতিক শক্তি, কখনো সাংস্কৃতিক।
লেখকের আসল সম্পদ তাঁর সৃষ্টিশীলতা, আর প্রকাশকের সম্পদ
তাঁর অবকাঠামো ও নেটওয়ার্ক। এই দুই সম্পদ যখন মিলিত হয়, তখন
বই কেবল জিনিস থাকে না, হ’য়ে ওঠে ঘটনা। সাহিত্য
ইতিহাসে এমন অগণিত উদাহরণ আছে যেখানে প্রকাশকই কোনো লেখকের কণ্ঠস্বরকে জগতের সামনে
এনেছেন। আবার এমনও দেখা গেছে, লেখকের প্রতিভা থাকলেও ভুল প্রকাশক, অবহেলিত সম্পাদনা, দুর্বল বিপণন, অদক্ষ বিতরণ তাঁকে আড়াল ক’রে রেখেছে। তাই বলা
যায়, লেখক ও প্রকাশক উভয়েই পরস্পরের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু তাদের নির্ভরতার প্রকৃতি সমান নয়। লেখক নির্ভর করেন অস্তিত্বের
পর্যায়ে, প্রকাশক নির্ভর করেন কার্যকারিতার পর্যায়ে।
লেখকের কাছে প্রকাশক মানে বইয়ের সামাজিক জীবন; প্রকাশকের
কাছে লেখক মানে বইয়ের জন্ম। জন্ম না হলে জীবন নেই, জীবন
না হলে বিস্তার নেই। এই সত্য যতই সাধারণ মনে হোক, সাহিত্যচর্চার
ভিত সেটাই। তবু এই সম্পর্কের মধ্যে নৈতিকতার প্রশ্ন গভীর। একজন ভালো প্রকাশক
লেখককে শুধু মুনাফার উৎস হিসেবে দেখেন না; তিনি লেখকের
ভাষা, মনন, পরিশ্রম, নিঃসঙ্গতা, উদ্বেগ ও শ্রমকে সম্মান করেন। একজন
ভালো লেখকও প্রকাশককে কেবল টাকা জোগাড়ের যন্ত্র হিসেবে দেখেন না; তিনি তাঁর বইকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অংশীদার হিসেবে দেখেন। যখন এই
পারস্পরিক সম্মান থাকে, তখন সম্পর্ক সুস্থ থাকে। আর যখন
সেই সম্মান ভেঙে যায়, তখন হয় শোষণ, না হয় অবিশ্বাস। প্রকাশনা জগতে শোষণের একটি বড় রূপ হলো লেখকের শ্রমের
অবমূল্যায়ন। কেউ কেউ মনে করেন, লেখা তো লেখকের শখ,
তাই তার মূল্য কম; অথচ একটি ভালো বইয়ের
পেছনে থাকে বহু বছরের অধ্যয়ন, শব্দচয়ন, সংশোধন, মানসিক দহন, অভিজ্ঞতার
সঞ্চয়। এই শ্রম যদি প্রকাশক স্বীকার না করেন, তবে
সম্পর্কটি ব্যবসায় নেমে আসে, সাহিত্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ
হয়। অপরদিকে লেখক যদি প্রকাশককে শুধু টাকা-পয়সার হিসাবের জন্য দোষারোপ করেন অথচ
বাজারের বাস্তবতা না বোঝেন, তবে সম্পর্কটি অবাস্তব হ’য়ে প’ড়ে। প্রকাশককে
মুদ্রণখরচ, কাগজের দাম, পরিবহন, দোকান
কমিশন, কর, অবিক্রীত কপির ঝুঁকি
সামলাতে হয়। ফলে তাঁরও সীমাবদ্ধতা আছে। লেখক যতই কল্পনার রাজ্যে থাকুন, প্রকাশককে বাস্তবের মাটিতে হাঁটতে হয়। এ-কারণেই দুজনের
সম্পর্ককে শুধু আদর্শিক দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। এটি কেবল ভালোবাসার নয়, হিসাবেরও
সম্পর্ক; কেবল স্বপ্নের নয়, জটিল
