সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য চিন্তা

 


আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পরিসরে বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) এমন এক নাম, যাঁকে শুধু কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার বা প্রাবন্ধিক হিসেবে আলাদা ভাবে বন্দি করলে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন সাহিত্যচিন্তার এমন এক নির্মাতা, যিনি সাহিত্যের ভিতরকে দেখেছেন, সাহিত্যের বাইরের শোরগোলের চেয়ে অনেক গভীরে। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল ভাষার অলংকার ছিল না, কেবল সমাজের দর্পণও ছিল না, আবার কেবল ব্যক্তিগত অনুভবের বিলাসও ছিল নাসাহিত্য ছিল জীবনের অন্তর্গত এক জটিল সৃজনশীল সত্য, যেখানে রূপ, অনুভূতি, বোধ, ইতিহাস, স্বপ্ন, সংকট, নৈঃশব্দ্য এবং বিদ্রোহ, সব একত্রে কাজ করে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি সাহিত্যকে কখনোই একমাত্রিক ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনেননি। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সাহিত্য মানুষের অস্তিত্বের এমন এক শর্ত, যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গেই নতুন করে পরিচিত হয়। বুদ্ধদেব বসুর চিন্তাজগৎ গড়ে উঠেছে একদিকে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তরপর্বে, অন্যদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতার সংস্পর্শেফলে তাঁর সাহিত্যদৃষ্টি একান্ত দেশীয়ও নয়, আবার নিছক পাশ্চাত্য অনুকরণও নয়। তিনি ছিলেন এমন এক সেতুবন্ধন, যিনি বাংলা ভাষার আবহমান সংবেদনকে আধুনিক ইউরোপীয় মননের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন। তাঁর সাহিত্যচিন্তায় রবীন্দ্রনাথ আছেন, কিন্তু রবীন্দ্র-অনুগমন নেই; শরৎচন্দ্র আছেন, কিন্তু আবেগের অনুচরত্ব নেই; মাইকেল আছেন, কিন্তু কাব্যিক বিপ্লবের নামে শৈল্পিক শৃঙ্খলা ভাঙার অবিমিশ্র প্রয়াস নেই। তিনি সবকিছু পড়েছেন, গ্রহণ করেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের বিবেচনা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ-কারণেই তাঁর প্রবন্ধভাষা শুধু ব্যাখ্যামূলক নয়, বিচারধর্মী; শুধু তথ্যনির্ভর নয়, ভাবনানির্ভর; শুধু সাহিত্য-ইতিহাস নয়, সাহিত্য-দর্শনও বটে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিকতা। তবে আধুনিকতা বলতে তিনি কেবল সময়ের নতুনত্ব বোঝেননি। তাঁর কাছে আধুনিকতা মানে চেতনার রূপান্তর, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, এবং শিল্পীসত্তার ভেতরে জেগে ওঠা এক নতুন আত্মসচেতনতা। আধুনিক সাহিত্য তখনই জন্ম নেয়, যখন মানুষ বুঝতে শেখে যে, পুরোনো ভাষায় নতুন অভিজ্ঞতার সবটুকু ধরা যাচ্ছে না। এই উপলব্ধি থেকেই বুদ্ধদেব বসুর শিল্পবোধ নতুন পরিসর চায়, নতুন বাক্যচাল চায়, নতুন দৃষ্টি চায়। তিনি মনে করতেন, কালের পরিবর্তন যখন মানুষের মনে, সামাজিক অভ্যাসে, নগরজীবনে, প্রেমে, বিচ্ছেদে, একাকিত্বে, সংকটে এবং আত্মসমীক্ষায় গভীর ছাপ ফেলে, তখন সাহিত্যও বদলাতে বাধ্য। কিন্তু এই বদল নিছক বাহ্যিক হওয়া চলবে না। কেবল নতুন শব্দ, নতুন ছন্দ, নতুন ফর্ম তৈরি করলেই আধুনিকতা আসবে না; চাই নতুন সংবেদন, নতুন বোধ, নতুন সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহস। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্পের স্বাধীনতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যকে কোনও সামাজিক শ্লোগান, নীতিপাঠ, রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা উদ্দেশ্যবাদী বয়ানের অধীন করা যায় না। সাহিত্য অবশ্যই সমাজের সঙ্গে যুক্ত, কারণ সাহিত্য মানুষকে নিয়ে, মানুষের ভাষায়, মানুষের সময়ের মধ্যে জন্ম নেয়; কিন্তু সাহিত্যকে যদি কেবল উপযোগিতার মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তবে তার অন্তর্জগৎ নষ্ট হয়। বুদ্ধদেব বসু শিল্পের স্বতন্ত্র মর্যাদা বিশ্বাস করতেন। তাঁর মতে, সাহিত্যকে তার নিজস্ব শর্তে বিচার করতে হবে, তার ভাষা, বিন্যাস, কল্পনা, সংগতি, প্রতীক, সুর, এবং অন্তর্নিহিত উত্তাপের ভিত্তিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে একদিকে প্রগতিশীল, অন্যদিকে শুদ্ধতাবাদী করে তোলে, কিন্তু সেই শুদ্ধতাবাদ সংকীর্ণতার শুদ্ধতাবাদ নয়; বরং শৈল্পিক সততার শুদ্ধতাবাদ। তিনি জানতেন, সাহিত্য যদি নৈতিক বক্তৃতায় পরিণত হয়, তবে তার প্রাণ শুকিয়ে যায়। আবার সাহিত্য যদি সামাজিক দায়কে একেবারে অস্বীকার করে, তবে তা আত্মকেন্দ্রিক নিষ্ফলতায় পর্যবসিত হতে পারে। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে তিনি খুঁজেছেন এক ভারসাম্য,শিল্পের মর্যাদা ও জীবনের দায়। তাঁর সাহিত্যভাবনার আরেকটি মৌলিক স্তম্ভ হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। বুদ্ধদেব বসু মনে করতেন, প্রত্যেক বড় সাহিত্যিকের কণ্ঠস্বর স্বতন্ত্র। সাহিত্য কোনো যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি নয়। কোনো যুগের সার্থক সাহিত্য তখনই সম্ভব, যখন সে যুগের লেখকেরা একে অন্যের ছায়া নন, বরং প্রত্যেকে নিজের অভিজ্ঞতা ও শৈলী নিয়ে উপস্থিত হন। এই কারণেই তিনি অনুসরণপ্রবণতাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর কাছে সাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজস্বতা। কিন্তু এই নিজস্বতা আত্মম্ভরিতা নয়; নিজের ভেতরের সত্যকে ভাষায় রূপ দিতে পারার ক্ষমতা। বুদ্ধদেব বসু বারবার বুঝিয়েছেন, লেখক যদি শুধু প্রচলিত সুরে লিখে যান, তবে তিনি সময়ের নয়, অভ্যাসের প্রতিনিধি হন। আর সাহিত্য যদি কেবল অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে তা হবে মৃত। সাহিত্যর সৌন্দর্য সেখানে অনেকটা ম্লান হ’য়ে উঠে।

