শহরটাকে
দূর থেকে দেখলে মনে হতো, কেউ যেন অসাবধানে ধূসর রঙের উপর একটু নীল কালি ফেলে দিয়েছে। সবকিছুই
এখানে অসম্পূর্ণ, অট্টালিকাগুলো
অর্ধেক স্বপ্নের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, রাস্তাগুলো কোথাও গিয়ে হঠাৎ থেমে যায়, আর
মানুষগুলো প্রতিদিন নিজেদের ভিতর থেকে একটু একটু করে হারিয়ে যায়। তবু এই শহরেই
কিছু মানুষ বেঁচে থাকে শুধুমাত্র একটি মুখের জন্য, একটি
কণ্ঠের জন্য, কিংবা কোনো অসম্ভব স্পর্শের স্মৃতির জন্য।
আবিরও তেমন একজন মানুষ ছিল।
সে পেশায় চিত্রকর, কিন্তু তার ছবিগুলো কেউ বুঝত না। কারণ সে মানুষের
মুখ আঁকত না, সে
আঁকত মানুষের অনুপস্থিতি। তার ক্যানভাসে সবসময় একটি খালি চেয়ার থাকত, আধখোলা জানালা থাকত, কিংবা বৃষ্টির পরে ভেজা রাস্তা। যারা ছবি কিনতে আসত, তারা বলত, ‘এখানে তো কিছুই নেই!’
আবির মনে মনে বলত, ‘সবচেয়ে বড় জিনিসগুলোই তো দেখা যায় না।’
তার জীবন ছিল ধীর, নীরব, এবং অদ্ভুতভাবে
একাকী। রাতের শেষে সে ছাদে উঠে দাঁড়াত, আকাশের দিকে
তাকিয়ে থাকত। তার মনে হতো, পৃথিবীতে নিশ্চয়ই এমন কিছু
মানুষ আছে যারা ভুলবশত এখানে এসে পড়েছে,যাদের আসল ঠিকানা
অন্য কোথাও।
সেই সময়ই প্রভার আগমন।
সেই দিনটি ছিল অদ্ভুত রকম। আকাশে রোদ ছিল, কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। পুরনো একটি গলির ভিতরে
ছোট্ট বইয়ের দোকানে ঢুকেছিল আবির। দোকানটিতে সবসময় পুরনো কাগজের গন্ধ থাকত, যেন বহু মৃত মানুষের স্বপ্ন সেখানে জমা
হয়ে আছে।
সেখানেই সে প্রথম দেখল মেয়েটিকে।
মেয়েটি মেঝেতে বসে একটি ছেঁড়া বই পড়ছিল। তার চুল
ভেজা ছিল, অথচ বাইরে
বৃষ্টি হয়নি। সে এমন মনোযোগ দিয়ে বইয়ের পাতায় হাত বুলাচ্ছিল, যেন কাগজ নয়, কারও মুখ ছুঁয়ে দেখছে।
আবির অনেকক্ষন সেদিকে তাকিয়ে ছিল।
মেয়েটি মুখ না তুলেই বলল,
‘আপনি কি সব অপরিচিত মানুষকে এভাবে দেখেন?’
আবির একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
‘না… শুধু যাদের দেখে মনে হয়, তারা পৃথিবীর না।’
মেয়েটি এবার তাকাল।
আবির আজীবন সেই চোখ ভুলতে পারেনি। সেই চোখে কোনো
কাজল ছিল না, তবু
মনে হচ্ছিল গভীর রাত জমে আছে। যেন কেউ বহুদিন ধরে সেখানে কান্না লুকিয়ে রেখেছে।
‘আপনি খুব দুঃখী,’
মেয়েটি বলল।
‘আপনি কীভাবে বুঝলেন?’
‘দুঃখী মানুষদের চারপাশে এক ধরনের নীরবতা থাকে। আমি
সেটা শুনতে পাই।’
আবির প্রথমবার অনুভব করল, কেউ
তাকে দেখছে। শুধু মুখ নয়, তার ভিতরটাও।
মেয়েটির নাম ছিল প্রভা।
নামটি উচ্চারণ করলেই আবিরের মনে হতো, যেন নদীর জলে সন্ধ্যা নেমে আসছে।
তাদের সম্পর্কের শুরুটা অন্যরকম ছিল। তারা
প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আচরণ করত না। তারা একে অপরের ভিতরে আশ্রয় নিত।
কখনও তারা শহরের সবচেয়ে ভিড় রাস্তায় হাঁটত, কিন্তু কথা বলত না। কখনও পুরনো
কবরস্থানের পাশে বসে চা খেত। প্রভা বলত,
‘মৃত মানুষেরা খুব বিশ্বস্ত। তারা কাউকে প্রতারণা করে না।’
আবির হাসত।
‘তুমি সবকিছু এত অদ্ভুতভাবে ভাবো কেন?’
প্রভা উত্তর দিত,
‘কারণ সাধারণভাবে ভাবলে পৃথিবীকে সহ্য করা যায় না।’
একদিন তারা নদীর ধারে বসেছিল। সন্ধ্যা নামছিল। দূরে
নৌকার আলো জ্বলছিল ক্ষুদ্র জোনাকির মতো।
প্রভা হঠাৎ বলল,
‘তুমি কি জানো, মানুষ আসলে কাউকে
ভালোবাসে না?’
আবির অবাক হয়ে তাকাল।
‘তাহলে?’
‘মানুষ ভালোবাসে সেই অনুভূতিটাকে, যেখানে সে নিজেকে কম একা মনে করে।’
‘আর তুমি?’
