সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমার হারানো শৈশব

 


আমার হারানো শৈশব, এই শব্দের ভেতর যেন এক আশ্চর্য আলোর ঘর, যেখানে আজও আমি ফিরে যেতে চাই, যদিও জানি, ফিরে যাওয়া আর ফেরা নয়, তা কেবল মনের ভেতর নরম আলো জ্বালিয়ে এক অনন্ত খোঁজের নাম। ছেলেবেলা আমার কাছে কেবল বয়সের একটি অধ্যায় নয়; তা ছিল প্রথম ভাষা, প্রথম বিস্ময়, প্রথম অভিমান, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম হারানোর ক্ষীণ বেদনা, আর প্রথম উপলব্ধির উষ্ণতম সকাল। জীবনের পরে যতই দিন এসে জমা হয়েছে, ততই আমি বুঝেছি, মানুষের আসল সম্পদ তার হারানো স্মৃতি, গাড়ির জট নয়, পরিচয়ের ভার নয়; মানুষের সত্যিকার সম্পদ হচ্ছে সেইসব অদৃশ্য স্মৃতি, যেগুলো মুঠো খুললেই বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে, অথচ বুকের ভেতর থেকে যায় ফুলের গন্ধের মতো। আমার ছেলেবেলার দিনগুলোও তেমনই, ধরা যায় না, তবু ছাড়াও যায় না। আজ যখন স্মৃতির জানালায় তাকাই, দেখি কাদা-ধুলার মিশ্র এক দুপুর, এক টুকরো ভাঙা আকাশ, আর দূরে মায়ের গলার ডাক; দেখি কাঁচা রাস্তার ধারে নরম ঘাস, শাপলার ভেতর লুকোনো জোনাকি, পুকুরের জলে ভেসে থাকা সূর্যের কম্পিত মুখ, আর সন্ধ্যার আগে আগে পাড়ার মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের স্বর। আমার ছেলেবেলা ছিল এমনই এক জগত, যেখানে প্রতিটি জিনিস কথা বলত, কিন্তু সেই ভাষা ছিল হৃদয়ের; সেখানে গাছেরা কেবল গাছ ছিল না, তারা ছিল আমাদের খেলার সঙ্গী; পাখিরা ছিল সুন্দর; বৃষ্টি ছিল আকাশের ছলছল কান্না; আর রাত ছিল মায়ের আঁচলের মতো নরম, ভয় আর স্নেহের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আমি যে ঘরে বড় হয়েছি, সেই ঘর খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার চারপাশে ছিল এক বিশালতর আকাশ; আর সেই আকাশের নিচে আমার শৈশব একটি ছায়া থেকে আলো হয়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে। আমাদের উঠোনে ছিল এক পুরোনো কাঁঠাল চাপা , যার শিকড় মাটির গভীরে আর ডালপালা যেন আমাদের স্বপ্নের শীর্ষে। সেই গাছের নিচে বসে আমরা কত পরিকল্পনা করেছি,কখনো ডাকাত ধরা, কখনো জাহাজ বানানো, কখনো রাজা হওয়া, কখনো উড়ে যাওয়া। ছেলেবেলায় আমরা বাস্তব আর কল্পনার মধ্যে কোনো সীমারেখা টানিনি; ছোট ছোট খেলনা আমাদের কাছে জীবন্ত বন্ধু ছিল, বাঁশের ঘোড়া ছিল আসল ঘোড়া, আর ছেঁড়া কাগজে আঁকা নদী ছিল সত্যিকারের নদী। আমি এখন বুঝি, মানুষের সৃষ্টিশীলতার প্রথম বিদ্যালয় হল ছেলেবেলা; সেখানেই মনের ভেতর কাঁদা দিয়ে প্রথম ঘর বানাতে শেখে, আর শূন্যতার ওপর রং ছিটিয়ে প্রথম পৃথিবী আঁকতে শেখে। আমার ছেলেবেলার স্নেহের সবচেয়ে বড় নাম ছিল মা। মা ছিলেন সেই নিরব ঘড়ি, যা আমাদের জীবনকে নীরবে চালিয়ে যেত, কিন্তু নিজের ক্লান্তির খবর কাউকে দিত না। ভোরবেলা তাঁর হাতের শব্দে ঘুম ভাঙত, সন্ধ্যাবেলা তাঁর ডাকে আমরা ঘরে ফিরতাম, আর রাতে তাঁর কণ্ঠের গল্পে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসত। মা শুধু আমাকে ভাত খাইয়ে মানুষ করেননি, তিনি আমাকে অনুভব করতে শিখিয়েছিলেন, মানুষ কেবল রুটি খায় না, মানুষ স্নেহও খায়; মানুষ কেবল হাঁটে না, মানুষ ভরসার ওপরও দাঁড়ায়। তাঁর চোখে আমি সবসময় এক অদ্ভুত কোমল দৃঢ়তা দেখতাম। তিনি রাগ করলে বজ্রপাতের মতো ছিল না, ছিল বরং ধীরে জ্বলে ওঠা প্রদীপের মতো; আর যখন আদর করতেন, মনে হতো যেন সন্ধ্যার আকাশে হঠাৎ চাঁদ উঠে এসেছে। আমার ছেলেবেলার এক একটি দিন যেন মায়ের উপস্থিতির আলপনা; সেই আলপনা আজও আমার অন্তরের মেঝেতে থেকে গেছে। বাবা ছিলেন অন্যরকম। তাঁর মধ্যে ছিল কম কথা, বেশি দায়িত্ব; কম হাসি, বেশি নিশ্চয়তা; তিনি ছিলেন গাছের শিকড়ের মতো, দেখা যায় না, কিন্তু ভর দিয়ে রাখে। ছেলেবেলায় বাবাকে আমি ভয়ও পেতাম, আবার নিরাপত্তাও পেতাম। তাঁর খাতায় লেখা অঙ্কের মতোই আমার শৈশবের হিসাব ছিল সোজা, কিন্তু তাঁর চুপচাপ মুখের ভেতরে লুকিয়ে থাকা চিন্তাগুলো তখন বুঝতাম না। আজ বুঝি, বাবারা অনেক সময় ভালোবাসা প্রকাশ করেন না বলে তাদের ভালোবাসা কমে না; বরং তা আরও গভীর হয়, আরও নীরব হয়, আরও জমাট বাঁধে। তিনি যখন সন্ধ্যায় কাজ শেষে ফিরতেন, তাঁর ক্লান্ত শরীরেও আমাদের জন্য কিছু না কিছু থাকত, কখনো কয়েকটা পাকা পেয়ারা, কখনো মুড়ি, কখনো কাগজে মোড়া ছোট্ট খেলনা, আর কখনো কেবল একটি স্নেহমাখা দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি ছিল আমাদের দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল পুরস্কার। ছেলেবেলার বন্ধুরা ছিল আমার জীবনের আরেকটি বড় সম্পদ। তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেবল খেলার ছিল না, তা ছিল একধরনের সহ-অস্তিত্ব। আমরা একসঙ্গে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়েছি, একসঙ্গে বৃষ্টি ভিজেছি, একসঙ্গে কাঁচা আমে লবণ মাখিয়ে খেয়েছি, একসঙ্গে কাদার ভেতরে জুতো হারিয়েছি, আর একসঙ্গে মিথ্যে রাগ করে আবার হেসে ফেলেছি। সেই বন্ধুত্বে কোনো স্বার্থ ছিল না, ছিল না কোনো হিসাব। কারও কাছে যদি একটি টিনের গাড়ি থাকত, তা হয়ে যেত সবার। কারও হাতে যদি নতুন ঘুড়ি উঠত, তা উড়ত গোটা পাড়ার আকাশে। আমরা তখন ভাগ করে খেতাম, ভাগ করে কাঁদতাম, ভাগ করে স্বপ্ন দেখতাম। আজকের জগতে মানুষ অনেক কিছু ভাগ করে না, বরং নিজের বলে আঁকড়ে রাখে; অথচ ছেলেবেলায় আমরা জানতাম, ভাগ করলে জিনিস কমে না, কখনো কখনো আনন্দ বেড়ে যায়। আমাদের খেলার মাঠ ছিল কোথাও নির্দিষ্ট নয়; কখনো পুকুরপাড়, কখনো মাঠের আল, কখনো আমবাগান, কখনো স্কুলের সামনের ফাঁকা জমি। সেইসব খেলার মধ্যে লুকিয়ে ছিল জীবন শেখার প্রথম পাঠ। কাবাডি, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, লুকোচুরি, বউছি, বৃষ্টির দিনে নৌকা ভাসানো, আর গ্রীষ্মের দুপুরে ঘুড়ি ওড়ানো, এসবই ছিল আমাদের ক্ষুদ্র রাজ্য। খেলায় হারলেও কাঁদিনি, জিতলেও ফুলে উঠিনি; কারণ আমরা তখন জানতাম না প্রতিযোগিতা কী, জানতাম শুধু আনন্দ। এই আনন্দের ভেতরেই ছিল জীবনের সবচেয়ে নির্মল শিক্ষা। আমাদের স্কুল ছিল ছোট, কিন্তু তার ভেতরে লুকোনো ছিল এক বিশাল ভবিষ্যতের ইশারা। স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতিটাই ছিল এক উৎসব। নতুন খাতা, নতুন পেনসিল, বোতামহীন ইউনিফর্ম, পুরোনো জুতা, আর বুকভর্তি অদ্ভুত উত্তেজনা, এসব নিয়ে আমরা যখন সকালে বের হতাম, মনে হতো যেন যুদ্ধযাত্রা, অথচ যুদ্ধ নয়, জ্ঞানের পথে প্রথম পদক্ষেপ। স্কুলের ঘণ্টা, স্যারের কড়া কণ্ঠ, বেঞ্চের কাঠের গন্ধ, চকধুলো, স্লেটের ওপর খসখস শব্দ, আর সহপাঠীদের চুপিসারে হাসি, এসব মিলে আমার ছেলেবেলার শিক্ষাজীবনকে রচনা করেছিল। অনেক কিছুই বুঝতাম না, তবু শিখতাম; অনেক প্রশ্ন ছিল, কিন্তু উত্তর ছিল ধীরে ধীরে। স্কুলে পড়া কেবল বই থেকে জ্ঞান নেওয়া ছিল না, ছিল মানুষের ভেতর মানুষ হওয়ার অনুশীলন। কোনোদিন স্যার শাসন করতেন, কোনোদিন স্নেহ করতেন; সেই শাসনের মধ্যেও লুকিয়ে থাকত মমতা। আমি জানি, তখন অনেক সময় মন খারাপ হত, অঙ্ক না পারলে অপমান বোধ হত, কবিতা মুখস্থ না হলে ভয় লাগত, কিন্তু এখন বুঝি, সেই ছোট ছোট কষ্টগুলোই আমাদের সহ্যশক্তির প্রথম বীজ বপন করেছিল। ছেলেবেলায় উৎসবের আনন্দ ছিল সীমাহীন। ঈদ, পয়লা বৈশাখ, পূজা, বর্ষা, হেমন্ত, সব ঋতুই যেন আলাদা রঙে সাজত। ঈদের আগে মায়ের হাতে সেলাই হওয়া জামার গন্ধ, বাজার থেকে কেনা সেমাই, নতুন স্যান্ডেল পায়ে লাগার অনুভূতি, আর বড়দের সালাম করে সালামি পাওয়ার আনন্দ, এসব ছিল ছেলেবেলার ঈদের অমূল্য স্মৃতি। পয়লা বৈশাখে নতুন খাতা আর নতুন আশা, পিঠাপুলির মৌসুমে বাড়ির উঠোনে ধোঁয়া, আর পৌষের শীতে ভাপা আর পাটিসাপটার সুবাস,এসব আমাদের জীবনকে শুধু আহারে নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়ে সমৃদ্ধ করেছিল। সেইসব উৎসবের মাঝে ধর্মীয়, সামাজিক, পারিবারিক নানা আচার-আনন্দ আমাদের জীবনকে এক বিশেষ গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য দিয়েছিল। ছেলেবেলা শেখায়, মানুষ কেবল ব্যক্তি নয়, সে একটি