সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

লেখক ও প্রকাশক: কে কার উপর নির্ভর ?

  লেখক ও প্রকাশক , এই দুই সত্তা যেন একই নদীর দুই তীর , একে অন্যকে ঘিরেও আলাদা , একে অন্যকে ছুঁয়েও ভিন্ন। সাহিত্যজগতে তাদের সম্পর্ক কেবল ব্যবসা ও সৃষ্টির সম্পর্ক নয় , তা নির্ভরতা , সহযোগিতা , দ্বন্দ্ব , প্রত্যাশা , বিশ্বাস এবং কখনো কখনো অদৃশ্য এক চুক্তির সম্পর্ক ; যে চুক্তি কাগজে লেখা থাকে না , কিন্তু বইয়ের প্রতিটি পাতায় তার ছায়া পড়ে। প্রশ্নটি যখন ওঠে , লেখক ও প্রকাশক , কে কার উপর নির্ভর , তখন সহজ উত্তর দেওয়া কঠিন , কারণ সম্পর্কটি একমুখী নয়। লেখক ছাড়া প্রকাশক অর্থহীন , প্রকাশক ছাড়া লেখক অপূর্ণ । আবার পাঠক ছাড়া উভয়েই নিঃসঙ্গ। তবু যদি গভীরে যাই , দেখি এই নির্ভরতা সমান নয় , বরং সময় , সমাজ , অর্থনীতি , প্রযুক্তি , বাজার , খ্যাতি , সৃজনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার তারতম্যে বদলে যায়। একসময় লেখক প্রকাশকের মুখাপেক্ষী ছিলেন , আবার কখনো প্রকাশক লেখকের প্রতীক্ষায় থাকেন। কখনো লেখকের জন্য প্রকাশক দরজা , কখনো প্রকাশকের জন্য লেখক প্রাণ ; কখনো লেখক সৃষ্টি করেন , প্রকাশক তাকে আকার দেন , আর কখনো প্রকাশক কাঠামো তৈরি করেন , লেখক তার ভেতর আত্মা ঢেলে দেন। এই পারস্পরিক নির্ভরতার ইতিহাস সাহিত্যচর্চার ই...

কবি ও কবিতা

  কবি ও কবিতা , এই দুইটি শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয় মানুষের অন্তর্লোকের এক অপার দরজা খুলে যায় , যেখানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না , ভাষা হ’য়ে ওঠে আত্মার স্পর্শ , স্মৃতির নক্ষত্র , বেদনার সংগীত , প্রেমের দীপ্তি , প্রতিবাদের শানিত অস্ত্র এবং স্বপ্নের অদৃশ্য পাখা। কবি কোনো সাধারণ লিখিয়েও নন , কবিতা কোনো সাধারণ বাক্যবিন্যাসও নয় ; এরা মানবজীবনের সেই সূক্ষ্মতম , গভীরতম , প্রায় অদৃশ্য সীমানায় অবস্থান করে , যেখানে অনুভব আর অভিব্যক্তি একে অপরের মধ্যে মিশে গিয়ে নতুন এক সত্য নির্মাণ করে। মানুষ জন্মের পর থেকেই ভাষার আশ্রয়ে বড় হতে থাকে , কিন্তু ভাষার প্রকৃত সম্ভাবনা সে তখনই অনুভব করে , যখন শব্দ হঠাৎ করে দৈনন্দিন ব্যবহার থেকে মুক্ত হয়ে নরম আলো , কাঁপা বাতাস , ক্ষতবিক্ষত স্মৃতি কিংবা অনন্ত আকাঙ্ক্ষার আকার নিতে শুরু করে। এই রূপান্তরের কারিগরই কবি , আর এই রূপান্তরের ফলই কবিতা। কবি ভাষার মধ্য দিয়ে এমন এক জগত নির্মাণ করেন , যেখানে চোখে দেখা বাস্তবতা আর হৃদয়ে অনুভূত অদৃশ্যতা মিলেমিশে এক নতুন বাস্তব তৈরি করে। কবিতা তাই কেবল ছন্দের খেলা নয় , অলংকারের প্রদর্শনী নয় , কেবল আবেগের উদ্গীরণও ন...

