সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঘাস ফড়িঙের ছায়া-ছোট গল্প

 

বর্ষার পরে অজস্র দিন কেটে গেলেও ওই সন্ধ্যেটির কথা আমার মনে এমনভাবে রয়ে গেছে, যেন বৃষ্টির জল শুকিয়ে গেলেও মাটির ভিতর থেকে একটুকরো সোঁদা গন্ধ উঠে আসে। শহরের বাইরের পুরনো বাসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম দেখেছিলাম তাকে, একটি অল্পবয়সী মেয়ে, কাঁধে সাদা চাদর, হাতে কিছু বই, আর চোখে এমন এক অস্বচ্ছল উজ্জ্বলতা, যা মানুষের ভিতরের ক্লান্তিকে হঠাৎ অপমান করে। তার নাম মীরা। নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল, এই নামের ভিতরে যেন এক ধরনের নরম কাচ আছে; আলো পড়লে ঝিলমিল করে, কিন্তু হাত দিলে আঙুল কাটে।

আমার নিজের বয়স তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। বয়সের এই পর্যায়ে মানুষ হয় দৃঢ় হয়ে ওঠে, না হয় ভেতরে ভেতরে ভেঙে যেতে শুরু করে। আমি দ্বিতীয় দলে ছিলাম। বাইরে থেকে আমাকে শান্ত, সুশৃঙ্খল, হয়তো কিছুটা নিরাসক্ত বলেই মনে হত। ভেতরে, সে সময়, এক পুরনো ক্ষত ক্রমাগত জেগে থাকত, সেই ক্ষতটি কোনো প্রেমের সম্পূর্ণ ভাঙন নয়, আবার কেবল বিচ্ছেদও নয়; বরং এক এমন অসমাপ্ততার যন্ত্রণা, যেখানে হারানোর চেয়ে বেশি কষ্ট থাকে হারানোর আগের দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। এই অসমাপ্ততাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, আবার ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলে।

মীরা পাশের ঘরে থাকত। সে ঢাকা শহরের এক কলেজে পড়ত, সাহিত্য নিয়ে। তার মামার বাড়ি এই পাড়ায়, আর শহরে পরীক্ষা চলাকালে সে এখানে এসে উঠেছিল। শুরুতে আমাদের মধ্যে খুব বেশি কথাবার্তা হত না। সকালের দিকে গেইটের কাছে দেখা হলে সে মাথা নিচু করে হাসত, আমি কেবল সামান্য জবাব দিতাম। কিন্তু একদিন বৃষ্টির মধ্যে সে ছাতা ভুলে বেরিয়ে এসে ভিজে জবজবে বই নিয়ে ফেরার সময় বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলল, ‘আপনি কি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতাটা আবার পড়ছেন?’

আমি অবাক হয়েছিলাম। হাতে তখন আমার নীলমলিন মলাটের একটি পুরনো বই ছিল।

কেন, মনে হচ্ছে?’ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

কারণ,’ সে হেসে বলেছিল, ‘ওই বইটা যাদের হাতে থাকে, তাদের চেহারায় একটু বিষণ্ণতা আসে।

তার এই সহজ স্বীকারোক্তিতে আমি খানিকটা অপমানিত, খানিকটা আনন্দিত হয়েছিলাম। বিষণ্ণতা মানুষকে গোপন রাখতে চায়, কিন্তু কিছু কিছু চোখ তাকে অনায়াসে চিনে ফেলে। সেদিন থেকে আমাদের মধ্যে কথাবার্তা বাড়তে লাগল। ছাদের ধারে, সিঁড়ির মোড়ে, বাগানের পাশে, যে কোনো অজুহাতে সে কথা বলত, আর আমি শুনতাম। বেশির ভাগ সময় সে বলত, বই, নদী, ট্রেন, পুরনো গান, আর কবিতা নিয়ে। আমি বলতাম কম; কিন্তু তার উপস্থিতি আমাকে এমনভাবে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছিল, যেমন দীর্ঘ বর্ষার পরে দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে শ্যাওলা জন্মায়, প্রথমে অদৃশ্য, তারপর হঠাৎ বুঝতে পারা যায়, দেয়াল আর আগের মতো নেই।

বিকেলের দিকে আমাদের পাড়ার শেষ মাথায় একটি ছোট্ট মাঠ ছিল। খুব বড় মাঠ নয়; শহরের ভিতরে জমে থাকা সবুজের এক টুকরো আহত স্মৃতি। সেখানে কয়েকটি ছেলেমেয়ে খেলত, আর বাতাসে শুকনো ঘাসের সঙ্গে কাদার গন্ধ মিশে থাকত। একদিন মীরা আমাকে ওই মাঠে টেনে নিয়ে গেল। সে বলল, ‘এখানে দাঁড়ালে কী দেখতে পান?’