পরিবারের, একটি সমাজের, একটি ভাষার সন্তান। আমরা বুঝতাম না, কিন্তু আমাদের ভেতরে বাংলার মাটি, নদী, ফসল, গানের সুর, লোককথার জাদু, এবং লোকজ জীবনের অমলিন রং নীরবে মিশে যেত। আমার ছেলেবেলার প্রকৃতি ছিল এক গভীর শিক্ষক। বর্ষার দিনে টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ শুনে আমি বহুবার শুয়ে শুয়ে পৃথিবীকে দেখেছি; মনে হয়েছে, আকাশ বুঝি আমাদের ঘরকেই বেছে নিয়েছে তার কান্না শোনানোর জন্য। বর্ষায় খাল, বিল, নালা, পুকুর সব একাকার হয়ে যেত; চারদিক ভরে উঠত কাদায়, আর সেই কাদার মধ্যে আমাদের আনন্দ ছিল সীমাহীন। শীতে কুয়াশার সাদা চাদর মুড়িয়ে রাখত ভোরকে; দূরের গাছগুলো তখন মনে হতো ভূতের মতো, আর আমরা মজা করে ভয় পেতাম। গ্রীষ্মে আমের গন্ধে বাতাস মধুর হয়ে উঠত, কামিনী ফুলের গন্ধ  ছড়িয়ে পড়ত গ্রামজুড়ে, আর দুপুরের রোদ এত তীব্র হত যে পৃথিবী যেন ঘামছিল। শরতের আকাশ ছিল নীলের নেশা, কাশফুলের সাদা স্রোত আর শিউলি ফুলের স্নিগ্ধতা মিশে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি করত। এই প্রকৃতি আমাকে কেবল দেখতেই শেখায়নি, বাঁচতেও শিখিয়েছে। গাছের ছায়া, পাখির ডাক, নদীর স্রোত, বাতাসের স্পর্শ, আর মাটির সোঁদা গন্ধের ভেতরে আমি জীবনকে চিনতে শিখেছি। ছেলেবেলার স্মৃতিতে এক বিশেষ জায়গা দখল করে আছে পুকুর। পুকুর ছিল আমাদের ভয়, আনন্দ, কৌতূহল আর শৈশবের গভীর রহস্যের কেন্দ্র। পুকুরপাড়ে বসে আমরা জলের দিকে তাকাতাম আর ভাবতাম, নিচে কী আছে। কখনো ছোট মাছের দৌড়, কখনো ব্যাঙের লাফ, কখনো শাপলার মাথা, কখনো জেলেদের জাল ফেলা, সবই ছিল আমাদের বিস্ময়ের বিষয়। গোসল করতে গিয়ে যে আনন্দের সঙ্গে ভয়ও মিলত, সেটিও একধরনের শিক্ষা ছিল। জল শেখায় প্রবাহ, শেখায় স্বচ্ছতা, আবার শেখায় গভীরতা। এখন ভাবি, জীবনের অনেক সত্যই আমি পুকুরের জলে প্রথম দেখেছিলাম। আমি দেখেছি, ঢিল ফেললে জল কাঁপে; মানুষের কথা কাঁপায় মনকেও। আমি দেখেছি, শান্ত জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়; মন শান্ত হলে তবেই সত্য ধরা পড়ে। ছেলেবেলায় পড়া নৈতিক গল্প, লোককথা, রূপকথা, কাঁথার নকশার মতোই আমার মনে বোনা হয়ে আছে। দাদী-নানীর মুখে শোনা গল্পে ছিল রাজা, পরী, বাঘ, জাদুকর, সততা, অন্যায়ের শাস্তি, আর সৎ মানুষের বিজয়। সেইসব গল্প আমাদের কল্পনার ডানা দিয়েছিল। আমাদের সময়ে গল্প ছিল জীবন্ত; তা শুনতে হত মুখের কাছাকাছি বসে, অন্ধকার ঘরের ভেতর, রাতের নিস্তব্ধতায়, মশারির ভেতরে শুয়ে। সেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত আতপচালের গন্ধ, চুলায় জ্বলা আগুনের শব্দ, আর বয়স্ক মানুষের কণ্ঠের কম্পন। ছেলেবেলায় শোনা