সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিঃসঙ্গ মেঘ ও আমরা তিনজন -ছোট গল্প

 

শহরটা দিনশেষে এমন এক রঙে ডুবে যেত, যেন কেউ আকাশের ওপর পুরোনো তামার পাত বসিয়ে দিয়েছে। জানালার কাচে শেষ বিকেলের আলো লেগে থাকত কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে-ধীরে নেমে আসত ধোঁয়ার মতো নীল অন্ধকার। সেই শহরে, ঠিক এমন এক ঋতুর সন্ধ্যায়, অয়ন প্রথমবার বুঝেছিল, কিছু প্রেম মানুষকে সম্পূর্ণ করে না, বরং ভেঙে ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলে। অয়ন ছিল স্থির চোখের একজন মানুষ। সে কম কথার মানুষ।  ভাবনায় গভীর, চেতনায় আধুনিক, ভাবনায় অনেকটা অগ্রগামীবিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত; স্লোগান বানাত, ব্র্যান্ডকে মানুষের স্বপ্নের মতো দেখাতে শিখত, অথচ নিজের জীবনের জন্য কোনো স্লোগান তার কাছে ছিল না। অফিসের কাচঘেরা তলাটিতে সবাই যখন ভেসে চলত দ্রুততা আর উচ্চাভিলাষের মধ্যে, তখন অয়ন চুপচাপ নোটবুকের পেছনের পাতায় লিখত, ‘মানুষ যা চায়, তা সবসময় মানুষ যা প্রয়োজন, তা নয়।এই একটি বাক্যই যেন তার ভিতরের বেঁচে থাকাকে ব্যাখ্যা করত।তার জীবনে প্রথম ঢুকেছিল মেঘলা। নামের মতোই সে ছিল অনিশ্চিত, ছায়াময়, অথচ আশ্চর্য উজ্জ্বল। মেঘলার হাসি ছিল এমন, যেন ব্যস্ত একটি গলি হঠাৎ একফোঁটা বৃষ্টিতে ধুয়ে গেলে যে স্বস্তি নামে, ঠিক সেই রকম। সে শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব পড়াত। মানুষের সম্পর্কে, ক্ষমতার রূপ নিয়ে, ভালোবাসার সামাজিক বিন্যাস নিয়ে তার ভাবনা ছিল তীক্ষ্ণ। সে বলত, ‘ভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি না, এটা সমাজেরও তৈরি করা ভাষা।কথা বলতে বলতে তার চোখে যে আগুন জ্বলত, তা অয়নকে অস্থির করত। সে মেঘলার সঙ্গে বসলে বুঝত, চিন্তা করাও এক ধরনের কাছাকাছি আসা।

ইরফান আহমেদমেঘলার শৈশবের বন্ধু, তার কলেজজীবনের সহপাঠী, এখন সফল স্থপতি। ইরফান এমন মানুষ, যাকে দেখে মনে হয় পৃথিবী তাকে আগে থেকেই বিশ্বাস করেছে। তার কণ্ঠ শান্ত, কাঁধে ভরসা, চোখে একধরনের দীর্ঘদিনের ক্লান্ত স্পষ্ট চিহ্নসে কম কথা বলত, কিন্তু যখন বলত, তখন যেন ঘরের বাতাস একটু ভারী হয়ে উঠত। তার নকশার ভেতরে ছিল শূন্যতার সৌন্দর্য; সে দালান বানাত এমনভাবে, যেন ভেতরের নীরবতাও বাসযোগ্য হয়। সকল সৌন্দর্য যেন আকাশ জুড়ে ধরা দেয়। এই তিনজনের জীবন একসময় একই বৃত্তে এসে পড়ল, যদিও কেউই শুরুতে তা টের পায়নি। মেঘলার একটি গবেষণা প্রকল্পে অয়নের বিজ্ঞাপনী অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ল, আর প্রকল্পের অংশ হিসেবে পুরোনো শহুরে বসতি বাঁচানোর একটি জনসচেতনতামূলক কাজের সঙ্গে ইরফানের স্থাপত্য-পরামর্শ যুক্ত হলো। কাজটি ছিল শহরের পুরোনো নদীপাড়ের পাথরের বাড়িগুলো, বারান্দা, গলিপথ, খসে পড়া দেয়াল, এসব নিয়ে। উন্নয়নের নামে যাকে গিলে খেতে চাইছিল নতুন নগরায়ণ। প্রথম বৈঠকে অয়ন আর ইরফান পরস্পরকে দেখে অদ্ভুত এক পরিচিতি অনুভব করল। একসময় তারা একই ছাত্রাবাসে থাকত, তর্ক করত, বই পাল্টাত, মধ্যরাতে চায়ের কাপ নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত। সেই পুরোনো বন্ধুত্বের নিচে যে অপূর্ণতা, এতদিন চুপচাপ শুয়ে ছিল, তা মেঘলার উপস্থিতিতে যেন হঠাৎ নড়েচড়ে উঠল। মেঘলা এই সম্পর্কের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিল একাকী কিন্তু দুর্বল নয়; বরং তার উপস্থিতিই দুজনকে আয়নার সামনে এনে ফেলেছিল।