কিছুই না,’ আমি বললাম।

সে একখানা ঘাসের আগা ছুঁয়ে দেখাল। এইটুকু দেখুন। ঘাসের ছায়া আছে।

আমি হেসেছিলাম। ঘাসেরও আবার ছায়া?’

সব কিছুরই ছায়া আছে,’ সে গম্ভীর হয়ে বলেছিল। যা আমরা দেখি, তার চেয়ে বেশি দেখা যায় তার অনুপস্থিতিতে।

সে বাক্যটি তখন আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছিল। আজও মনে হয়, কিছু কিছু কথা মানুষের কাছ থেকে নয়, যেন কোনো অচেনা গভীরতা থেকে উঠে আসে। সেদিন মাঠের উপর সূর্যের আলো লম্বা হয়ে পড়ছিল। ঘাসের পাতাগুলো মাটির উপর এক একটি চিকন রেখার মতো ছায়া ফেলেছিল। হঠাৎ মনে হয়েছিল, ছোট ছোট অস্তিত্বও ছায়া তৈরি করে, আর ছায়াই বোধ হয় সব অস্তিত্বের নীরব সাক্ষ্য।

মীরা ছিল অদ্ভুত সংবেদনশীল। সে এক টুকরো শুকনো পাতা দেখেও দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকতে পারত। আবার কোনো পুরনো গাছের কাণ্ডে হাত রাখলে সে এমনভাবে অনুভব করত, যেন গাছটি তার নিজের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তার এই ভঙ্গিমার মধ্যে এক ধরনের অবাধ কোমলতা দেখতাম, কিন্তু সেই কোমলতার সঙ্গে ছিল অদ্ভুত এক শাসন। সে সহজে কারও কাছে নিজেকে মেলে ধরত না; কেবল যতটা প্রয়োজন, ততটাই। তবু তার হাসির মধ্যে এমন উজ্জ্বলতা ছিল যে মানুষ ভুলে যেত, সে আসলে কতখানি দূরে অবস্থান করছে।

আমাদের মধ্যে সম্পর্কটি কী ছিল, তা আমি প্রথমদিকে নিজেই স্পষ্ট বুঝতে পারিনি। বন্ধু? না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী? সেটিও নয়। কোনো বয়স্ক আশ্রয়দাতা আর কিশোরী বিস্ময়? তাও নয়। বরং যেন দুজন মানুষ, যারা ভিন্ন ভিন্ন বয়সে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একই নদীর তীরে এসে দাঁড়িয়েছে। একজনের হাতে এখনও জলের ছলাৎ-ছলাৎ স্মৃতি, অন্যজনের হাতে নদীর বর্তমান।

একদিন সন্ধ্যায় সে আমার ঘরে এসে বসেছিল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। ঘরের জানালায় পানি পড়ার শব্দ এমন যেন অজস্র ক্ষুদ্র আঙুল কাচে টোকা দিচ্ছে। আমি চা এনেছিলাম। টেবিলের ওপর উল্টে রাখা কয়েকটি বই, পাশে পোড়াপাটি। সে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানালার দিকে চেয়ে বলল, ‘এই বৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে হয় কি জানেন?’

কি?’

কোনো মানুষের না-ফেরার কথা।

আমি চুপ করে গেলাম। সে আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘মানুষ ফুরিয়ে যায় খুব ধীরে। কেউ চলে যায়, কেউ থেকে যায়, কিন্তু যে চলে গেল, তার অনুপস্থিতি তো থাকেই।

আমি বললাম, ‘অনুপস্থিতিরও কি এমন অবাধ্য ক্ষমতা আছে?’

থাকে,’ সে বলল। কারণ আমরা যা পাই না, সেটাই আমাদের ভেতর সবচেয়ে গভীর দাগ কেটে যায়।

তার কথা শুনে আমার বুকের মধ্যে পুরনো এক স্মৃতির দরজা খুলে গেল। বহু বছর আগে, অন্য এক শহরে, অন্য এক নারীর সঙ্গে আমার এমনই অসম্পূর্ণ কিছু কথা হয়েছিল। সেই সম্পর্ক ছিল শব্দে ভরা, কিন্তু স্পর্শে অনন্য,  প্রতিশ্রুতিতে উজ্জ্বল, কিন্তু বাস্তবে কুয়াশাময়। শেষ পর্যন্ত কিছুই না-পাওয়া মানুষ শুধু স্মৃতি নয়, অভ্যাসও বয়ে বেড়ায়। সে নারী একদিন কোনো কারণ না বলেই দূরে সরে গিয়েছিল। কখনও আমরা কারণ চাই, কিন্তু কারণ পাই না; কিংবা কারণ থাকলেও সেটি এমন অদৃশ্য যে গ্রহণ করার উপায় থাকে না। সেই থেকে আমি খুব কমই কারও দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকেছিলাম। মীরা ছিল প্রথম, যার দিকে ঝোঁকার ভয় আমি টের পাচ্ছিলাম।

কিন্তু সে আমাকে প্রেমের দিকে টানেনি, অন্তত প্রথমে নয়। সে টেনেছিল একটি বিস্তৃত মানবিক শূন্যতার দিকে, যেখানে একটি চৈতন্য অন্যটির পাশে বসে নিজের অসংগতি শুনতে পায়। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি বুঝতে পারতাম, মানুষ কেবল সম্পর্কের দ্বারা নয়, একে অপরের নীরবতা দিয়ে আরও বেশি চিনে যায়। মীরা মাঝে মাঝে হঠাৎ চুপ হয়ে যেত, তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলত, ‘আমি কোথাও স্থির থাকতে পারি না।

কেন?’

কারণ, কোথাও গেলেই মনে হয়, কিছু একটা পেছনে রয়ে গেছে।

কি রয়ে গেছে?’

সে কাঁধ ঝাঁকাত। কী জানি। হয়তো নিজের কোনো পুরনো ছায়া।

এই কথায় আমি অনেকক্ষণ ভেবেছিলাম। ছায়া, নিজেরও কি ছায়া পুরনো হয়? নাকি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ার ভাষা বদলে যায়? তখনই আমি লক্ষ্য করি, বিকেলের দিকে মাঠে যারা হাঁটে, তাদের পা-ফেলা মাটির উপর একেকরকম রেখা তৈরি করে। একটি শিশুর ছায়া কাঁপে, এক বৃদ্ধের ছায়া ভারী হয়, আর একটি ক্লান্ত মধ্যবয়স্ক মানুষের ছায়া যেন নিজেরই দেহের চেয়ে বেশি সত্য হয়ে ওঠে। মীরার ছায়া ছিল ক্ষীণ, দ্রুত, এবং অদ্ভুতভাবে দীর্ঘ। ছোট দেহ, কিন্তু পায়ের নিচে অদৃশ্য কিছু যেন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

দিন যেতে লাগল। বর্ষা কমে এলো, আকাশে পাতলা রোদ, মাঠে নতুন ঘাস। এক সকালে মীরা আমাকে বলল, সে কিছুদিনের জন্য নানার বাড়িতে যাবে। খুব স্বাভাবিক স্বরে বলেছিল, কিন্তু তার চোখে অন্য এক দ্যুতি ছিল। আমি বুঝলাম, সে কিছু বলতে চায়, অথচ বলছে না। বিদায়ের আগে সে আমার ঘরে এসে একটি বই রেখে গেল। বইয়ের ভেতর কোনো চিঠি ছিল না, কোনো গোপন সংকেতও না। কেবল একটি পাতার কোণে ছোট করে পেন্সিলে লেখা: ঘাসের ছায়া কখনো একা থাকে না।

আমি বইটি খুলে দেখেছিলাম, কিন্তু পাতার ভেতর আর কিছু ছিল না। তবু ওই একটি পঙ্‌ক্তির মতো বাক্য আমাকে অনেকদিন ধরে তাড়িয়ে বেড়াল।

সে চলে যাওয়ার পর শহর অদ্ভুত রকম নীরব হয়ে গেল। বাইরে মানুষ ছিল, তবু আমার মনে হত, সবকিছু যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো দূরে সরে গেছে। মীরার সঙ্গে আমার সম্পর্কের মধ্যে যেটুকু উজ্জ্বলতা ছিল, তার বড় অংশই বোধহয় তারই অনুপস্থিতিতে আমি প্রথম বুঝেছিলাম। মানুষ যখন থাকে, আমরা তাকে দেখি; যখন চলে যায়, তখন দেখি তার আকৃতি আমাদের ভেতর কতটা জায়গা দখল করেছে।