গল্প কেবল বিনোদন ছিল না; তা ছিল নৈতিকতার বীজ। আমরা শিখেছিলাম, মিথ্যা কখনো দীর্ঘস্থায়ী নয়, অন্যায়ের জয় ক্ষণিকের, দয়া শক্তিশালী, আর সত্যের পথ কঠিন হলেও সেখানেই মানুষের মর্যাদা। এমনকি পাড়ার বয়স্ক মানুষদের কথাবার্তাও আমাদের জন্য শিক্ষা ছিল। তাঁরা বসে বসে সময় কাটাতেন, তাস খেলতেন, রাজনৈতিক আলোচনা করতেন, গ্রামের সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন, আর আমরা দূর থেকে শুনতাম। তখন বুঝতাম না সবকিছু, তবু জীবনের শব্দগুলো কানে কানে ঢুকত। ছেলেবেলা আমাকে শিখিয়েছিল কৌতূহল। আমি সবকিছু জানতে চাইতাম। আকাশ নীল কেন? পাখি উড়ে কেন? মানুষ মরে যায় কেন? স্বপ্ন কোথা থেকে আসে? রাতের শেষে আলো কোথায় থাকে? এসব প্রশ্ন আমার ভেতর থেকে আসত। বড়রা অনেক সময় উত্তর দিতেন, অনেক সময় হাসতেন, অনেক সময় বলতেন, বড় হয়ে বুঝবি। আজ বুঝি, শৈশবের এই প্রশ্নগুলোই ছিল আমার বুদ্ধির প্রথম শিকড়। যে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে, সে জীবনে সহজে থেমে যায় না। ছেলেবেলায় আমি অনেক ভুল করেছি। মায়ের চোখের জল দেখেছি, বাবার নীরব বিরক্তি দেখেছি, সহপাঠীর কষ্ট দেখেছি, আর নিজের অহংকার ভাঙতে শিখেছি। একদিন আমি অন্যের খেলনা ভেঙে দিয়েছিলাম, একদিন মিথ্যে বলেছিলাম, সেই ভুলগুলো আমাকে যন্ত্রণা দিয়েছে, কিন্তু সেখান থেকেই আমি প্রথম দায়বোধের স্বাদ পেয়েছি। মানুষের চরিত্র কেবল ভালো কাজের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে না; ভুলের অনুশোচনাও তাকে গড়ে তোলে। ছেলেবেলায় অনুশোচনা ছিল অশ্রুর মতো সহজ, আর ক্ষমা ছিল আকাশের মতো বড়। মা বকতেন, তারপর খাইয়ে দিতেন; বাবা রাগ করতেন, তারপর নীরবে সান্ত্বনা দিতেন; বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া হত, তারপর আবার খেলায় মিশে যেতাম। এই ক্ষমার পরিবেশেই আমরা মানুষ হতে শিখেছি। ছেলেবেলার আরেকটি বড় সৌন্দর্য ছিল সময়ের অবাধ প্রবাহ। তখন ঘড়ির কাঁটা আমাদের তাড়া করত না। সকাল মানে শুধুই সকাল, দুপুর মানে সূর্যের তেজ, সন্ধ্যা মানে পাখির ফেরার সময়, রাত মানে ঘুম আর গল্প। আমরা জানতাম না ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তাই বর্তমানকে পুরোটা নিয়ে বেঁচে নিতে পারতাম। আজকের মতো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল না অতিরিক্ত পরিকল্পনার চাপ। এক টুকরো মেঘ দেখেই আমরা আকাশে নানা আকৃতি খুঁজতাম, একটি গাছের পাতায় ঝুলে থাকা শিশির দেখে বিস্মিত হতাম, দুটো ফড়িং উড়তে দেখেই যেন বিরাট নাটক দেখে ফেলতাম। ছেলেবেলা তাই এত সুন্দর; কারণ তার চোখে পৃথিবী নবীন, তার বিস্ময়ে পৃথিবী সজীব। বড় হয়ে আমরা