সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কেমন হলো নির্বাচন ২০২৬

 


বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে নির্বাচন সবসময়ই এক গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক ঘটনা। নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক চেতনা, নাগরিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রতিচ্ছবি। ‘কেমন হল নির্বাচন ২০২৬’,  এই প্রশ্নের মধ্যে তাই কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, একটি সমগ্র জাতিগত অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি রয়েছে। নির্বাচন কেমন হলো, তা বোঝার জন্য শুধু ফলাফল দেখলেই হয় না; দেখতে হয় পরিবেশ কেমন ছিল, জনগণের অংশগ্রহণ কেমন ছিল, রাজনৈতিক দলগুলো কী ধরনের ভূমিকা পালন করল, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ থাকল, ভোটাররা কতটা আস্থাবান হল এবং রাষ্ট্র ও সমাজ নির্বাচনের পর কী ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিচার করতে হয়।

নির্বাচন সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা সবসময়ই উচ্চ। জনগণ চায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, যেখানে ভোটাধিকার হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থবহ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নির্বাচনী বাস্তবতা বহুস্তরীয়। এখানে একদিকে আছে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে আছে দলীয় স্বার্থ, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বিভাজন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণার নতুন জটিলতা। ২০২৬ সালের নির্বাচনও এসব বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং বলা যায়, এই নির্বাচন হয়ে উঠেছিল সময়ের এক বিশেষ প্রতিচ্ছবি, যেখানে পুরনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পাশাপাশি অবস্থান করেছিল। নির্বাচনের ভালো-মন্দ বিচার করতে হলে প্রথমেই দেখতে হয় ভোটারের মনোভাব। বাংলাদেশের জনগণ ইতিহাসগতভাবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন। গ্রাম থেকে শহর, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শিক্ষিত তরুণসবার মধ্যেই নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। ভোট দেওয়া এখানে শুধু নাগরিক অধিকার নয়, অনেক সময় তা রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের মাধ্যম, কখনও প্রতিবাদের ভাষা, আবার কখনও আশার প্রতীক। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ, বিশেষত তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি, ছিল বিশেষভাবে আলোচনার বিষয়। তরুণ প্রজন্ম এখন কেবল দলীয় স্লোগানে সন্তুষ্ট নয়; তারা চায় কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন, শিক্ষার মান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপদ জীবন এবং জবাবদিহিমূলক শাসন। ফলে নির্বাচনী প্রচারণায় আবেগের পাশাপাশি যুক্তি, প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবতার দাবি প্রবল হ’য়ে ওঠে। এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে নির্বাচনী সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক দিক। তবে নির্বাচনের গুণগত মান কেবল ভোটারের আগ্রহে নির্ভর করে না। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব যাদের হাতে থাকে, তাদের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা একটি মৌলিক শর্ত। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাহলে নির্বাচন যতই আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হোক না কেন, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হ’য়ে পড়ে। ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে প্রত্যাশা ছিল, তার একটি বড় অংশই নির্ভর করছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপর। জনগণ চায় না কেবল ভোট; তারা চায় নিরাপদ ভোট। মানুষ চায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শান্তভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে, ভয়হীন পরিবেশে লাইনে দাঁড়াতে, কোনো প্রভাব বা চাপ ছাড়াই পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন জানাতে। যেখানে এই নিশ্চয়তা থাকে, সেখানেই নির্বাচন অর্থবহ হয়। যেখানে তা অনুপস্থিত, সেখানে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও গণতন্ত্রের প্রাণসত্তা দুর্বল হ’য়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণও নির্বাচনের মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। একটি ভালো নির্বাচন মানে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন নয়; বরং তা হতে হবে নীতিনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলগুলো যদি জনগণের কাছে কেবল ক্ষমতার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক ন্যায়বিচার, দুর্নীতি দমন, শিক্ষা সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার রূপরেখা উপস্থাপন করে থাকে, তাহলে তা ছিল ইতিবাচক। কিন্তু যদি প্রচারণা কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ, গুজব, অপপ্রচার এবং বিভাজনমূলক ভাষায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। নির্বাচনী রাজনীতি তখনই সুন্দর হয়, যখন দলগুলো নিজের শক্তি দেখানোর বদলে জনগণের সমস্যার সমাধান দিতে প্রতিযোগিতা করে। নির্বাচনী বিতর্ক যদি নীতি, কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার স্তরে উঠতে পারে, তাহলে নির্বাচনের মানও উন্নত হয়।