 

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তায় ছন্দ, ভাষা এবং রূপের প্রতি গভীর মনোযোগ লক্ষ করা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য শুধু ভাবের বাহন নয়, ভাষার শিল্প। ভাব যদি থাকে কিন্তু ভাষা দুর্বল হয়, তবে সাহিত্য অর্ধেক বাঁচে; ভাষা যদি থাকে কিন্তু ভাবের সত্য না থাকে, তবে তা কেবল শব্দের প্রদর্শনী হয়ে দাঁড়ায়। তাই তিনি সাহিত্যকে ভাব ও ভাষার মিলনক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে শব্দের সংগীত, বাক্যের গতি, অনুপ্রাস, বিরাম, নৈঃশব্দ্য, এবং পঙ্‌ক্তির ওঠানামা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই কারণেই তাঁর সমালোচনাভঙ্গি অনেক সময় কেবল তাত্ত্বিক থাকে না, প্রায় কবিতার মতোই সংবেদনশীল হয়ে ওঠেতিনি লেখকদের কাজকে বিচার করেন শুধু বিষয়বস্তুর দ্বারা নয়, রচনার অন্তর্গত সুর ও স্থাপত্যের দ্বারা। এ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যবোধ, কারণ অনেকেই ভাবেন, যা বলা হলো সেটাই মুখ্য; বুদ্ধদেব বসু দেখান, কীভাবে বলা হলো, সেটাও সমান মুখ্য। এমনকি কখনো কখনো সেটাই মূল সত্য।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাংলা সাহিত্য যে নতুন আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়েছিল, বুদ্ধদেব বসু সেই পরিস্থিতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ; কিন্তু মহীরুহের ছায়ায় নতুন অঙ্কুরের লড়াইও শুরু হয়। বুদ্ধদেব বসু সেই অঙ্কুরের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেননি, বরং রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্বকে স্বীকার করেই তাঁর উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে বুঝতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতায় পুনরাবৃত্তি নয়, পুনর্নির্মাণ দরকার। এই পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন থেকেই আধুনিক কবিতা, আধুনিক গদ্য, আধুনিক সংবেদন, এবং আধুনিক আত্মসচেতনতা, সব একসঙ্গে বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করে। বুদ্ধদেব বসু; রবীন্দ্রপূজার অতিশয়োক্তিকে যেমন এড়িয়ে চলেছেন, তেমনি রবীন্দ্রবিরোধিতার ফাঁপা গৌরবকেও সমর্থন করেননি। তিনি একটি মধ্যবর্তী অথচ দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ বৃহৎ, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পরেও সাহিত্য চলবে; এবং সেই চলার পথ হবে নতুন।