একদিন বিকেলে আমি সেই মাঠে গেলাম। বর্ষার পরে ঘাস উঠে এসেছে, সবুজ পাতাগুলো বাতাসে নড়ছিল। কয়েকটি ঘাসফড়িং হঠাৎ লাফিয়ে উঠল। সূর্যের আলো তাদের দেহে লেগে ক্ষণিকের জন্য তামাটে হয়ে উঠল। আমি একটি ঘাসফড়িংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে মাটির উপর পড়া নিজের ছায়াকে এড়িয়ে আরেক দফা লাফ দিল। আশ্চর্য, এত ছোট্ট জীব, অথচ তার চলার মধ্যে এমন একটি ঔদ্ধত্য আছে, যেন সে নিজের ছায়াকে টপকে যেতে চায়। কিন্তু ছায়া তো পেছনেই পড়ে থাকে। তাকে কখনো টপকানো যায় না। সে নিজেই আমাদের গতির অনুসারী, আমাদেরই চিহ্ন।

আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবলাম, মানুষেরও কি তেমনি? আমরা জীবনে অনেক কিছু পার হয়ে যাই, কিন্তু আমাদের ছায়া, মানে আমাদের অতীত, আমাদের ভেতরেই থেকে যায়। তার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়েই তো ক্লান্তি জন্মায়। হয়তো মীরা সেটাই বুঝত। হয়তো সে নিজের পেছনের ছায়াকে বহন করেই চলছিল। হয়তো সে তাই কোথাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারত না।

মাসখানেক পরে সে ফিরে এলো। কিন্তু ফিরে এলেও যেন আগের মতো ফিরে এল না। বাইরে থেকে প্রায় একই; চোখে সেই আলো, ঠোঁটে সেই স্বল্প হাসি। তবু আমি টের পেলাম, তার মধ্যে একটি ভাঙা স্বর লুকিয়ে গেছে। সে এখন কম কথা বলে। আগের মতো মাঠে যেতে চায় না। জানালার পাশে বসেও আর সেই পুরনো উচ্ছ্বাসে প্রশ্ন করে না। যেন কিছুর আঘাতে তার ভিতরের খোলস পাতলা হয়ে গেছে।

এক সন্ধ্যায় সে আমার ঘরে এসে নীরবে বসে রইল। অনেকক্ষণ পরে বলল, ‘আপনি কি কখনও মনে করেছেন, মানুষ নিজের সঙ্গে নিজেরই দেরি করে?’

আমি বুঝলাম না। কী অর্থ?’

যে আমি এখন আছি, তাকে ধরতে ধরতে আমি পিছিয়ে পড়ি। যেন আমারই আরেকটি আমি আমার আগে আগে হাঁটে, আর আমি তাকে ধরতে পারি না।

তার কণ্ঠ খুব শান্ত ছিল। সে কাঁপছিল না, তবু আমি অনুভব করলাম তার ভেতরে প্রচণ্ড বেদনা জমে আছে। আমি কিছু বললাম না। নীরবতা অনেক সময় সান্ত্বনার চেয়ে বেশি সত্য হয়। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘ওখানে দেখুন।

আমি তাকালাম। মাঠের পাশ দিয়ে তখন সন্ধ্যার শেষ আলো পড়ছে। বাতাসে ঘাস নড়ে উঠছে। মৃদু আলোয় সেগুলোর ছায়া মাটির উপর এমনভাবে জড়ো হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল সব ঘাসের ছায়া মিলেমিশে একটাই কালচে দাগ। আর সেই দাগের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক শিশু, হাতে কাঠি, মুখে অবুঝ বিস্ময়।

মীরা আবার বলল, ‘ঘাসের ছায়া আসলে ঘাসের চেয়ে ছোট না বড়?’

আমি এ প্রশ্নের সহজ উত্তর জানতাম না। বললাম, ‘ছায়ার আকার তো আলোর উপর নির্ভর করে।

সে মৃদু হেসে বলল, ‘ঠিক তাই। আমাদেরও।

তারপর সে আর কিছু বলল না। আমি দেখলাম, তার চোখ জলে ভরে আসছে, কিন্তু সেই জল নামছে না। কিছু কান্না এমন হয়, যা ভিতরে ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে বেরোতে ভয় পায়, কিংবা বেরোলে নিজেরই অপমান বোধ করে। আমি তখন প্রথমবার অনুভব করলাম, তাকে বাঁচানোর কোনো ক্ষমতা আমার নেই। মানুষের ভেতরকার জট এমন জিনিস, যা অন্যের হাত দিয়ে খোলা যায় না। একা মানুষই তার নিজের ভিতরে আটকে থাকে, এবং সেই আটকানো জায়গাকে মুক্তি বলতে হয় এক ধরনের অভ্যাস।