ইলেকশন বনাম সিলেকশন: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

  ইলেকশন এবং সিলেকশন, এই শব্দ দু’টি কেবল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিন্ন রূপ নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবচেতনার গভীরতম দর্শনের সঙ্গে যুক্ত দু’টি বিপরীতধর্মী অথচ পরিপূরক ধারণা। ইলেকশন বা নির্বাচন বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে ভোটের মাধ্যমে বেছে নেয়। অন্যদিকে সিলেকশন বা নির্বাচনকৃত বাছাই হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ, দক্ষতা, যোগ্যতা বা প্রভাবের ভিত্তিতে কাউকে নির্বাচিত ক’রে। এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা কেবল রাজনৈতিক নয়; বরং তা নৈতিকতা, গণতন্ত্র, ক্ষমতা এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকেও গভীরভাবে স্পর্শ ক’রে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতার বণ্টন ও নেতৃত্ব নির্বাচন সর্বদাই একটি জটিল প্রক্রিয়া ছিল। প্রাচীন গ্রিক নগররাষ্ট্রে সীমিত পরিসরে ইলেকশনের ধারণা থাকলেও বাস্তবে সেখানে সিলেকশনের প্রভাব ছিল প্রবল। রাজতন্ত্রে সম্পূর্ণ সিলেকশন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, যেখানে জন্মই ছিল ক্ষমতার যোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড। আধুনিক গণতন্ত্র ইলেকশনকে কেন্দ্র ক’রে গ’ড়ে উঠলেও বাস্তব প্রেক্ষাপটে সিলেকশন এখনও অদৃশ্যভাবে সক্রিয়। ফলে ইলেকশন ও সিলেকশনের মধ্যে ...

কবিতার প্রধান শত্রু

কবিতা মানুষের ভাষার সবচেয়ে সূক্ষ্ম , সবচেয়ে জটিল , সবচেয়ে অনির্বচনীয় শিল্প । সে যেমন হৃদয়ের গভীরতম সুরকে উচ্চারণ ক’রে , তেমনি ভাষার সীমাকে অতিক্রম ক’রে নীরবতার দিকে এগিয়ে যায় , আর এই কারণেই কবিতা লিখতে যেমন মন লাগে , তেমনি লাগে কঠোর আত্মশাসন , নিবিড় সংবেদন , গভীর পাঠ , নৈঃশব্দ্যের সাধনা এবং সত্যের প্রতি নির্মম আনুগত্য ; কিন্তু কবিতার এই সৌন্দর্য , এই অনির্বচনীয়তা , এই আত্মিক উচ্চতা যতই মহিমান্বিত হোক না কেন , তার পথ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে বহু শত্রু , যাদের কেউ বাইরের , কেউ ভেতরের , কেউ সামাজিক , কেউ নন্দনতাত্ত্বিক , কেউ মনস্তাত্ত্বিক , আর কেউ আবার সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে কবিতার দেহে ঢুকে পড়া ক্ষয়রোগের মতো ; এই শত্রুদের মধ্যে প্রধান শত্রু একটিই , কবিতার ভেতরের জীবন্ত সত্যকে নষ্ট ক’রে ফেলে যে কৃত্রিমতা , যে বাহুল্য , যে প্রস্তুত বাক্য , যে স্বাভাবিক অনুভবকে পরিত্যাগ ক’রে সাজানো ভাষার বিন্যাস সেটিই কবিতার প্রধান শত্রু । কারণ কবিতা প্রথমত সত্যের শিল্প , দ্বিতীয়ত সংহতির শিল্প , তৃতীয়ত সংবাদের নয় , অনুভবের শিল্প , এবং চতুর্থত কৃত্রিম চাকচিক্যের নয় । জীবনের অন্তর্গত স্পন্দনের শিল্প ; যেখানে অনুভূতি নেই...

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য চিন্তা

  আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পরিসরে বুদ্ধদেব বসু ( ১৯০৮ - ১৯৭৪ ) এমন এক নাম , যাঁকে শুধু কবি , ঔপন্যাসিক , নাট্যকার বা প্রাবন্ধিক হিসেবে আলাদা ভাবে বন্দি করলে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন সাহিত্যচিন্তার এমন এক নির্মাতা , যিনি সাহিত্যের ভিতরকে দেখেছেন , সাহিত্যের বাইরের শোরগোলের চেয়ে অনেক গভীরে। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল ভাষার অলংকার ছিল না , কেবল সমাজের দর্পণও ছিল না , আবার কেবল ব্যক্তিগত অনুভবের বিলাসও ছিল না । সাহিত্য ছিল জীবনের অন্তর্গত এক জটিল সৃজনশীল সত্য , যেখানে রূপ , অনুভূতি , বোধ , ইতিহাস , স্বপ্ন , সংকট , নৈঃশব্দ্য এবং বিদ্রোহ , সব একত্রে কাজ ক ’ রে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচিন্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই যে , তিনি সাহিত্যকে কখনোই একমাত্রিক ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনেননি। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন , সাহিত্য মানুষের অস্তিত্বের এমন এক শর্ত , যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গেই নতুন ক ’ রে পরিচিত হয়। বুদ্ধদেব বসুর চিন্তাজগৎ গ ’ ড়ে উঠেছে একদিকে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তরপর্বে , অন্যদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতার সংস্পর্শে । ফলে তাঁর সাহিত্যদৃষ্টি একান্ত দেশীয়ও নয় , আবার নিছক পা...