 

কল্লোল যুগের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই যুগে বাংলা সাহিত্যে নতুন জীবনবোধ, নতুন নগরচেতনা, নতুন প্রেমবোধ, নতুন ভঙ্গি, এবং নতুন বিদ্রোহ প্রবল হয়ে উঠেছিল। বুদ্ধদেব বসু এ-রূপান্তরের কেবল একজন অংশগ্রহণকারী নন, বরং তার অন্যতম সংগঠক ও ব্যাখ্যাতা। কল্লোলের আবহে যে নতুন সাহিত্যিক মানস জন্ম নেয়, তা ছিল পুরোনো নীতিবাদী সাহিত্যভাবনার বিরুদ্ধে এক জাগরণ। বুদ্ধদেব বসু দেখিয়েছিলেন, সাহিত্যকে নতুন হতে হলে শুধু বিষয় বদলালেই চলবে না; চৈতন্য বদলাতে হবে। গ্রাম্য নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে শহুরে দ্বন্দ্ব, প্রেমের জটিলতা, শরীরী উপস্থিতি, মানুষের নিঃসঙ্গতা, এবং মানসিক দ্বন্দ্বকে সাহিত্যে আনতে হবে। তাঁর সাহিত্যচিন্তায় এইসব অভিজ্ঞতা কোনও লঘু কৌতূহল ছিল না; ছিল আধুনিক জীবনের সত্য। বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যখন সাহিত্য নিয়ে লেখেন, তখন শুধু সমালোচনা করেন না, একটি বোধের নির্মাণ করেন। তাঁর প্রবন্ধে তর্ক আছে, কিন্তু তর্কের নিষ্ঠুরতা নেই; বিশ্লেষণ আছে, কিন্তু বিশ্লেষণের শুষ্কতা নেই; ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু ব্যাখ্যার দৈন্য নেই। তাঁর গদ্য গড়নে পরিমিত, কিন্তু অর্থে গভীর। তিনি জানতেন, সমালোচনা নিজেই এক শিল্প। তাই তাঁর সমালোচনায় ভাষার দীপ্তি, বাক্যের সুষমা, এবং দৃষ্টির স্বচ্ছতা বিশেষভাবে উপস্থিত। সমালোচকের কাজ কেবল পছন্দ-অপছন্দ জানানো নয়; বরং রচনার অন্তর্গত শক্তি ও দুর্বলতাকে স্পষ্ট করা, তার ঐতিহাসিক স্থান নির্ধারণ করা, এবং তার নান্দনিক মূল্য নিরূপণ করা। বুদ্ধদেব বসু এই কাজটি অনায়াস দক্ষতায় করেছেন। তাঁর সাহিত্যচিন্তায় প্রেম একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। কিন্তু এই প্রেম কেবল রোমান্টিক আবেগ নয়। এটি কখনো দেহমনস্ক, কখনো আত্মদর্শী, কখনো বেদনাময়, কখনো প্রতীক্ষাময়, কখনো রূপের প্রতি আকুলতা, আবার কখনো রূপের সীমাবদ্ধতার বোধ। বুদ্ধদেব বসুর কাছে প্রেম জীবনের একটি গভীর নান্দনিক ও অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতা। তাই সাহিত্যেও প্রেম থাকবে, কিন্তু তা হবে বহুমাত্রিক। তাঁর অনেক বিশ্লেষণে প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাকিত্ব, অসম্পূর্ণতা, স্মৃতি, এবং সময়ের ক্ষয়। এই সংবেদন তাঁর নিজের কবিতা ও গদ্যে যেমন প্রতিফলিত, তেমনি তাঁর সমালোচনাতেও গভীরভাবে উপস্থিত।