 

একটি নির্বাচনের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো অংশগ্রহণ। শুধু প্রার্থীর সংখ্যা নয়, ভোটারের অংশগ্রহণও জরুরি। নির্বাচনে মানুষের উপস্থিতি যত বেশি, নির্বাচনের প্রতিনিধিত্ব তত বেশি। ২০২৬ সালের নির্বাচনে যদি সমাজের সব স্তরের মানুষনারী, তরুণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবী শ্রেণি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষক, পেশাজীবীসক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে থাকে, তাহলে তা একটি বড় অর্জন। কারণ ভোটাধিকার প্রয়োগ কেবল রাজনৈতিক কর্তব্য নয়; এটি আত্মমর্যাদার বিষয়ও বটে। বিশেষত নারীদের অংশগ্রহণ যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। নারী ভোটারদের নিরাপত্তা, সচেতনতা, প্রবেশগম্যতা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ যত বাড়ে, নির্বাচন ততই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র যত দৃশ্যমান হয়ে থাকবে, ততই বলা যাবে নির্বাচনটি ভালো হয়েছে। আধুনিক নির্বাচনে প্রযুক্তির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ডিজিটাল প্রচারণা, ভিডিও বার্তা এবং লাইভ প্রচারণা এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৬ সালের নির্বাচনও এর বাইরে ছিল না। প্রযুক্তি নির্বাচনী বার্তাকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তি এবং অপপ্রচারের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই এই নির্বাচনে ডিজিটাল শৃঙ্খলা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল প্রচারণা ছিল বিশেষ প্রয়োজনীয়। যারা তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, তারা গণতন্ত্রের ক্ষতি করেছে। আর যারা প্রযুক্তিকে সচেতনতা, সংলাপ ও স্বচ্ছতার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে, তারা নির্বাচনী সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এ কারণেই বলা যায়, ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু ব্যালটের নির্বাচন ছিল না, তা ছিল তথ্যযুদ্ধেরও একটি পর্ব। এই বাস্তবতায় জনগণের বোধ, মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের নৈতিকতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছিল। নির্বাচনের আরেকটি বড় মাত্রা হলো অর্থনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনই অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ও সামাজিক উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ ভোট দেয় কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, জীবনের বাস্তব চাহিদার কারণে। দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, বৈষম্য, শিল্পায়ন, কৃষি, রেমিট্যান্স, অবকাঠামো, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উন্নয়নএসব বিষয় সরাসরি ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে অর্থনীতি ছিল মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে। জনগণ চেয়েছে এমন সরকার, যারা শুধু ক্ষমতা দাবি করে না, বরং বাজার, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও স্থিতিশীলতা আনতে পারে। তাই নির্বাচনের ‘কেমন’ প্রশ্নের উত্তর আংশিকভাবে নির্ভর করে এই অর্থনৈতিক প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে তার ওপর। যদি নির্বাচন ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা দিতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটি সফল। আর যদি তা কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়।

বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় স্থানীয় প্রভাবও অত্যন্ত বড় বিষয়। অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির চেয়ে স্থানীয় নেতৃত্ব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এলাকায় কাজের রেকর্ড, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও এই স্থানীয় মাত্রা নিশ্চয়ই সক্রিয় ছিল। অনেক প্রার্থী জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি এলাকার রাস্তা, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল, কৃষি সহায়তা, বন্যা মোকাবিলা, কর্মসংস্থান এবং সেবামূলক ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। এই স্থানীয় রাজনীতিই জনগণের সঙ্গে নির্বাচনের বাস্তব সংযোগ তৈরি করে। কিন্তু স্থানীয় প্রভাব যদি অসুস্থ ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিণত হয়, তবে তা ভয়, দখলদারি এবং স্বার্থবাদী সমঝোতার জন্ম দেয়। তাই ২০২৬ সালের নির্বাচন কেমন হলো, তার একটি বড় মাপকাঠি ছিল স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কতটা স্বাস্থ্যকর ছিল। নির্বাচনের সময় শান্তি ও নিরাপত্তা একটি অপরিহার্য শর্ত। সহিংসতা, সংঘর্ষ, ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল, ভোটার বাধা, প্রশাসনিক পক্ষপাত, উত্তেজনাকর ভাষণএসব থাকলে নির্বাচন তার সৌন্দর্য হারায়। জনগণ চায় উৎসবমুখর নির্বাচন, যুদ্ধমুখর নয়। একটি ভালো নির্বাচন মানুষের মুখে হাসি আনে, ভয় নয়। নির্বাচন যদি মানুষের অংশগ্রহণে একটি গণতান্ত্রিক উৎসবে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়ে। অথচ যদি তা আতঙ্ক, অভিযোগ আর অবিশ্বাসের আবর্তে ডুবে যায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের মান নির্ধারণে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যে নির্বাচনে মানুষ নিরাপদে ভোট দিতে পারে, সে নির্বাচনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণসুশাসন। নির্বাচন হলো সুশাসনের প্রবেশদ্বার। জনগণ কেবল নেতা নির্বাচন করে না; তারা ভবিষ্যতের প্রশাসনিক সংস্কৃতি নির্বাচন করে। একটি ভালো নির্বাচনে মানুষ এমন নেতৃত্ব বেছে নিতে চায়, যারা জবাবদিহিতে বিশ্বাস করে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে, আইনের শাসন রক্ষা করে এবং জনগণকে অংশীদার মনে করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, জনগণের কাছে প্রশ্ন ছিলএই নির্বাচন কি একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের দিকে এগোল, না কি পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ধারা আরও গভীর হলো? এই প্রশ্নই নির্বাচনের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ধারণ করে। কারণ নির্বাচন শেষ হলেও তার প্রভাব বছরজুড়ে থাকেনীতিতে, প্রশাসনে, অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে এবং নাগরিক জীবনে।

 

বাংলাদেশের সমাজ বহুধাবিভক্ত নয়, তবে এখানে নানা শ্রেণি, পেশা, মত ও স্বার্থের সমাবেশ রয়েছে। নির্বাচন এসব ভিন্নতাকে একত্র করার একটি মাধ্যম হতে পারে। ২০২৬ সালের নির্বাচন যদি সবাইকে অন্তত একটা বিষয়ে একত্র করে থাকে, তা হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার প্রয়োজন। কে ক্ষমতায় এল, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলো, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কেবল বিজয়-পরাজয়ের গল্প নয়; এটি নাগরিক শিক্ষা, রাজনৈতিক পরিণতি এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাসেরও গল্প। যে নির্বাচন মানুষকে রাজনীতির কাছাকাছি আনে, সে নির্বাচন সফল। যে নির্বাচন মানুষকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সে নির্বাচন ব্যর্থ। এই মানদণ্ডে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে বিচার করতে হলে দেখতে হবে, তা কি জনগণের মধ্যে নতুন আশা জাগাতে পেরেছিল, নাকি পুরনো হতাশা আরও দৃঢ় করেছে। সবশেষে বলা যায়, ‘কেমন হল নির্বাচন ২০২৬’ প্রশ্নের উত্তর একক কোনো বাক্যে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ নির্বাচন কোনো একমাত্রিক ঘটনা নয়; এটি বহু স্তরের বাস্তবতা। সেখানে আছে ভোটারের আশা, দলের কৌশল, প্রশাসনের ভূমিকা, প্রযুক্তির প্রভাব, অর্থনীতির চাপ, সামাজিক মনস্তত্ত্ব, গণমাধ্যমের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার সম্ভাবনা। যদি ২০২৬ সালের নির্বাচন স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও জনআস্থাভিত্তিক হয়ে থাকে, তবে বলা যাবে এটি ছিল একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। আর যদি তাতে অবিশ্বাস, অনিয়ম, উত্তেজনা বা বিভাজন বেশি থেকে থাকে, তবে সেটিকে গণতন্ত্রের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। তবে যেকোনো অবস্থাতেই এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। কারণ প্রতিটি নির্বাচন আসলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণেরও প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের জনগণ সেই আত্মপরিচয়কে আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং গণতান্ত্রিক দেখতে চায়। ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই আকাঙ্ক্ষার কতটা কাছাকাছি যেতে পেরেছেএই প্রশ্নই এর সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...