সে রাতের পর মীরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। আগে যতটা আসত, আর ততটা নয়। কিছুদিন পর পরীক্ষার অজুহাত, কিছুদিন পর বাড়ির তাগিদ, শেষে তার নিজেরই এক অদৃশ্য সিদ্ধান্ত। আমি জানতাম, সে চলে যাবে। কিন্তু তাকে ধরে রাখার মতো জোর আমার ছিল না। এও জানতাম, কিছু মানুষ দরজার কাছ পর্যন্ত আসে, ভিতরে ঢোকে না। তারা ঘরে অল্প আলো ফেলে, তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। তাতে ঘরের দেওয়াল আর আগের মতো থাকে না।

তার শেষ দিনের কথা আমি স্পষ্ট মনে রাখিনি, কারণ কোনো শেষকে আমরা কখনও সম্পূর্ণভাবে স্মরণ করতে পারি না। মনে থাকে কিছু ভাঙা রেখা, একটি মুখভঙ্গি, একটি শব্দ, একটি কাপের শব্দ থেমে যাওয়া। মীরা চলে যাওয়ার কয়েকদিন পর আমি আবার মাঠে গেলাম। বিকেল তখন নামছে। ঘাস নরম, বাতাসে পোকামাকড়ের ক্ষীণ শব্দ। আমি একটি ঘাসফড়িংকে এক টুকরো ঘাসের পাতায় বসে থাকতে দেখলাম। তার ছায়া মাটির উপর কাঁপছে। আমি খুব ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। ছায়াটি তখন আমার নিজের ছায়ার সঙ্গে মিশে গেল। মনে হল, মানুষও বোধহয় এভাবেই একে অপরের ছায়ায় এসে পড়ে; কেউ কারও স্থায়ী হয় না, কিন্তু কারও ছায়া থেকে কিছুটা আলো ধার করে।

সেদিনই বুঝলাম, মীরা আমার কাছে কোনো প্রেমের পূর্ণতা হয়ে আসেনি। সে ছিল অনুপস্থিতির এক প্রশিক্ষক। তার মাধ্যমে আমি শিখেছিলাম, কীভাবে একটি উপস্থিতি মানুষকে বদলে দেয়, আর কীভাবে একটি অনুপস্থিতি তাকে আরও গভীর করে। সে আমাকে শেখায়নি কেবল ভালোবাসতে; শিখিয়েছিল দেখা আর না-দেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে কীভাবে দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে হয়। ছায়ার দিকে তাকিয়ে কীভাবে ছায়ার চেয়ে বড় কিছু বোঝা যায়।

বহুদিন পরে, যখন আমার ঘরে ধুলো জমে গেছে, বইয়ের পাতা হলুদ হয়ে এসেছে, আর আমি নিজের বয়সের সঙ্গে প্রায় সমঝোতা করে ফেলেছি, তখনও কখনও বিকেলের আলোয় ঘাসের ছায়া দেখলে মীরার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে, তার কণ্ঠস্বরের সেই শান্ত টান, চোখের ভিতরের অস্থির দীপ্তি, আর তার অদ্ভুত বাক্যটি: ঘাসের ছায়া কখনো একা থাকে না।

এখন বুঝি, ছায়া একা থাকে না, কারণ সে আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে জন্মায়। আমরা যে পথে হাঁটি, আমাদের পেছনে পেছনে সে পথের স্মৃতি গড়ে ওঠে। মীরা ছিল আমার জীবনের সেই পথচিহ্ন, যা আর ফিরে আসে না, কিন্তু মুছেও যায় না। সে আমার কাছে থেকে কোনো কিছু চাইনি, কোনো প্রতিশ্রুতিও নয়। তবু তার উপস্থিতি আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম বুঝতে পারি, মানুষের বাস্তব রূপ তার মুখে নয়, তার হারানোর ভঙ্গিতে।

সন্ধ্যায় জানালার ধারে দাঁড়িয়ে এখনো আমি কখনও কখনও মাঠের দিকে তাকাই। দূরে ঘাস নড়ে, আলো বদলায়, আর মাটির উপর অচেনা ছোট ছোট ছায়া দৌড়োতে থাকে। তখন মনে হয়, জীবন সম্ভবত খুব বড় কোনো নাটক নয়; বরং এক টুকরো জমিতে পড়া আলো আর তার ছায়ার মধ্যে চলতে থাকা নীরব সংলাপ। মানুষ আসে, মানুষ যায়। থাকে শুধু তাদের রেখে যাওয়া ছায়া, কখনও ভারী, কখনও হালকা, কখনও ঘাসফড়িঙের মতো ক্ষণিকের, কিন্তু তবু অমোচনীয়।

আর আমি, নিঃসঙ্গয়ে ওঠা মানুষ, সেই ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে এখনো শিখে চলেছি কীভাবে নীরবে হারাতে হয়, আর কীভাবে সব হারিয়েও কিছুটা আলো বহন করতে হয়।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...