প্রভা দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বলল,
‘আমি হয়তো এমন কাউকে খুঁজছি, যার পাশে
দাঁড়ালে আমার অস্তিত্বটা সত্যি মনে হবে।’
আবিরের বুকের ভিতর হঠাৎ এক ধরনের ব্যথা উঠল। সে বুঝল
না কেন।
ধীরে ধীরে তারা আরও কাছে এল।
কিন্তু সেই কাছাকাছির ভিতরেও এক অদ্ভুত দূরত্ব ছিল।
প্রভা কখনও নিজের পরিবার নিয়ে কথা বলত না। তার কোনো বন্ধু ছিল না। কোনো ছবি তুলতে
দিত না। এমনকি ফোনও ব্যবহার করত না।
আবির মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত,
‘তুমি আসলে কোথায় থাকো?’
প্রভা হাসত।
‘যেখানে মানুষ ভুলে যায়।’
‘এটা কোনো উত্তর হলো?’
‘সব সত্যি উত্তর সরাসরি বলা যায় না।’
আবির বিরক্ত হতো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই রহস্যই তাকে আরও টেনে নিত।
এক রাতে প্রভা তাকে শহরের বাইরে একটি পুরনো স্টেশনে
নিয়ে গেল।
স্টেশনটি বহু বছর ধরে বন্ধ। প্ল্যাটফর্মে আগাছা
জন্মেছে। বাতাসে মরিচা আর স্মৃতির গন্ধ।
‘এখানে কেন এনেছ?’
আবির জিজ্ঞেস করল।
প্রভা বলল,
‘কারণ কিছু বিদায় জনসমক্ষে বলা যায় না।’
আবিরের বুক কেঁপে উঠল।
‘বিদায়?’
প্রভা তার দিকে তাকাল না। শুধু দূরের অন্ধকার
রেললাইনের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে।’
‘মানে?’
‘আমি বেশিদিন কোথাও থাকতে পারি না।’
আবির তার হাত ধরে ফেলল।
‘তুমি এসব কী বলছ?’
প্রভা ধীরে তার দিকে ফিরল। সেই চোখে আজ গভীর
ক্লান্তি।
‘তুমি কি কখনও খেয়াল করেছ,’ সে বলল,
‘আমি কখনও দুপুরে তোমার সঙ্গে দেখা করি না? কখনও রোদে হাঁটি না? কখনও আয়নায় নিজেকে দেখি
না?’
আবির কিছু বলতে পারল না।
হঠাৎ বাতাস ঠান্ডা হয়ে উঠল।
দূরে রেললাইনের ভিতর কুয়াশা জমতে লাগল। তারপর, একটি
ট্রেনের শব্দ।
অথচ সেই লাইনে বহু বছর কোনো ট্রেন চলে না।
আবিরের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে কুয়াশা ভেদ করে একটি পুরনো নীল ট্রেন
এগিয়ে এল। ট্রেনটির জানালায় আলো ছিল,
কিন্তু ভিতরে কোনো মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। যেন ছায়ারা বসে
আছে।
প্রভা ফিসফিস করে বলল,
‘ওরা এসে গেছে।’
‘ওরা কারা?’
‘যারা হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’
আবির হঠাৎ অনুভব করল, পৃথিবীটা তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।
‘তুমি মানুষ নও?’
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
প্রভা মৃদু হাসল।
‘মানুষ ছিলাম। অনেক আগে।’
তারপর সে বলল এমন একটি কথা, যা আবিরকে সারাজীবন তাড়া করে
ফিরেছিল,
‘কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও পুরোপুরি চলে যেতে পারে না।
কারণ তাদের ভিতরে অসমাপ্ত ভালোবাসা থেকে যায়।’
আবিরের চোখ ভিজে উঠল।
‘তাহলে এতদিন…?’
‘আমি শুধু একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম,’
প্রভা বলল।
‘তোমার চোখের ভিতর।’
বৃষ্টি নামতে শুরু করল।
আবির তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল, কিন্তু হঠাৎ অনুভব করল, প্রভার শরীর ধীরে ধীরে ঠান্ডা কুয়াশার
মতো হয়ে যাচ্ছে।
‘যেও না…’
সে ফিসফিস করল।
প্রভা তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
‘প্রেমের সবচেয়ে বড় অভিশাপ জানো কী?’
আবির কাঁপা গলায় বলল, ‘কি?’
‘যাকে সত্যি ভালোবাসা যায়, তাকে
কখনও পুরোপুরি পৃথিবীতে রাখা যায় না।’
তারপর সে ট্রেনে উঠে গেল।
ট্রেনটি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আর ঠিক সেই
মুহূর্তে আবির বুঝতে পারল, মানুষের হৃদয় আসলে কোনো অঙ্গ নয়।
এটি একটি দীর্ঘ রেললাইন।
যেখানে কিছু ট্রেন আসে শুধু চলে যাওয়ার জন্য।
বহু বছর পরেও,
যখন গভীর রাতে শহরে বৃষ্টি নামে, আবির
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হয়, কুয়াশার ভিতর
কোথাও একটি নীল ট্রেন অপেক্ষা করছে।
আর সেখানে
বসে আছে একটি মেয়ে,
যে ছিল না পৃথিবীর,
তবু পৃথিবীর সবচেয়ে সত্যি প্রেম।
আবির আরও অনেক বেশি কষ্ট পায় সেই জ্বরের ভিতর এই রকম একটি স্বপ্ন না দেখলে কি
তার হতো না। সে বসে বসে ভাবতে থাকে, এটাকে সে কি স্বপ্ন বলবে না দুঃস্বপ্ন বলবে,
কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন