সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কবিতার প্রধান শত্রু



কবিতা মানুষের ভাষার সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে অনির্বচনীয় শিল্পসে যেমন হৃদয়ের গভীরতম সুরকে উচ্চারণ ক’রে, তেমনি ভাষার সীমাকে অতিক্রম ক’রে নীরবতার দিকে এগিয়ে যায়, আর এই কারণেই কবিতা লিখতে যেমন মন লাগে, তেমনি লাগে কঠোর আত্মশাসন, নিবিড় সংবেদন, গভীর পাঠ, নৈঃশব্দ্যের সাধনা এবং সত্যের প্রতি নির্মম আনুগত্য; কিন্তু কবিতার এই সৌন্দর্য, এই অনির্বচনীয়তা, এই আত্মিক উচ্চতা যতই মহিমান্বিত হোক না কেন, তার পথ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে বহু শত্রু, যাদের কেউ বাইরের, কেউ ভেতরের, কেউ সামাজিক, কেউ নন্দনতাত্ত্বিক, কেউ মনস্তাত্ত্বিক, আর কেউ আবার সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে কবিতার দেহে ঢুকে পড়া ক্ষয়রোগের মতো; এই শত্রুদের মধ্যে প্রধান শত্রু একটিই, কবিতার ভেতরের জীবন্ত সত্যকে নষ্ট ক’রে ফেলে যে কৃত্রিমতা, যে বাহুল্য, যে প্রস্তুত বাক্য, যে স্বাভাবিক অনুভবকে পরিত্যাগ ক’রে সাজানো ভাষার বিন্যাস সেটিই কবিতার প্রধান শত্রুকারণ কবিতা প্রথমত সত্যের শিল্প, দ্বিতীয়ত সংহতির শিল্প, তৃতীয়ত সংবাদের নয়, অনুভবের শিল্প, এবং চতুর্থত কৃত্রিম চাকচিক্যের নয়জীবনের অন্তর্গত স্পন্দনের শিল্প; যেখানে অনুভূতি নেই, সেখানে কবিতার আবহ আছে কিন্তু প্রাণ নেই; যেখানে ভাষা আছে কিন্তু অভিজ্ঞতার আগুন নেই, সেখানে পঙ্‌ক্তি আছে কিন্তু কবিতা নেই; যেখানে ছন্দ আছে কিন্তু অন্তর্দৃষ্টির আলো নেই, সেখানে শব্দের মিছিল আছে কিন্তু সৃষ্টির গৌরব নেইআর এই কারণেই কৃত্রিমতা ও বাহুল্যই কবিতার প্রথম ও প্রধান শত্রু, কারণ তারা কবিতাকে তার স্বভাব থেকে বিচ্যুত ক’রে, তার সরলতা কেড়ে নেয়, তার গভীরতা ভেঙে চুরমার ক’রে, এবং তাকে এক ধরনের সাজানো মৃতদেহে পরিণত ক’র। কবিতা এমন কোনো শিল্প নয় যে কেবল চমৎকার শব্দের জোড়া লাগালেই দাঁড়িয়ে যাবে, কিংবা বড়ো-বড়ো প্রতীক বসালেই মহৎ হ’য়ে উঠবে, কিংবা দুর্বোধ্যতা বাড়ালেই গভীর হবে; বরং কবিতা হলো সেই ভাষা, যা সংযমের ভিতর দিয়ে বহমান হয়, স্পষ্টতার ভিতর দিয়ে রহস্যকে জাগায়, এবং সাধারণ শব্দের ভিতর দিয়ে অসাধারণ সত্যকে উন্মোচিত ক’রে; কিন্তু আধুনিক সময়ে, এমনকি কাব্যসাহিত্যের নানা যুগে, বারবার দেখা গেছে যে কবিরা কবিতাকে সত্যের বদলে কৌশলে, সুরের বদলে ভঙ্গিমায়, অভিজ্ঞতার বদলে অলঙ্কারে, এবং অনুভূতির বদলে বাগ্মিতায় রূপ দিতে চেয়েছেন; এই প্রবণতাই কবিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সবচেয়ে বেশি; কারণ কবিতা যখন কৃত্রিম হয়, তখন সে মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারে না, সে পাঠকের চেতনায় অনুরণন তোলে না, সে মনে দাগ কাটে না; সে তখন কেবল একটি প্রদর্শনী হ’য়ে ওঠেএকটি সাহিত্যিক পোশাক, যার ভেতরে রক্তসঞ্চালন নেই; এই কৃত্রিমতার জন্ম নানা জায়গায়; কখনও তা আসে কবির আত্মসচেতন অহং থেকে, যখন সে ভাবতে থাকে, আমি যা লিখব তাই মহৎ হবে, তাই তাকে নিজের চেয়ে নিজের ভাষাকেই বড় ক’রে দেখতে হয়; তখন ভাষা আর অভিব্যক্তির বাহন থাকে না, ভাষা হ’য়ে ওঠে আত্মপ্রদর্শনের মঞ্চ; কখনও তা আসে পাঠকের তুষ্টির জন্য, যখন কবি ধরে নেয়, গূঢ়তা মানেই গভীরতা, দুর্বোধ্যতা মানেই শৈল্পিকতা, আর অলংকার মানেই মানতখন সে কথার ওপর কথা চাপায়, উপমার ওপর উপমা বসায়, প্রতীকের ওপর প্রতীক ঝুলিয়ে দেয়, যেন কবিতা নয়, যেন অলঙ্কারের দোকান; কখনও তা আসে সাহিত্যিক অনুকরণ থেকে, যখন একজন কবি নিজের অভিজ্ঞতা না লিখে অন্যের স্বর অনুকরণ ক’রে, অন্যের গদ্যচাল, ছন্দচাল, চিত্রকল্প, এমনকি অন্যের শ্বাসের ধরণ পর্যন্ত নকল ক’রে; তখন কবিতা আর আত্মার স্বাক্ষর থাকে না, হ’য়ে ওঠে ছাঁচে ঢালা শিল্পপণ্য; এইসব কারণেই কৃত্রিমতা কবিতার প্রধান শত্রুকারণ এটি কবিতার স্বকীয়তা নষ্ট ক’রে, আর স্বকীয়তা নষ্ট হলে কবিতা যে কেবল দুর্বল হয় তা নয়, তার অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়; কবিতা তো এমন এক সত্তা, যার জীবন নির্ভর ক’রে আত্মার সততার ওপর, শব্দের ঋজুতা, অনুভূতির শুদ্ধতা এবং অভিজ্ঞতার সত্যতার ওপরতাই কবির প্রথম কর্তব্য ভাষাকে ব্যবহার করা নয়, ভাষার ভেতর সত্যকে খুঁজে পাওয়া; আর এই সত্য কোনো পোষাক পরা সত্য নয়, কোনো বক্তৃতামঞ্চের সত্য নয়, কোনো তৈরি আদর্শের সত্য নয়; এটি জীবন থেকে উঠে আসা, অন্তর থেকে ফোটা, দুঃখ-সুখ, প্রেম-বিরহ, বিস্ময়-ভয়, আশা-হতাশা, জন্ম-মৃত্যুর ভিতর দিয়ে গঠিত সেই কঠিন ও কোমল সত্য, যা মানুষকে মানুষ ক’রে, কবিতাকে কবিতা ক’রে; কিন্তু আজকের সাহিত্যে আরেকটি সমস্যা খুব প্রবল, বাহুল্য; বাহুল্য মানে কেবল বেশি শব্দ নয়, বাহুল্য মানে অপ্রয়োজনীয়তা, আবেগের অতিরিক্ত অভিনয়, ভাবের পুনরাবৃত্তি, এবং ভাষার অবাঞ্ছিত বিস্তার; অনেক কবি মনে করেন, বেশি লিখলেই বেশি শক্তিশালী, অথচ কবিতার শক্তি প্রাচুর্যে নয়, নির্বাচনেকবি কত কম শব্দে কত বেশি অনুভব তৈরি করতে পারেন, সেটিই তার ক্ষমতা; একটি সৎ কবিতার সবচেয়ে বড়ো গুণ হলো, সে প্রয়োজনের চেয়ে এক অক্ষরও বেশি দাবি করে নাশব্দ তার কাছে শোভা নয়, দায়িত্ব; পঙ্‌ক্তি তার কাছে অলঙ্কার নয়, উপলব্ধির ধারক; কিন্তু বাহুল্য যখন কবিতায় ঢুকে পড়ে, তখন তার ভেতরকার সুর নষ্ট হয়, গতি ভেঙে যায়, এবং কবিতার সংহতি হারিয়ে যায়দুর্বল কবিরা প্রায়ই মনে করেন, জটিল বাক্য, দুরূহ চিত্রকল্প, এবং অতিপ্রস্তুত ভাবগম্ভীরতা তাদের কবিতাকে উন্নত করবে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি কবিতার দেহে অপ্রয়োজনীয় মেদ জমায়; কবিতা তখন সরু নদী থাকে না, হ’য়ে ওঠে কাদা-মেশানো জলাভূমি; যেখানে পাঠক হাঁটতে চায়, সেখানে সে ডুবে যায়; যেখানে হৃদয় প্রবেশ করতে চায়, সেখানে ভাষার জঞ্জাল বাধা হ’য়ে দাঁড়ায়; কবিতা তাই যত বেশি শুদ্ধ, তত বেশি শক্তিশালীআর শুদ্ধতার শত্রু হলো বাহুল্য; বাহুল্যের আরেক বিপজ্জনক রূপ হলো আবেগের নাটকীয়তা; অনেক কবি ভাবে, আবেগ যত জোরালো, কবিতা তত গভীর; ফলে তারা অনুভূতিকে সংযত করেন না, তাকে তীব্রতার নামে চিৎকারে পরিণত করেন; কিন্তু কবিতার সৌন্দর্য চিৎকারে নয়, সংযমে; কান্না কবিতায় থাকে, কিন্তু তা প্রদর্শিত কান্না নয়; বেদনা থাকে, কিন্তু তা জোর ক’রে আনা বেদনা নয়; প্রেম থাকে, কিন্তু তা অতিরঞ্জিত উচ্ছ্বাস নয়এক ধরনের নীরব আগুনই কবিতাকে জ্বালায়; এই আগুন যদি সংযত না হয়, তবে তা আলো দেয় না, পোড়ায়; এই আরেকটি প্রধান শত্রু অতিরঞ্জনকবিতা অতিরঞ্জনে মরে, কারণ অতিরঞ্জন সত্যের ভারসাম্য ভেঙে দেয়; সে বাস্তব অনুভূতিকে নাটকীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপন করতে গিয়ে তা কল্পিত, এমনকি অস্বাভাবিক ক’রে তোলে; ফলে পাঠকের বিশ্বাস নষ্ট হয়; সে কবিতাকে অনুভব করে না, বরং সন্দেহ ক’রেআর সন্দেহ যখন কবিতায় ঢুকে পড়ে, তখন আবেগের দরজা বন্ধ হয়; কবিতার একটি অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য শর্ত হলো বিশ্বাসযোগ্যতা; কবিতা বাস্তব না-ও হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে; সে অলৌকিক না-ও হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরের সত্য যদি পাঠকের আত্মায় না পৌঁছে, তবে সে শব্দমাত্রএই বিশ্বাসযোগ্যতাকে হত্যা ক’রে বাহুল্য, কৃত্রিমতা, এবং অতিরঞ্জন; তাই এগুলোকে একত্রে কবিতার প্রধান শত্রু বলা যায়; কিন্তু কবিতার শত্রু শুধু ভাষাগত নয়, মানসিকও; আত্মতুষ্টিও কবিতার এক ভয়ংকর শত্রু; যখন কবি নিজেকে সম্পূর্ণ বলে মনে করেন, যখন তিনি নিজের কণ্ঠে মুগ্ধ হ’য়ে অন্যের কান এড়িয়ে যান, যখন তিনি নিজস্ব ব্যর্থতাকে চিনতে অস্বীকার করেন, তখন তার লেখায় বিকাশ থেমে যায়কবিতা কোনো স্থির স্নানঘর নয়, যেখানে একবার ঢুকলেই সব ধুয়ে যাবে; কবিতা হলো চলমান নদী, যেখানে বারবার নামতে হয়, এবং প্রত্যেকবারই নতুনভাবে ভিজতে হয়; আত্মতুষ্ট কবি এই প্রবাহ থেকে সরে দাঁড়ান; তিনি ভাবেন, তিনি এসে গেছেন; কিন্তু কবি কখনও এসে যায় না, তাকে প্রতিদিন ফিরে আসতে হয় ভাষার দরজায়আর সেই ফেরার পথে প্রধান শত্রু হলো অহংঅহং কবিকে শোনার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত ক’রে; সে তাকে পড়তে, ভাবতে, সংশয় করতে শেখায় না; ফলে কবি নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলতে থাকেনকিন্তু জগতের সঙ্গে তার সংলাপ থাকে না; অথচ কবিতা জগতের সঙ্গে সংলাপ, মানুষের সঙ্গে সংলাপ, সময়ের সঙ্গে সংলাপ; আত্মতুষ্টি সেই সংলাপকে একপেশে ক’রে তোলেকবিতার আরেক শত্রু হলো প্রস্তুত ফর্মুলা; শিল্পে ফর্মুলা আছে, কিন্তু কবিতায় ফর্মুলা কোনোদিনই শেষ কথা হতে পারে নাকবিতা পুনরাবৃত্তি সহ্য করে না; একবার পাওয়া কৌশল, একবার চমক, একবার সফল ভঙ্গি, এগুলোকে ধরে নিয়ে সারাজীবন চলতে গেলে কবি নিজের কণ্ঠ হারান; তখন তার লেখা আগের লেখার ছায়া হয়, নতুন সৃষ্টির জন্ম হয় নাসৃজনশীলতার সবচেয়ে বড়ো শত্রু অভ্যাসগত সাফল্য; কারণ সাফল্য মানুষকে সাবধানের বদলে আত্মবিশ্বাসী, আর আত্মবিশ্বাস কখনও কখনও রূপ নেয় স্থবিরতায়কবি তাই প্রতিবার নতুনভাবে ভাষার মুখোমুখি হবেন, নতুনভাবে নিজেকে হারাবেন, নতুনভাবে নিজেকে খুঁজে পাবেনআর এই হারানো-খোঁজার খেলাই কবিতার প্রাণএ-প্রাণে আঘাত ক’রে যখন বুদ্ধিবাদী বাহাদুরি ঢুকে পড়ে।  তখন কবিতা আর হৃদয়ের শিল্প থাকে না, হ’য়ে ওঠে কেবল বুদ্ধির প্রদর্শনীবুদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু কবিতার কেন্দ্রে বুদ্ধি নয়, অনুভববুদ্ধি কবিতার দেহকে গঠন ক’রে, কিন্তু অনুভব তার শ্বাসযেখানে কেবল মেধার দাপট, সেখানে হৃদয়ের নীরবতা অবহেলিত; এই অবহেলাই কবিতার ভেতর শূন্যতা সৃষ্টি ক’রেকবিতা তখন চিন্তার ভারে নুয়ে পড়ে, কিন্তু উচ্চারণের উষ্ণতা হারায়পাঠক সেই কবিতাকে পড়তে পারে, কিন্তু তার মধ্যে বাস করতে পারে না; কারণ সে কবিতা তাকে স্পর্শ ক’রে না, তাকে শুধুই চমৎকৃত করেআর চমৎকৃতি অস্থায়ী, স্পর্শ স্থায়ী; তাই কবিতার শত্রু হলো এমন বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণ, যা হৃদয়কে উপেক্ষা ক’রেকবিতার আরেক বড়ো শত্রু সময়ের অবক্ষয়; যে সমাজে ভাষা জীর্ণ হয়চিন্তা খণ্ডিত হয়, মূল্যবোধ হ্রাস পায়, সেখানে কবিতাও আক্রান্ত হয়; যদিও কবিতা সমাজের ঊর্ধ্বে নয়, সমাজের মধ্যেই তার বাস, তবু সমাজ যদি কুৎসিত হ’য়ে ওঠেতবে কবির সংগ্রাম আরও কঠিন হয়; ভোগবাদী সংস্কৃতি, ত্বরিত উপভোগের মানসিকতা, সংক্ষিপ্ত বার্তার রাজত্ব, দৃশ্যের আধিপত্য, স্লোগানের দাপটএসব কবিতার বিরুদ্ধে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরি ক’রেমানুষ দ্রুত কিছু চায়, সহজ কিছু চায়, তাৎক্ষণিক কিছু চায়; কিন্তু কবিতা ধীর, গভীর, এবং দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগের দাবি ক’রেতাই সমকালীন দ্রুতগতির সভ্যতা কখনও কখনও কবিতার পরম শত্রু হ’য়ে দাঁড়ায়, কারণ এটি মনকে অস্থির ক’রে, ধৈর্যকে ক্ষয় ক’রে, এবং গভীর পাঠের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়যখন পাঠক আর ধীরে ভাবতে পারে না, তখন কবিতা তার প্রকৃত পাঠককে হারায়; অথচ কবিতা হারায় না, পাঠক হারায়; কিন্তু সেই হারানো