অনেক কিছু দেখে ফেলি, ফলে অনেক কিছু আর দেখা হয় না। ছেলেবেলায় দেখা মানে অনুভব, আর বয়সে দেখা মানে প্রায়ই বিশ্লেষণ। আমি আজও মনে করতে পারি, এক বর্ষার সন্ধ্যায় কাদা মেখে বাড়ি ফিরেছিলাম। মা প্রথমে রাগ করলেও পরে আমার ভেজা চুল মুছিয়ে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে আমি যেন বুঝেছিলাম, ভালোবাসা শাসনের চেয়েও বড়, ক্ষমার চেয়েও গভীর। এই ছোট ছোট ঘটনাই ছেলেবেলার ভেতরে জীবনের আসল মানচিত্র এঁকে দিয়েছিল। আমার ছেলেবেলার গান ছিল আলাদা। কখনো ভাটিয়ালি, কখনো বাউল, কখনো মায়ের গুনগুন, কখনো মসজিদের মাইকে ভেসে আসা কুরআন তিলাওয়াত, কখনো মাঠের ধারে কৃষকের সুরেলা ডাক, এসব ছিল আমার শৈশবের সংগীত। গানের সঙ্গে ছিল প্রকৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। বর্ষার রাতে দূরের ডাহুক পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, পাতার ফোঁটায় বৃষ্টির স্পর্শ, আর জানালার কাঁচে জমে থাকা জলবিন্দু, সব মিলিয়ে একধরনের সুর তৈরি হতো। সেই সুর আমাকে ঘুম পাড়াত, আবার জাগিয়ে দিত। আজকের কোলাহলপূর্ণ জীবনেও যখন কোনো পুরোনো গান শুনি, মনে হয় আমি আবার সেই ছেলেবেলার বারান্দায় ফিরে গেছি, যেখানে আকাশ ছিল আরও বড়, আর মন ছিল আরও হালকা। আমার ছেলেবেলার অভাবও ছিল। সবকিছু ছিল না, চাইতেও পারিনি সব। কখনো নতুন জুতো পাইনি, কখনো পছন্দের খাতা পাইনি, কখনো খেলনা কেনা হয়নি, কখনো মেলা থেকে ফিরে শুধু দর্শক হয়েছি। কিন্তু এখন ভাবি, অভাবও শৈশবকে শিখিয়েছিল সংযম, অপেক্ষা, আর তৃপ্তি। যে শিশু কম পায়, সে পেয়ে আনন্দ করতে শেখে; যে শিশু সব পায়, সে অনেক সময় বিস্ময় হারায়। আমাদের অভাব ছিল, কিন্তু আমাদের চাওয়া ছিল কম; আর সেই কম চাওয়ার ভেতরেই ছিল একধরনের মুক্তি। তখন আমরা পরিমিতিতে বাঁচতাম, তুলনায় নয়। আমার ছেলেবেলা আমাকে মানুষের গভীরতা শিখিয়েছে, বাহ্যিক চাকচিক্য নয়। পাড়ার এক বৃদ্ধা ছিলেন, সবার কাছে ছিলেন নিঃশব্দ এক আলোকিত মানুষ। তাঁর ঘরে তেমন কিছু ছিল না, কিন্তু তাঁর মুখে এমন প্রশান্তি ছিল যে আমরা অকারণেই তাঁর কাছে বসতে চাইতাম। তাঁর কথা কম, হাসি নরম, আর দৃষ্টি অদ্ভুত শান্ত। তিনি আমাকে একদিন বলেছিলেন, মানুষ বড় হয় বয়সে নয়, মননে। তখন কথাটির মানে পুরোপুরি বুঝিনি, আজ তার গভীরতা বুঝি। ছেলেবেলা যেন আমাকে সেইসব মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, যারা বইয়ের পাতায় নেই, কিন্তু জীবনের স্কুলে অমূল্য শিক্ষক। তাদের কাছ থেকে আমি নীরবতা, ধৈর্য, পরিশ্রম, এবং মমতার পাঠ পেয়েছি। আমার ছেলেবেলার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল আনন্দ। আমরা লজ্জা