প্রকল্পের দিনগুলোতে তারা প্রায়ই নদীপাড়ে যেত। ভাঙা সিঁড়ি, স্যাঁতসেঁতে বারান্দা, লবণ-লেগে ফ্যাকাশে দেয়াল, আর দূরে নৌকার শব্দ, সবকিছু মিলে এক অদ্ভুত বিষণ্ন সৌন্দর্য তৈরি করত। মেঘলা পুরোনো মানুষদের সঙ্গে কথা বলত; তাদের বাঁচিয়ে রাখা স্মৃতির দলিল লিখে নিত। অয়ন সেই স্মৃতিকে শব্দে রূপ দিত, পোস্টার ও ক্যাম্পেইন কনসেপ্টে ঢালত। ইরফান বাড়িগুলোর কাঠামো পরীক্ষা করত, কোন দেয়াল টিকে থাকবে, কোন বারান্দা ভেঙে পড়বে, তা দেখত। তাদের কাজের ভেতর ধীরে ধীরে একে অন্যের দিকে টান তৈরি হলো। তবে প্রেমের প্রথম চিহ্ন সবসময় হাসি বা স্পর্শ নয়; কখনো তা হয় কারও উপস্থিতিতে নিজের নীরবতাকে অন্যরকম মধুর মনে হওয়া। মেঘলা চা পছন্দ করে না, কিন্তু কফি বেশি খেলে মাথা ব্যথা হয়, এই অসম্ভব সহজ তথ্যগুলো অয়ন ধীরে ধীরে জেনেছিল এবং সে অনুযায়ী তার দিনগুলো সাজিয়েছিল। সে মেঘলার বই ফেরত দেওয়ার সময় পৃষ্ঠার মাঝখানে টুকে দিত ছোট্ট মন্তব্য, কখনো একটা কবিতার লাইন। মেঘলা বুঝত, কিন্তু সে উত্তর দিত নিজের ভঙ্গিতে, সোজাসুজি নয়, বরং এমনভাবে যে অয়ন মনে করত, নীরবতাও হয়তো সম্মতির একটি রূপ। কিন্তু ঠিক তখনই ইরফানের দিকে মেঘলার ঝোঁক স্পষ্ট হতে শুরু করল, নীরব, অথচ তীব্র। ইরফান তার কাজের মাধ্যমে সেই জায়গাগুলো দেখতে পেত, যেগুলো অন্যরা কেবল নকশার বাইরের সীমা বলে ভাবত। মেঘলা মানুষ ও স্থানকে আলাদা করত না; ইরফানও না। তাদের দুজনের কথার মধ্যে ছিল অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস, যেন অনেকদিন ধরে একে অন্যের বাক্য শেষ না করে, বাক্যের ভেতরের যন্ত্রণাটুকু বুঝে নেওয়ার অভ্যাস। একদিন নদীপাড়ের পুরোনো এক বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে মেঘলা বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভয় লাগে যখন বোঝা যায়, আমরা যাকে টিকে থাকা ভাবছি, সেটা আসলে শুধু মরে না যাওয়ার অনুশীলন।ইরফান তাকে দেখে শুধু বলেছিল, ‘কিছু জিনিস নকশায় ধরা পড়ে না। কিন্তু ভেঙে পড়ার আগে আমি তাদের স্পষ্ট দেখি।মেঘলা সেদিন প্রথমবার তার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল, যেন কোথাও হারিয়ে যাওয়া একটি চাবি হঠাৎ পেয়ে গেছে। অয়ন দূর থেকে এই টান টের পেত। কিন্তু ত্রিভুজের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, প্রতিটি কোণ অন্য কোণের অসহায়তা দেখে নিজেকে যুক্তিসঙ্গত ভাবতে শুরু করেঅয়ন ভাবত, মেঘলা তার সঙ্গে বেশি স্বচ্ছন্দ; ইরফান ভাবত, মেঘলা তার নীরবতাকে বেশি বোঝে; মেঘলা ভাবত, এদের দুজনের মধ্যে সে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে, কিন্তু কোথায় থামবে বুঝছে না। ভালোবাসা যখন তিনটি মানুষকে একসঙ্গে ছুঁয়ে ফেলে, তখন সত্য আর কল্পনার সীমানা নরম হয়ে যায়।

এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামল। প্রকল্পের ফাইল নিয়ে তারা তিনজন একটি পুরোনো চায়ের দোকানে বসেছিল। বাইরে জল জমে রাস্তার আলোকে ভেঙে দিচ্ছিল। দোকানের ভিতর পাখা ঘুরছিল আর ভেজা জামার গন্ধে কাঁচা উষ্ণতা মিশে ছিল। কথার ফাঁকে হঠাৎ অয়ন বলল, ‘সব সম্পর্কই কি শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে হারানোর গল্প?’ প্রশ্নটি এমনভাবে আসল যে ইরফান চুপ করে গেল, মেঘলা জানালার বাইরে তাকাল অনেকটা নীরব হয়ে। তারপর মেঘলা বলল, ‘না। কিছু সম্পর্কের কাজ হারানো নয়। কিছু সম্পর্কের কাজ আমাদের নিজের ভিতরের সীমা দেখিয়ে দেওয়া।অয়ন মৃদু হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসি ভেতরে রক্তপাতের মতো ছিল। ইরফান ধীরে-ধীরে তার কাপে চামচ নেড়ে বলল, ‘আর কিছু সম্পর্ক আমাদের শেখায়, ভালোবাসা মানে অধিকার না।এই বাক্যটির পর টেবিলের মাঝখানে এক ধরনের ভারী নীরবতা নেমে এল। মেঘলা বুঝল, যারা ভালোবাসে তারা একদিন না একদিন নিজেদের মধ্যে নৈতিকতার বিচারও বসায়। সে জানত, দুই পুরুষই তাকে চায়, কিন্তু সে নিজেও কী চায় তা এত সহজে বুঝতে পারছিল না। সে কি অয়নের কোমল মনন পছন্দ করে? নাকি ইরফানের প্রশান্ত গভীরতা? নাকি সে আসলে এমন কাউকে চায় যে তার একাকীত্বকে পূর্ণ না করে, বরং সম্মান করে?

পরের সপ্তাহগুলোতে প্রকল্প এগোলেও তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরো জটিল হলো। অয়ন একদিন মেঘলাকে জানাল, সে তাকে ভালোবাসে। কোনো ফুল, কোনো প্রথাগত দৃশ্য নয়; শুধু শীতল বিকেলে নৌকার ঘাটে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে এমনভাবে ভালোবেসেছি, যে ভালোবাসাটা আমি লুকিয়ে রাখতে পারিনি।মেঘলা চোখ নামিয়ে নিল। সে বলল, ‘অয়ন, তুমি আমার জীবনে খুব গভীরভাবে আছো।অয়ন বুঝল, এই বাক্য অনেক কিছু বলতে পারে, কিন্তু তার মানে প্রেমও হতে পারে, বিদায়ের ভূমিকা-ও হতে পারে। ইরফানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও নির্ভুল ছিল, আর তাই আরও বিপজ্জনক। এক রাতে কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে মেঘলা আর ইরফান একই রিকশায় উঠল। রাস্তার শব্দ, ভেজা হাওয়া, দূরের ট্রাফিক সিগন্যাল, সবকিছু মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছিল যেখানে বলা যায় না এমন কথাও সহজ হয়ে যায়। ইরফান হঠাৎ বলল, ‘তুমি কি কখনো ভেবেছ, মানুষ আসলে একাকীত্বের সঙ্গে প্রতারণা করে প্রেম খোঁজে?’ মেঘলা জানালায় চোখ রেখে বলল, ‘আর প্রেমের সঙ্গে প্রতারণা করে বেঁচে থাকার পদ্ধতি খোঁজে।দুজনেই হাসল। সেই হাসির ভেতরেই তাদের না-বলা স্বীকারোক্তি লুকিয়ে ছিল। তিনজনের মধ্যে টান ভাবটা যত বাড়ল, ততই প্রকল্পের বাইরের জীবন জটিল হয়ে উঠল। বন্ধুদের আড্ডা থেমে গেল। মেসেজের উত্তর ধীরে আসতে লাগল। প্রত্যেকের চোখে প্রত্যেকের জন্য একটা অস্বস্তিকর সতর্কতা জন্ম নিল। অয়ন ভাবল, মেঘলা ইরফানকে বেছে নিলে অন্তত সে শান্ত থাকবে, কারণ ইরফানকে সে বিশ্বাস করেকিন্তু মানুষের বিশ্বাস আর প্রেমের আকাঙ্ক্ষা সবসময় এক পথে হাঁটে না। ইরফান ভাবল, মেঘলা অয়নের কাছে ফিরে গেলে ভালো হবে, কারণ অয়ন তার অনুভূতিকে কোমলভাবে ধারণ করতে পারে। কিন্তু মেঘলা কোনো বিনিময়ের বস্তু নয়; সে নিজের ভিতরের অন্ধকার ও আলোর মধ্যে নিজেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ। একদিন মেঘলা তাদের দুজনকে একইসঙ্গে দেখা করতে বলল। নদীপাড়ের পুরোনো একটি গাছের নিচে। শীত প্রায় চলে গেছে, কিন্তু বাতাসে এখনও একধরনের ঠান্ডা ছিল। গাছটার ডালপালা এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল, যেন বহুদিন ধরে কিছু ধরে রাখছে, আবার কিছু ছেড়েও দিচ্ছে। মেঘলা শুরুতে খুব শান্ত ছিল। সে বলল, ‘আমি তোমাদের দুজনকেই ভালোবেসেছি, একই রকমভাবে নয়, আবার আলাদা করেও নয়। অয়ন, তোমার ভালোবাসা আমাকে নিরাপদ করেছে। আমি জানি, তোমার কাছে আমি বিচার নয়, আশ্রয়। ইরফান, তোমার বোঝার ক্ষমতা আমাকে নড়িয়েছে। তোমার সামনে আমি নিজের ভয়গুলো লুকোতে পারিনি। কিন্তু সত্যি বলি, আমি কারও সম্পূর্ণ হতে চাই না, কাউকে সম্পূর্ণও করতে চাই না।অয়ন প্রথমে কিছু বলল না। তার মুখে এমন এক শূন্যতা নেমে এল, যা কান্নারও আগে আসে। ইরফান নিচু গলায় বলল, ‘তাহলে?’ মেঘলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তাহলে আমি দুজনের কারও কাছে প্রতিশ্রুতি দিতে পারব না, যা আমার সত্য নয়। ভালোবাসা যদি মুক্তি না হয়, তবে তা ধীরে-ধীরে বন্দিত্ব হয়ে দাঁড়ায়।কথাগুলো সোজা, কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটি কষ্ট ছিল, যা নরম নয়, ধারালো। অয়ন হঠাৎ বুঝল, মেঘলাকে পাওয়া না-পাওয়ার বাইরেও একটা প্রশ্ন আছে: সে কি নিজের সত্যকে হারিয়ে ভালোবাসতে চায়? না। সে চায় না। তার ভেতরে কোনো এক মেজাজে শান্তি নেমে এল। সে বুঝল, এই হারানোই হয়তো তার সবচেয়ে বড় রক্ষা। ইরফানও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে অপমান ছিল না, ছিল এক ধরনের সম্মান। সে জানত, প্রেমকে জোর করে টেনে রাখলে সেটা আর প্রেম থাকে না। সে মৃদু হাসল, বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ।এরপর একটু থেমে যোগ করল, ‘আমরা অনেক সময় মানুষকে নয়, নিজেদের অসম্পূর্ণতাকে ধরে রাখতে চাই।এই কথায় মেঘলার চোখে জল এলো। কারণ ইরফান তার মনের এক অন্ধ কোণ স্পর্শ করে ফেলেছে।

অয়ন সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল এক নতুন অনুভূতি নিয়ে। তার হৃদয় ভাঙেনি শুধু, এক পুরোনো ভ্রমও ভেঙে গেছে। সে বুঝল, প্রেমে সবচেয়ে কঠিন বিষয় কাউকে ছেড়ে দেওয়া নয়; সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, কাউকে ছেড়ে দেওয়ার সময় নিজের গুরুত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখা। সেদিন রাত থেকে সে নিজেকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করল। তার একাকীত্ব আর পরাজয় আর এক জিনিস রইল না। দিনগুলো গড়িয়ে গেল। প্রকল্প শেষ হলো। নদীপাড়ের কিছু বাড়ি রক্ষা পেল, কিছু পেল না। শহর তার মতোই নিষ্ঠুর ও উদাসীন। মানুষ নতুন ভবনে উঠল, পুরোনো বাড়ির দরজায় তালা লাগল, গলিতে শিশুদের শব্দ বদলে গেল। কিন্তু অয়ন, মেঘলা আর ইরফানের জীবনে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন থেকে গেল, তাদের প্রত্যেকের ভিতরে, অন্য দুজনের জন্য, একটা আলাদা জায়গা তৈরি হলো। আর সেই জায়গাটা প্রেমের পরাজয় না, প্রেমের অভিধান। মেঘলা পরে একদিন অয়নকে বলেছিল, ‘তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?’ অয়ন হেসে ফেলেছিল। না। আমি শুধু তোমাকে আর নিজের মতো করে চাই না।মেঘলা মাথা নেড়েছিল। তারপর সে বলল, ‘সেটাই সম্ভবত সবচেয়ে সৎ ভালোবাসা।ইরফানের সঙ্গে তার সম্পর্কও বদলাল। তারা আর আগের মতো নয়, কিন্তু একে অন্যকে এড়িয়ে চলেও না। অনেকসময় সত্যিকারের ঘনিষ্ঠতা শেষ পর্যন্ত জয়ের চিহ্ন নয়, পরিণত নীরবতার চিহ্ন হয়ে থাকে। অয়ন এক নতুন কাজ শুরু করল, পুরোনো স্মৃতিচিহ্ন, নিঃসঙ্গ মানুষ, শহুরে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটি ব্যক্তিগত প্রজেক্ট। সে বুঝল, মানুষের অন্তর্গত ভাঙনই তার আসল ভাষা। মেঘলা বিদেশে একটি সেমিনারে গেল, ফিরে এসে আরও নিখুঁতভাবে লিখতে লাগল সম্পর্ক, ক্ষমতা, শরীর, নৈকট্য নিয়ে। ইরফান তার স্থাপত্যে আলো আর ফাঁকা জায়গার ব্যবহার আরও গভীর করল। যেন সে জেনে গেছে, প্রতিটি বাড়ির ভেতরে কিছু না-কিছু খালি জায়গা থাকতে হয়, যেখানে মানুষ নিজের অচেনা মুখ বসাতে পারে। আর শহরের সেই নদীপাড়ে, এক পুরোনো গাছের নিচে, তিনজনের দেখা শেষবারের মতো হয়েছিল। তখন গ্রীষ্মের শুরু। পাতাগুলো কাঁপছিল হালকা বাতাসে। কেউ আর প্রেমের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কথা বলেনি। কেউ আর জয়ের কথা বলেনি। কিন্তু তাদের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা যে মায়া তৈরি করেছিল, তা সহজে ভাঙার ছিল না। কারণ কিছু ত্রিমুখী প্রেম অবশেষে ত্রিভুজের সমাধান চায় না; সে চায় মানুষের ভিতরে সম্মান, বোধ, আর বেদনার সহাবস্থান। সেদিন মেঘলা হঠাৎ বলেছিল, ‘আমরা তিনজনই একে অন্যকে বদলে দিয়েছি।অয়ন উত্তর দিয়েছিল, ‘হ্যাঁ। আর সবচেয়ে বড় কথা, কেউ কাউকে গ্রাস করেনি।ইরফান একটু হেসে বলেছিল, ‘এটাই তো বিরল।বাতাসে নদীর গন্ধ ছিল। দূরে বিকেলের আলো নরম হয়ে আসছিল। তিনজনের ছায়া মাটিতে পাশাপাশি পড়েছিল, কিন্তু একাকার হয়নি। আর এই অমিলের মধ্যেই ছিল তাদের পরিণত প্রেমের সৌন্দর্য, যে প্রেম ধরে রাখে না, তবে মুছে ফেলেও না; যে প্রেম অধিকার করে না, তবে অস্বীকারও করে না; যে প্রেম শেষ পর্যন্ত মানুষকে একটু বেশি মানুষ করে তোলে। শহর তখনও কোলাহল পূর্ণগাড়ির হর্ন, মানুষের তাড়া, নির্মাণের শব্দ, মোবাইল স্ক্রিনের আলো, সবকিছু নিজের মতো চলছিল। কিন্তু সেই কোলাহলের মধ্যে তিনটি হৃদয় একটাই শিক্ষা নিয়ে আলাদা পথে হাঁটল: প্রেমের সবচেয়ে গভীর রূপ কখনো পাওয়ায় নয়, বরং বুঝে নেওয়ায়, পারস্পারিক শ্রদ্ধায়আর কখনো কখনো, কাউকে না পেয়েও মানুষ তার মতো করে সত্যিকারের বাঁচতে শেখে। দূর থেকে অনেকটা ছায়াকে ভালোবাসার মত, যার কোন প্রতিত্তর হয় না। 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...