কবিতারই ক্ষতি; কেননা কবিতা কেবল লেখার জিনিস নয়, পড়ারও শিল্প; পাঠকের মনোযোগের অভাবও কবিতার শত্রু; আর এই মনোযোগহীনতার জন্ম দেয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক তাড়াহুড়াযেখানে সবাই কিছু বলতে চায়, কিন্তু কিছু শুনতে চায় না; কবিতা তো শুনবার শিল্পও বটে; সে শব্দের ভেতর নীরবতা শোনে, নীরবতার ভেতর স্পন্দন শোনে; কিন্তু যখন শোনার ক্ষমতা লোপ পায়, তখন কবিতা তার প্রকৃত পাঠক হারায়কবিতার আরেক শত্রু ভাষার দীনতাভাষা যখন দরিদ্র হয়, শব্দ যখন রূঢ় হ’য়ে ওঠেভাবপ্রকাশ যখন সংকুচিত হয়, তখন কবির সামনে সংকট দেখা দেয়; তবে এখানে মনে রাখতে হবে, কবিতার ভাষা কেবল শব্দভাণ্ডারের পরিমাণে সমৃদ্ধ হয় নাভাষার প্রকৃত সমৃদ্ধি আসে অভিজ্ঞতার বিস্তার, চিন্তার গভীরতা, এবং সংবেদনের সূক্ষ্মতা থেকেযে কবি পৃথিবীকে নিবিড়ভাবে দেখেন না, মানুষের যন্ত্রণাকে অনুভব করেন না, প্রকৃতির নীরব ভাষা বোঝেন না, ইতিহাসের ভার টের পান না, তার ভাষা যতই চমৎকার হোক না কেন, তা ফাঁপা থেকে যায়কবিতা তাই শুধু লেখার ক্ষমতার বিষয় নয়, দেখার ক্ষমতারও বিষয়; এবং এই দেখাই শত্রু পীড়িত হয় যখন কবি দৃষ্টি হারানদৃষ্টি হারানো মানে শুধু চোখের দৃষ্টি নয়, অর্থবহ উপলব্ধির দৃষ্টি; যে দৃষ্টি না থাকলে ফুল কেবল ফুল, নদী কেবল জল, মেঘ কেবল জলীয় বাষ্প, মানুষ কেবল শরীর; কবি সেই মানুষ যিনি জগতের সাধারণ জিনিসকে অসাধারণভাবে দেখেন; কিন্তু কৃত্রিমতা, বাহুল্য, অহং, অনুকরণ, আত্মতুষ্টি, ফর্মুলা, এসব তার দৃষ্টিকে বেঁধে ফেলেফলে কবিতার বিস্ময় কমে যায়; বিস্ময় ছাড়া কবিতা মৃত; কারণ বিস্ময়ই তাকে জন্ম দেয়শিশুর মতো নতুন চোখে দেখা, প্রথমবারের মতো স্পর্শ করা, বারবার বিস্মিত হওয়াএই ক্ষমতা হারালে কবিতা নিঃশেষ হ’য়ে যায়; কবিতা তাই কোনো স্থির সংজ্ঞা নয়, একটি ক্রমাগত বিস্ময়ের প্রক্রিয়া; আর এই বিস্ময়ের শত্রু হলো অভ্যাসের জড়তাঅভ্যাস একবার যদি কবির ভেতর বসে যায়, তবে সে আর নতুনভাবে কিছু অনুভব ক’রে না; সে তখন লেখে, কিন্তু দেখে না; বলে, কিন্তু শোনে না; আর এই অদেখা ও অশোনাই কবিতার মৃত্যুকবিতার প্রধান শত্রু তাই বহুমাত্রিক হলেও তার মূল মুখ একটাই, অসততাঅসততা কখনও কৃত্রিমতার রূপ নেয়, কখনও বাহুল্যের, কখনও অনুকরণের, কখনও আত্মতুষ্টির, কখনও অতিরঞ্জনেরকিন্তু সব রূপের নিচে রয়েছে হৃদয়ের সত্য থেকে সরে যাওয়াকবি যদি নিজের সত্যের সামনে সৎ না হন, তবে তিনি যত বড়ো শিল্পীই হোন না কেন, তার লেখা শেষ পর্যন্ত কেবল শব্দের বালি; এক ঢেউয়ে ধুয়ে যাবে; কবিতা টিকে থাকে যাদের লেখায় অন্তরের অভিজ্ঞতা আছে, সত্যের দায় আছে, এবং ভাষার প্রতি নৈতিক নিষ্ঠা আছেএই নিষ্ঠা ছাড়া কবিতা কাগজের খেলা; তাই কবিতার শত্রু চিনতে হলে প্রথমে কবিকে নিজের ভেতরে তাকাতে