পেতাম না কাদা মাখতে, ভিজতে, হাসতে, দৌড়াতে। আজ মানুষ হয়তো অন্যের চোখে কেমন দেখায়, তা নিয়ে বেশি ব্যস্ত; আমরা তখন কেমন লাগছি, তা নিয়ে ভাবিনি। ছেলেবেলায় মানুষ নিজেকে আড়াল করে না, তাই সত্যিকারের থাকে। সেই সত্যিকারের থাকার মধ্যেই ছিল আত্মার স্বচ্ছতা। এখন যখন চারদিকে জটিলতা, প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস, আর ক্লান্তির স্তূপ দেখি, তখন ছেলেবেলার সেই সরলতার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে আবার মায়ের পাশে বসে ভাত খাই, বাবার চুপচাপ মুখ দেখি, বন্ধুদের সঙ্গে কাঁচা আম চুরি করি, স্কুলের মাঠে হাওয়া মেখে দৌড়াই, বৃষ্টির দিনে ভিজে ফিরি, আর রাতের অন্ধকারে গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু জানি, সেই ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়। সময় কাউকে দ্বিতীয়বার একই দরজায় দাঁড়াতে দেয় না। তবু স্মৃতি আছে বলে মানুষ বেঁচে থাকে; স্মৃতি আছে বলে মানুষ নিজের হারানো ঘরটিকে অন্তরের ভেতর নতুন করে গড়ে নেয়। আমার ছেলেবেলা এখন আর বাস্তব সময়ে নেই, আছে চেতনায়, ভাষায়, অনুভবে, লেখায়। আমি যখন লিখি, তখন সেই ছেলেবেলা আমার হাতে এসে বসে। আমি যখন হাসি, তখন তার ছায়া পাশে থাকে। আমি যখন কাঁদি, তখন সে নীরবে আমার কাঁধে হাত রাখে। জীবনের কঠোরতা অনেক কিছু শিখিয়েছে, কিন্তু কোমলতা শিখিয়েছে ছেলেবেলা। মানুষ যদি তার ছেলেবেলার সঙ্গে সংযোগ হারায়, তবে সে নিজের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হারায়। আমার কাছে তাই ছেলেবেলা কেবল অতীত নয়; তা একটি নৈতিক ভূগোল, একটি আবেগের মানচিত্র, একটি চিরকালীন আশ্রয়। সেখানে আছে শৈশবের কাঁচা রোদ, প্রথম বৃষ্টির ভেজা গন্ধ, মায়ের ভাতের গন্ধ, বাবার ক্লান্ত স্নেহ, বন্ধুর কাঁধে ভর, স্কুলের চকধুলো, পুকুরের জলের কম্পন, গাছের পাতায় ঝুলে থাকা শিশির, আর রাতের গল্পের নিস্তব্ধ জ্যোৎস্না। এইসব নিয়ে আমার ছেলেবেলা গড়ে উঠেছিল, অতি সাধারণ, অথচ অতি অসাধারণ; অল্পের ভেতর অশেষ, ক্ষুদ্রের ভেতর মহৎ। তাই আজও আমি বলি, মানুষের জীবনে অনেক অধ্যায় আসে, কিন্তু ছেলেবেলার মতো সুন্দর, স্নিগ্ধ, আর অবিনাশী অধ্যায় আর কখনও আসে না। আমার ছেলেবেলা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে অনুভব করতে হয়, কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে হারিয়ে গিয়েও নিজেকে খুঁজে পেতে হয়। আর সেই কারণেই আমার কাছে ছেলেবেলা একটি স্মৃতি নয়, একটি অন্তর্গত আলো, যে আলো নিভে যায় না, শুধু সময়ের স্তরে স্তরে আরও গভীর হয়ে জ্বলে।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...