 

বুদ্ধদেব বসু বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ মানস নির্মাণ করেছেন। তাঁর মতে, গদ্য শুধু কথনভঙ্গি নয়, চিন্তার সংগঠন। ভালো গদ্য মানে এমন গদ্য, যেখানে ভাবনা স্পষ্ট, ভাষা সংহত, এবং প্রকাশে শৈল্পিক শৃঙ্খলা থাকে। তিনি গদ্যের রস, গদ্যের লাবণ্য, গদ্যের গতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। যে গদ্য কেবল তথ্যবাহী, তা সাহিত্যিক গদ্য নয়; আর যে গদ্য কেবল অলংকৃত, তা পুনরায় দুর্বল। বুদ্ধদেব বসু দেখিয়েছেন, গদ্যকে একই সঙ্গে বুদ্ধির এবং সৌন্দর্যের বাহন হতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে নতুন মান যোগ করেছে। তাঁর প্রবন্ধ ও সমালোচনায় তাই কেবল বোধের বিস্তার নেই, একটি শৈল্পিক আনন্দও আছে।

 

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঐতিহ্য ও নবতার সম্পর্ক। তিনি কোনো চরমপন্থী আধুনিকতাবাদী ছিলেন না, যিনি অতীতকে পুরোপুরি ছুড়ে ফেলে দিতে চান। আবার তিনি এমন রক্ষণশীলও নন, যিনি প্রাচীনতার ঘেরাটোপে আটকে থাকতে চান। তাঁর অবস্থান ছিল জটিল এবং পরিশীলিত। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, নতুন সাহিত্য মানে অতীতের ধ্বংস নয়; বরং অতীতের সজীব পুনর্ব্যাখ্যা। যে ঐতিহ্য বর্তমানকে নতুন প্রাণ দিতে পারে, সেটিই প্রকৃত ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্য কেবল কঙ্কাল হয়ে থাকে, তা ভক্তির বস্তু হতে পারে, কিন্তু সৃজনের নয়। বুদ্ধদেব বসু এই ঐতিহ্যচেতনার ভেতর দিয়েই আধুনিকতার একটি সপ্রাণ ধারণা নির্মাণ করেন। তাঁর সাহিত্যচিন্তায় নগরজীবনের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। গ্রাম্য, কৃষিভিত্তিক, নৈতিক সাহিত্যচেতনার বিপরীতে তিনি নগরের জটিলতা, আলস্য, দ্রুততা, বিচ্ছিন্নতা, এবং মানসিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দেন। নগর কেবল ইট-পাথরের সমষ্টি নয়; নগর মানে সম্পর্কের বদল, ভাষার বদল, সময়ের বদল। আধুনিক সাহিত্য নগরকে এড়িয়ে যেতে পারে না। বুদ্ধদেব বসু এই সত্যটি গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক মানুষের মন আগের চেয়ে বেশি আত্মসচেতন, বেশি দ্বিধাগ্রস্ত, বেশি বিচ্ছিন্ন, এবং তাই সাহিত্যেও তার ছাপ পড়তে বাধ্য। নগরজীবন যেমন সুযোগের, তেমনি সংকটেরও; সাহিত্য এই দুটোই ধারণ করবে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যভাবনায় সংকটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বড় সাহিত্য সুখের সরল অভিব্যক্তি নয়; বড় সাহিত্য জটিলতা, দ্বন্দ্ব, অনিশ্চয়তা এবং আত্মসন্ধানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়। তাঁর নিজের সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক টানাপড়েন তাঁকে ভাবিয়েছে, কিন্তু তিনি সাহিত্যকে তাৎক্ষণিক মতাদর্শের স্তরে আটকে রাখতে চাননি। বরং তিনি সাহিত্যকে এমন এক স্থান হিসেবে দেখেছেন, যেখানে সংকট রূপান্তরিত হয় নান্দনিক অভিজ্ঞতায়। এই অর্থে বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তা গভীরভাবে মানবতাবাদী। তিনি মানুষকে কেবল সামাজিক শ্রেণি হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন বহুমাত্রিক, বিচলিত, স্বপ্নময় সত্তা হিসেবে। তাঁর সাহিত্যচিন্তার আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো আন্তর্জাতিক দৃষ্টি। তিনি বিশ্বসাহিত্যের নানা ধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। বিদেশি সাহিত্যের রসাস্বাদন তাঁকে বাংলা সাহিত্যের মধ্যে তুলনামূলক বোধ এনে দেয়। কিন্তু এই তুলনা ছিল আত্মবিসর্জনের নয়; আত্মপরিচয়ের। অন্য ভাষার সাহিত্য তাঁর কাছে ছিল শেখার ক্ষেত্র, অনুকরণের নয়। তিনি জানতেন, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে দাঁড়াতে হলে নিজস্বতা বজায় রেখেই বিশ্বমানের পরিমিতি অর্জন করতে হবে। তাঁর সাহিত্যচিন্তা বাংলা সাহিত্যের ভিতরে এই বিশ্বদৃষ্টি সংযোজন করেছে।

 

বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধে প্রায়ই দেখা যায়, তিনি কোনও সাহিত্যিককে বিচার করার সময় কেবল সেই লেখকের রচনা নয়, তাঁর সময়, প্রভাব, প্রবণতা, এবং সৃষ্টিশীল সীমা, সবকিছুকে একত্রে বিবেচনা করেন। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে শক্তিশালী সমালোচক করে তুলেছে। তিনি জানতেন, সাহিত্যিক মূল্যায়ন কখনো শূন্যস্থানে হয় না। সাহিত্যিক তাঁর যুগের সন্তান, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি যুগের বিদ্রোহীও হতে পারেন। সুতরাং সমালোচকের দায়িত্ব হলো এই দ্বৈত অবস্থানকে বোঝা। বুদ্ধদেব বসু এই দায়িত্ব পালন করেছেন গভীর সংবেদন ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। তাঁর সাহিত্যচিন্তায় আত্মশৃঙ্খলারও বড় ভূমিকা আছে। তিনি কেবল আবেগে বিশ্বাস করেননি; শিল্প নির্মাণে সংযম, পরিমিতি, এবং সম্পাদনার গুরুত্বকে মূল্য দিয়েছেন। বড় সাহিত্য সবসময় উচ্ছ্বাসের ওপর দাঁড়ায় না; অনেক সময় তা আত্মনিয়ন্ত্রণের ফল। একটি কবিতার লাইনে কী থাকবে, কী থাকবে না, এই নির্বাচনই শিল্পীর দক্ষতা। বুদ্ধদেব বসু এই নির্বাচনের নান্দনিক প্রয়োজনীয়তা বুঝতেন। তাঁর মতে, শিল্পীকে সব কিছু বলা যায় না; কিছু জিনিস ইঙ্গিতে রাখতে হয়, কিছু নীরবতায়, কিছু ছন্দে, কিছু ফাঁকে। এই নীরবতার সৌন্দর্য তাঁর সাহিত্যচিন্তার একটি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য।

 

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যভাবনায় নারী, দেহ, প্রেম, এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির জটিল উপস্থিতি বিশেষ স্থান পায়। তিনি রক্ষণশীল নৈতিকতার বাইরে গিয়ে মানবজীবনের সেইসব স্তরকে সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন, যেগুলো আগে অবহেলিত বা চাপা ছিল। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এক নতুন সাহস এনে দেয়। তবে তিনি নগ্ন কৌতূহল বা কৃত্রিম বেপরোয়ার সমর্থক ছিলেন না। তাঁর কাছে দেহও শিল্পের অংশ, কিন্তু তা নান্দনিক রূপে প্রকাশিত হতে হবে। এই অবস্থান তাঁর সাহিত্যচিন্তাকে পরিশীলিত ও মানবিক করে তোলে।

 

বুদ্ধদেব বসুর সমালোচনার ভাষা কখনো কঠোর, কখনো মধুর, কিন্তু কখনোই নিষ্ঠুর নয়। তিনি লেখকদের প্রতি দায়িত্বশীল সম্মান রেখে কথা বলেছেন। প্রশংসার সময় তিনি উদার, কিন্তু অন্ধ নন; সমালোচনার সময় তিনি স্পষ্ট, কিন্তু অযথা বিদ্রূপে আসক্ত নন। এই ভারসাম্যই তাঁকে প্রাজ্ঞ সমালোচকের আসনে বসিয়েছে। বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে তিনি সেইসব কয়েকজনের একজন, যাঁদের লেখা কেবল বিচারের উপকরণ নয়, নিজেরাই সাহিত্য। এটাই তাঁর সাহিত্যচিন্তার সাফল্য, চিন্তা, ভাষা, এবং শিল্প একত্রে বিকশিত হয়েছে। বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যকে নৈতিক প্রচারমাধ্যম ভাবেননি, আবার নিরেট কৌতুকময় বিলাসও ভাবেননি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল জীবনের গভীরতম অন্বেষণ। মানুষ কেন কাঁদে, কেন ভালোবাসে, কেন হারায়, কেন ফিরে পায়, কেন ভেঙে যায়, কেন নতুন করে জেগে ওঠে, এইসব প্রশ্নের উত্তর সাহিত্য দিয়ে একেবারে সমাধান হয় না, কিন্তু সাহিত্য এই প্রশ্নগুলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যের এই অর্থনির্মাণের শক্তিকে চিনেছিলেন। তাই তাঁর সাহিত্যচিন্তা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই চিন্তা। আজও বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যভাবনা আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক, কারণ সাহিত্য নিয়ে বিভ্রান্তির দিন এখনও শেষ হয়নি। কেউ সাহিত্যে শুধু মতাদর্শ খোঁজে, কেউ কেবল শৈলী, কেউ কেবল আবেগ, কেউ কেবল বাজার। বুদ্ধদেব বসু শেখান, সাহিত্যকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে তার মানবিক, নান্দনিক, ঐতিহাসিক এবং ভাষাগত, সব মাত্রাই দেখতে হয়তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সাহিত্য এমন একটি সৃজনশীল ক্ষেত্র, যেখানে সত্য একমাত্র তথ্যের মধ্যে বাস করে না; সত্য বাস করে রূপের ভেতরে, সুরের ভেতরে, দ্বন্দ্বের ভেতরে, এবং নীরবতার ভেতরেও। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তা তাই মূলত একটি পরিশীলিত জীবনদর্শন। এতে আছে আধুনিকতার স্পন্দন, ঐতিহ্যের বুদ্ধিমান গ্রহণ, শিল্পের স্বাধীনতার ঘোষণা, ভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, এবং মানুষের অন্তর্জগতের প্রতি অশেষ মনোযোগ। তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কেবল একজন লেখক নন; তিনি একধরনের সাহিত্যবিবেক। তাঁর প্রবন্ধ, সমালোচনা, কবিতা, এবং ভাবনার ভেতর দিয়ে বাংলা সাহিত্য নিজের নতুন মুখ দেখেছে। সেই মুখে আছে শৃঙ্খলা, আছে সাহস, আছে সৌন্দর্য, এবং আছে প্রশ্ন। আর প্রশ্নই তো প্রকৃত সাহিত্যচিন্তার প্রথম শর্ত। বুদ্ধদেব বসু সেই প্রশ্নকে জাগিয়ে রেখেছেন, উজ্জ্বল রেখেছেন, এবং বাংলা সাহিত্যের অন্তর্লোকে স্থায়ী করে গেছেন। তাঁর সাহিত্যচিন্তা তাই সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আজও আমাদের ভাবায়, সাহিত্য কী, লেখক কে, ভাষার দায়িত্ব কতখানি, এবং শিল্পের অন্তর্গত সত্য আসলে কোথায়। এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই বুদ্ধদেব বসুর স্থায়িত্ব, তাঁর গভীরতা, এবং তাঁর অনির্বাণ উপস্থিতি নিহিত।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...