হয়; সেখানে কি আমি অন্যের মতো লিখছি? সেখানে কি আমি শব্দে মোহিত, অনুভবে নয়? সেখানে কি আমি পাঠকের বাহবা চাইছি, না-কি সত্যকে প্রকাশ করছি? সেখানে কি আমি সহজ ভাষাকে অবজ্ঞা ক’রে জটিলতার মুখোশ পরছি? সেখানে কি আমি ভাবের গভীরতা না রেখে কেবল ভাসমান চিত্রকল্প সাজাচ্ছি? এসব প্রশ্নের উত্তরেই কবিতার রক্ষা বা ক্ষতি নির্ভর করেকারণ কবিতার সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধ বাইরে নয়, ভেতরেনিজের ভেতরের ভণ্ডামি, ভেতরের অলসতা, ভেতরের অনুকরণ, ভেতরের অহং, এইসবকে জয় করতে না পারলে কবি কখনও কবিতা লিখতে পারেন নাকেবল ছদ্ম-কবিতা লিখতে পারেন; আর ছদ্ম-কবিতা সাহিত্যকে সাময়িক মোহ দেয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী মর্যাদা দেয় নাসুতরাং বলতেই হয়, কবিতার প্রধান শত্রু কোনো একক বাহ্যশক্তি নয়, বরং এমন এক জটিল অন্তর্লোক, যেখানে কৃত্রিমতা, বাহুল্য, অহং, অনুকরণ, অতিরঞ্জন, আত্মতুষ্টি, ভাষার জড়তা, এবং দৃষ্টির অভাব একত্রে কবিতার স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত ক’রেআর এইসবের বিরুদ্ধে কবির অস্ত্র হলো সততা, সংযম, পাঠ, পরিশ্রম, আত্মসমালোচনা, এবং জীবনের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা; যে কবি জীবনকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসেন, তিনি তাকে সাজিয়ে তোলার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না; তিনি জানেন, একটি সৎ শব্দ কখনও দশটি সাজানো শব্দের চেয়ে শক্তিশালী; একটি গভীর নীরবতা কখনও অতিরঞ্জিত উচ্চারণের চেয়ে বেশি কাব্যিক; একটি খাঁটি অনুভব কখনও প্রদর্শনমূলক আবেগের চেয়ে বেশি স্থায়ী; একটি ছোট, নিখুঁত পঙ্‌ক্তি কখনও দীর্ঘ, ভারাক্রান্ত, কৃত্রিম কবিতার চেয়ে বড়োএভাবেই কবিতা বাঁচে, আর এভাবেই তার শত্রুকে পরাজিত করতে হয়; কবিতার প্রধান শত্রু তাই শেষ পর্যন্ত সেইসব জিনিস, যা সত্যের বদলে ছায়া, অভিজ্ঞতার বদলে নকল, অনুভূতির বদলে ভঙ্গি, সংযমের বদলে বাহুল্য, এবং সৃষ্টির বদলে প্রদর্শনকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়এই শত্রুর বিরুদ্ধে কবির শপথ হওয়া উচিতআমি ভাষাকে ব্যবহার করব, কিন্তু ভাষার দাস হব না; আমি অলংকারকে চিনব, কিন্তু অলংকারে হারাব না; আমি গভীর হব, কিন্তু গূঢ়তার ভান করব না; আমি আবেগী হব, কিন্তু অতি-নাটকীয় হব না; আমি নতুন হব, কিন্তু অনুকরণ করব না; আমি সৎ হব, কারণ কবিতা মিথ্যাকে সহ্য করে না; আর এই শপথই কবিতাকে রক্ষা করেকারণ কবিতা শেষ পর্যন্ত এক ধরনের নৈতিক শুদ্ধতা, এক ধরনের আত্মিক সাহস, এক ধরনের নির্জন দীপ্তি; যে দীপ্তি কেবল সত্যের ভেতর থেকেই জ্বলে ওঠে, এবং যার সবচেয়ে বড়ো শত্রু হলো অসততা।

  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...