অর্থনীতিরও সম্পর্ক। তবু এই হিসাবের বাইরে একটি পবিত্রতা আছে। সে হলো বিশ্বাস।
লেখক বিশ্বাস করেন, প্রকাশক তাঁর লেখাকে নষ্ট করবেন না।
প্রকাশক বিশ্বাস করেন, লেখক অযথা দুর্বল, অপাঠ্য, দায়িত্বহীন লেখা দেবেন না। এই বিশ্বাস
ভেঙে গেলে পুরো সেতুটি ডুবে যায়। একটি বই প্রকাশের আগে যেমন সম্পাদনার দরকার,
তেমনি সম্পর্কে দরকার সংলাপ। লেখককে জানতে হবে কীভাবে তাঁর লেখা
উপস্থাপিত হবে, আর প্রকাশককে জানতে হবে কীভাবে লেখকের
স্বরকে অক্ষুণ্ণ রাখা যায়। বইয়ের প্রচ্ছদ, কাগজ, টাইপোগ্রাফি, মুদ্রণমান, শিরোনাম, এসব কেবল বাহ্যিক নয়; এগুলোও পাঠের
অংশ। প্রকাশক এখানে নীরব সহলেখকের মতো, যদিও তাঁর নাম
মলাটে লেখকের সমানভাবে উজ্জ্বল নাও হতে পারে। ভালো প্রকাশক জানেন, বইয়ের সৌন্দর্য পাঠকের মনে লেখকের প্রতি আস্থা তৈরি ক’রে। খারাপ প্রকাশক
জানেন না, বা জানলেও গুরুত্ব দেন না। ফলে লেখক যদি ভালো প্রকাশকের হাতে পড়েন,
তাঁর সৃষ্টি বিকশিত হয়; আর খারাপ প্রকাশকের
হাতে পড়লে সৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ-কারণে অনেক লেখক প্রকাশকের প্রতি
কৃতজ্ঞ থাকেন, আবার অনেক প্রকাশক লেখকের প্রতি গর্ববোধ করেন। কিন্তু কৃতজ্ঞতা ও
গর্বের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম রাজনীতি আছে। লেখক যদি অতি নির্ভরশীল হ’য়ে পড়েন, তবে তাঁর কণ্ঠ
দুর্বল হ’য়ে যায়। প্রকাশক যদি অতিরিক্ত ক্ষমতাবান হন, তবে সাহিত্যের
স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। তাই সম্পর্কের সঠিক ভারসাম্য দরকার। লেখককে নিজের মেরুদণ্ড
বজায় রাখতে হবে, আর প্রকাশককে নিজের দক্ষতা। একজন
আরেকজনকে চাপিয়ে নয়, বরং পরিপূরক হ’য়ে উঠবেন। এই
পরিপূরকতার ধারণাই সাহিত্যসভ্যতার ভিত্তি। একা লেখক বইকে সম্পূর্ণ করতে পারেন না, একা প্রকাশক
বইকে সৃষ্টি করতে পারেন না। লেখক না হলে ভাবনা জন্মায় না, প্রকাশক না হলে ভাবনার দেহ হয় না। লেখক ও প্রকাশক যেন দুটি ধ্রুব,
যাদের মধ্যে সংঘর্ষও আছে, আবার সমঝোতাও
আছে। লেখক স্বাধীনতার কথা বলেন, প্রকাশক বাস্তবতার কথা
বলেন; লেখক বলেন ‘আমি এভাবে লিখতে চাই’, প্রকাশক বলেন ‘পাঠক কীভাবে গ্রহণ
করবে?’; লেখক বলেন ‘সত্য প্রয়োজন’, প্রকাশক বলেন ‘সত্য যেন পাঠযোগ্যও
হয়।‘ কখনো
এই দুই কণ্ঠে সংঘাত হয়,
কিন্তু সেই সংঘাতও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কারণ উত্তম বই
প্রায়শই এমন এক জায়গায় জন্ম নেয়, যেখানে সৃজনশীল অনিয়ম আর
সম্পাদিত শৃঙ্খলা মিলিত হয়। অতিরিক্ত স্বাধীনতা কখনো অগোছালো লেখার জন্ম দেয়,
অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কখনো প্রাণহীন বইয়ের জন্ম দেয়। তাই লেখক ও
প্রকাশকের নির্ভরতা আসলে একটি সুষম নৃত্য। তাদের মধ্যে কেউ শাসক, কেউ শাসিত, এমন সরলীকরণ যথেষ্ট নয়। বরং কেউ
স্রষ্টা, কেউ প্রবর্তক; কেউ বীজ, কেউ মাটি; কেউ জ্যোতি, কেউ প্রদীপ; কেউ কণ্ঠ, কেউ অনুরণন। বইয়ের পরিণতি এ-দুয়ের মিলনে। আর পাঠক? পাঠক হলো সেই
তৃতীয় শক্তি, যে এই সম্পর্কের সত্যতা নির্ধারণ ক’রে। পাঠক গ্রহণ না
করলে লেখক-প্রকাশকের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। পাঠক গ্রহণ করলে প্রকাশকের ঝুঁকি সার্থক
হয়, লেখকের শ্রম ফল দেয়। তাই শেষ বিচারে উভয়ের নির্ভরতা পাঠকের উপরও
বিস্তৃত। তবে পাঠককে পৌঁছাতে গেলে প্রথম সেতু হলো প্রকাশক, আর প্রকাশকের প্রাথমিক সম্পদ হলো লেখক। সাহিত্যজগৎকে যদি একটি জীবন্ত
শরীর ধরা যায়, তবে লেখক তার হৃদয়, প্রকাশক তার রক্তসঞ্চালনব্যবস্থা, আর পাঠক তার
শ্বাস। হৃদয় বাঁচিয়ে রাখে, রক্ত ছড়িয়ে দেয়, শ্বাস গ্রহণ করে। একটির অভাবেই অন্যটি দুর্বল। সুতরাং কে কার উপর
নির্ভর-এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর একক নয়। লেখক নির্ভর করেন
প্রকাশকের উপর, কারণ তাঁর লেখা বই হ’য়ে উঠতে হলে প্রতিষ্ঠান, সম্পাদনা,
মুদ্রণ, বিপণন ও বিতরণের সাহায্য
প্রয়োজন। প্রকাশক নির্ভর করেন লেখকের উপর, কারণ তাঁর
সমস্ত প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত অক্ষরের জীবনধারণের জন্য নির্মিত। কিন্তু
সূক্ষ্মভাবে দেখলে, লেখকের নির্ভরতা অস্তিত্বগত, প্রকাশকের নির্ভরতা কর্মগত; লেখক সৃষ্টি করেন,
প্রকাশক চালনা করেন; লেখক স্বপ্ন দেখেন,
প্রকাশক সেই স্বপ্নকে বাজারে টিকিয়ে রাখেন। এই সম্পর্কের
সৌন্দর্যও এখানেই, সংঘর্ষও এখানেই। যদি দুই পক্ষ একে
অন্যকে সম্মান ক’রে,
তবে বই হবে কেবল ব্যবসা নয়, হবে সভ্যতার
আলোক। যদি কেউ কাউকে শোষণ ক’রে, তবে বই হবে কেবল পণ্য, আর সাহিত্য হারাবে আত্মা। সুতরাং বলা যায়, লেখক
ও প্রকাশক পরস্পরের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু তাদের
নির্ভরতার রেখা সমান্তরাল নয়; একে অন্যকে ছাড়িয়ে নয়,
একে অন্যকে পূর্ণ ক’রে তারা টিকে থাকে।
লেখক শব্দের জন্ম দেন,
প্রকাশক শব্দকে সমাজে বাঁচান; লেখক না
থাকলে প্রকাশকের ঘর শূন্য, প্রকাশক না থাকলে লেখকের
স্বপ্ন অসমাপ্ত। এই অসমতার মধ্যেই আছে তাদের ন্যায্য সমতা, তাদের দ্বন্দ্বের মধ্যে আছে তাদের প্রয়োজন, আর
তাদের নির্ভরতাই সাহিত্যকে যুগে যুগে জীবন্ত রেখেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন